বাঙালি ব্যাবসায় অনাগ্রহী— এমন কথা তো শুনতে আর বিশ্বাস করতে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু গত ৯৪ বছর ধরে বাঙালির যে-প্রতিষ্ঠান আজও তাদের যাত্রা অব্যাহত রেখেছে আন্তরিক নিষ্ঠায় তাদের প্রসঙ্গ কি আমাদের আলোচনা আর চর্চায় উঠে আসে? সংস্কৃতিপ্রেমী বাঙালির চর্চার অভিমুখ যতখানি বিশ্বমুখিন ততটুকু আত্মানুসন্ধানী নয়। আর তা নয় বলেই, সম্পূর্ণ বাঙালির উদ্যোগে গড়ে ওঠা হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি যে আজও তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে আমাদের সংস্কৃতি যাপনের ঐতিহ্যকে আধুনিক ‘বঙ্গজীবনের অঙ্গ’ করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে সেকথা খুব একটা আলোচিত হয় না— একথা বলার সময় মনে রাখছি যে, একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ গ্রামোফোন কোম্পানি লিমিটেডও (যাকে আমরা এইচএমভি নামে জানি) তাদের উপস্থিতি আজ আন্তর্জালিক ব্যবসায় সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে।
১৯৩২ সালে চণ্ডীচরণ সাহা নামের এক তরুণ উদ্যমী বাঙালি গ্রামোফোন কোম্পানি লিমিটেডের মতো একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সমান্তরাল এবং প্রতিস্পর্ধী প্রতিষ্ঠান হিসেবে হিন্দুস্থান রেকর্ডের প্রতিষ্ঠা করেন রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ এবং সহযোগিতাকে সঙ্গী করে। বাঙালির নিজস্ব একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে চণ্ডীবাবুর দেশপ্রেমের আবেগ তো নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু সে-কাজে তিনি নিজেকে দক্ষ, উপযুক্ত এবং অধিকারী করে তুলেছিলেন জার্মানিতে গিয়ে ধ্বনিধারণ (sound recording) এবং ধ্বনিমুদ্রণের (record pressing) সে-সময়ের আধুনিকতম প্রযুক্তি শিখে এসে— নেহাত খামখেয়ালের রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে এই কাজে তিনি নামেননি।
আরও পড়ুন: চায়ের পেয়ালা হাতে শিল্পিত অবসর যাপন এই বই! লিখছেন সুশোভন অধিকারী…
চণ্ডীচরণ যখন জার্মানিতে এই কাজে হাত পাকাতে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ সপুত্র তখন সেখানে। সেখানেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে চণ্ডীচরণের দীর্ঘস্থায়ী যোগাযোগের শুরু। এই যোগাযোগ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বোঝাপড়া আর বিনিময়ের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ছিল না। আমাদের মনে থাকবে ১৯১৫ সালের ১০ মার্চ রবীন্দ্রনাথের সলিসিটর খগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় গ্রামোফোন কোম্পানিকে রবীন্দ্রগানের রয়্যালটি দাবি করে চিঠি দেন। তখনও রবীন্দ্রনাথ নিজে গ্রামোফোন কোম্পানিতে তাঁর কণ্ঠ রেকর্ড করেননি। এই চিঠি দেওয়ার প্রায় সাড়ে এগারো বছর পর ১৯২৬-এর ৫ অক্টোবর গ্রামোফোন কোম্পানি আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যেখানে প্রতিটি ডব্ল সাইডেড রেকর্ডের জন্য কোম্পানি কবিকে আট আনা রয়্যালটি দেবে। অথচ হিন্দুস্থান রেকর্ডের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এরকম কোনও লিখিত চুক্তি করেননি, রয়্যালটিও দাবি করেননি। ৬/১ অক্রূর দত্ত লেনের হিন্দুস্থান রেকর্ডের স্টুডিওতে রবীন্দ্রনাথ সপার্ষদ (প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, রানী মহলানবিশ, রমা মজুমদার, সাবিত্রী কৃষ্ণণ, নিউ থিয়েটার্স-এর প্রতিষ্ঠাতা বীরেন্দ্রনাথ সরকার, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইত্যাদি) ১৯৩২-এর ৫ এপ্রিল আসেন তাঁর কণ্ঠ রেকর্ড করার জন্য। সেদিন যে-মন্তব্য তিনি কোম্পানির ভিজিটরস বুকে লিখে রেখেছিলেন, সেখানেই তাঁর মনোভাবটি ধরা পড়ে— ‘হিন্দুস্থান ম্যুজিকাল প্রডাক্টস ভেরাইটি সিন্ডিকেট জয়যুক্ত হোক,—এরূপ প্রতিষ্ঠান এদেশে এই প্রথম, ইহার সফলতায় আমাদের সকলেরই গৌরব।