চতুর্থ পর্ব: ভোট দিন
মূল রচনা
বের্টোল্ট ব্রেখট
বঙ্গীকরণ
নীহার ভট্টাচার্য
পরিমার্জনা ও সম্পাদিত নাট্যরূপ
অনির্বাণ ভট্টাচার্য, প্রতীক দত্ত

(ইন্টারভালের পর মিঠুন, শাকিল, পন্তু, চিন্টু, মনচলি নাচতে থাকে)
শাকিল: বাজা দো ইয়ার— (হাততালি)
দেশে এরকম নেতা বহৎ কম মিলতা হ্যায় জিনকো ক্ল্যাসিক্যাল ডান্স ভি আতা হো—
পন্তু: এভরিথিং ইজ ক্ল্যাসিক্যাল
লাইফ ইজ ক্ল্যাসিক্যাল
ডেথ ইজ ক্ল্যাসিক্যাল
সিগারেট ইজ ক্ল্যাসিক
শাকিল: কাল…
পন্তু: সেক্স ইজ ক্ল্যাসিক্যাল
ভোট ইজ ক্ল্যাসিক্যাল
এভরিথিং ইজ ক্ল্যাসিক্যাল।
শাকিল: ওয়ে হোয়ে, ক্যা বাত হ্যায়! ডবল ভলুম মে বাজাও ইয়ার— ধন্যবাদ, শুকরিয়া। আজকের ভোটের প্রচার একটু অন্য স্বাদের। আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন, আজকের ক্যাম্পেন র্যালিতে আমাদের সাথে থাকবেন জাতীয় দলের উইকেট কিপার হবার লক্ষ্যে এগিয়ে থাকা চিন্টু পাল। (হাততালি) চিন্টুজি, কুছ বোলিয়ে—
চিন্টু: পন্তুজিকে ভোট দিন, আপনাদের ভাল হবে। সবই ভাল হবে। জগন্নাথ পন্তুজির সাথে আছে। আমার মতো বিশ্বখ্যাত উইকেটকিপারের সাথে আছে, আপনাদের সাথেও থাকবে। পন্তুজিকে ভোট দিন। দেখুন, আমরা খেলোয়াড়রা যখন রোদে প্র্যাকটিস করি, তখন ভগবান জগন্নাথ… (পন্তুর ইশারায় শাকিল মাইক কেড়ে নেয়)
শাকিল: আরেকজন বহৎ প্যারা ইনসান ভি হামারে সাথ হ্যায়। দিলমে তুফান তুলনেওয়ালা হিরোইন, লেডি খিলাড়ি-খ্যাত মনচলি শর্মা— মনচলিজি, কুছ বাতাইয়ে—
মনচলি: (টাকার খামের জন্য অপেক্ষা করে। উকিল খাম নিয়ে এলে তারপর বলে) পন্তুজিকো ভোট দিজিয়ে। দুনিয়াকি সবসে বড়া লোকতন্ত্র কি কদর কিজিয়ে, ভোট দিজিয়ে। পন্তুজি কো ভোট দিজিয়ে।
শাকিল: ওয়ে, সিটিওয়ালা চলা দে—, অব, আজকের র্যালির প্রধান আকর্ষণ, পন্তু লাহাআআ। আইয়ে পন্তুজি….
(মাইক নিয়ে পন্তু কথা বলার মতো করলেই গান শুরু হয়। মেয়েরা গায়)
(গান)
একটি কলির দুইটি পাত তাইত’ প্যাটের ভাত
পাহি পাহি পাতা তরি টকরি ভরাই
হায়রে হায়রে হায় হায়রে হায়রে হায়রে হায়
ই সখি জিয়ে কি উপায়ে!
দু’টাকার বাজার করি বাকি আনি লাউ পানি (হো হো হো হো)
সারাদিন পাতা তরি হপ্তা হিসাব পাই
হায় রে হায় রে হায় হায় রে হায় রে হায় রে হায়
ই সখি জিয়ে কী উপায়ে!
বাবুভায়ের ছানাপোনা ইস্কুল পড়ে যায় রে (হো হো হো হো)
মজুর ছানা পকা বিছে যায়
হায় রে হায় রে হায় হায় রে হায় রে হায় রে হায়
ই সখি জিয়ে কি উপায়ে!
