আজ প্রথম দফার ভোট। ভোটপ্রার্থীরা প্রচারে, অর্থাৎ নানা চারে-উপচারে, নানা নেটওয়ার্ক খাটিয়ে, ভোটারদের জালে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেন এবং এখনও যাচ্ছেন। যে-যার বিধানসভায় জনগণমনের ‘অধিনায়ক’ হতে চাইছেন। দ্বিতীয় দফার ২৪ ঘণ্টা আগে পর্যন্ত, ভোটারের সমর্থন আদায়ে চলবে ভোটপ্রার্থীর ঢালাও প্রতিশ্রুতি, সর্বদা জনসাধারণের পাশে থাকার আশ্বাস। ইতিমধ্যে পাশে থাকার নানা নমুনা আমরা পেয়েছি; ভোটারের বাড়ি ঢুকে রান্না করে দেওয়া, দেওয়ালে ঘুঁটে দেওয়া, দাড়ি কামিয়ে দেওয়া, জঙ্গলের পথে মাথায় কাঠ বয়ে দেওয়া। এরকম নানাবিধ চমকপ্রদ জনসংযোগে গণমাধ্যম সরগরম, সমাজমাধ্যমে তা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপের বন্যা বইছে।
যদিও জনসংযোগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে, প্রার্থীর নাম ঘোষণার অনেক আগে থেকেই এলাকাভিত্তিক দেওয়াল লিখন চলছিল। প্রার্থীর নামের জায়গাটি খালি রেখে দলীয় চিহ্নের ছবি-যোগে দেওয়ালে লেখা-আঁকা চলতে থাকে, তারপর প্রার্থীর নাম পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে নামটি যুক্ত হয়ে পড়ে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নামটি খুব জরুরি নয়, কেননা ভোট হয় দলের প্রতীকে। ইদানীং দেওয়াল লিখনের থেকেও অনেক বেশি দ্রুত জনগণসংযোগ ঘটায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্ৰাম, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার নামক নানা সামাজিক মাধ্যম। এই নানাবিধ ডিজিটাল ওয়াল আর সাবেকি দেওয়ালের ধরনধারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনও প্রতীক বা প্রার্থীর হয়ে ওয়ালে পোস্ট, সেখানকার ছবি-ছড়ায় ব্যবহৃত ফন্ট, ফোটোশপের কারিকুরিতে কারিগরি আছে নিশ্চিত। সর্বোপরি সেই পোস্টের প্রেক্ষিতে নানাবিধ প্রতিক্রিয়াও মুহূর্তে হাজির। অন্যদিকে সাবেকি দেওয়াল লিখনের কোনও তাৎক্ষণিক লিখিত-জবাব না মিললেও, এক-একটি মূর্তিমান দেওয়ালের বুকে সজ্জিত জাজ্বল্যমান অক্ষরমালা থেকে, সেই এলাকার মানুষের রাজনৈতিক গতিবিধি কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়।
ভোটের দেওয়াল লিখন, এলাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক পরিচিতি। তাছাড়াও বিশুদ্ধ দেওয়াললিখনে আছে চিত্র-বিচিত্র অক্ষরসজ্জা; রং-তুলির টানটোনে, লেখা ও আঁকার সমন্বয়ে এক অনন্য শিল্প। আবার, দেওয়াল থেকে ওয়ালের মধ্যবর্তীতেও আছে অনেক গণমাধ্যম। নিউজ পেপার, রেডিও, টিভি, ইউটিউব, পডকাস্টে অডিও-ভিডিও মাধ্যম, আর দৃশ্যত ফ্লেক্স-ব্যানার-পোস্টার-স্টিকার-লিফলেটে বিবিধ ইস্তাহার। এমনকী টুপি, ছাতা, হাতপাখা, জলের বোতল থেকে শুরু করে পোশাক-আশাকে, আদুল গায়ে, হেয়ারকাটে দলীয় প্রতীক এঁকে চলে চিত্রবিচিত্র প্রচার।
আরও পড়ুন: নাম লুঠের ভার কি গণতন্ত্র বইতে পারবে?