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ করে রাখা দরকার যে, হিন্দুস্থান রেকর্ডের সূচনাপর্ব থেকেই কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ওই কোম্পানির ম্যানেজিং বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে যুক্ত থেকেছেন ১৯৫১ সাল পর্যন্ত। আরও একটা কথা— ১৯৩৭ সালে চণ্ডীচরণ সাহা প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের কাছে জানতে পারেন যে— রবীন্দ্রনাথ গ্রামোফোন কোম্পানির কাছে তাঁর সমস্ত গানের কপিরাইট বিক্রি করে দিতে চান পঁচিশ হাজার টাকায়। শান্তিনিকেতনের আশ্রম ও বিদ্যালয় পরিচালনার খরচ সামাল দিতেই নাকি কবির এই সিদ্ধান্ত। সে-সময়ে চণ্ডীচরণ সাহা এবং পঙ্কজকুমার মল্লিক চাঁদা তুলে এবং ব্যক্তিগত অর্থ সাহায্য দিয়ে সেই পঁচিশ হাজার টাকা রবীন্দ্রনাথের সেক্রটারি প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে পাঠিয়ে রবীন্দ্রগানের কপিরাইট রক্ষা করেন। এই তথ্য বিশেষ করে উল্লেখের প্রয়োজন আছে এই কারণে যে চণ্ডীবাবুর ব্যাবসায়িক উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথ যেমন নিঃশর্ত সহযোগের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, চণ্ডীচরণও তার যোগ্য প্রতিদান দিয়েছেন প্রয়োজনে—আজকের দিনে বিশ্বাস আর ভরসার এই উভয়মুখী হাত ধরাধরির উদাহরণ আমাদের বিশ্বায়িত জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। অথচ এই উদাহরণে যে মানুষগুলি জড়িত, তাঁরা কেউই গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপের বাসিন্দা নন। তাঁরাও সেই সময়ের বিশ্বায়িত পৃথিবীর মানুষই ছিলেন।

‘রবীন্দ্র-অনুষঙ্গে হিন্দুস্থান রেকর্ড’-এর দীর্ঘ পথপরিক্রমার এক দলিল আমাদের হাতে সদ্য তুলে দিলেন অমল বন্দ্যোপাধ্যায়। অমলবাবু দীর্ঘ সময় গ্রামোফোন কোম্পানির কন্টেন্ট ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। এখন তিনি হিন্দুস্থান রেকর্ড এবং মেগাফোনের পুরোনো মহাফেজখানা ঘেঁটে লুপ্তরত্নোদ্ধারের সুকঠিন দায়িত্ব পালন করে চলেছেন একরকম লোকচক্ষু আর প্রচারের আলোর বাইরে থেকে। হিন্দুস্থান রেকর্ডের এই ইতিহাস লেখার যোগ্যতম মানুষ তিনি— এতে সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রগানের রেকর্ডিং-এর সূত্র ধরে কত হারিয়ে যাওয়া, না-জানা কথা যে অমলবাবু আমাদের জানিয়েছেন সে-কথা জানতে গেলে এই বই আমাদের হাতে নিতেই হবে।
