অন্নদাশঙ্কর, বিনু, দেশ

তাঁর চেতনায় প্রভাব ছিল গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ আর তলস্তয়ের। রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘গায়ত্রীমন্ত্রে আমার উপনয়ন হয়নি। হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের কবিতায়।’ শিবনারায়ণ রায়ের সংশয় ছিল তাঁর গান্ধী ও তলস্তয়-প্রীতি নিয়ে। শিবনারায়ণের র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট মনে ‘ধর্মনির্ভর গান্ধী এবং শেষের দিকে প্রায় অতিনৈতিক টলস্টয়’-এর চিন্তা তেমন দাগ কাটেনি। কিন্তু চিঠিতে এই নিয়ে কথা চালানোর সময় তিনি শিবনারায়ণকে লিখেছিলেন— ‘আমার মনের বহু অংশ জুড়ে রয়েছে সমাজমন’… কিন্তু সৃষ্টি করবে যে সে আমার ব্যক্তি আমি, রসসৃষ্টি ব্যক্তি আমির কাজ।’ 

ভাবনার এই ধরতাইটুকু মনে রাখলে বোঝা যায়, কেন তিনি ‘স্বরবৃত্ত’ পত্রিকায় ‘আলটিমেট ট্রুথ’ প্রসঙ্গে মানব গঙ্গোপাধ্যায়কে নিজের বিশ্বাসের কথা জানাতে গিয়ে বলেছিলেন— “Ultimate truth-কে শুধুমাত্র intellect দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। Intellect-এর যে  highest flight সেও সেখানে পৌঁছোতে পারবে না। তার জন্য দরকার হয় প্রধানত প্রেম। ‘বিনা প্রেমসে না মিলে নন্দলাল’ ভালোবাসা না থাকলে ভগবানকে পাওয়া যায় না। তেমনই ultimate truth-কেও প্রেম দিয়েই পেতে হয়, সেই utimate truth-ই ভগবান। দ্বিতীয়ত, intellect দিয়ে যেখানে পৌঁছানো যায় না সেখানে intuition দিয়েই পৌঁছোতে হয়।” কথাগুলো পড়ে অবধারিতভাবে আমাদের কী মনে পড়বে না— সফলতা আর নিষ্ফলতার টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত জীবনানন্দের কথাগুলো, ‘অনেক বিদ্যার দান উত্তরাধিকারে পেয়ে তবু/ আমাদের এই শতকের বিজ্ঞান তো সংকলিত জিনিসের ভিড় শুধু— বেড়ে যায় শুধু;/ তবুও কোথাও তার প্রাণ নেই বলে অর্থময়/ জ্ঞান নেই আজ এই পৃথিবীতে; জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই।’ অন্যদিকে ১৯৩৬ সালে, প্রথম প্রগতি সাহিত্য সম্মিলনে মুনশি প্রেমচন্দ তো পরিষ্কার জানিয়েছিলেন, নীতিশাস্ত্র আর সাহিত্যশাস্ত্রের মূল লক্ষ্য একই। বঞ্চিতের পক্ষ নিয়ে সমাজের আদালতে সওয়াল করাটাই নাকি সাহিত্যিকের কাজ। আসলে নৈতিকতা আর আর্ট নিয়ে তকরার অনেককালের। 

যাঁর কথা বলতে বসে এই গৌরচন্দ্রিকা, তিনি বিশ্বাস করতেন মুক্তচিন্তায়। ‘রি-থিঙ্কিং’-এ। চেতনার বদ্ধতায় দম বন্ধ হয়ে আসত তাঁর। অল্পবয়সে ওড়িয়া ভাষায় ‘সবুজ সাহিত্য’-র অন্যতম হোতা ছিলেন, তারপর থেকে জীবনের দীর্ঘ পথে কখনো চিন্তার ক্লীবতায় ভোগেননি। অন্নদাশঙ্কর রায়ের বিশ্বাস ছিল— ‘কোনোরকম অন্ধতাই ভালো নয়, সে ভক্তিই হোক, বিশ্বাসই হোক। সব কিছুকে বিচার করে নেওয়া চাই।’ প্রসঙ্গত বলে রাখি, জীবনানন্দকে তিনি মনে করতেন— ‘যতদুর মনে হয়, জীবনানন্দই আমাদের শুদ্ধতম কবি।’ অন্নদাশঙ্কর রায়ের চেতনার বেলাভূমিতে সংকীর্ণতার কোনও জায়গা নেই, দর্শনের নামে মতবাদের দাসত্ব নেই। সবটাই মানবকেন্দ্রিক ও মুক্তচেতনার ওপর দাঁড়িয়ে। নইলে চুরানব্বই বছর বয়সে নিজের নতুন প্রবন্ধ-বইয়ের নাম দেওয়া যায়— ‘নতুন করে ভাবা’ ? তিনি আমাদের বুঝিয়ে গেছেন ভাবা একটা অনিঃশেষ প্রক্রিয়া, যার শুরু থাকতে পারে কিন্তু শেষ বলে কিছু হয় না। শেষ মানে মৃত্যু। তাঁর লেখায় চোখ রাখলে আমাদের চকিতে মনে পড়ে যাবে রবীন্দ্রনাথ- গান্ধী-তলস্তয়-রাসেলরাই আমাদের পিতৃপুরুষ— পুব বা পশ্চিম গোলার্ধের কোনও রাষ্ট্রনেতা নয়।

