সামথিং সামথিং : পর্ব ৭৬

আয়নার অপমান

আর জি কর হাসপাতালে লিফট-বিভ্রাটে একজন মর্মান্তিকভাবে মারা গেলেন, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের সামনেই। লিফটে লিফটম্যান ছিলেন না কেন? সাহায্য চেয়ে প্রাণপণ চিৎকার করলেও কেউ এলেন না কেন? সিকিউরিটি গার্ডরা কোথায় ছিলেন কী করছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর এই বাংলায় খুব একটা হয় না। তাঁরা হয়তো অন্যত্র গুলতানি করছিলেন, বা ঢুলছিলেন, বা মোবাইলে গান শুনছিলেন।

কিন্তু সেটাই তো প্রত্যাশিত। কাজের সময় যথাসম্ভব ফাঁকি মারব এবং নিংড়ে বিনোদন উপভোগ করে নেব, এ-ই কি আমাদের প্রায় সক্কলেরই মনোবাঞ্ছা নয়? বাংলার কর্মসংস্কৃতি জুড়ে কি একটা আকাশ-পাতাল ব্যাপ্ত হাই এবং ‘সাড়ে তিন ঘণ্টা টিপিন খাই’ যুগ-যুগ খচিত নেই? হ্যাঁ, সরকারি কর্মচারীদের কর্মবিমুখতাকে বিদ্রুপ করে বিখ্যাত গায়ক গান গাইলে, তাঁরা তেড়ে মারতে আসেন। কিন্তু ক্ষোভ তো অপদার্থতাকে ত্রাণ করে না। কেউ-কেউ নির্ঘাত কাজ করেন, অল্পসংখ্যক মানুষ অবশ্যই নিজের দায়িত্ব পালন করেন, এবং বেশিরভাগ লোক তাঁদের ঢালের আড়ালে আধশোয়া হয়ে— তৃণমূল না বিজেপি, মিম না হাট্টিমাটিম— জরুরি দ্বন্দ্বে ডুবকি লাগান। বেসরকারি ক্ষেত্রে, কড়া নজরদারির বৃত্তে, অনেকে উদ্যমী ও প্রয়াসী, কিন্তু সেই তৎপরতার পিছনে আছে শাস্তির ভয়। আমি মাইনে নিচ্ছি, সুতরাং আমি কাজ করব, কাজ না-করার প্রশ্নটা উঠছে কোত্থেকে— এই সহজ নীতি থেকে নিষ্ঠা জন্মানোর চল এ-রাজ্যে কম।

আরও পড়ুন : বাজবল বনাম কাজবল বিতর্ক! লিখছেন চন্দ্রিল ভট্টাচাৰ্য…

অথচ লোকের আত্মমূল্যায়নের মাপটাই হওয়া উচিত: নিজস্ব কাজের প্রতি নিবেদন। দোকানি, কেরানি, ডাক্তার, মিস্তিরি— প্রত্যেকেরই, দিনের শেষে নিজেকে সহ্য হচ্ছে কি না, তার মূল নির্ণায়ক হবে: আজ কেমন কাজ করলাম। প্রোমোশনের দিকে, আরও কাজের বরাত পাওয়ার দিকে এগোচ্ছি কি না। তার বদলে, জীবনের সার্থকতাটা আসছে আইপিএল বা রাজনৈতিক বিতণ্ডা কিংবা বেড়ালের কুস্তি থেকে। আগের যুগে আড্ডা আর রেডিওর গান আর বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঝিরিঝিরি হাওয়ায় গা-জুড়োনো দিয়েই নিশ্চয় দিন ওজন হত। তার মূল কারণ অবশ্যই: আমাদের অধিকাংশের কাজের সঙ্গেই প্রাণের যোগ নেই। ফলে কাজ থেকে কতটা মুক্তি পেলাম, কাজকে এড়িয়ে কতটা বিকেল চুরি করে নিলাম, তা দিয়েই বরং স্থির হয়, কতটা বেঁচে নিলাম। অনেকে এর মধ্যে পুঁজিবাদের কর্কশ চাকায় মানুষের সত্তা নিষ্পেষণ খুঁজে পাবেন। আর অনেকে বলবেন, রোজগারের জন্য বাধ্য হয়ে কাজ করতে হচ্ছে— তা বলে তা দিয়েই আমার দাম আমার কাছে ধার্য, এ তো আত্মার অবমাননা! মানুষ নিজেকে মাপবে তার সন্তানকে আদর করার, কিংবা রবীন্দ্রসংগীতে ডুবে থাকার মুহূর্তগুলো জড়ো করে। কাজ একটা তেতো বড়ি, সহ্য করতে হয়, কিন্তু তার বন্দনা শুরু করলে তো বিপদ।

