তাঁর PUN-দোষের জন্য অনেকটাই দায়ি মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের বাবু শিবরাম। আর খানিকটা বোধহয় পারিবারিক বন্ধু শরৎচন্দ্র পণ্ডিত ওরফে ‘দাদাঠাকুর’। সাহিত্যিক-সম্পাদক বাবা পরিমল গোস্বামীর খাতিরে তাঁদের কৈলাস বোস স্ট্রিট-এর বাড়িতে শরৎ পণ্ডিতের যাতায়াত অনেকদিনের। হিমানীশ মোটামুটি ছোট থেকেই দেখছেন, তাঁর নিমেশে কথার পিঠে কথা বসিয়ে কথকতার দালান কোঠা বানানোর খোদকারি। দাদাঠাকুরের ব্র্যান্ড-ম্যাজিক। আর দাদা শতদলের সঙ্গে শিবরাম চক্রবর্তীর ‘মুক্ত-আরাম’-এর মেসবাড়িতে যাতায়াত শুরু আরও-একটু বড়বেলায়। সেখানে শিবরামের ‘তক্তারাম’ আর ‘রাবড়িচুন’-এর সংসারের সঙ্গে হিমানিশের সেই যে সেঁটে যাওয়া, সেই সম্পর্ক থেকে গিয়েছিল শিবরামের মৃত্যুর দিন অবধি। শিবরামের PUN-উন্মত্ততা মাঝে-মাঝেই কেমন মাত্রা ছাড়াত, এমনকী ক্ষতিকারকও হত (নিজের বেশি অন্যের কম), সেটা তার কল্লোল যুগের সঙ্গী-সাথীরা কেউ-কেউ লিখে গেছেন। কিন্তু দাদাঠাকুর বা শিবরাম কেউই বোধহয় ভাবেননি, যে-হিমানিশ-কে তাঁরা PUN-অভ্যেস ধরালেন, তাঁর কলমে সেই নেশাই কীভাবে, কখন, কতটা বিপজ্জনক বা রীতিমতো নাশকতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
তাঁর এই PUN বা শব্দখেলার অন্তর্ঘাতের এমনই একটা মারাত্মক নমুনা ‘আমার রামায়ণ’। ১৯৮৬ সালে একটি বিখ্যাত সাপ্তাহিকে (অধুনা পাক্ষিক) এই রম্য রচনাটি যখন প্রকাশিত হচ্ছে, রামমন্দিরের মুদ্দাখানি ভারতীয় রাজনীতির ঘোলা জলে সবে ভাসানো হয়েছে। সাহাবানু মামলার সরকারি অপকম্মটি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সবে বাবরি মসজিদের তালাটি খুলে দিয়েছেন। সংসদে বিজেপির আসন তখনও মাত্র দুটো। অযোধ্যা নিয়ে গেরুয়া ব্রিগেড তখন সবে গা গরম শুরু করেছে। ‘মন্দির ওঁহি বানায়েঙ্গে’-র স্লোগান তখনও ফিশফাশের চেয়ে একটু বেশি। তবে রামায়ণ-এর রামচন্দ্র যে, অযোধ্যার সমস্ত জায়গা ছেড়ে, বাবরি মসজিদের অন্দরে ঠিক নামাজ পড়ার চবুতরাটিতেই জন্মেছিলেন, এটা ততদিনে স্থির-নিশ্চিত হয়য়ে গেছে। কী করে প্রমাণ হল? অবশ্যই বিশ্বাস! আর কে না জানে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।
আরও পড়ুন: আজীবন রসবোধে নিমজ্জিত ছিলেন আমার বাবা হিমানীশ গোস্বামী!
লিখছেন হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়...
