উল্টো দূরবিন: পর্ব ৮

ফেলে আসা গান

ওরা এখনও সেই ফুটফুটে, শিখার বিনুনিতে লাল ফিতে, বিদ্যুৎ-এর দাঁত পড়ে গেছে। আলো, ঘাগরা ফ্রক পরে গোল হয়ে ঘুরছে। ওর ঘাঘরা ফ্রক উঁচু হয়ে ঘুরছে।

শিখার বাবা গান শেখাতেন। বড়বড় মেয়েরা গান শিখতে আসত। শিখার বাবা সব রকমের গানই শেখাত। ‘দূর দীপ বাসিনী’, ‘শুকনো পাতায় নূপুর বাজে’, এই গানটায় ‘…ঝিলিমিলি ঝিলিমিলি ঢেউ খেলিয়া যায়…’ শুনবার জন্য কান খাড়া করে রাখতাম। ‘মায়ের পায়ের জবা হয়ে’, ‘ফুল বলে ধন্য আমি’, ‘এই আসন তলে মাটির পরে’, ‘আমার সোনার হরিণ চাই’— এরকম সব গান। কোনটা নজরুল গীতি, কোনটা শ্যামা সংগীত কোনটা ভজন বুঝতাম না তখন। গান মানে গান। তখন গান শুনতাম পিসেমশাইয়ের রেডিও-তে আর মায়ের গলায়।

আমার মা সময় পেলে গান গাইতেন। মায়ের সময় পাওয়াটাই ছিল মুশকিল। শিখার বাবা ননীবাবু কোনও এক প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করত। কী কোম্পানি মনে নেই। ওদের কোম্পানিতে বোনাস হত। শিখা বলত, বোনাসের টাকা পেলেই আমরাও রেডিও কিনব। আমার বাবার বোনাস ছিল না, তাই আমরা ওসব ভাবতাম না। কিন্তু পুজো চলে গেল, শিখাদের রেডিও কেনা হল না।  শিখা বলেছিল, সামনের বছর বোনাস পেলে বাবা কিনবেই, কিনবেই, কিনবেই।

প্লাসটিকের পুতুলরা প্রণাম করত তাদের ঘাড়ে স্প্রিং বসানো মাথা নাড়া দাদুকে! পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব: ৭

সিঁড়ির কোণায় ঘুঁটের বস্তা রাখা নিয়ে শিখার মায়ের সঙ্গে আমার মায়ের ঝগড়া হয়েচ্ছিল। কথাবার্তাই বন্ধ হয়য়ে গিয়েছিল। একদিন আমার বোন, আপন মনে সোনার হরিণ গাইছিল, শিখা আমার বোনকে বলেছিল— এটা আমাদের গান গাইছিস, লজ্জা করে না? তোদের সঙ্গে তো আমাদের ঝগড়া। সত্যিই তো। গানটা তো শিখাদের ঘর থেকেই ক্রমাগত এসেছে।

শিখার বাবার কোনও ছাত্রী টাকা দিয়ে এই গানটা শিখেছে, শিখার বাবা বারবার গেয়েছে, আমার বোন সেটা চুরি করেছে। আমার মা বোধ হয় শুনে ফেলেছেন এটা। মা আবার বোনকে গলা সাধা শেখাতেন। সা-রে-গা— রে-গা-মা— গা-মা-পা…। আর ‘আলো আমার আলো ওগো’, ‘আয় তবে সহচরী হাতে-হাতে ধরি ধরি…’— কারণ এগুলো ছিল সহজ গান। কিন্তু মায়ের সময় কোথায়? শিখার ওইসব শুনেই বোধ হয় মা বোনকে নিয়ে বসলেন— আয় তোকে গান শেখাব। ওই গানটাই শিখবি। নে, ধর— ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ…’  বোন আঙুলটা মায়ের ঠোঁটের সামনে ধরে বলেছিল চুপ, চুপ মা… ওটা না, ওটা শিখাদের গান। মা ঘাড় কাত করে বললেন, ইঃ আহ্লাদ? ওদের গান? এটা রবীন্দ্রনাথের। রবীন্দ্রনাথ সব্বার।

ছোটবেলার ঝগড়া বেশিদিন থাকে না। ওদের সঙ্গে আমরাও এক্কা-দোক্কা স্কিপিং-এর চোর…।

আমার বাবা বলত, ননীবাবুরা ‘এদেশি’। ‘এদেশি’ শব্দটা খুব একটা সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হত না। কেমন যেন একটা তাচ্ছিল্য ভাব। আজ এতদিন পরে মনে হয়— আমরাই তো শরণার্থী, আমরা তো অনুকম্পা প্রার্থী। অথচ…।

