পুতুলখেলা
‘বোম্বাইওয়ালা’-‘বোম্বাইওয়ালা’ বলে হাঁক পেড়ে একটা মোটা লাঠির মাথায় একটা দলা মতো কিছু, লাল কাপড়ে ঢেকে রাখা। ওখানে তিন-চাররকম দলা আছে। সাদা, লাল, সবুজ, কমলা। ওখান থেকে খাবলা দিয়ে টেনে আনলে ফিতের মতো লম্বা হয়ে যায়। সেই ফিতের টুকরো দিয়ে ওরা বানিয়ে দিত ফুল, প্রজাপতি, ঘড়ি। ঘড়ির সাদা ডায়াল ও দু’পাশে ফিতে। ফুলের আবার পাতাও থাকত। ওগুলো খেতাম। খুব মিষ্টি। পরে জেনেছি, ওগুলো সুগার জেল। কিছুদিন আগে দেখলাম, শপিংমলে ওই জিনিস বিক্রি হচ্ছে, অনেক দাম। বুড়ির মাথার চুলও শপিং মলে দেখেছি। নাম হল ক্যান্ডিক্লস। আমরা কিনতাম দু’পয়সায়। ওরা বিক্রি করছে পঞ্চাশ টাকায়। কতগুণ? হিসেব করলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। আড়াই হাজার গুণ বেড়েছে পঁয়ষট্টি বছরে।
আর-একটা আশ্চর্য খাবার ছিল, রামধনু বরফ। কাঠ চাঁচার র্যাঁদাকে উল্টো করে রেখে বরফের চাঁই ঘষলে কুঁচি বরফ বের হয়। একটা ভাঁড়ে সেই বরফকে মুকুটে রেখে নানা রঙের সিরাপ দিয়ে একটা নির্মাণ হত। ভাঁড়ের মধ্যে দেওয়া থাকত, একটা পাইপ। এটা এখন আর বিক্রি হতে দেখি না। আর-একটা আশ্চর্য খাবারের কথা মনে পড়ছে। স্কুলের টিফিনবেলায় দেখতাম। সেনাপতি বিস্কুট। গৌর নামে একজন ঘুগনি-আলুর দম-ওলা বসত। টিনের বাক্সের ভেতরে দুটো ডালডার টিন থাকত। একটায় ছিল ছোট আলুর দম, অন্যটায় চাপ ঘুঘনি। খুব ঘন আর নরম। ক্ষীরের মতো। শালপাতায় আলুর দমে গুঁড়োমশলা ছিটিয়ে একটা কাঠি পুঁতে। আহা! আর ছিল ঘন ঘুগনি। আর সেনাপতি বিস্কুট হল— কড়কড়ে গোল টোস্ট বিস্কুটের উপরে চামচ করে ঘুগনি লেপটে দেওয়া। বিস্কুটটা কামড়ে খেতাম। সেনাপতি বিস্কুট কেন নাম হয়েছিল জানি না। হতে পারে গৌরের পুরো নাম ছিল গৌরচন্দ্র সেনাপতি। গৌরের দেশ মেদিনীপুর ছিল। কারণ ঘুঘনির মধ্যে নারকেল থাকত। গৌরদা বলত, এই নারকেলের স্বাদ-ই আলাদা। আমার দেশের নারকেল। মেদিনীপুরের নারকেল।
চুনকাম খসে গিয়ে তৈরি হত এক পায়ে দাঁড়ানো বক, উড়ন্ত চিল, কখনও-বা কুমড়োপটাশ! পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ৬…
চুনকাম প্রসঙ্গে এত কথা এল। আর এলই যখন, আর দু’একটা ছোটবেলার বাইরের খাবারের কথা বলি। সিগারেট লজেন্স। এক্কেবারে সিগারেটের মতো সাদা রঙ। ঠোঁটে দিলে মনে হত সিগারেট। চুষে খেতে হত। মৌরি লজেন্স। একটা সরু কাচের নলের মধ্যে ছোট্ট-ছোট্ট লজেন্স, ভিতরে মৌরি। হাতি ঘোড়া বিস্কুট। ছোট-ছোট বিস্কুট। বিভিন্ন জীবজন্তুর আদলে। মাছ লজেন্স। লম্বাটে লজেন্স, মাছের আকৃতি। চুষে বা চেটে খাওয়া হত। ঝুরো শনপাপড়ি। টিনের বাক্সে ফেরি করত— শনপাপড়ি-শনপাপড়ি হেঁকে। একজন শনপাপড়িওলা ছিল, যে পাড়ায় এসে হাঁকত— এই যে