যাত্রার উত্তম-সুচিত্রা

যাত্রাজগতের অবিসংবাদী জুটি কাকলি চৌধুরী ও অনল চক্রবর্তীর সঙ্গে কথোপকথনে সংযুক্তা বসু…

প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জ, মফসসল, শহরতলির মাঠ-ময়দানে তিন-চার হাজার দর্শক যখন এক শামিয়ানার নীচে উল্লসিত হয়ে আপনাদের যাত্রা দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে হাততালি দেন, তখন মঞ্চে অভিনয় করতে করতে আপনাদের ঠিক কেমন লাগে?

কাকলি: সে-অনুভূতি বলে বোঝানো যায় না। মনে হয়, অনেক জন্মের পুণ্যফল। আমরা মনে করি, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণর আশীর্বাদ ছাড়া শিল্পী হওয়া যায় না। যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানুষের উল্লসিত ভাললাগার কথা শুনি, চোখে জল এসে যায়।  আমাদের জুটিকে নিয়ে দর্শকের যে উন্মাদনা, তা অভিভূত, বাকরুদ্ধ করে দেয়।

আপনাদের জুটির যৌথ অভিনয়ে কোন কোন যাত্রার অভিনয়, জীবনের পৃষ্ঠায় সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে?

অনল: আমাদের যৌথ পালায় মাইলস্টোন তৈরি করেছিল ‘আমি মিস ক্যালকাটা’, ‘এক দিন রাত্রে’। আমাদের এই বছরের যাত্রা ‘সেই হারানো সুর’ মানুষ এত ভালবাসবে ভাবতে পারিনি। বিষয়ের দিক থেকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দু’টি পালা ‘জোড়াদিঘির চৌধুরী বাড়ি’, ‘বিসর্জনের পরে’।

উৎপল রায়ের লেখা যে-যাত্রা দিয়ে আমাদের জুটির পথচলা শুরু হল—
‘মেনকা মাথায় দে লো ঘোমটা’ সেই যাত্রাও মানুষ আজও ভুলতে পারেনি। বেশিরভাগ যাত্রাই সুদীর্ঘ উনত্রিশ বছরে সোনার জলে লেখা। 

কাকলি-অনল

আরও পড়ুন: জনপ্রিয়তাই শংকরের বন্ধু ও শত্রু!
লিখছেন সৌভিক চট্টোপাধ্যায়…

‘যাত্রা দেখে ফাতরা লোকে’… এইরকম একটা হীন মন্তব্য প্রচলিত আছে সংস্কৃতিজগতে। বিশেষ করে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহলে। কেমন লাগে কথাটি শুনলে?

কাকলি: শুনতে খুব খারাপ লাগে। আসলে ফালতু কথাটা থেকেই বোধহয় ‘ফাতরা’ কথাটা এসেছে। তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা যাত্রাকে একটা মোটা দাগের শিল্প বলে মনে করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন যেখানে দেখি, যাত্রাকে ছোট করে কেউ কোনও মন্তব্য করে আমি তীব্রভাবে প্রতিবাদ করি।

অনল: ‘ফাতরা’ বলতে সম্ভবত কম শিক্ষিত মানুষজনকেই বোঝায়। তথাকথিত শিক্ষিত লোকরা কম শিক্ষিতদের ছোট করার জন্যই এমনটা বলে থাকেন। সেই নিরিখে যারা বলেন, ‘যাত্রা দেখে ফাতরা লোকে’, তারা ঠিকই বলছেন। তবে সত্যিকারের বুদ্ধিজীবীরা এই ধরনের মন্তব্য করেন না।

অনল চক্রবর্তী ও কাকলি চৌধুরী। যাত্রা-রসিকরা বলে থাকেন, বাংলার যাত্রাজগতের ‘উত্তম-সুচিত্রা’ জুটি আপনারা। এক এবং অদ্বিতীয়। এই বিশেষণের যৌক্তিকতা কতখানি?

