হাংরি কিংবদন্তী
উৎপলকুমার বসু (১৯৩৭), সুবিমল বসাকের থেকে মাত্র দু’বছরের বড়। তাঁদের সম্পর্কটি ছিল যথেষ্টই সৌজন্যমূলক। হাংরি আন্দোলনের সদস্যদের মধ্যে, বিনয় মজুমদার ও মলয় রায়চৌধুরীর পাশাপাশি উৎপলকেও যথেষ্ট অ্যাডমায়ার করতেন সুবিমল। উভয়ের আলাপ ছ’য়ের দশকে, কলকাতায়। উৎপল নিজেও তখন হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। হাংরি লিফলেট হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কবিতা ‘পোপের সমাধি’। ১৯৬৪-র মে মাসে সুবিমল-সম্পাদিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ পত্রিকায় উৎপলের একটি কবিতাও প্রকাশিত হয়, যা পরবর্তীতে ‘আবার পুরী সিরিজ’ গ্রন্থের (১৯৭৮) অন্তর্ভুক্ত। কবিতাটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল ‘কবিতা’ শিরোনাম দিয়েই, যদিও তার একাংশ সম্পাদনার পর ‘চিঠিপত্র’ শীর্ষক কবিতার ৬ নং হিসেবে গ্রন্থিত; প্রথম লাইন— ‘উতল সিন্ধুর জলে উড়ে যায় উত্তরী তোমার’। পত্রিকার মুদ্রিত একই কবিতার অপর অংশ, ওই একই সিরিজের ৮ নং, সম্পাদনার পর গ্রন্থিত।
সুবিমলের ডায়েরিতে উৎপলের প্রথম বিস্তৃত উল্লেখ ৯.৫.৬৪ তারিখে। বিষয় মূলত উৎপলের মুখে অ্যালেন গিন্সবার্গের একটি কাহিনি। পড়ে নেওয়া যাক—
‘কফিহাউসে আজ প্রচণ্ড ভিড়। সুভাষ সুবো রামানন্দ আমি রয়েছি। উৎপলদা এলেন। শৈলেশ্বর নেই। উৎপলদা অ্যালেনের সম্পর্কে একটা ঘটনা বললেন। অ্যালেন যখন চিকাগোতে পিটারের সঙ্গে পথে ঘুরছিল, চিকাগোর টেডি বয় গুলো বড় ডেঞ্জারাস। অ্যালেন ও পিটার দূর থেকে তাদের দেখতে পেয়েছে যেন রকে বসে আড্ডা মারে। তাদর পাশ থেকে যাবার সময় তাদের টনটিং করেছে। ওরা দুজনে এগিয়ে গিয়ে পেছন ফিরে দেখতেই ওরা ছুটে আসে। অ্যালেনকে ধরে ওর গলার কাছে একটা ধার ছুরি বোলাতে থাকে, যার একটু ছোঁয়ায় গলা চিড়ে যাবে। পিটার ওটাকে জোক হিসেবে নিয়েছিল। সে হাসছে, ওদিকে অ্যালেনের অবস্থা কাহিল, সে পকেট থেকে বাইবেল বের করে গলার কাছে বাধা দিতে থাকে। যখন পীটারের হাসি পায় অ্যালেন তখন মরিয়া হয়ে ‘পুলিশ পুলিশ’ বলে চেঁচাতে ওরা পালিয়ে যায়। টেডি বয় গুলো বড় ডেঞ্জারাস সেখানে। উৎপলদা একখানি ঘড়ি কিনেছে ন’টাকা মাত্র তার দাম, মালায়া থেকে আনা।’
এর কদিন পরেই উৎপল পঞ্জাবে চলে যান। ফিরে আসেন জুলাই মাসে। ৭ জুলাই ১৯৬৪, সুবিমলের ডায়েরিতে উৎপল-সম্পর্কে দীর্ঘ এন্ট্রি পাওয়া যায়—
‘ …(কফিহাউসে) উৎপল এল। পাঞ্জাবে ডালহৌসীতে ছিল এতদিন। কলকাতায় যখন তুমুল হৈ-চৈ, সে তখন দূরে। এত চালাক যে প্রতিদ্বন্দ্বী পাবার পর কিছু লেখেনি এ সম্পর্কে। দেবীর কাছে চিঠিতে ডালহৌসীর ব্যাপার জানিয়েছে, এতটুকু জানতে চায়নি।
ডালহৌসীর গল্প বলছিল, ওখানে তিব্বতী বৌদ্ধদের ইংরেজী শেখায়। একজন ইংরেজ ছেলের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, সাংঘাতিক ছেলে। সারারাত তাজমহলে ছিল, ওখানে থাকার আইন নেই, কী করে গম্বুজের উপরে উঠে গ্যাছে, রাত কাটিয়েছে সেখানে, বললো, বাইরের লোকেরা বাংলাদেশের কবিতা বা সাহিত্যের ব্যাপারে তেমন করে ভাবে না, কিংবা হয়তো তাদের দেখা পায়নি সে।