লিখছেন আব্দুল কাফি…
এই প্রচারাভিযানের সবচেয়ে প্রাচীন হল খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন এবং দেওয়াল লিখন। ভোটের এই প্রচার-প্রসার ও তার বক্তব্যের গভীরতা, রসিকতার ‘দাদাঠাকুর’ ছিলেন ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’-খ্যাত শরচ্চন্দ্র পণ্ডিত (১৮৭৯-১৯৬৮)। একবার জঙ্গীপুর মিউনিসিপ্যালিটির ট্যাক্স বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে, মিউনিসিপ্যালিটির ভোটে দাদাঠাকুরের মনোনীত প্রার্থী হয়ে দাঁড়ান জঙ্গীপুরের এক সাধারণ চানাচুর-বুলবুলভাজা বিক্রেতা কার্তিকচন্দ্র সাহা। আর এই কার্তিকের জনসমর্থন আদায়ে এক অভিনব প্রচারে সামিল হলেন সাংবাদিক, সুরসিক দাদাঠাকুর। প্রচলিত ছড়ার হেরফের ঘটিয়ে, তিনি ভোট নিয়ে ছড়া কাটলেন,‘আমি ভোটের লাগিয়া ভিখারি সাজিনু/ ফিরিনু গো দ্বারে দ্বারে/…আমি ভিখারি না শিকারি গো/… আমি নেতা কি অভিনেতা হেথা মালুম করিবে কে তা?’কী অসামান্য দূরদর্শিতা! আবার লিখলেন,‘আয় ভোটার আয়, ভোট দিয়ে যা/ মাছ কুটলে মুড়ো দেবো/ গাই বিয়োলে দুধ দেবো/ দুধ খাওয়ার বাটি দেবো/ সুদ দিলে টাকা দেবো/ ঘি দিলে উকিল হবো/ চাল দিলে ভাত দেবো।’
এইভাবে ছেলেভুলানো ছড়ার প্রচলিত পঙ্ক্তিতে এক অন্যমাত্রার পঙ্ক্তি জুড়ে, কোনওরকম রাখঢাক না করে বচন-সর্বস্ব নির্বাচনের আঁতের কথা রসস্নিগ্ধতায় পরিবেশন করেন দাদাঠাকুর। আর এতেই বাজিমাত। সেবারের ভোটে জয়যুক্ত হোন কার্তিকচন্দ্র সাহা। যদিও তারপরও ভোটকে কেন্দ্র করে অজস্র রসরচনা আছে দাদাঠাকুরের। আর সেই রঙ্গরসিকতার আড়ালে আছে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যঙ্গ, নতুবা তুমুল পরিহাস। কথায়-কথায় ‘পান’ করা, বাংলায়‘প্যালিনড্রোম’তৈরিতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। দাদাঠাকুর উবাচ— “এ মেলে ও মেলে বলেই তো‘এমএলএ’”বা“আমাদের দেশে সবাই‘নেতা’, ‘দেতা’নেই।” কলিকাতা পুরসভার জন্য ছড়ায় আছে,‘যিনি তস্কর দলপতি দৈত্যগুরু/ তিনি বাক্যদানে আজি কল্পতরু।’একবার বহরমপুর মিউনিসিপ্যালিটির নির্বাচনে রমণীমোহন সেনের কাছে হেরে যান নীলমণি ভট্টাচার্য। দাদাঠাকুর তাঁর বিশ্লেষণে জানালে, ‘সবই টাকার খেলা ভাই, Raw-money’র সঙ্গে কি Nil-money পারে?’ তাঁর ‘ভোটামৃত’ নামে কীর্তনের আঙ্গিকে লেখা সরেস রচনায় এই বঙ্গের ভোটরঙ্গ নিয়ে যা ব্যঞ্জনার্থে বলা আছে, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।


সরকারি অনুদানের পরিবর্তে দলের প্রতি আনুগত্য দাবি। এর মাঝে অবশ্যই রাজনৈতিক বিবাদমান দলের মধ্যে উচ্চমানের চাপান-উতোরও চলে। তবে মানের নিরিখে বঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে-সঙ্গে দেওয়াল লিখনের মানও ইদানীং নিম্নগামী। ছ’সাতের দশকে কংগ্রেস সরকারকে কটাক্ষ করে বামপন্থীরা তুলে আনেন নজরুল, সুকান্তের কবিতা-পঙ্ক্তি আর গানে-স্লোগানে সলিল চৌধুরী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অমোঘ সব