সত্যিই, কাজকে প্রায় কেউই জড়িয়েমড়িয়ে ভালবাসে না। উপায় থাকলে ক’টা লোক আর কাজ করত? সকলেই লেপ জড়িয়ে নেটফ্লিক্স দেখত। কিন্তু তাহলে অনেক দেশেই, ট্রেন লেট করে না কেন? কেন এয়ারপোর্টে ইতিউতি তাকালেই সাহায্য করার লোক পাওয়া যায়? কেন পথের ধারে শৌচালয় তকতকে পরিষ্কার থাকে? কেন রাস্তাঘাট হয় গর্তহীন ও মসৃণ? নিশ্চয় সেখানে লোকে কমোড পরিষ্কারের মধ্যে, বা রাস্তায় সমানভাবে পিচ ঢালার মধ্যে আশ্চর্য জীবনানন্দ খুঁজে পায় না? তাহলে তাদের কাজে ত্রুটি থাকে না কেন? কারণ সেখানে কাজটা যথাযথভাবে সম্পন্ন করার মধ্যে লোকের আত্মসম্মান নিহিত থাকে। এমন হতেই পারে, আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে সনেট লিখতে চেয়েছিলাম কিন্তু পরিস্থিতির চাপে আমাকে ইঞ্জিনিয়ার হতে হল, এমনও হতে পারে সে-কাঁদুনি ঘেনিয়ে আমি বৈঠকখানায় সিমপ্যাথি-তরঙ্গ তুলি, কিন্তু তা আমার ব্যাঁকা ব্রিজ বানানোর অজুহাত হতে পারে না। প্রায় প্রতিটি মানুষই জীবিকা অর্জনের জন্য একটা কাজে জুতে গেছে, অফিস যেতে হবে ভাবলে কারওরই বুকে ফোয়ারা উত্থিত হয় না, কিন্তু কাজটা করলে ভালভাবেই করতে হবে— এ হল একটা স্বাভাবিক সংগতির বোধ। নিজের কর্তব্য থেকে চ্যুত না-হওয়ার মধ্যে ন্যায় ও ঔচিত্যের প্রেরণা আছে। আর, আমার কাজটা আমি ঠিকভাবে করি— এই কথাটা নীরবে নিজের মধ্যে বেজে চললে, তা থেকে আত্মশ্রদ্ধা উৎপন্ন হয়, যা মানুষের কাছে নিজেকে মূল্যবান করে তোলে। এমনকী, অন্য লোকে যদি তাকে খুব দামি না-ও মনে করে, ‘এমপ্লয়ি অফ দ্য মান্থ’ হিসেবে ছবি না টাঙায় এবং তার ঐকান্তিক চেষ্টাকে আড়-উপেক্ষায় গ্রহণ করে, তাহলেও সে আয়নায় তাকিয়ে স্বমর্যাদা অনুভব করতে পারে, এবং তা মানুষের জীবনের দুরন্ত প্রাপ্তি।

নিজের কাজ না-করা, কিন্তু তার জন্য টাকা নেওয়া— এ হল অসততা। অথচ আমাদের দেশে ও সমাজে সেই বোধ তৈরি করা হয় না। টাকার কথাটাও বড় নয়, আমার কাজটার একটা উপযোগিতা আছে এবং অন্য অনেকের কাজও এর ওপর নির্ভরশীল— এই বোধ থেকেই আসে নিজ কাজ নিপুণ ও দায়িত্ববদ্ধভাবে করার প্রয়াস, এ সমাজ-সচেতনতাও বটে।

আসলে, অলসরা পাশবালিশে বিবেক চেপে, আত্মমূল্য নিয়ে না-ভাবতে শিখে যায়। আয়নার অপমানকে কোঁৎ করে গিলে নেয়। ফাঁকিবাজিকে কৃতিত্বও ভাবে। বস-এর নজর এড়িয়ে কতটা ছাদে বেড়িয়েছি: অপরাধবোধটাকে বাহাদুরিতে পাল্টে নিলে, বিকৃত সহ-মনার হাততালি জোটে। নিজের কাজ না-করা, কিন্তু তার জন্য টাকা নেওয়া— এ হল অসততা। অথচ আমাদের দেশে ও সমাজে সেই বোধ তৈরি করা হয় না। টাকার কথাটাও বড় নয়, আমার কাজটার একটা উপযোগিতা আছে এবং অন্য অনেকের কাজও এর ওপর নির্ভরশীল— এই বোধ থেকেই আসে নিজ কাজ নিপুণ ও দায়িত্ববদ্ধভাবে করার প্রয়াস, এ সমাজ-সচেতনতাও বটে। জাপানের দর্শকরা বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখার পর নিজেদের ফেলা প্রতিটি আবর্জনা কুড়িয়ে নেন, জাপানি দল ড্রেসিং রুম পরিষ্কার করে দিয়ে যায়। না-করলেই হত। এ তো তাঁদের করার কথাই নয়। আমরা বোধহয় জাপানিদের শুচিবায়ুগ্রস্ত বলে হাসাহাসি করি। আমাদের বড় শিল্পীরাও সাক্ষাৎকারে বলেন, নিজের প্রতিভাকে আলস্যের বশে তাঁরা কদ্দূর নষ্ট করেছেন।

সে-সমাজে (বা সেই দেশে) লিফটে লিফটম্যান থাকলে এবং তিনি মন দিয়ে কাজ করলেই বরং অবাক হয়ে যাওয়ার কথা। একটা গোটা দেশ যে আদতে কুঁকড়ে আছে, গণ্ডগোঁয়ার ধর্মবাজি বা ক্রিকেটবাচক হুররে ছাড়া কোনও কিছুতেই বুক চাপড়ে অহংকার করতে পারে না, অবচেতনে বোঝে আমরা ফোঁপরা এবং দীন, কারণ অধিকাংশ লোকই ফাঁকিবাজ, অকর্মা। অচেষ্টা ও নিস্পৃহতা যেখানে ব্যত্যয় নয়, নিয়ম, গা-সওয়া ও প্রশ্রয়প্রাপ্ত, সেখানে শুধু হাসপাতালের সুপার বা রাজনীতির চাঁইদের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না। অফিসটাইমে নিজের মোবাইল-মশগুল মুখটাকেও থাবড়া মারতে শিখতে হবে।