কাকলি: কথাটা শুনে লজ্জা লাগে। তবে আমরা দীর্ঘদিনের জুটি বলেই দর্শক এইধরনের মন্তব্য করেন আবেগ থেকে। ‘উত্তম-সুচিত্রা’-র উচ্চতা স্পর্শ করতে কেউ কোনওদিন পারেনি, পারবেও না।

অনল: উত্তম-সুচিত্রা জুটি না বলে উত্তম জুটি বললে ভাল হত। উত্তম মানে সেরা। সেরা জুটি।

আমার কিন্তু এই বিশেষণটাকে শীতের কারুকাজ করা আলোয়ানের মতো গায়ে জড়িয়ে থাকতে মন্দ লাগে না।

এই কিংবদন্তি প্রায় সেরা জুটি হয়ে ওঠার ম্যাজিকটা কী?

কাকলি: আজ থেকে উনত্রিশ বছর আগে থেকে অনলের হাত ধরা সহ-অভিনেতা হিসেবে। তো পথ চলতে-চলতে আমরা একটু পারিবারিক হয়ে গেলাম। কিছু-কিছু সম্পর্ক হয়, যার কোনও নাম হয় না। কিন্তু সেই অনামা সম্পর্কটা শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভরসার ওপর নির্ভর করে চলে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে অনলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা খুব ব্যাপ্ত। আমার কন্যা তো বটেই, আমার স্বামী, যিনি প্রয়াত হয়েছেন বেশ কিছু বছর, তাঁর সঙ্গেও অনলের বন্ধুত্বটা এত নিবিড় ছিল যে, পারিবারিক দিক থেকেও একটা বন্ধন তৈরি হয়েছে অনেকদিন ধরে।

সেটাই কি একমাত্র ম্যাজিক?

কাকলি: আসল কথা সময়ের মাপে আমার আর অনলের জুটি যাত্রার অন্যান্য জুটিদের ছাপিয়ে গিয়েছে। এমনকী, উত্তম-সুচিত্রাও উনত্রিশ বছর ধরে জুটি থাকেননি। যাত্রার মহলা ঘরে বা মঞ্চে আমি না-বললেও অনল জানে, আমি কী করব, আর ও না-বললেও আমি জানি, অনল কী করবে! এই বোঝাবুঝিটাই এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেছে যে, একটা অপূর্ব রসায়ন তৈরি হয়েছে। সেটাই ম্যাজিক।

অনল: আমি আর কাকলি দু’জনেই প্রথমত থিয়েটারের শিল্পী। যাত্রা করতে যখন এলাম, দু’জনেই নাটকের বৈশিষ্ট্যগুলোকে যাত্রার মধ্যে কাজে লাগাতে শুরু করলাম। যাত্রার ফর্মের এই বদলটা জনপ্রিয়তা পেল। যাত্রায় যে-ধরনের স্ক্রিপ্ট হয়, তার বাইরে খেলার চেষ্টা করলাম। সম্পূর্ণ সায়েন্টিফিক রিপ্রেজেন্টেশন একটা চমক তৈরি করল। যাত্রায় যে উচ্চগ্রামের অভিনয় হয়, সেটাকে নামিয়ে আনার চেষ্টা করলাম খানিকটা নাটকের আঙ্গিকে।

মানে বলতে চান আপনাদের যাত্রায় মেলড্রামা থাকে না?

কাকলি: আমি আর অনল অভিনয়কে একেবারে আটপৌরে জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। স্বাভাবিক আচরণ সুলভ সংলাপ বলি মঞ্চে। বিহেভিয়রিয়াল…

সাধারণত যাত্রার নামকরণেও মেলোড্রামা থাকে। ‘শাঁখা দিও না ভেঙে’, ‘সিঁদুর নিও না মুছে’ ইত্যাদি ইত্যাদি…

কাকলি: সেটা হত, এখনও হয়। বিভিন্ন যাত্রা সংস্থা বা দলের রুচি বা কীভাবে যাত্রার নামকে ব্যবহার করবে তার ওপর নির্ভর করে এই সব নাম।

আপনারা যে যাত্রায় থিয়েটারের ঘরানা ব্যবহার করছেন, তাতে তো একটি প্রধান লোকশিল্প ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছে?