পন্তু: (হাতে চারটি ব্র্যান্ডেড কোম্পানির প্যাকেট, কাঁদতে-কাঁদতে ঢোকে)
হায় চিল, সোনালি ডানার চিল…
আয় আয় আয়, (প্রসেন ঢোকে) দাঁড়া দাঁড়া দাঁড়া, মোনোটনি বাজা—
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে-উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে;
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চ’লে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!
হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর উড়ে-উড়ে কেঁদোনাকো ধানসিড়ি নদীটির পাশে। (কান্না থামিয়ে)

পন্তু: আমার চারপাশে যাবতীয় যা, সবই তো আমার। যত দূর চোখ যায়, আমাকেই দেখতে পাই শুধু। তবু তেতো স্বাদ লেগে থাকে মুখে। তবু কেমন হেরে গেছি হেরে গেছি মনে হয় সারাক্ষণ। কিচ্ছু না চেয়ে একটি অপুষ্ট, প্রসূতি মোজাম্বিকের মেয়ে চেয়ে থাকে আমার দিকে, অপলক। একটি অব্যক্ত মুমূর্ষু সুদানের শিশু আমার কোলে উঠতে চায়। প্রতিদিন, প্রতি মিনিটে না খেতে পেয়ে মারা যাওয়া কুড়িটি শিশুর প্রত্যেককে আমার খেলনা দিতে ইচ্ছে করে। অনেক খেলনা। ওরা কিছু চায় না কেন মতি? কেন ওরা কেড়ে নেয় না আমার সব? ওরা খুব বোকা মতি। ওরা সবাই খুব বোকা।— তুমি কতটা খাও মতি?
মতি: যখন যেমন খিদে থাকে কর্তা।
পন্তু: বেশ করো মতি, ঠিক করো। ঠিক করো। খিদে পেলেই খাবে। খিদেই তো খাবার কারণ, তাই না?
মতি: আজ্ঞে হ্যাঁ।
পন্তু: কিন্তু খিদে যে বছরে নব্বই লক্ষ মানুষের মৃত্যুরও কারণ, মতি।
মতি: আজ্ঞে তারা তো বোকা। আপনি তো বললেন।
পন্তু: না না, বোকা নয় মতি, ওরা একা। খুব একা।
মতি: ৯০ লক্ষ লোক একা, কত্তা!
পন্তু: হ্যাঁ, কারণ ওরা তো বোকা। বুঝতে পারছিস, গঙ্গা ?
(গঙ্গা পেছন থেকে উঠে আসে)
গঙ্গা: হ্যাঁ বুজেচি, যান শুয়ে পডুন। প্যাকেটগুলো দিন, আপনার ঘরে রেখে আসি।
পন্তু: না না, আমার ঘরে না। তোদের ঘরে। এই প্যাকেটগুলো তোদের। এটা তোর, এটা মতির আর এইটা শুধু রাধার। সব এক দোকান থেকে কেনা, বুঝলি? শহরে একটা ন্যাংটো ছেলেকে দেখি ফুটপাতে বসে আছে, একা ও বোকা। বুঝলি গঙ্গা, ওমনি মুখটা আমার তেতো হয়ে গেল। সোজা চলে গেলাম সামনেই একটা বড় দোকানে। লম্বা দোকান। বাচ্চাটার জন্য দুটো আর তোদের জন্য একটা করে জামা কিনলাম। বেরিয়ে এসে দেখি ন্যাংটোটা আর নেই! কোথায় চলে গেল কে জানে! ফেরার পথে জামাদুটো কী করব ভাবতে গিয়েই সুরেনের দুই ছেলের কথা মনে পড়ে গেল। আমার বেস্ট কমরেড সুরেন আর তার ওই ফুটফুটে দুটো ছেলে, কী নাম যেন ওদের!…
গঙ্গা: কানাই আর মানিকা।
পন্তু: হ্যাঁ, আমার লিটল কমরেডস কানু আর মানু। এই নে। কাল দিয়ে দিস সুরেনকে। বলিস, জামা দুটো পরে ওরা যেন আমায় দেখিয়ে যায়। নয়তো শান্তি পাব না।
গঙ্গা: ঠিক আছে, আপনি যান, শুয়ে পড়ুন।
পন্তু: তুইও এই নতুন জামাটা পরে আমায় দেখিয়ে যাস একবার। তাহলে শান্তিতে ঘুমতে পারব। আর মতি… কমরেড মতিকে কাল সকালে দেখব।
গঙ্গা: ঠিক আছে, আপনি যান, আমি আসছি।
পন্তু: তুই কিন্তু জামাটা পড়ে দেখিয়ে যাস আমায়, নাহলে আমি…
(পন্তু কিছু দূর গিয়ে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে)
পন্তু: এইইইইই সুরেন সুরেন সুরেন…
(মতি এগিয়ে গিয়ে দেখতে যায় কেউ আছে কি না। পায় না কাউকে)
মতি: কোথায় সুরেন ?