পঙ্ক্তি। জনপ্রিয় গান-কবিতার প্যারোডি সেই ১৯৬৯ থেকে আজ অবধি প্রতিটি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। সেই সময়ে যুক্তফ্রন্টের শাসনকালকে কটাক্ষ করে কংগ্ৰেসিদের দেওয়াল লিখন চণ্ডীদাসের সুরে, ‘শুনহে দেশের ভাই/ যুক্তফ্রন্টের গদিই সত্য/ দেশপ্রেম কিছু নাই’। যুক্তফ্রন্ট কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘খুকু ও খোকা’ ছড়ার ঢঙে লিখেছিল,‘কিল মারেনি, ঢিল মেরেছে?/ তাতেই তোমরা রুষ্ট হলে!/ তোমরা যখন হুকুম দিয়ে/ চালাও গুলি দুষ্ট বলে!/ তার বেলা?’ ১৯৭৭-এর বিধানসভার নির্বাচনে ‘নাস্তিক’ বামেদের প্রত্যয়ী দেওয়াল লিখন, ‘হবে বাম, হবে বাম, হবে বাম, হবে হবে’-এর প্রত্যুত্তরে কংগ্রেসিদের জবাব,‘হবে কষ্ট, হবে কষ্ট, হবে কষ্ট, হবে হবে’। আর একটি চাপান-উতোর তো খুবই পরিচিত, ‘চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে/ ছাদনাতলায় কে?/ হাতি নাচছে, ঘোড়া নাচছে/ জ্যোতি বাবুর বে।’এর উত্তরে বামপন্থীরা, ‘ঠিক বলেছিস, ঠিক বলেছিস/ ঠিক বলেছিস ভাই।/ ইন্দিরাকে ছাদনাতলায়/ সাজিয়ে আনা চাই’।একটু ব্যক্তিগত এবং তিক্ত আক্রমণ হলেও, সেদিনের ‘নিম’বক্তব্য থেকে আজকের ‘মিম’-বার্তায় এই অনুচিত প্রসঙ্গ নির্বাচনের ‘রণক্ষেত্র’-তে একপ্রকার মান্যতা পেয়ে এসেছে।
দেওয়াল লিখনে বামেরা যেমন বুদ্ধিদীপ্ততার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনই চরম ব্যক্তিগত আক্রমণে চূড়ান্ত নিন্দনীয় বার্তাও হেনেছেন। ওই সাতের দশকেই লেখা হয়েছে, ‘ইন্দিরা মাসি বাজায় বাঁশি/ প্রফুল্ল বাজায় ঢোল/ আয় অতুল্য ভাত খাবি আয়/ দিয়ে কানা বেগুনের ঝোল’। কোথাও-বা লেখা হয়েছে, ‘দু’আনা সের বেগুন কিনে/ মন হল প্রফুল্ল/ বাড়ি এনে কেটে দেখি/ সব কানা অতুল্য’। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ব্রিটিশ আমলে জেলে থাকাকালীন পুলিশের লাঠির আঘাতে অতুল্য ঘোষের এক চোখের দৃষ্টি নষ্ট হয়ে যায়। প্যারোডির এক ভাল দৃষ্টান্ত, ১৯৯৮-এ যেবার তেরো মাসের বাজপেয়ী সরকারের পতন ঘটল, তরুণ তেজপালের নেতৃত্বে তহলকা-র ফাঁস করা রিপোর্ট, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এনডিএ জোট ছেড়ে বেরিয়ে আসা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেওয়াল লিখলেন বামপন্থীরা— ‘নোটন নোটন মন্ত্রীগুলি ঝোটন বেঁধেছে/ ওপারেতে জর্জ-জায়া ভেসে উঠেছে/ কে দেখেছে? কে দেখেছে? তহলকা দেখেছে/ তহলকার হাতে ডট.কম ছিল ছুড়ে মেরেছে/ উহ্ দিদির বড্ড লেগেছে’।

বাংলার দেওয়াল লিখনে প্যারোডি পুরনো এবং জনপ্রিয়। নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘কাঙাল মালসাট’ গ্ৰন্থে আছে, মেদিনীপুরের কংগ্রেস নেত্রী আভা মাইতি গরিব মানুষদের মধ্যে মাইলো অর্থাৎ বুলগার হুইট বিতরণ করেন। সেই সূত্রে বামেরা ‘এলাটিং বেলাটিং সই-লো/ একটি বালিকা চাইলো’-র সুরে ছড়া লেখেন, ‘আভাদিদির মাইলো/ সবাই মিলে খাইলো’। ১৯৮২-র বিধানসভা নির্বাচনে বিষ্ণুপুর কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী ছিলেন গৌর লোহার। গৌরবাবুর নাম-পদবিকে কটাক্ষ করে বামেরা দেওয়ালে লিখলেন, ‘মাটির গৌর যেথা-সেথা, সোনার গৌর নদীয়ায়/ লোহার গৌর দেখবি যদি, রামবিলাসের কুঞ্জে আয়’। ওই সময়ে রামবিলাস চক্রবর্তী ছিলেন বিষ্ণুপুর কংগ্রেস দলের কর্তাব্যক্তি।