উৎপল বলল, কাল সন্দীপন শক্তি দীপক সে ওরা মদ খেতে গিয়েছিল, এবং খাবার শেষে চৌরঙ্গীতে দাঁড়িয়ে অনেকের কাছ থেকে ভিক্ষে চেয়েছিল— মদ খাবার জন্য। এবং আধঘণ্টার মধ্যে প্রায় চারটাকা চাঁদা তুলেছে। গাড়ীর নম্বর লিখে রেখেছে, পরে ফেরৎ দেবে বলে। সুভাষ বলল, আপনারা বুঝি return দেবেন বলে ঠিক করে ভিক্ষে করেছেন? উৎপল সামলে নিয়ে বলল, ঠিক তা নয়, অন্যরা নম্বর লিখছিল। যাহোক ব্যাপারটা অ্যাডভেঞ্চার্স।
উৎপল বলল— হারাধনের সমালোচনাটা আমার ভালো লেগেছে, আমি ওকে চিঠি দিয়েছি এ সম্পর্কে। উৎপল বেশীক্ষণ বসলো না, একজন লোক [সম্ভবতঃ নচিকেতা ভরদ্বাজ] তাঁকে মদ খাবার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল। উৎপল বলল— শরীর ভালো নেই। উৎপল তার পরে বলল— আমার সম্পর্কে কেউ কিছু বললে আমি বলেছি প্রেস্টিজ ড্যামেজ স্যুট করবো। কলেজে বা public ইত্যাদির সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে কেস শক্ত হয়।’
১৯৬৩ সালে সতীন্দ্র ভৌমিক সম্পাদিত ‘এষণা’ পত্রিকায় মুদ্রিত হয় একটি নতুন পত্রিকা প্রকাশের বিজ্ঞাপন— ‘জেব্রা’, যার যুগ্ম সম্পাদক উৎপলকুমার বসু ও মলয় রায়চৌধুরী। ‘জেব্রা’ নামটিও উৎপলেরই দেওয়া। তবে ১৯৬৫ সালে অবশেষে সেই পত্রিকা যখন বেরোয়, উৎপল আর কোনও সংস্রব রাখেননি; মলয়ের একক সম্পাদনাতেই প্রকাশ পায় তা। ১৯৬৪-র সেপ্টেম্বরে বেরোয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘পুরী সিরিজ’; সুবিমলের ডায়েরিতে সংক্ষিপ্ত উল্লেখ (১৪.১১.৬৪) — ‘উৎপলের ‘পুরী সিরীজ’ বার হয়েছে। দিচ্ছে অনেককে। চটি বই।’ হাংরি জেনারেশনের কাব্যগ্রন্থ হিসেবে, কিছুক্ষেত্রে পরিচিত হয় সেটিও।
হাংরি জেনারেশনের যে-বুলেটিনটি (আগস্ট ১৯৬৪) অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়, সে-সংখ্যায় ‘কুসংস্কার’ নামের একটি কবিতা ছিল উৎপলের। অন্যদের সঙ্গে ওয়ারেন্ট জারি হয় তাঁর নামেও, যদিও গ্রেপ্তার হননি শেষাবধি। তবে কালক্রমে যোগমায়া দেবী কলেজে অধ্যাপকের চাকরি হারান তিনি। এ-ব্যাপারে মলয় রায়চৌধুরী তাঁর ‘হাংরি কিংবদন্তী’ বইয়ে লিখেছেন—
‘আর যাদের নামে ওয়ারেন্ট ছিল, তাদের আর গ্রেপ্তার করা হবে না তা ক্রমশ বোঝা যাচ্ছিল, যেমন অনেকসময়ে লালবাজারে বা আদালতে সুবিমল কিংবা বাসুদেব আমাদের সঙ্গে থাকতেন। উৎপলকুমার বসু আমাদের সংশ্রব ছেড়ে ছিলেন, সন্দীপনের সঙ্গে তখন তাঁর ভাব-মেলামেশা। কিন্তু তাঁর কলেজে তাঁকে হেনস্থা করা আরম্ভ হয়ে গেছে, একে মেয়েদের কলেজ তার ওপর হাংরি বদনাম। অশ্লীলতার অভিযোগে কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রথমেই চোখ-কান বুজে উৎপলকে ছমাসের জন্যে সাসপেন্ড করেন। সাসপেন্ড করার জন্যে কলেজের ওপর চাপ দিয়েছিলেন কিছু সাহিত্যিক। তারপর একটা এনকোয়ারি কমিটি পনেরো দিন অন্তর জেরা করত উৎপলকে, যেন প্যারোলে ছাড়া কয়েদি। লেখাটেখা পড়ে কমিটি রায় দেয় তার লেখা অশ্লীল। ফলে কলেজ থেকে বরখাস্ত হন। বরখাস্ত হবার পর যা পয়সা জমেছিল তাই নিয়ে উৎপল পাড়ি জমান ইংলন্ড। ওখানে গিয়ে আগের চেনা-জানা একজনকে বিয়ে করেন। তারপর বছর দশেক কাটিয়ে কলকাতায় ফেরেন, একেবারে আলাদা উৎপল, না এদিকের না ওদিকের।’