এর আগে বাঙাল-ঘটি সম্পর্কে জ্ঞান হয়ে গেছে। একটা মুদি-দোকান ছিল মারহাট্টা ডিচ লেন-এ। ফটিকদার দোকান। আমি দাদুর সঙ্গে মুদি-দোকানে যেতাম। কখনও হাতে কাঁসার বাটি, কখনও অ্যালুমিনিয়ামের বাটি। বাটিতে গুড় কিম্বা ডালডা। দাদু গেলে ফটিকদা বলতেন— এই যে বাঙালদাদু এসে গেছে।  কী শুকনা মরিচ লাগাইব নাকি? আর গুড়ে? দাদুর মুখে শুনেছি, দাদু কবে ওখানে এক পোয়া চিড়া চেয়েছিলেন। ফটিকদা বলেছিল— ‘চিড়া’ আবার কী? বলুন চিড়ে। দাদু বলেছিলেন, তাহলে এক গুড়েও দিন। ফটিকদা বলেছিল, গুড়ে আবার কী, গুড় বলুন। দাদু বলেছিলেন, চিড়া যদি চিড়ে হয়, গুড়ও তবে গুড়ে। তাছাড়া ঝগড়ার সময়ে শিপ্রার মা বলেছিল— বাঙাল তো, তাই ভদ্রতা জানানো। কথায় বলে না— বাঙাল মনুষ্য নয়, আজব এক জন্তু। তাছাড়া কোথাও যেন শুনেছিলাম, বাঙালু রস খাইলু, ভাঁড় ভাঙিলু পয়সা দিলু না রে পয়সা দিলু না!

শিখাদের ঘরের খাটের উপরে বিছানাটা পাতা থাকত, চাদরটা বেশ টান-টান। আমাদের ঘরের চৌকির উপর বিছানাটা পাতা থাকত না। তোষকটা গোটানোই থাকত। আমরা কাঠের উপর বসে পড়াশুনো বা অন্য কাজ করতাম। রাত্রে তোষকটা পেতে নেওয়া হত। শিখার বাবা ঘরে অধিকাংশ সময়েই গামছা পরে থাকত। ওরা রবিবার সকালে ‘নুচি’ খেত, আমরা খেতাম না।

আমরা যে-ঘরে থাকতাম, সেই ঘরের দক্ষিণের দিকে জানলা ছিল দুটো। জানলা খুললে বট গাছটা, যার সঙ্গে মা কথা বলত। আর বট-পাতাগুলোর ফাঁকা দিয়ে বস্তি। ওটা জেলেপাড়ার বস্তি। জেলেরা কমই ছিল তখন। এখনও বস্তিটা আছে, কিন্তু জেলে একেবারেই নেই। জেলেরা গঙ্গায় মাছ ধরত।

বারো নম্বর বাড়ির ‘কালির কল’-এ যারা কাজ করত, তাঁদের কয়েকজনের নাম এবং মুখ আমার মনে আছে আজও। খ্যাঁদা, গনা, বিজয়, সন্তোষ, রামরতন, সহদেব, বলরাম, গঙ্গা, কদম ঝিঙ্গুর দশবারো জন কাজ করত। এর মধ্যে কয়েকজন ওই বস্তিতেই থাকত। সমস্ত শ্রমিকদের সুপারভাইজার ছিল গঙ্গাদা। গঙ্গাদার দেশ ছিল দিলদার নগর। প্ল্যাটফর্মকে ল্যাটফর্ম বলত। কিছুতেই ট্যাবলেট বলতে পারত না। বলত ল্যাবলেট। কালির কারখানার ডিউটিতে ওদের সারা গা কালি মাখা হয়ে থাকত।

ওই বস্তিতে একটা বড় চাতাল মতো দেখতাম। যার চারিদিকে খোলার চাল আর টিনের চালের ঘর। চাতালে একটা বটগাছের গোড়ায় একটা শিব-পাথর ছিল। অনেকেই জল ঢালত। আর ছিল একজন কুমোর। তাঁর ছিল একটা চাকা। চাকার উপর মাটির তাল দিয়ে একটা লাঠি দিয়ে চাকটা ঘোরাত। মাঝখানে বসানো মাটির তলটাও ঘুরত। তার ধার দুই হাতের আঙুলের খেলায় তৈরি হত মাটির ভাঁড়। একটা কাঠের তক্তার উপর কাঁচা ভাঁড়গুলিকে রাখা হত, রোদ্দুর শুকনো হত, তখন বেশ ধোঁয়া হত। ঘরেও  ধোঁয়া আসত জানলা দিয়ে। কাউকে তো বিরক্ত হতে দেখিনি। ওই ভাঁড়ওয়ালা ছিল বিহারি। ওরা নিজেদের মধ্যে হিন্দিতেই কথা বলত সঙ্গে হিন্দির টান মেশানো বাংলাতেই। আমি আমাদের দোতলার জানলা দিয়ে ভাঁড় তৈরি দেখতাম। ভাঁড়ওয়ালাকে মামা ডাকতে কে শিখিয়েছিল মনে নেই, মামা ডাকতাম। আর মামা ডাকতাম বলেই, কালীপুজোর আগে আমাদের বাড়িতে এসে মাটির পুতুল দিয়ে যেত। ছাঁচে ঢালা বউ, টিয়াপাখি, গরু, হাতি— এইসব।