রবীন্দ্রগানের রেকর্ডিং-এর ইতিহাস বা তার পেছনের কাহিনি নিয়ে বাংলায় একাধিক বই লেখা হয়েছে। সেসবের ভিড়েও এই বই আলাদা জায়গা করে নেবে। কেন? রবীন্দ্রগানের রেকর্ডিং-এর ক্ষেত্রে হিন্দুস্থান রেকর্ড হল রবীন্দ্রনাথ সমর্থিত একমাত্র প্রতিষ্ঠান। আজ রবীন্দ্রগানের গায়কির বিবর্তন নিয়ে বিদ্যায়তনিক চর্চা হচ্ছে নানাদিকে। সেই চর্চার প্রধানতম উপকরণ হল রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ অভিভাবকত্বে হওয়া রবীন্দ্রগানের এই রেকর্ডিংগুলি। আমলবাবুর বই সেই উপকরণের ধরতাইটা করে দিল। এই কাজে তিনি হিন্দুস্থান রেকর্ডের পুরোনো রেকর্ডিং রেজিস্টার, ভিজিটার্স বুক, প্রথম বোর্ড মিটিংয়ের রেজিস্টার খাতার মতো দুষ্প্রাপ্য নথির সাক্ষ্য ব্যবহার করেছেন, হিন্দুস্থান রেকর্ডের রেকর্ডিস্ট নীরদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথার প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবহার করেছেন, আরও বহু শিল্পীর স্মৃতিসাক্ষ্যও এই বইকে সমৃদ্ধ করেছে তথ্যে। অমলবাবু হিন্দুস্থান রেকর্ডের বর্তমান কর্ণধার শ্রী শোভনলাল সাহার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় তাঁর অভিজ্ঞতার কথা শুনেছেন। এই সবই এই বইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
বইয়ের ৬৭ পৃষ্ঠার মূল টেক্সট ন’টি অধ্যায়ে ছড়িয়ে আছে, যার প্রধান অংশ ৩৬ পৃষ্ঠার ‘রবীন্দ্র-অনুষঙ্গে হিন্দুস্থান রেকর্ড’ নামের অধ্যায়টি। বাকি সাতটি অধ্যায়ে রবীন্দ্রসংগীত ও আবৃত্তির কপিরাইট এবং রয়্যালটি, প্রথম জাতীয় সংগীত রেকর্ডের কৃতিত্ব, রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে হিন্দুস্থান রেকর্ডের ভূমিকা, দেবব্রত বিশ্বাস এবং বিশ্বভারতী সংগীত সমিতির সংঘাত, হিন্দুস্থান রেকর্ডে যাঁরা গান গেয়েছেন তাঁদের প্রথম রেকর্ডের তালিকা (১৯৩২ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত) ইত্যাদি খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এই বইতে এনেছেন অমলবাবু। সঙ্গে আছে বেশ কিছু রেকর্ড লেবেলের ছবি, নথির প্রতিলিপি, শিল্পীদের ছবি।
আমলবাবুর বই সেই উপকরণের ধরতাইটা করে দিল। এই কাজে তিনি হিন্দুস্থান রেকর্ডের পুরোনো রেকর্ডিং রেজিস্টার, ভিজিটার্স বুক, প্রথম বোর্ড মিটিংয়ের রেজিস্টার খাতার মতো দুষ্প্রাপ্য নথির সাক্ষ্য ব্যবহার করেছেন, হিন্দুস্থান রেকর্ডের রেকর্ডিস্ট নীরদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথার প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবহার করেছেন, আরও বহু শিল্পীর স্মৃতিসাক্ষ্যও এই বইকে সমৃদ্ধ করেছে তথ্যে।
তাহলে, এই বই কি শুধুই তথ্যের সমাহার? তথ্য এই বইয়ের প্রধান ভিত্তি, কিন্তু মজার স্মৃতিও এখানে কম নেই। দু-একটা বলি! ১৯৩৯ সালের নভেম্বরে রবীন্দ্রনাথ শেষবারের জন্য হিন্দুস্থানের স্টুডিওতে এসেছেন রেকর্ডিং-এর জন্য। কবি একবার আবৃত্তি করলেন। সে-সময়ে মোমের ডিস্কে প্রথম রেকর্ডিং হত যা বাজিয়ে শোনা যেত না— সেই মোমের ডিস্ক থেকে গালার ডিস্ক তৈরি হলেই সেই রেকর্ডিং শোনা সম্ভব হত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ রেকর্ডিং হয়ে যাবার পর শুনতে চাইলেন। চালানো হল মোমের রেকর্ড— নষ্টও হল সেটা। এদিকে রবীন্দ্রনাথ শুনে খুশি, বললেন, ‘বাঃ বড় সুন্দর হয়েছে তো!’ বুলা মহলানবিশ (প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের ভাই) কবিকে অনুরোধ করলেন ‘আপনাকে ওটা আর একবার বলতে হবে।’ রবীন্দ্রনাথ বিভ্রান্ত, ‘কেন, ভালোই হয়েছে তো।’ বুলা জানালেন যে আগের রেকর্ডিংটা ছিল টেস্ট, পরেরটা ফাইনাল। রবীন্দ্রনাথ কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, ‘বুলা, আমার আজ প্রায় আশি বছর বয়সে আমাকে টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে আবার ফাইনালে বসতে হবে! এ তুই কী করলি! বুড়োর ওপর এতখানি অবিচার করছিস কেন?’