কাকলি: যাত্রার ফরম্যাটকে বা কাঠামোকে এক রেখে অভিনয়ের দিকটার আধুনিকীকরণ করছি আমরা।

অনল: যাত্রায় সাবেকিয়ানা বলতে তখন মাইক ছাড়া যাত্রা হত। এখন যেভাবে সংলাপ বলা হয়, তাতে উন্নত আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। যাতে শেষ সারির দর্শক কথা শুনতে পায়।  আগে হ্যাজাক লাইটে অভিনয় হত, এখন এসেছে এলইডি আলো। তাতে দূরের লোকেদের যাত্রার চরিত্রদের সঙ্গে রিলেট করতে সুবিধে হয়। আলোর আধুনিকীকরণের ফলে যাত্রার শেষ সারির মানুষ শিল্পীদের প্রতিটা এক্সপ্রেশন দেখতে পাচ্ছে।

এটা তো যাত্রার বিবর্তন। বিচ্যুতি তো নয়।

অনল আপনি দীর্ঘ দিন ধরে নায়ক, অভিনেতা তো বটেই। সেই সঙ্গে মঞ্চসফল পালাকার। আদতে লেখক। নাটক সিনেমা নয়, যাত্রার প্রতি এই গভীর টানটা এল কী করে?

অনল: আমি একসময় দু-চারটে নাটকও লিখেছি। একসময় থিয়েটার ইউনিট দলে ছিলাম। তখন জুনিয়র শিল্পী। ওই দলে রবি ঘোষ, শেখর চট্টোপাধ্যায় ছিলেন।

ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘেও ছিলাম। এগুলো নিজেকে তৈরি করার অভিজ্ঞতা। কলেজে ওঠার পর নানা লিটল ম্যাগাজিনে লেখালিখি শুরু করি। যাত্রায় আসার পর যাত্রা লেখার ইচ্ছেটা আসে। আমার প্রথম যাত্রাপালা লেখা হল লক্ষ্মীনারায়ণ অপেরার ‘দরদী মায়ের ফাঁসি’।

ক্রমশ বুঝতে আরম্ভ করি উৎপল দত্ত গবেষণামূলক নাটক ও যাত্রার আঙ্গিকের মেলবন্ধন করতে চেয়েছিলেন। সেই প্রক্রিয়াটা সবসময় ব্যবহার করার চেষ্টা করি। সেইসঙ্গে আমার লেখা যাত্রায় মিলেমিশে যায় ব্রেখটিয়ান পদ্ধতি ও স্তানিস্লভস্কির পদ্ধতি।

এইসব প্রক্রিয়া মিলিয়ে আমাদের যাত্রা হয়ে ওঠে দৃশ্যকাব্য বা কাব্যনাট্য।

এবারের যাত্রা ‘সেই হারানো সুর’-এ রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা আছে।

অনল: কবিদের গান ও কবিতা ব্যবহার করে যাত্রাকে দৃশ্যকাব্য করে তুলতে চেয়েছি। আমাদের যাত্রাকে গীতিনাট্যও বলা যায়। এই দৃশ্যকাব্য যাত্রায় একটা আকর্ষণ বা টেম্পটেশন তৈরি করে।

কাকলি: আমরা বাড়ির কথাবার্তার মতো করে যাত্রায় সংলাপ বলি। একেবারে স্বাভাবিক আচরণসুলভ আটপৌরে অভিনয়।

অনল, আজকাল আপনার লেখা পালায় কাকলি বেশ কিছু ইনপুট দেন।

অনল: হ্যাঁ কাকলি যাত্রার নাট্যরূপ দেওয়ার সময় এডিটিংটা খুব ভাল বোঝে। দৃশ্য ও সংলাপের লিংকগুলো ঠিকঠাক যাছে কি না, সম্পর্কগুলো ঠিকঠাক প্রবহমানতা পাচ্ছে কি না এবং টাইম ফ্যাক্টরটা কাকলি খুব ভাল বোঝে। আমার পালাকে অনেকটাই থিয়েটার করে তুলি কাকলির চোখ দিয়ে।

আপনার নিজের লেখা পালার সংখ্যা কত?