অন্নদাশঙ্কর রায়

আরও পড়ুন : শোভনলাল সাহাই ছিলেন হিন্দুস্তান রেকর্ডের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল! লিখছেন রাজীব চক্রবর্তী…

অন্নদাশঙ্করকে একটু কাছ থেকে জানতে ‘বিনুর বই’-এর বিকল্প কিছু নেই। বাংলা ভাষা এমন বই বারবার পাবে না। ‘বিনুর বই’ এক অর্থে অন্নদাশঙ্করের সৃজনের আত্মকথা। জামশেদপুরে প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে বক্তৃতা করতে গিয়ে ‘বিনু’-র প্রথম অবতারণা। ‘বিনুর বই’ লেখা হয়েছিল ১৯৪৪ সালে— লেখকের চল্লিশ বছর বয়সে। অন্নদাশঙ্কর জানিয়েছেন, ‘যৌবন তখনও অস্ত যায়নি। শরীর ও মনের যথেষ্ট শক্তি ছিল। দিনের পর দিন এক এক পৃষ্ঠায় একে একটি অনুচ্ছেদ লিখতুম। লেখা কলমের মুখে আপনি আসত, তাকে সাধতে হত না। ভাবনাও আসত আপনি, তার পিছনে ছুটতে হত না।’ সে-ভাবনার গভীরতা কিন্তু তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। টুকরো-টুকরো ভাবনাগুলোর নাম ‘দোরোখা নীতি’, ‘কর্তব্য’, ‘স্টাইল’, ‘কস্মৈ দেবায়’, ‘শ্রেণীসাহিত্য’, ‘দায়’, ‘লিখব না বাঁচব’, ‘আপনাকে চেনা’, ‘ডায়ালেকটিক’, ‘আর্ট ফর আর্টস্ সেক’, ‘প্রেরণা’, ‘সাহিত্যের সত্য’— এই রকম। 

‘দোরাখা নীতি’ আজকের জেন্ডার পলিটিক্সে আলোচিত বিষয়। কিন্তু সেকালেই বিনু উপলব্ধি করেছে— ‘নারীর এক বার পদস্খলন হলে সে যাবজ্জীবন পতিতা, অথচ পুরুষের পতন নেই একদিনও। স্ত্রী থাকতে স্বামী অকারণে আবার বিয়ে করে, কিন্তু স্বামী থাকতে— এমনকী, স্বামীর মৃত্যুর পরেও— স্ত্রী সকারণে আবার বিয়ে করতে পারে না। বিধবার তবু আইনের বাধা নেই, পতি-পরিত্যক্তার সেদিকেও বাধা। নির্যাতিতার দৈব সখা, মানুষ তার শরীরের কষ্ট লাঘব করতে পারে, কিন্তু মনের ওষুধ জানে না, জানলেও কিছু করবে না। রবীন্দ্রনাথের নারীচরিত্রের দশা দেখে কবির প্রতি তার অভিযোগের ভাব এল, ঠিক একই কারণে শরৎচন্দ্রের প্রতি মাথার পাগড়ি খুলে পায়ে রাখার ভাব। ইবসেনের প্রতিও। ইবসেনই তো নাটের গুরু।’

