আরেকটি প্রেমের ‘সিনেমা’

Representative image

প্যাকেট খুলে সে যে জিনিসটা বার করে, তাতে তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। আনন্দ (ভূষণ মনোজ) বাবার মৃত্যু-পরবর্তী ধর্মীয় আচার পালন করতে যতদিন এই গ্রামে এসেছে, একদিনের জন্যও এর আগে হাসেনি। সে এতক্ষণ মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়েছিল। মামা-বাড়ি গিয়ে নিজের বাবা অর্থাৎ আনন্দের দাদুকে মা একবার দেখতে চান। বহু বছর নিজের বাবার সঙ্গে দেখা হয়নি আনন্দের মায়ের। দাদু এখন চলচ্ছক্তিহীন অন্ধ এক মানুষ। তাঁর ছিল দু’টি মেয়ে। তিনি চেয়েছিলেন, ছোট মেয়ের সঙ্গে আনন্দের বাবার বিয়ে হোক। কিন্তু আনন্দের বাবা রান্না চেখে দেখার শর্ত দিয়েছিলেন। যার রান্না ভাল তিনি তাকেই বিয়ে করবেন। কেন? কারণ, যে-মেয়ের রান্না ভাল, সেই-ই আনন্দের বাবাকে যত্ন করে রাখবে।

আনন্দের মা নিরক্ষর, তত সুন্দরী না। বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন আনন্দের বাবার সঙ্গে। আনন্দের বাবার মৃত্যু দিয়ে ছবির শুরু। প্রথমেই যে-ব্যাপারটি দর্শককে নাড়া দিয়ে যায়, তা হল পরিচালক রোহন পরশুরাম কানাওয়াড়ে আর তাঁর ক্যামেরার দেখার দৃষ্টি। ধীর অথচ কী সাংঘাতিক গভীর সেই দেখা! আনন্দের মুখমণ্ডলে ক্যামেরাকে প্রথম দেখা যায়। আনন্দের সদ্য পিতৃবিয়োগ হয়েছে। হাসপাতালের করিডরে রাত-জাগা দু’টি মানুষ— আনন্দ আর তার মা। আকাশ পরিষ্কারের একটু আগে কয়েকজন আত্মীয়স্বজন এসে পৌঁছলো। আনন্দের মা কেঁদে উঠল। পুরো দৃশ্যটা কোনও রকম উত্তেজনা আর নাটক ছাড়া সম্পূর্ণ আবেগহীন ভাবে পরিচালকের ক্যামেরা দেখতে থাকল। এই প্রথম দৃশ্যটিই ছবির নিজস্ব স্রোত কোনদিকে বইবে তা যেন আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে যায়।

আরও পড়ুন: ভিমা কোরেগাঁও থেকে কেজরিওয়াল, নীল নকশা কি একই ? লিখছেন স্বস্তিক চৌধুরী…

‘সবর বন্দা’ একটি ব্যতিক্রমী ছবি তার বিষয়ের জন্য নয়। ভারতীয় গ্রাম জীবন ও সমকাম নিয়ে ফিকশন ছবি কম তৈরি হলেও, এর আগে বহু ডকুমেন্টরি ছবি নির্মিত হয়েছে। আমাদের বাংলাতেই কিছু পরিচালক আছেন, যাঁরা ক্রমাগত যৌনসংখ্যালঘু মানুষদের বিশেষত প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতর মানুষদের বিষয় করে ফিকশন এবং নন-ফিকশন— দু’ধরনেরই ছবি তৈরি করেছেন। কথা হল, মেনস্ট্রিম মাধ্যমের ছবি থেকে যখন গ্রাম-জীবনই হারিয়ে গেছে, আজ কয়েক দশক সেই গ্রামের সমকামী মানুষদের কথা আলাদা করে আর কে বলবে?