মলয়কে লেখা উৎপলের একটি চিঠিতে সেই সময়কার টানাপোড়েনের আভাস পাওয়া যায়—
13.2.65
Cal. 16
প্রিয় মলয়,
আপনার চিঠি ও টেলিগ্রাম এমন সময় পেলাম যে দ্রুত চলে যাওয়া সম্ভব হল না। যাই হোক কি ঘটল জানাবেন। আমার কলেজ একটি সাব কমিটি তৈরি করেছে তদন্ত করে দেখার জন্য। আমি leave with pay পেয়েছি।
কমিটি অন পোয়েট্রি সম্পর্কে আমি বিশেষ জানিনা। অ্যালেন আছে, এটুকু জানি। বিশদ করে লিখবেন বা ১৯ তারিখে যদি আসেন আলোচনা করা যাবে। এইরকম একটা সঙীন প্রস্তুত করা দরকার। আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল বলে, আপনার লেখা পছন্দ করি বলে, প্রচুর বিরুদ্ধতা সহ্য করতে হচ্ছে। নির্বুদ্ধিতা যে এত ব্যাপক তা আগে জানতাম না। দেখা যাক কি হয়। ইতি
উৎপল কুমার বসু
প্রায় একই প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় সুবিমলের ডায়েরিতেও। সন্দীপনের সঙ্গে সেদিন উৎপলের বাড়িতে হাজির সুবিমল, পরে শুধু দুজন। কী ঘটেছিল সেদিন (২৫.৬.৬৫)? ডাইরিতে নজর রাখা যাক—
‘…সন্দীপন তারপর উৎপলের বাড়ী যাবার কথা তুললো। গেলাম আমরা। উৎপলকে দেখালো, সন্দীপন এদের সঙ্গে ঠিক যোগাযোগ রেখে চলেছে। উৎপল আলু ভাজছিল। একা আছে। উৎপলের চাকরী গেছে এই H.G.’র জন্য। সেখানে অনেক গল্পো হলো। উৎপলের বাসায় অন্য ফ্ল্যাটে কাল সাপ আসা থেকে নিয়ে, বেনবেলার বন্দী অবস্থা…
…রাস্তায় উৎপলের সঙ্গে কি সব পরামর্শ করে কেটে পড়ল সন্দীপন। আমরা হেটে এলাম অনেকক্ষণ। উৎপল আমায় বললো— আপনার নাকি হিন্দি কালেকশন বেরোচ্ছে একটা! আমি বল্লাম— হ্যাঁ। আগে বাংলাটা বেরিয়ে নিক।…
হোটেলে খেতে খেতে বললো উৎপল— তার বাসার ঠিকানা পাল্টে দিয়েছে। লেকচারারশিপের জন্য অ্যাপ্লাই করছে চতুর্দিক। সমন্ না এলে কোর্টে হাজির হতে চায় না সে। সত্যজিৎ ‘মহাপুরুষ’ কেন চিত্রায়িত করলো? Self realization তো নয়। পরে ‘ভয়ে’-র কথা উঠলো। …উৎপল বলছিলো— এক ভদ্রলোকের কথা। যার কাজ ছিলো ফাঁসীর জায়গায় আঙুল তোলা। অর্থাৎ তারই নির্দ্দেশে ফাঁসী হওয়া। কথাগুলি সে নাকি স্বাভাবিক ভাবে বলছিলো। খুবই স্বাভাবিক ভাবে।’
মলয়ের মামলায়, উৎপল সাক্ষী দিতে গিয়েছিলেন আদালতে, ওই বছরই ১৪ জুলাই। আদালতের সেই কথোপকথন বিভিন্ন জায়গায় গ্রন্থিত হওয়ায়, এখানে পুনরুল্লেখ অপ্রয়োজনীয়। সুবিমলই যাবতীয় সওয়াল জবাবের নোট নিতেন। তবে ডায়েরিতে সে-সম্পর্কে লেখা সংক্ষিপ্তই— ‘ওদের সওয়াল জবাব আমি লিখলাম। জজ একবার উৎপলকে বলেছিল— আপনি সাধারণ লোক হিসেবে ওই কবিতাকে কি বলেন? উৎপল বললো— আমি আমাকে বাদ দিয়ে ভাবতে পারি না। আমি যে কবি— সেটা ভুলি কি করে?’