অন্নদাশঙ্করকে একটু কাছ থেকে জানতে ‘বিনুর বই’-এর বিকল্প কিছু নেই

তবে বিনু কালাপাহাড় হতে চায়নি। নদীর একটি কূল ভাঙলে অন্য কূল গড়ে— সে দ্বিতীয়টায় বেশি আকৃষ্ট হয়। শুধু গড়া নয়, কী গড়া তাও বুঝতে শেখে। ওমর খৈয়ামের মতো কল্পসহচরীকে বলে, ‘Ah, Love could thou and I with Fate conspire/ To grasp this sorry Scheme of Things entire,/ Would not we shatter it to bits— and then/ Re-mould it nearer to the Heart’s Desire!’ তখন তার নিজের আইডেনটিটি নিয়ে প্রশ্ন জাগে— ‘কী তবে সে ? যার কোনো লেবেল নেই। নিশ্চিহ্নিত মানুষ।’ আবার, ‘স্টাইল’ লেখাটিতে বিনু বলে, শিক্ষানবিশির কথা। প্রমথ চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজির শিক্ষানবিশি করার একমাত্র উদ্দেশ্য নিজেকে চেনা। ‘আর্ট ফর আর্টস্‌ সেক’-এ বিনু বলে, ‘আর্টের মানদণ্ড আর্টের ভিতরে। তাই তার সার্থকতা আর্ট হওয়াতে। আর যা-কিছু তা অধিকন্তু। তাতে দোষ নেই। কিন্তু আর্টের উদ্দেশ্য সেটা নয়, উপায় তো নয়ই।’

আসলে সাহিত্যের সত্য সম্পর্কে অন্নদাশঙ্করের স্পষ্ট ধারণা ছিল— বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিক সত্যের সঙ্গে সাহিত্যিক সত্যের তিনি তুলনা হয় বলে মনে করতেন না। সাহিত্যের কাজ জ্ঞানের সীমা বাড়ানো নয়, তা করবে দর্শন-বিজ্ঞান। কিন্তু সাহিত্য মানুষের মনকে এক পলকের জন্যও নিরস হতে দেয় না। সবুজ রাখে। সভ্যতার ইতিহাসে সাহিত্যের সত্য হাজার হাজার বছরে বদলায়নি। ‘জীবন-মরণ সুখ-দুঃখ নিয়ম-প্রকৃতি বিরহ-মিলন প্রেম-অপ্রেম-এদের নিয়ে অন্তহীন আদিহীন বিশ্বপ্রবাহ’। এই পর্যন্ত পড়ে যাঁদের মনে হবে ‘বিনুর বই’ সাহিত্যের নন্দনতত্ত্বের বই, তাঁরা ভুল ভাবছেন। বিষয় কতকটা সেরকমই— কিন্তু লেখার গুণে তা একেবারেই ‘শুষ্কং কাষ্ঠং’ নয়। আর দ্বিতীয় পর্বে হালকা আড়াল রেখে নিজের জীবনের কথাই বলেছেন অন্নদাশঙ্কর। 

‘চতুরঙ্গ’ বইয়ের ‘ফরাসী-বাঙলা’ লেখাটিতে সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছিলেন— “ফরাসী ভাষার সর্বপ্রধান গুণ তার স্বচ্ছতা, তার সরলতা। ফরাসীরা নিজেই বলেন, ‘যে বস্তু স্বচ্ছ (ক্ল্যার, ক্লিয়ার) নয় সে জিনিস ফরাসী নয়।’ আমাদের দেশে আজকাল যে দুর্বোধ্য অবোধ্য পথ্য বেরয় সে ‘মাল’ প্রথম যখন ফ্রান্সে বেরতে আরম্ভ করল তখন গুণী আনাতোল ফ্রাঁস বলেছিলেন, ‘যে মধুর ললিত বয়সে মানুষ অবোধ্য জিনিস ভালোবাসে আমার সে বয়স পেরিয়ে গিয়েছে; আমি আলো ভালোবাসি।’ তাই আরেক গুণী শেষ কথা বলেছেন, ‘স্বচ্ছতা, স্বচ্ছতা, পুনরপি স্বচ্ছতা।’”

অন্নদাশঙ্করের লেখায় (তা সে গদ্য-পদ্য-আখ্যান— যাই হোক না কেন) আমি এই স্বচ্ছ আলো দেখি। তা যেমন তাঁর আড়ম্বরহীন গদ্যের কারণে, তেমনই চিন্তার স্বচ্ছতার কারণে, এবং এর পিছনে প্রমথ চৌধুরীর প্রতি তাঁর অনুরাগ একটা প্রাথমিক কারণ হলেও হতে পারে। প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর বহুকালের সম্পর্ক। 