অনল: তা প্রায় ষাট-পঁয়ষট্টি হবে।

কাকলি: আমরা ২৯ বছর ধরে একসঙ্গে যাত্রা করছি। এই ২৯ বছরে ২৭টা পালা অনলের লেখা। পালার মূল কাঠামো অনলের মাথা থেকে বেরয়। কিন্তু সামগ্রিক কাঠামো বা structural জায়গাটা নিয়ে আমরা যৌথভাবে আলোচনা করি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করি।

অনলের লেখা কোন যাত্রাপালায় আপনি প্রথম অভিনয় করেন?

কাকলি: ২৭ বছর আগে লেখা যাত্রা ‘শ্রীমতী ৪২০’।

অনল: দুর্ঘটনার শিকার আমরা না হলেও অন্যের দুর্ঘটনা ঘটতে দেখেছি। অত্যন্ত সতর্ক থাকি। সারারাত জেগে ড্রাইভারের পাশে বসে থাকি। একবার ডাকাতির সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু ডাকাতরা আমাকে চিনে ফেলায় রেহাই দিয়েছিল।

কাকলি: আমরা তো শো করতে গিয়ে ডাকাতদের বাড়িতে থেকেওছি। মানে ওই বাড়ির পূর্বপুরুষেরা ডাকাত ছিল। এখন তারা পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত। এখন রাতবিরেতে পুলিশি তৎপরতা খুব বেশি হয়ে গেছে ।

কাকলি আপনি থিয়েটার, অ্যামেচার থিয়েটার, যাত্রা— সবেতেই সফলভাবে অভিনয় করেছেন। তা সত্ত্বেও সিনেমায় অভিনয় করার স্বপ্ন ছিল। সেটা সফল হল না কেন?

কাকলি: অল্প বয়সে বাংলা সিনেমার লোকজনের সঙ্গে একেবারে যোগাযোগ হয়নি, তা নয়। কিন্তু ওই জগতে একটা কম্প্রোমাইজ করার ব্যাপার ছিল। সেটা করতে পারিনি বলেই সিনেমায় আসতে পারিনি।

তারপর আমার মা যাত্রাশিল্পী কাজল চৌধুরীর হাত ধরে চলে এলাম যাত্রায়। যাত্রা আমাকে বুক দিয়ে টেনে নিল। বাকিটা ইতিহাস।

যাত্রায় কম্প্রোমাইজ করতে হয় না?

কাকলি: না, খুব দৃঢ়ভাবে বলছি করতে হয় না। যাত্রা ইন্ডাস্ট্রি খুব স্বচ্ছ। কোনও বিভাগেই কোনও কম্প্রোমাইজ করতে হয় না।

বড়জোর শিল্পীদের মধ্যে দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে প্রেম হয়, বিয়ে হয়, সংসার হয়। কখনও বা সাময়িক ভালবাসা তৈরি হয়। বিয়ে-টিয়ে হয় না। এগুলোকে আর যাই হোক কম্প্রোমাইজ বলা যায় না।

অনল: যাত্রায় স্বজনপোষণও নেই।

কাকলি: নেই তো। আমার মেয়ে আদ্যোপান্ত শিল্পী। কাজের সূত্রে কর্পোরেট ইন্ডাস্ট্রিতে। কিন্তু দারুণভাবে যাত্রায় আসতে চায়। আমি ওকে বলেছি, যাত্রা করতে হলে প্রথম দু’বছর কষ্ট করে যাত্রাদলের বাসে যাতায়াত করতে হবে। নিজেকে যোগ্য বলে প্রমাণ করতে হবে। তারপর গাড়ি চড়া।

ইদানীং কাকলি আর অনল একসঙ্গে যাত্রা পরিচালনা করছেন। দায়িত্ব কীভাবে ভাগাভাগি হয়?