এর কয়েকমাস পরেই (ডিসেম্বর ১৯৬৫) উৎপল চলে যান লন্ডনে। সেখান থেকে সুবিমলকে লেখা দুটি চিঠি রয়েছে আমাদের সংগ্রহে। প্রথমটি ১৯৬৭-র আগস্ট মাসের।
U.K. BASU
90, Chesterton Road.
London. W. 10
17 August 1967
প্রিয় সুবিমল,
আপনার চিঠি পেলাম। তার আগে আপনার পাঠানো পত্রিকা ইত্যাদি পেয়েছি। এগুলি দেখে অর্থাৎ এই সব পত্রিকা প’ড়ে মন খারাপ হয়ে যায় এই জন্য যে ‘সমাজ’ থেকে কত দূর এই সব লেখা। প্রথমত আপনার কাগজ ‘প্রতিদ্বন্দ্বীর’ কভারে কিছু দার্শনিক (অর্থাৎ ডিডাকটিভ) স্লোগান। DEDUCTIVE স্লোগান পাঠককে তর্ক করার সুযোগ দেয় এবং আমরা বহু তর্ক করেছি। এবং সমাজ বা পাঠকের সঙ্গে তর্ক করার অর্থই হল ‘দূরত্ব’। চল্লিশ সালে/পঞ্চাশ সালে কলকাতার শিক্ষিত ভদ্রসমাজ, বুদ্ধদেব বসু, সত্যজিৎ রায়, সিগনেট প্রেস, বামপন্থী বাবুরা এ ধরণের যথেষ্ট তর্ক করেছেন। আজকাল এদেশে নানাধরনের ‘বোতাম’ চালু হয়েছে— এগুলো ছেলেমেয়েরা জামায়, কলারে, সার্টের বুকপকেটে লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এগুলি অনেক বেশি DIRECT, FUNNY এবং অভিনব। এখানে কতকগুলো নমুনা দিলাম:

আমার মনে হয় এই ধরণের স্লোগান অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ব, বস্তুত বহু বছর ধ’রে ক্রীশ্চান সাহিত্য, কলেজ শিক্ষা ইত্যাদি আমাদের যথেষ্ট BRAIN WASHING করেছে। আমরা এখনো বুঝতে পারি নি হয়তো যে সাহিত্য হৃদয়ের বিষয়, তর্কের বিষয় নয়। তাছাড়া এদেশে এবং সানফ্রানসিস্কোতে FLOWER CHILDREN-রা অর্থাৎ যুবকযুবতীরা ফুললতাপাতা নিয়ে খোলা মাঠে, গাছতলায় সভা করছে। পুলিস উৎপাত করলে— একটা করে ফুল হাতে গুঁজে দেয়। তর্ক করে না, ঝগড়া করে না। এরা এটাকে বলে FLOWER POWER।
আমার বাড়ির কাছে জর্জ ডাউডেন ব’লে একজন আমেরিকান কবি থাকেন। সে প্রায়ই আমার এখানে আসে এবং আপনাদের ব্যাপারে অত্যন্ত উৎসাহী। সে ALLEN GINSBERG-এর উপর RESEARCH করছে। ALLEN কলকাতায় থাকাকালীন যেসব ঘটনা ঘটেছিল তার একটা DETAIL LIST করছে সে। সে নিম্নলিখিত বইপরে চায় এবং তারজন্য প্রয়োজনীয় টাকাকড়ি দিতে প্রস্তুত।
1 উত্তরসূরী, Year 10, vol 1, oct-dec 1963
2 মহেঞ্জোদারো, 1963, যাতে ALLEN আছে
3 QUEST, No 36, JAN-MARCH 1963
4 কৃত্তিবাস যাতে ALLEN ইত্যাদিরা আছে
5 Illus. Weekly, 27 MAY, 1962
6 ASHok Sehani-র Address
আপনি এগুলো জোগাড় করতে পারলে তাকে AIRMAIL এ পাঠিয়ে দেবেন। তার ঠিকানা GEORGE DOWDEN, 40 HEREFORD ST. LONDON. W.2. সে আপনাদের জন্য মলয়ের কাছে বইপত্র টাকাকড়ি পাঠিয়েছে— কিন্তু আপনারা কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন না ব’লে— খানিকটা অবাক হয়েছে। আমি আপনাদের চিঠিপত্র, লেখা তাকে অনুবাদ করে শোনাই। সে খুবই impressed।