হিমানীশ-ও তাঁর আমার রামায়ণ-এর শুরু-শুরুতেই একই কায়দাতেই সাফাই দিয়েছিলেন— ‘অতীত কথা বলে ঠিকই, কিন্তু সে-ভাষণ বড় দুরূহ আর দুরূপ বলেই, বিশ্বাসের ওপরেই তাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ তারপর খুব লাজুক গোবেচারা ভঙ্গিতে বেশ একটা নিরীহ ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণার ছলে তিনি তাঁর PUN-এর বাণ ছুঁড়তে শুরু করেন।
তাঁর রামায়ণ-এ রাজা দশরথের রাজত্ব ভারত পেরিয়ে ‘অপরূপা’,‘অরূপা’, মানে ‘ইউরোপা’, অর্থাৎ ইউরোপ অবধি বিস্তৃত ছিল। আর রাম যে দশরথের কথায় ১৪ বছর বনবাসে গিয়েছিলেন, সেই বন আসলে কোনও জঙ্গল-অরণ্য নয়, সেটা হল অরূপার একটি প্রদেশ ‘জমদগ্নি’, মানে জার্মানির একটা বড় শহর বন। সেখানে একজন জংলি লোক, নিজের দখল কায়েম করে, নিজেকে রাজা ঘোষণা করে দেয়। বনের রাজা বলে লোকের কথায় তার নাম হয়ে যায়— রা-বন— সেখান থেকেই রাবণ। একা রাবণে রক্ষা নেই! এই সময়েই হুন-মানুষ, মানে হুনম্যান-রাও অরূপায় খুব ঝামেলা শুরু করে দেয়। এই ডবল ঝক্কি সামলাতেই দশরথের আদেশে রাম-কে বনবাসে, মানে অরূপায় তথা বনে যেতে হয়। সেখানে রাম অনেক কায়দা করে হুনম্যান তথা হনুমানদের দলে টেনে কীভাবে রাবণকে জব্দ করলেন, সে-সব অনেক গল্প।
‘আমার রামায়ণ’-এ এছাড়াও কিছু আঁশটে প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যাপার-স্যাপারও আছে। ১৯৮৬-তে সে-সব নিয়ে সমস্যা ছিল না। কিন্তু ২০১৪-য়, কঙ্গনা রানাওয়াত কথিত, ভারতের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের পরবর্তীকালে সে-সব কথা লেখা বা ছাপা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সে-সব বখেরায় না-যাওয়াই ভাল। এটুকু বলা যায়, হিমানীশের রাম শুধু ‘বন’-এ গিয়ে শান্তিই ফেরাননি— সত্যেন্দ্রনাথ দত্তর কবিতার বিজয় সিংহ-র মতোই গোটা অরূপা জুড়ে তাঁর অনেক কীর্তিচিহ্ন ও পরিচয় রেখে গিয়েছিলেন। যেমন রামের নামেই যে রোম নগরী প্রতিষ্ঠা, কিংবা রাম-ই যে অরূপার একটি রাজ্যের নাম রেখেছিলেন ‘রামায়ণী’, সেখান থেকেই রোমানিয়া নাম হয়েছে— হিমানীশ না জানালে তো আমরা জানতেই পারতাম না। অরূপা-জোড়া সেই রামরাজত্ব তথা ভারতীয় উপনিবেশ ভর্তিই নাকি রাম নামের ছড়াছড়ি। ফ্রান্সের একটা জায়গার নামই তো নাম বলিয়ে, মানে ‘জয় শ্রী রাম বল’। অরূপা-তে রামের জয়যাত্রাকে স্মরণীয় করে রাখতে, সেখানকার আস্ত একটা উত্তেজনা বর্ধক পানীয়র নাম-ই দেওয়া হল রাম!