কাকলি: এমন অনেক সময় হয়, আমি যাত্রার মহিলা শিল্পীদের অভিনয় দেখিয়ে দিচ্ছি, অনল ছেলেদের দেখিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিল। প্রত্যেক বছর, প্রতিটা যাত্রাকে আমরা লালন-পালন করি সন্তানের মতো। এ-বছরের যাত্রা ‘সেই হারানো সুর’ দেড়শো রজনী পার হয়ে যাবে। এত সফল যাত্রা হওয়ার পরও আমরা সংলাপ, দৃশ্যায়ন নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছি। শয়নে, স্বপনে, জাগরণে যাত্রা।

একসময় ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক পালার খুব প্রচলন ছিল। আপনারা এই ধরনের পালায় কাজ করেছেন?

অনল: আমি ব্যক্তিগতভাবে ভারতী অপেরার ‘কচ দেবযানী’ পালায় অভিনয় করেছি। সেখানে নাট্য-পরিচালক ছিলেন শ্রদ্ধেয় অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। সংগীত পরিচালনা রামকুমার চট্টপাধ্যায়ের। আর করেছিলাম ‘অশ্রুবাদল’ বলে একটি পৌরাণিক পালা। সেইখানেই চপলরানির সঙ্গে পরিচয়।

কাকলি: আমার ভক্তিমুলক পালা রামী চণ্ডীদাসের জীবন নিয়ে ‘কৃষ্ণ কলঙ্কিনী’। আর করেছিলাম ‘জাত সঁপেছি কৃষ্ণ পায়ে’। সঙ্গে ছিলেন অভিনয়ে শ্রীমতী বীণা দাশগুপ্তা। এখন টিভিতে-মোবাইলে এত গর্জাস সব পৌরাণিক-ঐতিহাসিক-ভক্তিমুলক সিরিয়াল, সিনেমা, সিরিজ হয় যে, ওই সেট-সেটিং, স্পেশাল এফেক্ট যাত্রায় আনা সম্ভব নয়।

আমরা একবার পৌরাণিক পালা করব বলে মঞ্চায়নের আগে প্রচার করেছিলাম। কিন্তু তেমন সাড়া পাইনি। তাই শেষমেশ সেই যাত্রা মঞ্চস্থ হয়নি। বাংলার আপামর দর্শক আমার আর অনলের জুটিতে সামাজিক-পারিবারিক যাত্রাই বারবার দেখতে চান। যেখানে রোমান্স, কমেডি, ট্র্যাজেডি আছে। আছে সামাজিক, পারিবারিক আরও সব নানা উপকরণ।

অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত নামের যাত্রা হয়। ‘শাঁখা দিও না ভেঙে’, ‘সিঁদুর নিও না মুছে’…

অনল: এইসব নামের আকর্ষণে যাত্রায় মানুষের ভিড় হয়। আবার সেই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের মতে ‘যাত্রা দেখে ফাতরা লোকে’… সেই অল্পশিক্ষিত ফাতরা লোকেরাই এইসব নামের যাত্রা দেখতে যায় বোধ হয়। কী জানি!

আবার আপনাদের যাত্রার নামকরণ হয় অনেকটা সিনেমার নামে। এই যেমন ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘জোড়াদিঘির চৌধুরী বাড়ি’, ‘সেই হারানো সুর’ ইত্যাদি। সামনের বছর আপনারা করতে চলেছেন ‘জীবনের চাওয়া পাওয়া’!

কাকলি: যাত্রার দর্শকমহলে একটা কথা প্রচলিত আছে, যে, অনল-কাকলিদের যাত্রা একটু আলাদা গোত্রের। এই আলাদা তকমাটা থেকেই আমরা যাত্রার নামকরণ এইভাবে করছি। ‘কাকলি-অনল’ জুটির সঙ্গে মানানসই হচ্ছে এই ধরনের নামকরণ।

বছরের পর বছর যাত্রায় দেড়শো রজনী অতিক্রান্ত সাফল্য কি দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়?