আমি এখানে নানাকারণে ব্যস্ত আছে। কিছুই লিখি না। ঘুরে বেড়াচ্ছি প্রচুর। কলকাতায় যাবার এখন কোনো ইচ্ছে নেই। পরে টাকাকড়ি হঠাৎ হাতে পেলে একবার কলকাতায় যেতে পারি।
মলয়ের CASE-টার হাইকোর্টে কি হ’ল আমাকে detail জানাবেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। এখানে অনেকে জানতে চায়। ALLEN এখন লন্ডনে— সেও কৌতূহলী। মলয় কি মাইনে, expences ইত্যাদি ফেরত পাবে?
আমি কিছু বই পাঠাবো পরে।
উৎপল
দীর্ঘ এই চিঠির প্রথমার্ধে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ পত্রিকার যে-সংখ্যাটির প্রসঙ্গ রয়েছে, সেটি ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত। কভারে লেখা যে-টেক্সটের প্রসঙ্গ উৎপল টেনেছেন, তা এই ধারাবাহিকেরই প্রথম পর্বে আলোচিত হয়েছে। এই চিঠিতে আরও দেখা যায়, জর্জ ডাউডেনের সঙ্গে সুবিমলের পরিচয় ঘটাচ্ছেন উৎপল। ডাউডেনের সঙ্গে পরবর্তীতে সুবিমলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সুবিমলের বাড়িতেও একাধিকবার আসেন তিনি। ডাউডেনের প্রায় প্রত্যেকটি কাব্যগ্রন্থ-সহ, তাঁর লেখা শতাধিক ইংরাজি চিঠি খুঁজে পেয়েছি সুবিমলের সংগ্রহে। এই চিঠিগুলি কখনও সম্পাদনা করে প্রকাশ করা গেলে, ডাউডেন-সুবিমল সম্পর্ক সহ বহু অজানা তথ্য উঠে আসবে পাঠকের দরবারে।
সুবিমলকে লেখা উৎপলের দ্বিতীয় ও শেষ যে-চিঠিটি খুঁজে পেয়েছি, তা ১৯৬৯ সালের—

/ June 1969
প্রিয় সুবিমল,
অনেকদিন আপনাদের কোনো খবরাখবর নেই। আশাকরি ভালো আছেন। গতকাল জর্জ এসেছিল— সে আজকাল ব্রাইটনে থাকে, মধ্যে মধ্যে এখানে আসে। কিছু বাংলা কাগজপত্র নিয়ে এসেছিল সে— এবং আপনাদের নিয়ে আলাপ আলোচনা হ’ল। আমি জুলাই মাসের শেষদিকে কলকাতায় যেতে পারি মাসখানেকের জন্য। দুটো সস্তা প্লেনটিকিট পাওয়া গেছে। তখন আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে। পথে কায়রোতে একদিন থাকতে হবে। এবং বোম্বাইতে গিয়ে কলকাতার টিকিট কাটতে হবে কারণ প্লেনটিকিট বোম্বাই অব্দি। বোম্বাইতে হয়ত কিছুক্ষণ (বা একটা দিন) থাকতে হবে। আপনাদের চেনা কেউ ওখানে থাকলে দেখা করতে পারি। ঠিকানা জানাবেন। অশোক সেহানীর বর্তমান ঠিকানা কি? তাকে পুনার ঠিকানায় চিঠি লিখে কোনো উত্তর পাই নি। যাইহোক আপনাদের চেনাজানা লোকজন থাকলে দেখা করব।
এখানে আমি নানা কাজে ব্যস্ত আছি। তার উপর এখন ভিসা, পাসপোর্ট, ইঞ্জেকশন ইত্যাদির তোড়জোড় চলেছে। আমরা বলাবাহুল্য খুবই উল্লসিত। আপনাদের খবরাখবর দিয়ে তাড়াতাড়ি চিঠি দেবেন।
ইতি
উৎপল

এ ছাড়া, সুবিমলের সংগ্রহে উৎপলের আরেকটি চিঠি পাওয়া গেছে। সেটি অবশ্য মলয় রায়চৌধুরীকে লেখা। চিঠিটি মলয় সম্পাদিত ‘জেব্রা’ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় (১৯৬৭) প্রকাশিতও হয়েছিল। ইতিহাসরক্ষার স্বার্থে, সেই চিঠির বয়ান তুলে ধরা হল—
U. BASU
90, Chesterton Road.