সব মিলিয়ে ভাবতে গেলে গায়ের রোম খাড়া হয়ে যাওয়ার জোগাড়। এই ভারতের কত-কত দেশভক্ত, সনাতনি রাষ্ট্রবাদী, তথাকথিত ইতিহাসকাররা কবে থেকে বলে আসছেন, আর্যরা মোটেই বিদেশি নয়, সাচ্চা সনাতনি ভারতীয়। ভারতবর্ষ থেকেই তারা ইউরোপ বা অন্য এদিক-ওদিকে গেছে। ইউরোপের জংলিদের সভ্যতা-সহবত, রকেট সাইন্স থেকে প্লাস্টিক সার্জারি, নিউক্লিয়ার যুদ্ধ থেকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সবই শিখিয়েছে। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করছিল না, এতদিনে হিমানীশ এসবের ভাষাতাত্ত্বিক, পাথুরে প্রমাণপত্র দিলেন। আজকের রামপন্থী সনাতনি শাসকরা অবশ্য সে-জন্য হিমানীশ-কে মরণোত্তর খেতাব-পদক দেবেন না কি PUN সরিয়ে লেখার শাঁস অবধি পৌঁছে গিয়ে শতবর্ষীয় লেখককে নতুন করে হিন্দু বিরোধী দেশদ্রোহী, আরবান নকশাল-টকশাল বলে দাগিয়ে দেবেন— বলা মুশকিল। তবে তাতে পাঠকের কী এসে যায়! হিমানীশের অঝোর PUN-রস পান করতে চাইলে, তাঁর রম্যরচনার সংকলনে ‘আমার রামায়ণ’ খুঁজে নিন। তারপর ভিসুভিয়াস বা বিসুবিয়াস আগ্নেয়গিরির নামকরণ, রামের অরূপা অভিযানের কোনও বাঙালি সঙ্গী বিশু বিশ্বাসের নামের সূত্রে হয়েছিল কি না তাই নিয়ে মাথা ঘামান।
শব্দের ভাঙা-জোড়া, ইংরিজির ঘাড়ে বাংলা বা বাংলার ল্যাজে বাঁধা ইংরিজি তার সঙ্গে কল্পনার মুক্ত উদ্দাম হিস্টিরিয়া দিয়ে, পাঠকের মগজকে ঝাঁকিয়ে দেওয়ার দুর্ধর্ষ আয়োজন হিমানীশের শেষ বয়সের সৃষ্টি, দুনিয়ার এক আশ্চর্যতম অভিধান, ‘অভি-ধানাইপানাই’। ঝকঝকে হিউমার-বোধের সঙ্গে পিটার প্যান-সুলভ চিরকেলে ছেলেমানুষিপনা, স্রেফ ইয়ার্কি মারতে-মারতেই আচমকা ঝলসে ওঠা সমাজ-রাজনীতি সচেতনতা— বাংলা ভাষার এই সরসতম থেসরাস (Thesaurus) এই সবকটারই উপাদেয় মিশেল। সেখানে ‘নিরস্ত্রীকরণ’-এর মতো ভীষণ কূটনৈতিক শব্দ মানে পালটে হয়ে যায়, ‘ডিভোর্স’— স্বামীর তরফে স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদ। আর কেউ যদি এখানে মেলগেজ বা পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি খোঁজেন, তার হাতে-গরম জবাবও ‘অভি-ধানাইপানাই’-এই আছে। স্ত্রী যখন স্বামীর কাছে বিচ্ছেদ চাইবেন, সেটা হবে গো-স্বামী বা Go-স্বামী। মানে গোস্বামী মতে ডিভোর্স ফাইনাল। ওদিকে যে বারবেলা শব্দটাতেই শাস্ত্রমতে বিধিনিষেধের অনেক ত্রস্ত বেড়া, হিমানীশ সেখানে বিধিভাঙা ফুর্তির ফোয়ারা বইয়ে দেন। তাঁর শব্দকোষে বারবেলা হয়ে যায় Bar-বেলা, মানে পানশালা খোলার সময়। এ যদি অন্তর্ঘাত না হয়, তাহলে অন্তর্ঘাত আর কাকে বলে!