পন্তু: কী ?
মতি: আপনিই তো বললেন। সুরেন কোথায় ?
পন্তু: কোথায় সুরেন? কই?
গঙ্গা: ঠিক আছে, আপনি যান, আমি আসছি।
পন্তু: হ্যাঁ…
(পন্তু বেরিয়ে যায়)

মতি: ভালই হয়েছে। এই এক জামা রাতে কেচে পরদিন সকালে যখন গায়ে গলাই, তখন শালা আধভেজা। …একটা জাঙিয়া দিলে আরও ভাল হত।
গঙ্গা: ইইইইহহ ….
মতি: এই না না! আমার এক্সট্রা জাঙিয়া আছে। দুটো আছে।
গঙ্গা: হুমমম…
মতি: তোমায় কী দিল দেখি— ও না, আগে তো বাবু দেখবেন।
গঙ্গা: ঢং—
মতি: সে আমায় পরে দেখাতে হবে না। একটু খুলে দেখালেই হবে।
গঙ্গা: আগে তোমারটা দেখি—
মতি: আমারটা?… ও জামা! (ব্যাগ থেকে জামা বের করে দেখে) আরিসশালা! এটা আমি পরব?
গঙ্গা: এক্ষুনি পরে ফেলো। কাল সকাল হয়ে গেলে আর না-ও পরা হতে পারে।
(মতি জামা খোলে, গঙ্গা তাকিয়ে দ্যাখে)
গঙ্গা: ইশ, তুমি কি রোগা—
মতি: রোগাই ভাল। তোমারটা দ্যাখাও—
পন্তু: (নেপথ্য থেকে) গঙ্গা—
গঙ্গা: যাই— (পোশাক বের করে, তুলে ধরে, কেঁদে ফেলে)
(গান) হায় রে হায় রে হায় হায় রে হায় রে হায়
ই সখি জিয়ে কি উপায়ে?
(মতি জড়িয়ে ধরে, ছাড়িয়ে বেরিয়ে যায়। সুরেন ঢোকে হ্যারিকেন নিয়ে। মতির দিকে তাকায়। সুরেন বেরিয়ে যায়)
পন্তু: (নেপথ্য) গঙ্গা আয়, ছিটকিনিটা দিয়ে দে।
(মতি গুটিয়ে বসে থাকে। রাধা ঢোকে।)


রাধা: ইয়ে মউসম কা জাদু হায় মিয়াওয়া, না অব দিলপে কাবু হায় মিতওয়া— এই যে, দু’দিন পরে কী, জানো?
মতি: কী? ও হ্যাঁ, আপনার বিয়ে।
রাধা: জানো সেটা?
মতি: সে তো লাহাপুরের সবাই জানে।
রাধা: কী জানে?
মতি: এই, দারোগা আয়ান ঘোষকে পন্তুবাবু জামাই করবেন, সঙ্গে আপনিও বিয়ে করে নেবেন। আমরা খাব।
রাধা: ডাব খাবে?
মতি: কার ডাব?
রাধা: গাছের।
মতি: না
রাধা: (ভারতীকে) নিয়ে যা— উফ্, বিরক্ত লাগছে আমার সকাল থেকে।
মতি: ও বিকেল হলে ঠিক হয়ে যাবে।
রাধা: চুপ করো তো। আমি কিন্তু চাইলে তোমাকেও বিয়ে করতে পারি, জানো তো? শুধু বাবা আয়ান ঘোষকে কথা দিয়ে রেখেছে, বাবার কথার খেলাপ হবে, তাই।
মতি: ইশশশ, তাহলে তো আপনি খুব সমস্যায় আছেন।
রাধা: মোটেই না। আমারই ভুল হয়েছে তোমাকে এসব কথা বলে।
মতি: ওইটাই তো মানুষের সুবিধা। ছাগল-ভেড়াগুলো যদি নিজেদের মধ্যে কথা বলতে পারত, তবে কসাইখানাগুলো কবে উঠে যেত গো—
রাধা: তুমি খুব কথা জানো তো!