আর-একটা! কুন্দনলাল সায়গল রবীন্দ্রনাথের গান রেকর্ড করবেন। রবীন্দ্রনাথের অনুমতির জন্য গেলেন তাঁর সামনে গেয়ে পরীক্ষ দিতে। সায়গল চোখ বুজে গাইলেন ‘আমি আমায় যত শুনিয়েছিলেম গান’। রবীন্দ্রনাথ গান থামিয়ে শুধরে দিলেন কয়েকবার, কিন্তু সায়গল ‘আমায়’-তেই থিতু হয়ে রইলেন। সায়গলকে নিয়ে গিয়েছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক— রবীন্দ্রনাথ পঙ্কজকে বলে দিলেন কথা যেন ঠিক করে গায় রেকর্ডিং-এ, পঙ্কজ কথা দিলেন। সায়গলের গানের গলা আর আকুতি রবীন্দ্রনাথের পছন্দ হয়েছিল—আনুমতি দিলেন তিনি। কিন্তু রেকর্ডিং-এ সেই একই বিপত্তি—‘আমি আমায় যত’ হয়ে চলেছে বারেবারে। রেকর্ডিং-এর সময় উপস্থিত ছিলেন হিন্দুস্থান রেকর্ডে হাজির রবীন্দ্রগানের অন্যতম কাণ্ডারি, সুগায়ক হরিপদ চট্টোপাধ্যায়, ওরফে ‘মোটাদা’ (গায়ে-গতরে তিনি সার্থকনাম ছিলেন)। হরিপদ সায়গলকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সায়গল, তুই ভুল করে, ‘আমি আমার যত’ গাইছিস কেন রে পাগলের মত?’ সায়গল জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হরিপদদা, এই ‘তুমি’টা কে আমায় বলতে পারো?’ হরিপদ বললেন ‘…ভগবান’। সায়গল হাসতে-হাসতে বললেন, ‘মোটাদা, একথাটা অস্বীকার করতে পারো যে, সেই যে ‘তুমি’ তিনি কি আমার মধ্যে নেই? আমার মধ্যেও তো ভগবান রয়েছেন, তোমরাই তো বলো মানুষের মধ্যেই ভগবান। তা আমি যদি সত্যি সত্যি মন-প্রাণ দিয়ে আমাকেই গান শোনাতে পারি তো সেই গান তো ‘তুমি’র কানেতে গিয়ে পৌঁছবে।’ বলা বাহুল্য, এই প্রশ্নের সদুত্তর মোটাদা হরিপদ দিতে পারেননি, কিন্তু সায়গল এরপরে গানটা ‘তোমায়’ করেই গেয়েছিলেন— রেকর্ডে তার প্রমাণ ধরা আছে।
এই বইটির সম্পর্কে ব্যক্তিগত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেও বলতে হচ্ছে যে এই বই বনফুলের সেই অমোঘ লাইন ‘বাংলা বইয়ে সবসময় ভুল থাকে’র কাতারে একটা সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। হিন্দুস্থানের কর্ণধার শোভনলাল সাহার ‘ভূমিকা’ এবং ‘লেখকের কথা’সহ নিরানব্বই পৃষ্ঠার এই বই আক্ষরিক অর্থেই অজস্র ভুলে কণ্টকিত। ভুল নানারকম—বানানের ব্যাপারে কথা না বাড়ানোই ভালো। বাংলা বইতে বানান ভুল না থাকলে বাংলা বইয়ের পরিবারভুক্ত হওয়াই কঠিন কোনও বইয়ের পক্ষে। কিন্তু রবীন্দ্রগানের ভাণ্ডারী দিনেন্দ্রনাথ যখন এই বইতে আগাগোড়া ‘দীনেন্দ্রনাথ’ হয়ে বিচরণ করেন তখন সেই দৈন্য মেনে নেওয়া কষ্টকর হয় বইকি! সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়েছেন ‘সৌমেন্দ্রনাথ’। কিন্তু আর-এক ধরনের ভুল আছে, সেগুলি হল তথ্যগত ভুল। ৫১ পৃষ্ঠায় দেখছি লেখা— ‘এর পর ১৯৪১ সালে রথীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর শন্তিনিকেতনের আশ্রম ও বিদ্যালয়ের কাজে তিনি আরও ব্যস্ত হয়ে পড়েন।’ এই কথা বলা হচ্ছে যাঁর সম্পর্কে তিনি মারা যাবেন আরও কুড়ি বছর পরে। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ একাধিকবার হয়েছেন ‘প্রশান্ত কুমার’—প্রশান্তচন্দ্রের কৌমার্য আমরা চাই না। ৯১ পৃষ্ঠায় হিমঘ্ন রায়চৌধুরী হয়েছেন ‘হেমাঙ্গ’, অথচ ৯৪ পৃষ্ঠার ছবিতে তিনি স্বরূপেই বিরাজিত। ৬৫ পৃষ্ঠায় দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বভারতীর সংগীত বোর্ডের সংঘাতের প্রসঙ্গে ‘অননুমোদিত’ হয়ে রয়েছে ‘অনুমোদিত’—এই ভুলকে স্রেফ বানান ভুল হিসেবে অগ্রাহ্য করা কঠিন। সাহানা দেবীর গানের রেকর্ডিং প্রসঙ্গে ৬৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন ‘অনেক পরে পন্ডিচেরি থেকে সাহানা দেবী কলকাতায় এসে রবীন্দ্রভারতীকে গানটি গেয়ে রেকর্ড করে দেন’। যে গানের প্রসঙ্গে এই কথা সেটা হল ‘বুঝি ওই সুদূরে ডাকিলে মোরে’। এই গান তালবাদ্য ছাড়া সাহানাদেবী গেয়েছিলেন পন্ডিচেরিতে বসে, যা রেকর্ড করেছিলেন তড়িৎ চৌধুরী—পরে রবীন্দ্র ভারতীর অধিকারে সে রেকর্ডিং আসে। প্রসঙ্গত বলে রাখি ১৯৮৩ সালের ৯ই জানুয়ারি ‘আজকাল’-এ প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে সাহানাদেবী জানিয়েছিলেন— ‘১৯২৮এ এসেছি। নড়িনি কোথাও।’ কাজেই ১৯৩৬-এ হিন্দুস্থান থেকে বেরোনো রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডটির রেকর্ডিং ঠিক কোথায় হয়েছিল সে নিয়ে ধন্ধ কাটে না। আর ‘বুঝি ওই সুদূরে’ নিয়ে এই বইয়ে ‘বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের ট্রেড মার্ক ছাড়া রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড—১৯৬২’ অধ্যায়টি বেশ বিভ্রান্তিকর এবং তথ্যাল্পতায় রুগ্ণ। কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে একটি মন্তব্য—‘এরপর তিনি বড়ো কোম্পানির মোহে চলে গেলেন গ্রামোফোন কোম্পানিতে’—আপত্তিকর। এই রকম মন্তব্য ব্যক্তিগত পরিসরে হয়তো করা চলে, কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস রচনার অনুষঙ্গে এইরকম মন্তব্য অনভিপ্রেত। এমনকী ৩৬ পৃষ্ঠার ‘সতী, জয়া ও বিজয়ার মধ্যে সবচেয়ে গুণী শিল্পী ছিলেন সতী দেবী’ মন্তব্যটিও ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক—শিল্পীর গুণাগুণ এভাবে বিচার করা যায় না।
সব শেষে বলি—এই বইয়ের একটি সুসম্পাদিত নির্ভুল সংস্করণ হওয়া আশু প্রয়োজন। না হলে এমন মূল্যবান একটা কাজ ভুলের স্বর্গে থেকে গেলে তাতে আমাদেরই ক্ষতি।
রবীন্দ্র-অনুষঙ্গে হিন্দুস্থান রেকর্ড। অমল বন্দ্যোপাধ্যায়। তবুও প্রয়াস এবং হিন্দুস্থান রেকর্ড। জানুয়ারি ২০২৬, দাম ২৫০টাকা