কাকলি: আমি তো প্রচণ্ড প্যানিক করি। কেবল মনে হয় আমাদের সামনের  বছরের পালা এই রকম সাফল্য পাবে তো? জানেন, খুব ভয় করে। আমি তো অনলকে বলি আমার প্রচুর টাকা থাকলে যাত্রা ছেড়ে চলে যেতাম, এত টেনশন হয়। অথচ এই যাত্রাই আমার প্রাণ।

অনল: আমার প্যানিক তো হয়ই না। বরং একটু সাহস বাড়ে। আমি ভাবতে থাকি, কী করে পরের বছরের নতুন যাত্রার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যায়! এ-বছরের যাত্রার মরশুম শেষ হয়ে গেলে দিনসাতেক পরেই এ-যাত্রা ভুলে গিয়ে পরের যাত্রা ভাবতে থাকব।

কাকলির যেমন মা যাত্রায় ছিলেন, তেমনই অনলের পরিবারে যাত্রা করতেন কেউ?

অনল: আমার মেজজ্যাঠামশাই শ্রী অতুল চক্রবর্তী অ্যামেচার নাটকে, যাত্রায়ও অভিনয় করতেন। তাঁর চেহারা, কণ্ঠস্বর— সবই ছিল দেখার মতো। এখন আমার ভাইপো অভ্র চক্রবর্তী যাত্রায় কাজ করছে। আমার মা-ও যাত্রা ও নাটকের অভিনেত্রী ছিলেন।

আপনারা প্রায় চার দশক হল যাত্রায় অভিনয় করছেন। সেই সময় জুটি হিসেবে কারা উল্লেখযোগ্য ছিলেন?

অনল: বেলা সরকার-দেবগোপাল, তাপসকুমার-সন্ধ্যা রায়, বীণা দাশগুপ্তা-অরুণ দাশগুপ্ত, ইন্দ্র লাহিড়ি-ছন্দা ভট্টাচার্য, নির্মল মুখোপাধ্যায়-মীনা কুমারী, দিলীপকুমার-মধুশ্রী দেবী, রুমা দাশগুপ্তা-মৃণাল মুখোপাধ্যায়, জ্যোছনা দত্ত-গুরুদাস ধারা— এঁরাই ছিলেন সেরা জুটির উচ্চতায়।

কাকলি: এঁদের মধ্যে দীর্ঘতম সময়ের জুটি ছিলেন নির্মল মুখোপাধ্যায়-মীনা কুমারী।  একটানা তিরিশ বছর  জুটিতে যাত্রা করেছিলেন। আমি আর অনল আশা করি ওঁদের ধারাবাহিকতার রেকর্ড টপকে যাব। নির্মলদা আজও আমাদের প্রচণ্ড ভালবাসেন। উনি যাত্রায় আধুনিক ফর্ম আনার চেষ্টা করেছিলেন।

এখানে বলা দরকার, ১৯৯৭ সালে আমরা যখন নায়ক-নায়িকা হিসেবে যাত্রায় আসি, তখন কোনও জুটি শিল্পী ছিলেন না। প্রায় ফাঁকা ময়দান। সেই ফাঁকা মাঠেই আমরা জুটি গড়ে তুললাম।

যাত্রা-সমালোচক ও বোদ্ধা দর্শকেরা বলে থাকেন যাত্রার যে মহিমা ছিল, তা আর নেই। অবক্ষয় শুরু হয়ে গিয়েছে।

অনল: যাঁরা এ-কথা বলেন, তাঁরা পুরনো দিনের লোক। আর যদি অবক্ষয়ের কথা বলতেই হয়, তো বলব, সামগ্রিকভাবে সংস্কৃতির অবক্ষয় চলেছে। শেষ কোন আধুনিক গান হিট হয়েছে? সেই কবে লগ্নজিতার ‘বসন্ত এসে গেছে”। আমাদের যাত্রায় মিউজিককে খুব আধুনিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যাত্রার সংগীতকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছেন নীলাঞ্জন নন্দী।