‘সবর বন্দা’ ছবিটি আলাদা তার শৈল্পিক গুণে। আনন্দ প্যাকেট খুলে ক্যাকটাস ফল দেখতে পায় আর হেসে । যত্ন করে কাঁটা ছাড়ানো লাল ফল। আনন্দের সকালে উঠতে দেরি হয় জেনে, তার বাল্যবন্ধু বালিয়া (সূরয সুমন) ‘সারপ্রাইজ’ বলে জিনিসটি রেখে গেছে। এই ক্যাকটাস ফল— মারাঠি ভাষায় যাকে সবর বন্দা বলে— তা আনন্দের শৈশব ও তারুণ্যের অভিজ্ঞান। এই ফলের মধ্যে দিয়ে বালিয়াকেও কি পুনরাবিষ্কার করে আনন্দ? শুধু বালিয়া কেন তার ছোটবেলার প্রেম, তার যৌনতাবোধ, তার গ্রাম ছেড়ে যাওয়া, তার শহুরে নিম্নবিত্ত জীবন— সবটাই যেন ফিরে পায় আনন্দ। ছোটবেলার বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কে একটা যৌন আভাস ছিল আনন্দের, কিন্তু বহু বছর তেমন যোগাযোগ নেই, বাবার মৃত্যু না হলে, এমন ভাবে গ্রামে হয়তো তার ফেরাও হত না, অথচ প্রতিদিন এখানে বালিয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে আর নদীর ধারে, গরু চড়াতে গিয়ে, দীর্ঘ রাস্তায় বাইক চালানোর সময়ে, নির্জন দুপুরে গাছের নীচে একে অপরকে আবিষ্কার করছে তারা। অপূর্ব কিছু টেনশননির্ভর দৃশ্য নির্মাণের মধ্যে দিয়ে পরিচালক তাঁর মুন্সিয়ানা বুঝিয়েছেন। আরেকটি দিক থেকে ‘সবর বন্দা’-কে সবার থেকে আলাদা করেছেন পরিচালক। তথাকথিত সমকামিতা-রূপান্তরকামিতা বিষয়ক ছবিতে অকারণ যৌনতার ফোড়ন না দিয়ে, অনেকেই দৃশ্য তৈরি করতে পারেন না। যৌনসংখ্যালঘু মানুষের যৌনতা না দেখিয়ে যেন ঠিক তাদের ব্যবচ্ছেদ করা যায় না। এ এক অস্থির দৃশ্যসুখ— তা সে দর্শকেরই হোক আর ছবিকরিয়েদের। রোহন পরশুরাম কানাওয়াড়ে সেদিক থেকে অনেক উঁচু মাপের শিল্পী-পরিচালক। এ-ছবিতে দু’একটা আচম্বিত চুম্বন ছাড়া আর সমকামিতা চিহ্নিত করতে যৌনদৃশ্যের সংযোজন নেই বললে চলে। বরং, একই দেশের গ্রাম, শহর আর গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের মধ্যে কত রকম স্তর তৈরি হয়, সেই অবাক-পৃথিবী তিনি আমাদের দেখান। সেই মুকুরে যৌনচেতনাও অদ্ভুত ভাবে ধরা দেয়। বালিয়া জানায় গ্রামের ‘ওই ধরনের’ মানুষরা ‘কাজ করে’ চলে যায়। বেশি কথা বলে না, গল্প করে না! আর আনন্দ নিজের সেই বন্ধুর স্টেটাস চেক করতে থাকে যার সঙ্গে তার কিছু দিন আগে অবধি সম্পর্ক ছিল কিন্তু এখন ওই ছেলেটি বিবাহিত।

মুম্বই শহরে নিজেকে আনন্দের ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। তবে একদিক থেকে আনন্দ বালিয়ার থেকে ভাগ্যবান। বালিয়া নিজের যৌন পছন্দ ও পরিচয়ের কথা বাড়িতে বলতে পারেনি। সে কেবল নারীকে বিয়ের সমস্ত প্রস্তাব নাকচ করেছে। এমনিতেও ‘চাষীর সঙ্গে’ কেউ মেয়ের বিয়ে দিতে চায় না, এমনকী গ্রামেও। তবু তার বাবা-মা জোর করেন বালিয়াকে। বাবা মাঝে-মাঝে মারেন পর্যন্ত! কিন্তু আনন্দ এক সময়ে তার বাবাকে সব বলেছিল। মা প্রথমটায় বোঝেনি। কিন্তু বাবা তাকেও বুঝিয়েছিলেন।

মুম্বইতে সারা জীবন ট্যাক্সি চালানো আনন্দের বাবা এতটা বুঝলেন কী করে তা আনন্দকেও অবাক করে। বাবা চলে যাবার শূন্যতা তাই এখন আরও তীব্র! আনন্দের সংবেদনশীল মা-বাবার মধ্যে দিয়ে পরিচালক আমাদের বুঝিয়ে দেন যে, কোনও মানুষের যৌনপরিচয় ও পছন্দের জন্য সে-মানুষটা আর সকলের থেকে যতই আলাদা হোক তার মা-বাবার কাছে সে পর নাও হতে পারে; সেই মা-বাবা গরিবই হোক আর নিরক্ষর!

গত শতকের নয়ের দশকে আমেরিকার ‘নিউ কুইয়ার সিনেমা মুভমেন্ট’ দিয়ে সারা পৃথিবীতে সমকামী-রূপান্তরকামী মানুষদের মূল বিষয় ও চরিত্র করে সিনেমা নির্মাণের এক আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই রেশ ইউরোপ শুধু নয়, এশিয়ার সিনেমা-নির্মাণেও প্রভাব ফেলেছিল। এ-বিষয়ে আমাদের উপমহাদেশের সিনেমা পিছিয়ে থাকেনি। ভারতে ‘বদনাম বস্তি’ (১৯৭১)-এর হাত ধরে সিনেমার আঙিনায় এসে পৌঁছে ছিল যৌনসংখ্যালঘু মানুষের প্রেমজীবন ও তার কথকতা। রোহন পরশুরাম কানাওয়াড়ে পরিচালিত ‘সবর বন্দা’ (২০২৫) নিঃসন্দেহে সেই ঐতিহ্যের এক অতি শক্তিশালী, অপার শৈল্পিক ও অনির্বচনীয় সংযোজন।