London. W. 10
10 April, 1967
প্রিয় মলয়,
আপনার চিঠি বেশ কিছুদিন হ’ল পেয়েছি। জর্জ ডাউডেন আপনার কাছে আমার ঠিকানা পেয়েছিল এবং তারপর কয়েকবার আমার এখানে এসেছিল। সে এবং তার স্ত্রী আমাদের বাড়ীর কাছেই থাকে। তারপর একদিন তার কবিতা পাঠের সভায় গিয়েছিলাম— সেখানে আরো কয়েকজন লেখকদের সঙ্গে আলাপ হ’ল। এ ধরণের আড্ডায় আমি আগেও গিয়েছি— কিছুটা ক্লান্তিকর, কিছুটা বোকা বোকা। এখানকার লেখা-সম্পর্কিত আবহাওয়া কলকাতা বা ন্যুইয়র্কের মতো নয়। সবাই বেশ হিসেবী এবং চতুর— আমাদের বয়েসী লেখকরা গ্রামের দিকে ছোটখাটো চমৎকার বাড়ি নিয়ে থাকে, গাড়ি আছে, দৈনিক এবং রবিবারের কাগজে লিখে পয়সা কামায়। সবাই socially ‘কনসাস’— সব চেয়ে মজার ব্যাপার হ’ল এখানে কোনো আকর্ষণীয় পত্রিকাও নেই— Encounter ইত্যাদি কেউ পড়ে না ওসব ধরণের কাগজ সদ্যশিক্ষিত কলোনী অঞ্চলে জনপ্রিয় (আফ্রিকায় বা ভারতবর্ষে)— কিন্তু আবার City Lights ধরণের পত্রিকাও নেই— আছে অজস্র কমার্সিয়াল বা হাফ-কমার্সিয়াল কাগজ, নয়ত New Society বা Spectator ধরণের সমাজ-সচেতন, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কাগজ। CREATIVE WRITER-দের কোনো প্রিয় কাগজ নেই। এমনকি বই-এর দোকানও খুব বেশি নেই। যেগুলি আছে সেগুলি অনেকটা আমাদের দেশের থ্যাকার স্পিঙ্ক ধরণের অভিজাত দোকান— যেখানে বইএর অর্ডার দেওয়া যায় এবং তারা সেগুলি চমৎকার কাগজে মুড়ে ‘রিবন’ দিয়ে বেঁধে দেয়। জর্জদের প্রিয় দোকান চারিংক্রশ রোডের উপর BETTER BOOK SHOP— এখানে এলে খানিকটা মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। এখানে অজস্র বই হেলাফেলায় ছড়ানোছিটোনো আছে। সেখানে শুক্রবার রাত্রে কবিতাপাঠ হয়। এদেশে লেখার ব্যাপারটা খুবই লঘু এবং সৌখিন। হয়ত অন্য medium of Art এটার integrity নষ্ট করে দিয়েছে— টেলিভিশন এবং সস্তার দৈনিক কাগজ হয়ত এরজন্য দায়ী।
জর্জএর সূত্রে অনেক বই পড়তে পাচ্ছি— এছাড়া এখানে আর আমি উল্লেখযোগ্য কিছুই করছি না বলতে গ্যালে। চাকরী করছি বলাই বাহুল্য। দেশে ফিরে গিয়ে আমার যতদূর ধারণা চাকরী পাওয়া কঠিন হবে। আমি আরো কিছুদিন এদেশে থাকতে চাই— কিছুদিন ইটালিতেও থাকতে চাই।
জর্জ সুবিমলের লেখা পড়ে খুবই moved. আপনি ওকে আরো কিছু অনুবাদ ইত্যাদি পাঠাতে পারেন। আপনাদের লেখা ইত্যাদি ছাপা হ’লে আমাকে পাঠাবেন এবং আপনাদের সকলের বর্তমান অবস্থা (পুলিশ, চাকরী) কেমন জানাবেন কেন না এখানে অনেকে আপনাদের খবর detail জানতে চায়।
আপনার সঙ্গে MIKE ALDRICH-এর যোগাযোগ আছে কিনা জানাবেন। তার ঠিকানা:
Michael R. Aldrich.