নন্দের দুলালেরা, আর বাঁশরি বাজিও না, এসো শনপাপড়ি এনেছি। খেয়ে যাও। ওইসব শনপাপড়ি ছিল খুব হালকা, ফাঁপা। এখন যে-সব প্যাক করা শনপাপড়ি বিক্রি হয়, আদৌ ওরকম নয়। এগুলো অনেক টাইট। মিষ্টির দোকানেও প্রায় একই রকম শনপাপড়ি বিক্রি হয়। ওরকম নরম-মোলায়েম শনপাপড়ি হারিয়েই গেল। কটকটি নামে আর-একটা খাবার ছিল, ছাতুর দলাকে লম্বা করে ভেজে চিনির রসে চুবিয়ে তৈরি করা হত। মেলায় এখনও একটা বিক্রি হতে দেখেছি, কিন্তু কটকটিওলারা আর নেই। দু’পয়সা দামের কাঠি-আইসক্রিমও আর নেই। একটা কাঠির সঙ্গে স্যাকারিন দেওয়া জমানো বরফ আর কিছু নয়।
কিন্তু মিষ্টির দোকানে যা পাওয়া যেত, আজও সবকিছুই আছে। তবে লবঙ্গলতিকা, জিবে গজা, ক্ষীরের চপ কম দোকানেই পাওয়া যায় আজকাল। আগে দানাদারের জনপ্রিয়তা ছিল খুব। এখন কম দোকানেই আছে। ছোটবেলার ফুচকা, আলুকাবলি, ঝালমুড়ি আজও একইরকম ভাবে বিক্রি হয়। শালপাতার পরিবর্তে থার্মকলের পাত্রে।
বাবলুদার বোনের নাম কুটুদি। আমার চেয়ে একটু বড়ই ছিল। আমি যখন থ্রি-ফোর, কুটুদি বোধহয় ফাইভ-সিক্স। সকালবেলার স্কুলে পড়ত। সম্ভবত সরস্বতী ইস্কুল। সকালে টিফিন দিত। মনে পড়ে, স্কুল থেকে ফিরলেই কুটুদির মায়ের প্রথম জিজ্ঞাস্য ছিল, কী টিফিন দিল? কুটুদি কখনও বলত, বাদাম-চিড়েভাজা, কখনও পাঁউরুটি-জেলি, কখনও কলা-পাঁউরুটি। কুটুদির রান্নাবাটিও ছিল। কড়াই, টিনের উনুন, মশলাবাটার ছোট্ট পাটা। ছাদ থেকে কুড়িয়ে আনা লাল কালির গুঁড়ো দিয়ে লাল ঝোল, তুলোর ছোট খণ্ড দিয়ে তৈরি মাংস ভাসছে সেই ঝোলে, খবরের কাগজের কুঁচি দিয়ে তৈরি শাকভাজা। তেঁতুলের বিচি, চালের কাঁকড়, সাবানের টুকরো এরকম নানা কিছু দিয়ে নানা রন্ধন। উদ্ভাবনী ক্ষমতা ছিল বটে।
পুতুল ছিল। একটা জুতোর বাক্সের মধ্যে পুতুলের সংসার। তিন-চারটে পুতুল, ওদের জামাকাপড়, বিছানা। পুতুলগুলো প্লাসটিকের। একটা ঘাড়ে স্প্রিং বসানো মাথা নাড়া দাদুও ছিল। পুতুলদের দাদু, পুতুলরা দাদুকে প্রণাম করত। দাদুর কানে-কানেও কথা বলত। আমার নিজের বোন বা পিসতুতো বোনরাও পুতুল খেলায় আসত। পুতুল কম পড়লে, একটা কাপড়ের ফালিকে গিঁট দিয়ে অনন্য দক্ষতায় পুতুল তৈরি করে নেওয়া যেত। পুতুলের বিয়ে হলে পুতুল তো কম পড়তই। বিয়ের পর ফুলশয্যাও হত। ছেলে পুতুল-মেয়ে পুতুলকে পাশাপাশি শুইয়ে দিয়ে ওরা বাক্সটার মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য ভরে দিত।
এই কুটুদি একবার দুপুরে বলল, শোন, একটা খেলা দেখাব। ঝুলবারান্দায় চল। সেই দুপুরে কেন জানি না আর কেউ ছিল না, গরমকাল। নিঝুম দুপুর। কুটুদি বলল, আমরা পেশেন-ডাক্তার খেলা খেলব। আমি বেশ পেশেন, তুই বেশ ডাক্তার। তুই আমাকে ইন্জেকশন দিবি হ্যাঁ?