সেই সাত-আট দশকের অনেক ভাল-মন্দ, ব্যঙ্গ-বক্রোক্তিপূর্ণ দেওয়াল লিখনের দৃষ্টান্ত মিলবে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘আলাপ-বিলাপ’ এবং ভগীরথ মিশ্রের ‘আমলাগাছি’ গ্রন্থে।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই সময়ের দেওয়ালের প্রসঙ্গে আসা যাক। মূল বিরোধী শক্তি বিজেপি তাদের আশাপূরণের বার্তা রেখেছেন দেওয়ালে, ‘পাড়ায় পাড়ায় বলছে/ এবার বিজেপি আসছে’বা‘মা-বোনেরা বলছে/ এবার বিজেপি আসছে’। বেকারদের পক্ষে লেখা হয়েছে, ‘ভাতা নয় চাকরি চাই/ বঙ্গে এবার বিজেপি চাই’। গভীর প্রত্যাশা আর নিবিড় প্রতিদানের আকুতি নিয়ে লেখা, ‘১৫ বছর চোরদের দিলেন/ ৩৫ বছর বাম/ ৫ টি বছর দিয়ে দেখুন, কেমন রাখে রাম’। এই দেওয়াল লিখনের পাশে তৃণমূলের পালটা, ‘ভাত, ডাল, রুটি, বিরিয়ানি অনেক খেয়েছেন/ একবার ফলিডল খেয়ে দেখুন’। অন্যদিকে বিজেপির লেখায় দেওয়াল বলছে, ‘দিদি দিদি করিস না/ দিদির ফাঁদে পড়িস না।/ দিদির জ্বালায় জীবন শেষ/ সামনে শুধুই বাংলাদেশ’।
২০২১-এ তৃণমূলের ক্যাচলাইন ছিল, ‘বাংলা নিজের মেয়েকে চায়’। তাতে হিন্দি-বলয়ের নেতৃত্বনির্ভর বাংলা-বিজেপির প্রতি কটাক্ষ স্পষ্ট। এবার ২০২৬-এ বঙ্গভাষীদের ভিনরাজ্যে হেনস্থার প্রতিবাদে, বাংলা ও বাঙালি সেন্টিমেন্টকে উসকে দিয়ে তাদের স্লোগান,‘আবার জিতবে বাংলা’। এর সঙ্গে আছে, ‘যে লড়ছে সবার ডাকে/ সেই জেতাবে বাংলা মাকে’। শাসক দল হিসেবে তৃণমূলের বার্তায় উঠে এসেছে নানান সরকারি প্রকল্পের জয়গান। অন্যদিকে যথারীতি বিজেপির সেই হিন্দুত্ব ইস্যুতে শান দেওয়া গান-স্লোগান। তৃণমূলের বার্তা, ‘সেতু, বিদুৎ, রাস্তা/ অর্জিত আজ আস্থা/ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য/ করেছে যথাসাধ্য/ ভরসা জাগায় মমতা/ বলছে বঙ্গজনতা’।বিজেপির ধর্মভিত্তিক বক্তব্য,‘জন্ম যখন হিন্দুকুলে/ ভোট দেব পদ্মফুলে’। এবার দিকে-দিকে পালিত হয়েছে বিজেপির‘পরিবর্তন যাত্রা’, সেই উপলক্ষ্যেও বাঁধা হয়েছে গান। সেই গানের কথায় যদিও ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই, আছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, চাকরি নিয়ে প্রত্যাশিত প্রতিশ্রুতি। গানে-গানে বলা হয়েছে, ‘বাংলা এবার বিকশিত হবে সচ্ছল সক্ষম/ নব বাংলায় গাইবে সবাই‘বন্দেমাতরম’/ আর কতকাল বঞ্চিত রবে বাংলার জনগণ/ নতুন বাংলা গড়বে এবার, হবে পরিবর্তন/ চাকরির খোঁজে বাংলার ছেলে দেবে না বিদেশ পাড়ি/ মায়ের কোলে ফিরবে খোকা, ফিরবে নিজের বাড়ি… নির্ভয়ে নারী হাঁটবে, পথে ভয়হীন রাত কাটবে/ নব বাংলার নারীরা সমাজে মাথা উঁচু করে রবে… শিক্ষা, শিল্প, চাকরির সাথে ফিরবে রাজ্যে শান্তি/বিকশিত পশ্চিমবঙ্গ, বিজেপির গ্যারান্টি…’।