কোনও হাত-কচ্লানো ধানাইপানাই ছাড়াই হিমানীশ এ-অভিধান ভরে রেখেছেন এমই সব সূক্ষ্ম দস্যি নাশকতায়। ‘কলকাকলি’-র মতো অমন শান্ত-মধুর রম্য শব্দটাকে তিনি বদলে দিতে পারেন বাথরুমের কল থেকে লোহার বালতিতে ছ্যাড়ছ্যাড় করে জল পড়ার এতটুকু রোম্যান্স বিহীন নাগরিক শব্দে, মানে কল-কাকলিতে। লেখক হিমানীশ এমনই। বাঙালির চটচটে আবেগ বা ভস্ভসে হাসি তাঁর রস রচনায় পাবেন না। তাঁর ধরনটা খানিক বিলিতি। চারপাশের জীবন আর চরিত্রদের তিনি একটু তেরচা চোখে দেখেন আর মুচ্কি মতন হাসেন। তাঁর গল্পের চরিত্ররা, তা সে গোয়েন্দাই হোক কিংবা ভূত, হয় চরম সৃষ্টিছাড়া নয় অদ্ভুতুড়ে! তাঁর গোয়েন্দা কিট্টু লাহিড়ী একেবারেই বইয়ের গোয়েন্দাদের মতো স্মার্ট, সেরিব্রাল বা অ্যাকশন-পটু নয়। তদন্তের মাঝরাস্তায় সে মাঝেমাঝেই বেশ ঘেঁটে থাকে। মনখারাপ- হতাশায় ভোগে। এমনকী প্রায়ই ডিপ্রেশনে চলে যায়-যায়। আর কিট্টু লাহিড়ি-র ভক্ত পাঠকরা সে-জন্যই তাকে আর তার দেখভাল করা বাঘাকাকা-র জুটিকে এত ভালবেসে ফেলেন। এখানেই বাকি বইয়ের গোয়েন্দাদের সঙ্গে কিট্টুর অনেক তফাত হয়ে যায়। ওই সব গোয়েন্দাদের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্কে ভক্তি-শ্রদ্ধা মেশানো একটা মুগ্ধতা থাকে— খানিকটা পুজো-পুজো ভাব! কিন্তু শখের গোয়েন্দাকে পাঠক ভালবেসে ফেলছেন, এমন ম্যাজিক বোধহয় হিমানীশ-ই পারেন।
লেখক হিমানীশ এমনই। বাঙালির চটচটে আবেগ বা ভস্ভসে হাসি তাঁর রস রচনায় পাবেন না। তাঁর ধরনটা খানিক বিলিতি। চারপাশের জীবন আর চরিত্রদের তিনি একটু তেরচা চোখে দেখেন আর মুচ্কি মতন হাসেন। তাঁর গল্পের চরিত্ররা, তা সে গোয়েন্দাই হোক কিংবা ভূত, হয় চরম সৃষ্টিছাড়া নয় অদ্ভুতুড়ে! তাঁর গোয়েন্দা কিট্টু লাহিড়ী একেবারেই বইয়ের গোয়েন্দাদের মতো স্মার্ট, সেরিব্রাল বা অ্যাকশন-পটু নয়। তদন্তের মাঝরাস্তায় সে মাঝেমাঝেই বেশ ঘেঁটে থাকে। মনখারাপ- হতাশায় ভোগে।
তাঁর ভূতেরাও আর পাঁচটা পেতনি-শাকচুন্নি বা ব্রহ্মদত্তিদের মতো নয়। তাঁর ভূত-সমাজে দুর্নীতি, ফেরেব্বাজি, রাজনৈতিক ল্যাং মারামারি— সবই চলে। আবার সেখানেই আছে নানিয়াঁ-র মতো রীতিমতো র্যাডিক্যাল, আক্ষরিকভাবেই ‘আলোকপ্রাপ্ত’ ভূত। কারণ অন্য ভূতেদের মতো সে আলো দেখে ভয় পায় না। রামনাম শুনেও না। নাকি সুরে কথা বলাটাকে বদ-অভ্যেস বা পুরনো কুসংস্কার মনে করে। এমন প্রথাভাঙা প্রতিষ্ঠান বিরোধী নানিয়াঁকে স্বাভাবিক-ভাবেই একঘরে থুড়ি ‘একগেছে’ করে দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরেও সে হার মানে না।
হিমানীশ নিজেও সমাজ-রাজনীতির যে-কোনও গোঁড়ামি, অন্ধত্ব, অন্ধকারের বিরোধী ছিলেন। তিনি নিজেকে বলতেন ‘মার্ক্সবাদী’। তবে জার্মানির কার্ল মার্ক্স নয়, তাঁর আইডল ছিলেন হলিউডি-কমেডির অন্যতম প্রবাদ-পুরুষ গ্রাউচো মার্ক্স। গ্রাউচোর মতো তিনিও বলতেন, আমি যে-কোনও মতবাদেরই বিরোধী। তাঁর ছ-বছর লন্ডন-প্রবাসের ফসল ছ-পর্বের বিলিতি সিরিজ, সেখানেও তিনি ইংরেজদের যন্ত্রের মতো চলার প্রবণতা নিয়ে অনেক রঙ্গ-রসিকতা করেছেন, টিপিক্যাল হিমানীশিয় কায়দাতেই। তবে তাঁর ‘লন্ডন সমগ্র’, বাংলা ভ্রমণ তথা রম্য সাহিত্যের এক অতুল বা অতল রত্নভাণ্ডার। সে-খোঁজাখুঁজির পালা বরং অন্য কোনও পর্বের জন্য তোলা থাকুক। অন্য কোনও অভিযাত্রীর জন্য।