ওদের দেশের গ্রামে দেওয়ালিতে মেলা বসত। ওদের পূর্বপুরুষরা দেওয়ালির আগে পুতুল বানাত মেলায় বিক্রি করবে বলে। এখানে মেলা নেই, তবু সেই নিয়ম রক্ষা করে চলেছে।  দেওয়ালির আগে কিন্তু পুতুল ওরা তৈরি করতই। আমরা যেমন মেলা খরচ পেতাম, চৈত্র সংক্রান্তির আগে গুরুজনরা আমদের হাতে পয়সা দিতেন। মেলা খরচা। আমার মেজপিসেমশাই দিতেন সবচেয়ে বেশি। একটা আধুলি। একটা গোটা টাকাও পেয়েছি। কোনও আত্মীয়স্বজন যদি চৈত্রসংক্রান্তির আগে আসতেন, প্রণাম করলেই কিছু দিয়ে দিতেন। কুড়ি পয়সা বা চার আনা। কুড়িয়ে বাড়িয়ে দেড়-দু’টাকা হয়েই যেত। একটাকায় গোটা দশেক ফুচকা, একটা রাজভোগ দুটো শিঙাড়া হয়ে যেত। কিম্বা টিনের বাক্সর সিনেমা, সেই সঙ্গে একটা কটকটি ব্যাঙ, একটা বাঁশি আসলে আমাদের ছেড়ে আসা দেশে চৈত্র সংক্রান্তিতে মেলা হত। সেই মেলায় আনন্দ করার জন্য বড়রা ছোটদের হাতে পয়সা দিত। সেই নিয়মটা চলছিল। বহুদিন এই মেলা চালু ছিল। আমি যখন ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ি, তখনও।

আমার ভাঁড়ওলা মামা এবং মামী দু’জনই আসত কালীপুজোর দিন। পুতুল দিয়ে যেত। পয়সা নিত না।

বারো নম্বর বাড়ির ‘কালির কল’-এ যারা কাজ করত, তাঁদের কয়েকজনের নাম এবং মুখ আমার মনে আছে আজও। খ্যাঁদা, গনা, বিজয়, সন্তোষ, রামরতন, সহদেব, বলরাম, গঙ্গা, কদম ঝিঙ্গুর দশবারো জন কাজ করত। এর মধ্যে কয়েকজন ওই বস্তিতেই থাকত। সমস্ত শ্রমিকদের সুপারভাইজার ছিল গঙ্গাদা। গঙ্গাদার দেশ ছিল দিলদার নগর। প্ল্যাটফর্মকে ল্যাটফর্ম বলত। কিছুতেই ট্যাবলেট বলতে পারত না। বলত ল্যাবলেট। কালির কারখানার ডিউটিতে ওদের সারা গা কালি মাখা হয়ে থাকত।

একটা কলঘর ছিল, ওখানে ওরা সবাই একসঙ্গে চান করত। লাইফবয় সাবান, কোম্পানি দিত। কলঘরটা ছিল বারো নম্বর বাড়ির একতলায়। একতলার ওই বড় ঘরটাকে আস্তাবল বলা হত। হয়তো এক সময়ে ঘোড়া থাকত। আমি গরু থাকতে দেখেছি। ওখানে গরু পোষা হয়েছে। আমার মেজ পিসেমশাই গরু কিনে রেখেছিলেন। কারখানার কোনও কর্মচারীই হয়তো দেখাশোনা করত। গোয়ালা আসতে দেখেছি। পেতলের বালতিতে ফেনাময় দুধ। আমরাও ওই দুধের ভাগ পেতাম।

ওই আস্তাবলেই এক-একটা অংশে টিন আর ত্রিপল দিয়ে ঘিরে একটা ঘর করা হয়েছিল। ওখানে একটা খাটিয়া থাকত। ওখানে থাকত রামরতন। একটু কুঁজো মতন। কারখানার কর্মচারী শুনেছি আফিম খেত।  আরও শুনেছি রামরতনকে কাঁকড়া বিছে কামড়েছে অনেকবার, রামরতনের কোনও ব্যথাই লাগেনি। উল্টে বিছেই নাকি মরে গেছে। রাস্তাটার ওপারে খালধারে, কিছুটা জায়গা বেড়া দিয়ে রামরতন একটা বাগান করেছিল। করবী, জবা, শিউলি টগর, এসব গাছ ছিল। রামরতনের বাগানই ছিল আমার প্রকৃতি পরিচয়ের জায়গা। রামরতন প্রতিদিন সকালেই গাছগুলিকে যত্ন করত, কথাও বলত হিন্দিতে। গাছে বসত পাখি, প্রজাপতি। যেহেতু খালের পাড়েই বাগান, পাড়টা নেবে গিয়ে খালের জল পর্যন্ত চলে যেত। জোয়ারে কিছুটা জল বাগানের ওপর পর্যন্ত আসত। জলের সনঙ্গে দু’চারটে কাঁকড়াও দেখেচি। বক আসত। অনেক পরে রামরতনের বাগান নামে একটা একটা গল্প লিখেছিলাম।