আপনাদের এ-বছরের যাত্রা ‘সেই হারানো সুর’-এ কোনও সংঘর্ষ নেই, ধর্ষণ নেই, রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক হানাহানি নেই। সময়ের কোনও প্রতিচ্ছবি নেই। এটা কেন? যাত্রা-নাটক-সিনেমার চলতি সময়ের কাছে একটা দায়বদ্ধতা থাকে তো? শিল্প তো সমাজেরই দর্পণ।

অনল: এই যাত্রায় আমরা দুর্নীতি থেকে মুক্ত হওয়ার পথ খুঁজতে চেয়েছি।

টেলিভিশন, ফেসবুকে, খবরের কাগজে সর্বত্র দুর্নীতি, হানাহানির খবর। যাত্রায় সেগুলো দেখিয়ে মানুষকে ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত করতে চাইনি। এমন সব ঘটনা দেখিয়েছি, যাতে মানুষের বাড়ি, ঘর, সংসারের কথা মনে পড়ে। সেটা করতে গিয়ে অপেরার ফরম্যাট ব্যবহার করেছি। মঞ্চকে এমনভাবে ব্যবহার করেছি, যাতে তিনদিকের দর্শক দেখতে পান, শুনতে পান। মাইকের ব্যবহার হয়েছে রাউন্ড শেপে।

কাকলি: যাত্রা আফটার অল এক শামিয়ানার নীচে পরিবার নিয়ে দেখার শিল্প। সেখানে এমন কিছু আমরা দেখাতে পারি না, যেটা একসঙ্গে দেখাতে গেলে অস্বস্তি হতে পারে। 

যাত্রার সময় সীমা সাড়ে তিন ঘণ্টা, সোয়া তিন ঘণ্টা থেকে নামিয়ে দু’ঘণ্টা পঞ্চাশ মিনিটে শেষ হল এবারের যাত্রা ‘সেই হারানো সুর’।

কাকলি: যাত্রাপালাটি যদি ঠিকঠাক লেখা হয়, মঞ্চায়ন যদি ঠিকঠাক হয়, তখন দৃশ্যের পর দৃশ্য বাড়িয়ে অনেক কথা বলার দরকার নেই। এলইডি লাইটের জমানায় আজকাল মানুষ আমাদের এক্সপ্রেশনগুলো যখন দেখতে পাচ্ছেন, তখন সংলাপ বাড়িয়েই বা লাভ কী?

অনল: তা ছাড়া মানুষের হাতে সময় কম। ফাস্ট লাইফ লিড করে। বিনোদনের, যোগাযোগের মাধ্যম এখন অগণিত। যাত্রার দৈর্ঘ্য কমানোর প্রধান কারণ এটাই।

কাকলি, আপনি যাত্রায় যে সুখ্যাতি বা সম্মান পেয়েছেন তাতে সিনেমায় অভিনয় না করা নিয়ে কোনও খেদ থাকার তো কথা নয়।

কাকলি: খেদ তো নেই। আমার মুখ ও চেহারার অ্যাঙ্গেল ফোটোজিনিক ছিল। দেখতে-শুনতে খুব একটা খারাপ ছিলাম না। অভিনয়টাও পর্দায় বোধহয় খারাপ করতাম না। সেটাই মনে হয়।

তবে আজকাল মাঝে মাঝে সিনেমার অফার পেয়ে থাকি। কিন্তু সময় কোথায়? সারারাত যাত্রা করে, ভোরবেলা ফিরে আবার সারাদিন শুটিং করে বিকেলবেলা যাত্রায় ফিরে যাওয়া! না, সেটা আমি পারব না। ভাল হবে না। এখন নিজেকে প্রমাণ করার কিছু নেই। এখন যাত্রা শিল্পে সেরা কাজের স্বাক্ষর রেখে যেতে হবে।

আচ্ছা অন্য দলের যাত্রা দেখতে যান আপনারা? না কি সময় হয় না?