পুতুল ছিল। একটা জুতোর বাক্সের মধ্যে পুতুলের সংসার। তিন-চারটে পুতুল, ওদের জামাকাপড়, বিছানা। পুতুলগুলো প্লাসটিকের। একটা ঘাড়ে স্প্রিং বসানো মাথা নাড়া দাদুও ছিল। পুতুলদের দাদু, পুতুলরা দাদুকে প্রণাম করত। দাদুর কানে-কানেও কথা বলত। আমার নিজের বোন বা পিসতুতো বোনরাও পুতুল খেলায় আসত। পুতুল কম পড়লে, একটা কাপড়ের কালিকে গিঁট দিয়ে অনন্য দক্ষতায় পুতুল তৈরি করে নেওয়া যেত।
ইন্জেকশনের ব্যবস্থা কুটুদিই করে রেখেছিল। একটা ছোট্ট শিশিতে জল, আর-একটা ড্রপার। শিশি থেকে ড্রপারের একটু জল টেনে নেওয়া হল। কুটুদি এবার বলল— আমার তো জ্বর হয়েছে, তুই আমাকে দেখবি। আগে জ্বর দেখবি বগলে ‘থার্মেটার’ দিয়ে। একটা পেন্সিল বের করল। বলল, এই নে ‘থার্মেটার’। তারপর বুকে কফ জমে আছে কিনা দেখবি। এই নে টেলিস্কোপ। এটা দিয়ে। ওর দাদার ইয়া-ইয়া খেলার চাক্তিটা আমার হাতে দিল। সুতোটা কানে দিবি। আমি বললাম, একটা সুতো তো। কুটুদি বলল, একটা কানেই শুনবি। শুনে বলবি, কফ জমেছে, ইন্জেকশন দিতে হবে।
ঝুলবারান্দায় গিয়ে দরজাটা দিয়ে দিল কুটুদি। ফ্রকটা নামিয়ে দিল। বগলে পেন্সিল দিলাম। কুটুদি বের করে আমাকে দিল। বলল জ্বর দেখ। একশো এক বলবি। আমি তাই করলাম। এবার বুকের কফ দেখছি। সাদা চাকতিটা বসাচ্ছি ফ্রকের উপরেই। আমার হাতে উত্তাপ লাগছিল। ওর কি সত্যি-সত্যি জ্বর হয়েছে? কুটুদি জোরে-জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। একটু বেশিক্ষণ ধরেই বোধ হয় কফ দেখছিলাম। বুকটা সামান্য উঁচু মতো। ওখানেও কি কফ দেখব?
কুটুদি চোখ বুজে আছে।
এবার ইন্জেকশন। কুটুদি বলল, কোমরে দিবি। শুয়ে পড়ল কুটুদি। লাল ইজেরের দড়িটা একটু ঢিলে করে উপুর হল, আমি ড্রপার টিপে ইন্জেকশন দিলাম। কুটুদি বলল, খুব ব্যথা লেগেছে। একটু হাত বুলিয়ে দে।
কুটুদি বলেছিল, কারোক্কে বলবি না হ্যাঁ? খেলাটা ভাল নয়!
আমি শুধু মাথা হেলিয়েছিলাম, মনে আছে। এরপরে আরও দু’তিনবার ‘পেশেন-ডাক্তার’ খেলা করেছিলাম। কুটুদিরা এই ঘরটা ছেড়ে দিয়েছিল। এরপর আসে ননীবাবু নামে একজন। উনি বাড়িতে গান শেখাতেন। ননীবাবুর তিন মেয়ে। শিখা, বিদ্যুৎ, আলো। শিখা বোধ হয় আমার বয়সিই ছিল। অন্য মেয়েরা পরপর। বেশ সুন্দরী ছিল ওই তিন বোন। এতদিনে ওরা সবাই নিশ্চয়ই বৃদ্ধার দলেই পড়ে গেছে। কিন্তু আমার স্মৃতিতে ওরা ওখানেই।