243 West Tupper Street. Apt 20.
Buffalo. New York. 14201. U.S.A.
সে মধ্যে লন্ডনে এসে আমার এখানে কিছুদিন ছিল। সে সম্ভবত Howard ইত্যাদিরা যারা আপনাদের Salted Feathers ছাপাচ্ছে সঙ্গে পরিচিত। সে-ও আপনাদের লেখায় উৎসাহী। তবে তার ধারণা কৃত্তিবাস গ্রুপ বেশি interesting। তাকে কৃত্তিবাস এবং H.G. সম্পর্কে detail তথ্যবহুল একটা লেখা পাঠাবেন। সে এ সম্বন্ধে কিছু লিখছে এবং কিছু কিছু ভুল ধারণা আছে।
আমি আপনাকে পরে নিশ্চয়ই কিছু বই পাঠাবো। এখানে একদল নতুন গ্রুপ ‘লিভারপুল পোয়েটস্’ কিছু চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
আপনাদের TALENT সম্বন্ধে আমি আগেও নিঃসন্দেহ ছিলাম এবং এখনো আছি। বস্তুত শৈলেশ্বর-এর মতো ‘ভয়াবহ’ কবিতা আর কেউ বাংলাদেশে লিখেছে কিনা সন্দেহ। এবং সুবিমলের ছাতামাতা Remarkable। আপনাদের নতুন লেখা বা বই পড়ার জন্য আমি যথেষ্ট উদগ্রীব। বাংলাদেশের অর্থাৎ কলকাতার ESTAB-LISHMENT এখন ভাঙার পথে— এবং আপনাদের সকলকেই এর সুযোগ নিতে হবে।
চিঠি দেবেন। ইতি
উৎপল
আমার ‘ইতিহাস’ তো মোটামুটি আপনাদের সকলেরই জানা। এ সম্বন্ধে আর বিশেষ কি লিখব!
দেবী রায়ের চিঠি পেয়েছি। পরে উত্তর দেব।
রাজকমলকে একবার আমার কথা মনে করিয়ে দেবেন।

উৎপল লন্ডন থেকে কলকাতায় পাকাপাকিভাবে ফেরেন ১৯৭৭ সালে। সে-বছর থেকেই, কফিহাউস ও অন্যত্র, আবার সুবিমলের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ শুরু হয়। তেমনই এক দিনের কথা সুবিমল লিখে রেখেছেন ডায়েরিতে (২৪.১০.৭৭)—
‘…কফিহাউসে উৎপল, দেবপ্রসাদ, গৌতম ঠাকুর এরা ছিল। উৎপল মধ্যমণি। ‘পুরী সিরীজ’ আবার বার করছে— এতে আরও কিছু কবিতা জুড়ে দেবে জানালো। উৎপল আজ গল্প করছিল, লন্ডনের জীবনযাত্রা সম্পর্কে। ওখানে কোন কবি’র সঙ্গে সখ্যতা হয়নি, অধিকাংশ অন্য সকলের যারা তাদের প্রকাশের mediumটা অন্যভাবে adopt করেছে। ফিল্ম, গান, ছবি— এইসব নিয়ে যারা হৈচৈ করেছে তাদেরই সঙ্গে কাটিয়েছে। বেশ মজার ব্যাপার। এবং, উৎপল serious ব্যাপারগুলোও খুব সহজ সাধারণ ভাবেই বর্ণনা করছিল।
একসময় আমাকে বললো, কবিতা সম্পর্কে আপনার ১টা লেখা পড়লুম। ভালো লাগলো। গালাগাল বটে তবে এ ধরণের লেখা উচিৎ। আসলে এক ধরণের লোক ভাবছে অন্যরা সুবিধা পাচ্ছে— আমরা পাবো না কেন?’