মুক্ত চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়

আজকের ভারতে সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্তে অন্নদাশঙ্করের লেখালিখির একটা বাড়তি গুরুত্বও রয়েছে। নতুন করে ভাবতে বসে, তিনি স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেই শঙ্কিত হয়েছিলেন এই অনুভব করে যে, দেশ চলছে গান্ধীর ভাবনার বিপরীত পথে। পরমাণু বোমা তৈরি করে আমরা গর্বিত হচ্ছি। দেশের প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বেড়েছে এক্সপোনেনশিয়াল গতিতে। তিনি দেখে গেছেন বাবরি মসজিদ ভেঙে রামমন্দির নির্মাণের তোড়জোড়। আর আমরা সেই সময়টাও পেরিয়ে আজকের দিনে বেঁচে আছি। সমাজ-রাজনীতির ডিসকোর্সগুলোর প্যারাডাইম দ্রুত বদলাচ্ছে। নতুন গাড্ডায় পড়ছি প্রতিদিন। 

মৌলবাদ নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল, সেই সংকট থেকে উত্তরণের কথাও আছে তাঁর লেখায়। বাংলাদেশে ১৯৯৫ সালে সালাম আজাদকে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন— ‘মৌলবাদের রুট হচ্ছে শাস্ত্র। আর এক শ্রেণির অবুঝ, স্বার্থান্বেষী, উন্মাদ লোক ওদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। মৌলবাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রাচীনকে ধরে রাখা। এরা পড়ে রয়েছে মধ্যযুগে। প্রগতিশীল, আধুনিক চিন্তাকে এরা সব দেশে, সব সময়ে বাধা দিয়ে আসছে। এরা আমাদেরকে স্বকীয় বিশ্বাস নিয়ে থাকতে বাধা দিচ্ছে। মৌলবাদীরা প্রগতিশীল ব্যক্তিদের জেলে দিতে চাইছে, ফাঁসি দিতে চাইছে। শুধু হিন্দু বা মুসলিম মৌলবাদীই নয়, খ্রিস্টান, ইহুদি প্রভৃতি মৌলবাদীরাও প্রাচীন শাস্ত্রে বিশ্বাসী। পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন, সব মৌলবাদের উদ্দেশ্য এক। কোন প্রগতিশীল ব্যক্তি কিন্তু মৌলবাদীদের আঘাত করছে না। আমরা আধুনিক চিন্তা চেতনা নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই। মৌলবাদ যত শক্তিশালীই হোক-না, তা ক্ষণস্থায়ী। কারণ ওঁর ভিত্তি অবৈজ্ঞানিক, মধ্যযুগীয়।’ 

স্বাধীন ভারতবর্ষে সেকুলারিজমকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল তাতে তাঁর সায় ছিল। ‘যে-দেশে বহু ধর্ম বহু ভাষা’ প্রবন্ধটি তিনি শুরুই করেছিলেন এইভাবে⎯ 

‘যে-দেশে বহু ধর্ম সেদেশের মূলনীতি কী হওয়া উচিত? এ প্রশ্নের উত্তর পাকিস্তান একভাবে দিয়েছে। ভারত দিয়েছে অন্যভাবে। পাকিস্তানের অধিকাংশের ইচ্ছা অনুসারে স্থির হয়ে গেছে পাকিস্তান হচ্ছে ইসলামি রাষ্ট্র।

সেই যুক্তি অনুসরণ করলে ভারত হতে পারত হিন্দু রাষ্ট্র। কিন্তু ভারত করল অপর একটি যুক্তি অবলম্বন। ভারতের মতে সব ধর্মই সমান, সব ধর্মই সত্য, সংখ্যাগুরুর মুখ চেয়ে একটি ধর্মকেই রাষ্ট্রধর্মে পরিণত করলে আর-সব ধর্মের ওপর অবিচার করা হবে, সুতরাং সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সর্বোদয়ের বিচারে সকলের প্রতি সমদর্শিতার খাতিরে ভারতকে হতে হবে সেকুলার স্টেট। যে রাষ্ট্র ধর্মের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ।…

ভারত সেকুলার স্টেট হয়ে বর্মা ও পাকিস্তানের দশা এড়িয়েছে। সেকুলার স্টেট যতই দৃঢ় হবে গণতন্ত্রও ততই দৃঢ় হবে। অনেকেই এটা হৃদয়ঙ্গম করেছেন, কিন্তু সকলে এখনও করেননি। তাঁরা চান হিন্দু রাষ্ট্র, হলই-বা সেটা ফ্যাসিস্টশাসিত।

ইতিহাস এঁদের বাসনা পূর্ণ করলে ভারতেরও দশা হবে পাকিস্তান বা বর্মার মতোই।’  