অনল: আমি খুব একটা যাত্রা দেখতে ভালবাসি না। সিনেমাও নয়। সারা বছরই একটা কল্পনার মধ্যে থাকি। জীবনের চারপাশে মানুষজন, কিছু কিছু দূরের মানুষজন… তাঁদের সহায়তার জন্য আমি সবসময় তৈরি। ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট আছে। কিন্তু দেখি না।

কাকলি: আমি কিন্তু যাত্রা দেখতে খুব ভালোবাসি। সব যাত্রাদলই আমার প্রিয়।  বিভিন্ন যাত্রাদলে অনেক শিল্পী আছেন, যাঁরা আমাদের ঘর থেকে বেরিয়েছেন।

রাতবিরেতে যাত্রা সেরে বাড়ি ফেরার পথে কোনও দুর্ঘটনা, বা কোনও অপ্রিয় ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন?

অনল: দুর্ঘটনার শিকার আমরা না হলেও অন্যের দুর্ঘটনা ঘটতে দেখেছি। অত্যন্ত সতর্ক থাকি। সারারাত জেগে ড্রাইভারের পাশে বসে থাকি। একবার ডাকাতির সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু ডাকাতরা আমাকে চিনে ফেলায় রেহাই দিয়েছিল।

কাকলি: আমরা তো শো করতে গিয়ে ডাকাতদের বাড়িতে থেকেওছি। মানে ওই বাড়ির পূর্বপুরুষেরা ডাকাত ছিল। এখন তারা পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত। এখন রাতবিরেতে পুলিশি তৎপরতা খুব বেশি হয়ে গেছে ।

অনল: প্রশাসনিক সাপোর্ট খুব পাই।

নিয়মিত যাত্রা করার জন্য কী ধরনের শারীরিক সতর্কতা নেন?

অনল: ঠান্ডা, বর্ষা থেকে বাঁচতে হয়। আর সময়ে খেতে হয়। অল্প খাওয়া। তবে আমি ইদানীং একদম ব্যায়াম করি না। রিহার্সালের সময়, যাত্রার সময় যাবতীয় হাঁটা-চলা, মুভমেন্টই আমার এক্সসারসাইজ।

কাকলি: আমি সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত ঘুমোই। ৭-৮ ঘণ্টা না ঘুমোলে গলা উঠবে না। যাত্রা শেষ হলে কথা বন্ধ রাখি। পরের দিন যাত্রা শুরু হওয়ার আগে খুব প্রয়োজন না হলে কথা বলি না। নিয়মিত ব্যায়াম করি। কম খাওয়া। সংযত জীবন। সবসময় পজিটিভ চিন্তা করি। মানুষের ক্ষতির চিন্তা করি না। তাতেই মুখে ঔজ্জ্বল্য আসে।

আজ থেকে পনেরো-কুড়ি বছর বাদে নিজেদের কোন জায়গায় দেখতে চান?

অনল: সময় আমাকে যেভাবে মানসিক তাগিদ যোগাবে, সেভাবেই অবস্থান করব। শরীরকে জোর করে যাত্রামঞ্চের দিকে ঠেলে দেব না। পর্বতারোহীর মতো হিমালয়ের চূড়ায় যে করে হোক পতাকা পুঁতে আসতেই হবে— এমন লক্ষ্য আমার নেই।

কাকলি: প্রথম কথা ওই পর্যন্ত আমরা মঞ্চে থাকব না। রাজা-রানির মতো প্রস্থান করব যাত্রাজগৎ থেকে। খুব স্পোর্টিংলি। ইতিমধ্যে, অনেক বছর আগেই আমরা চরিত্রাভিনেতা-চরিত্রাভিনেত্রী হয়ে উঠেছি। অকারণে আঠারো বছরের খোকা-খুকু সাজার চেষ্টা করিনি বহুদিন। যেমন চরিত্রে মানিয়েছে তেমনটাই করেছি।

ঈশ্বর যদি সুস্থতা দেন, আমরা অবসরটাকেও দারুণ উপভোগ করব।