মতি: কয়েকটা জানি।
রাধা: আয়ান ঘোষকে বিয়ে করতে ইচ্ছে করছে না। সেটা ওকে কী করে জানাব বলো দেখি, যাতে ও নিজেই সরে পড়ে?
মতি: ও যা মাল, আকারে-ইঙ্গিতে বলে লাভ হবে না।
রাধা: তাহলে?
মতি: একটু খোলাখুলি বলতে হবে আর কী…
রাধা: কীরকম?
মতি: বলব? এই ধরুন বাবু সেদিন বললেন না, আপনার সাথে আমার বিয়ে দেবেন? আমি তাতে সাহস পেয়ে গেলাম। আপনারও আমাকে মনে ধরল। দু’জনে একটু মাখো-মাখো ভাব দেখালাম। ব্যস, দারোগাবাবু সেটা জানতে পেরে বলল, ‘কীইই! ড্রাইভারের সাথে ওইসব? দরকার নেই আমার ওইসব মাগীর…
রাধা: এইই..
মতি: মেয়ের।’ এরকমও হতে পারে।
রাধা: মাখো-মাখো ভাবটা কী করে দেখানো হবে শুনি—
মতি: ও আপনি পেরে যাবেন। দারোগার সামনে ধরুন আমি আপনার নাম ধরে তুমি বলব।
রাধা: কীরকম?
মতি: রাধি, জামার বোতামটা আটকাও।
রাধা: (জামার বোতাম দেখে) কই? ওওও, এটা বলবে? কিন্তু ওর যা টাকার লোভ, ও এতে কিছু মনে করবে না।
মতি: তাহলে আমি ভুল করে পকেট থেকে রুমাল বের করতে গিয়ে আপনার একটা ব্লাউজ বা একটা ইয়ে বের করতে পারি। এমনভাবে করতে হবে যাতে ও দেখতে পায়।
রাধা: এসব ব্যাপারে তোমার খুব মাথা খোলে দেখছি?
মতি: আপনার বিপদে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলাম—
রাধা: তাহলে আরেকটু ভাবো, এতেও হবে না। ও বলবে, তুমি মনে-মনে আমায় ভালবাসো বলে আমার ইয়ে চুরি করে পকেটে রেখেছ। আরেকটু ভেবে দেখো, পেয়ে যাবে।
মতি: তাহলে ওর সামনে আমরা দু’জনে একসাথে স্নানঘর থেকে বেরতে পারি।
রাধা: তোমাকে নিয়ে মুশকিল হল, তুমি কখন ঠাট্টা করছ আর কখন করছ না, বোঝা যায় না।
মতি: সে তো আপনি দাঁতের ডাক্তারের বেলাতেও জানেন না। হাঁ করে বসে থাকেন। ডাক্তার কী করবে, সে-ই জানে।
রাধা: তোমার এইসব কথা শুনে না, ভয় লাগে। দু’জনে একসাথে স্নানঘরে গেলে তুমি তার সুযোগ নেবে না তো?
মতি: গরিব মানুষের কি আর অত সহজে সুযোগ আসে? ঠিক আছে, আপনার আপত্তি থাকলে…
রাধা: আচ্ছা বেশ, তোমাকে বিশ্বাস করে যাচ্ছি কিন্তু।
মতি: আরে দাঁড়ান দাঁড়ান ম্যাডাম, দাঁড়ান। এখনই না। আগে দারোগাবাবু আসুক। ওনার সামনে দিয়ে দু’জনকে স্নানঘরে যেতে হবে। যান এখন বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করুন। আমিও তাস নিয়ে আসি।
রাধা: তাস কী হবে?
মতি: ভেতরে সময় কাটাতে হবে তো—
রাধা: ও তুমি ভেতরে গিয়ে তাস খেলবে?
মতি: যদি সময় পাই…
রাধা: ঠিক আছে, যাও।
(দু’জনের প্রস্থান। পন্তু ও আয়ানের প্রবেশ।)
আয়ান: ভাবছি, বিয়েটা হলেই লাহাপুরে ট্রান্সফার নিয়ে চলে আসব।
পন্তু: হুমমম।
রাধা: নাআআ, নাআআ, ক’রো না প্লিজ। দিনের বেলা এসব করতে নেই। এখন ছেড়ে দাও, পরে হবে।
আয়ান: রাধার গলা না?