আসলে সাহিত্যের সত্য সম্পর্কে অন্নদাশঙ্করের স্পষ্ট ধারণা ছিল— বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিক সত্যের সঙ্গে সাহিত্যিক সত্যের তিনি তুলনা হয় বলে মনে করতেন না। সাহিত্যের কাজ জ্ঞানের সীমা বাড়ানো নয়, তা করবে দর্শন-বিজ্ঞান। কিন্তু সাহিত্য মানুষের মনকে এক পলকের জন্যও নিরস হতে দেয় না। সবুজ রাখে। সভ্যতার ইতিহাসে সাহিত্যের সত্য হাজার হাজার বছরে বদলায়নি।

এর পরে অন্নদাশঙ্করের দূরদর্শিতা নিয়ে কোনও প্রশ্নই ওঠে না। আবার ‘চেতাবনি’ প্রবন্ধে তিনি অভিভাবকের প্রাজ্ঞতায় আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন ধর্ম থাকবে, নইলে মানুষের চলবে না। রাষ্ট্রও সম্ভবত থাকবে। তিনি ধর্মের সঙ্গে ঝগড়া চুকিয়ে নিতে চান। তাঁর সহজ যুক্তি—

“ধর্মও থাকুক, রাষ্ট্রও থাকুক, কিন্তু জোড়া লেগে ধর্মরাষ্ট্র না হোক। বকও ভালো, কচ্ছপও ভালো, কিন্তু সুকুমার রায়ের ছড়ার সেই ‘বকচ্ছপ’ ভালো নয়। সেকুলার স্টেট সকলের কাছে সমান আনুগত্য দাবি করে, তাই সকলের প্রতি তার সমান অপক্ষপাত। হিন্দু রাষ্ট্র সকলের প্রতি সমান অপক্ষপাতী হতে পারে না, কাজেই তার প্রতি সকলের সমান আনুগত্য সম্ভব নয়। আনুগত্যের প্রয়োজনই নির্দেশ করে দিচ্ছে অপক্ষপাতের প্রয়োজন। আমাদের কর্তাদের ব্যবহারে একচুল পক্ষপাত এসে পড়লেই আমাদের জনসাধারণের আনুগত্যে চিড় ধরবে। তাতে কর্তাদের কী ! তাঁরা তো গঙ্গার দিকে পা বাড়িয়েই বসে আছেন। কিন্তু ভুগবে ভবিষ্যৎ বংশ।… 

ধর্ম নিজের পায়ে হাঁটতে শিখুক। ঘোড়ার পিঠে চড়া ছেড়ে দিক। ঘোড়ার পিঠ থেকে তাকে নামতে হবেই। কেউ-না-কেউ তাকে নামাবে। আমরা ধর্মের শুভানুধ্যায়ী বলেই তাকে পরামর্শ দিই— বাপু তুমি মন্দিরে থাকো, মসজিদে থাকো, গির্জায় থাকো, গৃহে থাকো, বেদিতে থাকো, মর্মে থাকো কিন্তু রাজদ্বারে যেয়ো না। রাজপুরুষদের মাথায় উঠো না। রাজকোষের অর্থ নিয়ো না। আজ নাহয় ওরা তোমার দৌলতে জনপ্রিয় হবে, জনতার ভোট পাবে, কিংবা উপরওয়ালার নেকনজর; কিন্তু কাল যখন ওরা তলিয়ে যাবে তখন তুমিও তো তলিয়ে যাবে ওদের সঙ্গে। অতএব সময় থাকতে নিরস্ত হও। তুমিও বাঁচবে, ওরাও বাঁচবে। আর নয়তো তোমার ভক্তরাই তোমাকে সাবাড় করবে।…”

আজকের ভারতে এমন পরিচ্ছন্ন মনের সত্যিই অভাব। আমরা ভুলতে বসেছি আমাদের অতীত, আমাদের ভবিষ্যতের পরোয়া নেই, আমরা বিস্মৃত হয়েছি ‘সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী’-টুকুও। আমাদের দেশে সেকথা মনে করিয়ে দেবার মতো মানুষও পাল্লা দিয়ে কমছে। জীবননান্দ তো বলেইছিলেন এই সব মানুষের হৃদয় এখন ‘শকুন ও শেয়ালের খাদ্য’। তাৎক্ষণিকতায় এমন আত্মসমপর্ণ করে বসেছি আমরা, যে দূরের জিনিস দেখতে ভুলে গেছি। একটা জাতি আজ মায়োপিয়ায় আক্রান্ত। আর এখানেই লেখক হিসেবে অন্নদাশঙ্কর আমাদের জাগিয়ে রাখেন, উদ্বুদ্ধ করেন, দূরের জিনিস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন— ‘আমি তোমার শৌখিন লেখক নই, না লিখলেও যার চলে। অথবা নই পেশাদার লেখক, না লিখলে যার চলে না।’