পরবর্তী বছরগুলিতে উৎপলকুমার বসুর সঙ্গে সুবিমলের যোগাযোগ কমে এলেও, ছিন্ন হয়নি একেবারে। উৎপল প্রয়াত হন ২০১৫-র ৩ অক্টোবর। তার দু’দিন পরেই, সুবিমলের বাড়িতে গিয়ে উৎপল-সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিচারণ ক্যামেরাবন্দি করি। সেই স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে আলাপ, বন্ধুত্ব, উৎপলের লেখা সম্পর্কে সুবিমলের দৃষ্টিভঙ্গি ও অন্যান্য। প্রাসঙ্গিকবোধে, সেই ভিডিয়োটিও সংযুক্ত করা হল এখানে—
দীর্ঘ উৎপল-প্রসঙ্গ পেরিয়ে, প্রভাত চৌধুরীর দুটি সংক্ষিপ্ত চিঠি দিয়ে এই পর্ব শেষ করা যাক। পত্রবিনিময় নব্বইয়ের দশকের শেষার্ধে হলেও, উভয়ের আলাপ যে ষাটের দশকেই হয়েছিল, তা সুবিমলের ডাইরি পড়ে জানা যায়। ১৯৬৮-র ৩ সেপ্টেম্বর, ডায়েরিতে লেখা—
‘সাউথে প্রভাত চৌধুরীর দলের সঙ্গে দেখা। ‘ধ্বংসকালীন কবিতা’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ওরা। রাজনীতি নিয়ে খুবই কচকচানি শোনা গেল। কবিতায় sex শব্দ ব্যবহারে দারুণ আপত্তি। ১ আধ লাইন কোট করে হাংরি কবিতার সমালোচনা করতে sex সম্পর্কে মোটামুটি আমার ধারনা জানালাম। প্রভাতের নানান কবিতাপত্রে নানান ধরনের কবিতা। এস্টাব্লিশমেন্টের দিকে ঝোঁক আছে। বিয়ে করতে যাচ্ছে। দাড়ি কেটেছে মেয়ে দেখতে যাবে বলে, টাই পড়বে— হ্যানত্যান।’
প্রভাতের চিঠিদুটি যে-সময়ে লেখা, সেই বছরগুলির ডায়েরি সংগ্রহে না-থাকায়, শুধুমাত্র বয়ানের উল্লেখ করেই রাশ টানতে হবে।

১।
প্রিয়
সুবিমলদা/
আপনার চিঠি পেলাম। এরকম চিঠি দেবেন না— এতে আমার Confidence বেড়ে যাবে, পরিণামে হয়ত ক্ষতিও হয়ে যাবে। আর আপনারা আমাকে যে পরিমান ভালোবাসেন, তাতে আমার ক্ষতি হয় এমন কিছুই করতে চাইবেন না।
এখন কবিতার কাছে যেতে চাইছি, কবে যাবো জানি না। এই যাত্রাপথে কিছু না পেলেও আপনাদের মতো বন্ধু পেলাম— এটা খুবই বড় প্রাপ্তি, আমার কাছে।
ভালোবাসা/
প্রভাত
৩১/৭/৯৭
২।
প্রিয় সুবিমলদা
কবিতা দুটি পেলাম, ইনল্যান্ডে।
গত সন্ধ্যায় সমীরদা এসেছিলেন, Meaning নিয়ে কিছু জানা গেল। মাঝে মাঝে মনে হয়, কত কম জানি, অথচ কত বেশি লিখি। কীরকম অন্যায় বলুন তো। এসবের জন্য শেষ বয়সে কেউ যদি ভীষণ শাস্তি দেয়, বেঞ্চির ওপর দাঁড় করিয়ে রাখে, তাহলে কী হবে। তা সহ্য করতে পারবো তো?
এইমাত্র শান্তনু ফোন করেছিল, ও রাতের দিকে আসছে। সুজিতেরও আসার কথা আছে।
বেশ আছি।
ভালোবাসা।
প্রভাত চৌধুরী
২৪.৮.৯৮
নয়ের দশকে, ‘কবিতা পাক্ষিক’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন প্রভাত। সেই পত্রিকার জন্যেই সম্ভবত কবিতার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সুবিমলের কাছে। সমীরদা— সমীর রায়চৌধুরী। শান্তনু— শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়, সুজিত—সুজিত সরকার।
২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রয়াত হন প্রভাত চৌধুরীও।
(ডায়েরি ও চিঠির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য