গত লোকসভায় বাঁকুড়ার রানিবাঁধের একটি দেওয়ালের চরম টিপ্পনী ছিল, ‘কালো টাকা ফিরিয়ে আনতে ১ টিপুন/ বছরে দু’কোটি চাকরির জন্য ২ টিপুন/ ফের মোদীর ঢপ শুনতে হ্যাশ টিপুন’। অন্যদিকে তৃণমূল আর বিজেপির সেটিং-তত্ত্বকে মাথায় রেখে ডিওয়াইএফআই-এর লেখনী, ‘ঘাসফুল আর পদ্মফুল/ আলাদা ভাবলেই এপ্রিল ফুল’। এই পারস্পরিক আঁতাতের কথা ২০২১ বিধানসভায়, ২০২৪ লোকসভায় বামেদের একটি চালু শব্দবন্ধ ‘বিজেমূল’। সেই সূত্রে লেখা, ‘বিষবৃক্ষের দুটি ফুল/ বিজেপি আর তৃণমূল’। এর জবাবে তৃণমূলের লেখা, ‘বিষবৃক্ষের ফুল হয় না/ মূর্খরা তাও জানে না’। যদিও জবাবটা খুব জুতসই নয়। যেখানে মূল বিষয়ই হল, যেভাবেই হোক ‘ভোট-আনি’-র, সেখানে‘বোটানি’-র তত্ত্ব অচল। তবে ২০১৬ এবং ২০২১-এর নির্বাচনে বামেদের দু’টি দেওয়াল লিখননজর কেড়েছিল, “ফুলের গন্ধে মাথা ধরেছে? ‘বাম’লাগান” এবং “‘বাম’দিকের রাস্তা ধরে হাঁটুন, নিরাপদে থাকুন।”

জনৈক বাম-সমর্থকের ফেসবুক ওয়ালে পেলাম, ‘বলবে এবার বেলেঘাটা/ তৃণমূল প্রার্থী জেলখাটা’। এই প্রসঙ্গে মনে এল, তখন মদন মিত্র জেলে। তখন বামেরা দেওয়ালে ফুট কেটেছিলেন, ‘বসন্ত এসে গেছে/ মদন ফেঁসে গেছে’। যেমন গত লোকসভায় আর একটি দুই পঙ্ক্তির লেখা, ‘এসেছেন স্যান্ডেলে/ যাবেন স্ক্যান্ডালে’। বক্তব্যে হুল খুব স্পষ্ট। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চপ্পল বা চটি নিয়ে অসংখ্য দেওয়াল লিখন হয়েছে, অজস্র মিম ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ২০১৬-তে বামেরা লিখছেন, ‘দিদির পায়ে হাওয়াই চটি/ দিদির ভাইরা সব কোটিপতি’। ২০২১-এ বিজেপি লিখল, ‘পাড়ায় পাড়ায় আওয়াজ তোলো/ হাওয়াই চটি বদলে ফেলো’। ২০১৯, ২০২৪-এ, এর বিপ্রতীপে তৃণমূলের লেখা, ‘অনেক হয়েছে গোরুর পটি/ দিল্লিতে চাই হাওয়াই চটি’। কোথাও-বা লেখা, ‘৮০ টাকার হাওয়াই চটি, ৩০০ টাকার শাড়ি/ ১০ লাখি স্যুটের থেকে অনেক বেশি ভারী’। এবারের বিধানসভা যুদ্ধেও দিকে-দিকে লেখা, ‘লাফাচ্ছে সব চুনোপুঁটি/ একাই একশো হাওয়াই চটি’। আবার রাম-বামকে এক পঙ্ক্তিতে ফেলে তৃণমূলের বার্তা, ‘বাইরে বাম, ভিতরে রাম/ অনেক হয়েছে, এবার থাম।/ ডুবছে পদ্ম, ফুটছে ফুল/ ছাব্বিশেও তৃণমূল’।
দলের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে-সঙ্গে দেওয়াল লিখনের পরিবর্তনও চোখে পড়ে। ২০০১-এ, তৃণমূলের স্লোগান ছিল,‘উল্টে দিন/পাল্টে দিন’। ২০০৬-এ, তৃণমূলের স্লোগান ছিল, ‘চুপচাপ/ফুলে ছাপ’। বিশ বছর বাদ, সিপিআইএমের পক্ষ থেকে আহ্বান, ‘চুপচাপ ইভিএমে/ সব ভোট সিপিয়েমে’।
যদিও পরিবর্তন কীভাবে আসবে, চুপিসাড়ে না সরবে, তা বলবে পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং সময়; রায় দেবেন জনতা। তবে পরিবর্তন বা প্রত্যাবর্তনের বার্তা শুনতে পায় দেওয়াল। কেননা দেওয়ালেরও কান আছে। ততদিন আমরা চোখ খোলা রাখি দেওয়ালে-দেওয়ালে।