পন্তু: না না, রাধা না। কানে কি ইয়ে গুঁজে থাকো নাকি! গোয়ালার মেয়েটা কার সঙ্গে যেন আজকাল ওইদিকটায় খুব যায়। কয়েকদিন ধরে লক্ষ করছি। ছাড়ো এসব।
রাধা: (বাথরুমের ভেতর থেকে) ছাড়ো না গো। আমার কিন্তু কাতুকুতু লাগছে।
আয়ান: রাধার গলা, আপনি শুনতে পেলেন?
আয়ান: পিসিমাকেও সাথে করে নিয়ে আসব। (ঝিয়ের প্রবেশ, চা নিয়ে) সবাই মিলে একসাথে সুখী পরিবার হয়েই থাকা যাবে… (ঝিয়ের গাল টিপে) কেমন আছ?… বাবা আমার বড়সাহেবের সাথে সমস্ত কথা হয়ে গেছে। ট্রান্সফার পেতে বেশি অসুবিধা হবে না।
পন্তু: তোমার বড়সাহেব বিয়েতে আসছেন তো?
আয়ান: হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি অনেকবার করে বলেছি।
পন্তু: আবার বলো। উনি যেন অবশ্যই আসেন, সেটা দেখো। আমি ভোটের আগে বিয়েটা কিন্তু— (রাধা ঢোকে) কী রে, কোথায় চললি?
আয়ান: কেমন আছ রাধা?
রাধা: ভাল আছি। ওই বাথরুমে চান করতে যাচ্ছি।
পন্তু: এখন স্নান?
রাধা: হ্যাঁ। মাথাটা খুব ধরেছে সকাল থেকে।… চান করতে গেলাম।
আয়ান: হ্যাঁ। হ্যাঁ।
রাধা: বাবা চান করতে গেলাম।
পন্তু: আরে হ্যাঁ ঠিক আছে। বিদেশ যাচ্ছে যেন। জন্মে শুনিনি মাথা ধরলে কেউ স্নান করে।
আয়ান: করে বাবা, অনেকসময় করে।
পন্তু: তুমি কিন্তু ওই ব্যাপারটা ভুলো না।
আয়ান: কোন ব্যাপারটা?
পন্তু: তোমার বড়সাহেব—
আয়ান: হ্যাঁ হ্যাঁ চিন্তা করবেন না। উনি তো আমাকে খুব ভালবাসেন। (মতির প্রবেশ) এইতো ক’দিন আগেই অফিসের গাড়িটা নিয়ে ওনার দেশের বাড়ি থেকে ঘুরে এলাম একসাথে। ভাবছি বিয়ের পর রাধিকে নিয়ে একবার যাব। তখন অবশ্য নিজের গাড়িতে যাব, মানে আপনার গাড়িতে আর কী!
পন্তু: (মতিকে) কী হল, এখানে কী ঘুরঘুর করছ? ঘুরে বেড়ালেই মাইনে পাওয়া যায়, নাকি? যাও, কাজে যাও।
মতি: ঠাণ্ডে ঠাণ্ডে পানি সে নাহানা চাহিয়ে…
(পন্তু ও আয়ান মতিকে রাধার বাথরুমে ঢুকতে দেখে।)
আয়ান: ভাবছি বিয়েটা হয়ে গেলে…
পন্তু: দাঁড়াও। রাধির সাথে বিয়ে নিয়ে তোমার খোলাখুলি কথা হয়েছে তো? আমার একমাত্র মেয়ে। ওর অমতে কিন্তু…
আয়ান: না না হয়েছে, হয়েছে। খোলাখুলি, জড়াজড়ি হয়েছে, ভীষণ হয়েছে, অনেকবার হয়েছে। একেবারে পাকা কথা। ও তো একটু ল্যাজুক…
পন্তু: ল্যাজুক?
আয়ান: স্পষ্ট করে কিছু বলে না, তাই ঠিক… তবে রাজি আছে, এটা আমি জানি।
পন্তু: হুমমম। ওর সাথে কথা না বলে কিন্তু কিছু করা যাবে না।
রাধা: নাআআ, নাআআ, ক’রো না প্লিজ। দিনের বেলা এসব করতে নেই। এখন ছেড়ে দাও, পরে হবে।
আয়ান: রাধার গলা না?
পন্তু: না না, রাধা না। কানে কি ইয়ে গুঁজে থাকো নাকি! গোয়ালার মেয়েটা কার সঙ্গে যেন আজকাল ওইদিকটায় খুব যায়। কয়েকদিন ধরে লক্ষ করছি। ছাড়ো এসব।
রাধা: (বাথরুমের ভেতর থেকে) ছাড়ো না গো। আমার কিন্তু কাতুকুতু লাগছে।
আয়ান: রাধার গলা, আপনি শুনতে পেলেন?
মতি: (বাথরুমের ভেতর থেকে) পেলাম। উফ্, কতদিন পর পেলাম। আজ আর কথা শুনব না, কারও কথা শুনব না। আজ খুব ইচ্ছে করছে।
আয়ান: মতির গলা। মিঠুনের মিমিক্রি করছে।
(পন্তু বাথরুমের কাছে যায়। রাধার আওয়াজ শুনে তাড়াতাড়ি ফিরে আসে)
পন্তু: চলো, আমরা ভেতরের ঘরে গিয়ে বসে কথা বলি।
মতি: (বাথরুমের ভেতর থেকে) না, এখানেই। এখানেই। এই তো কত জায়গা, হয়ে যাবে।
রাধা: (বাথরুমের ভেতর থেকে) না, এখানে ওসব ক’রো না।
মতি: এর আবার এখানের-ওখানের কী আছে! ওই শেষ যেদিন ওনার চা বাগানের পেছনদিকটায় সন্ধেবেলায় গেলাম, সেদিনও তো শুরুতে না না করছিলে—
রাধা: (বাথরুমের ভেতর থেকে) না না, তাই বলে এখানে?
মতি: (বাথরুমের ভেতর থেকে আস্তে আস্তে বলে) এবার না বলাটা আস্তে-আস্তে কমিয়ে দিন। (আবার জোরে) থামো তো, নিকুচি করেছে তোমার না-এর। গামছাটা খোলো— আহ্, এখানেই পেতে দাও— আহ্…
রাধা: (বাথরুমের ভেতর থেকে মতিকে কাছে টেনে, আস্তে-আস্তে বলে) নাও, যা করবে তাড়াতাড়ি করো।
মতি: (নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে) জোরে বলুন, জোরে।
রাধা: (বাথরুমের ভেতর থেকে) ও হ্যাঁ, যা করবে তাড়াতাড়ি করো। যদি কেউ আবার চলে আসে এদিকে?
পন্তু: রাধা! রাধা! রাধা!
রাধা: (বাথরুমের ভেতর থেকে) (মতিকে) যাহ, এবার তো বেরতেই হবে!
মতি: হুমম। দাঁড়ান। (রাধার চুল-পোশাক অবিন্যস্ত করে দেয়)
রাধা: এতে হবে না। (ব্রা খুলে মতির হাতে দেয়)
পন্তু: রাধিইইইই—
রাধা: (বেরিয়ে এসে) বাবা ডাকছিলে?
পন্তু: কী করছিলি তুই ওখানে? এত জোরে কথা বলতে-বলতে— আমাদের কি কান নেই, না কি?
রাধা: তুমি কী শুনলে!
(মতি গান গাইতে-গাইতে বেরয়। কানে ব্রা-টা ঝুলছে)
পন্তু: ইশশশ, দেখ, ওই দেখ। ওটা কী? (আয়ান মতির কাছে গিয়ে ব্রা-টা নিয়ে ভাঁজ করতে থাকে)
মতি: আমি তো দিদিমণির সাথে একটু তাস খেলছিলাম। এই দেখুন, তাস।
পন্তু: চুপ কর হারামজাদা। রাধার আশপাশে যেন আর ঘোরাঘুরি করতে না দেখি তোকে। ফের কোনও বাঁদরামি দেখলে তোর লাশটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না লাহাপুরে। আয়ানবাবু বাড়ি আছেন, আর তুই… (আয়ানকে) এই গান্ডু, তুমি ওটা নিয়ে কী করছ? ফেরত দাও—
আয়ান: রাধা— (ফেরত দেয়)
পন্তু: (মতির গলা চেপে ধরে) হারামজাদা—
আয়ান: (আয়ান ছুটে গিয়ে পন্তুকে সামলায়) বাবা বাবা, ঠিক আছে, বাবা— আপনি উত্তেজিত হবেন না। শরীর খারাপ করবে। ওরা তো তাসই খেলছিল। আমার বড়সাহেব তো সবসময় বলেন, খেলাধুলোর মধ্যে থাকলে শরীর-স্বাস্থ্য সব ভাল থাকে। ভাবছি বিয়ের পর বাড়ির পাশে একটা ব্যাডমিন্টন কোর্ট বানাব। আমি আর রাধা টাকাস…
মতি: টুকুস…
আয়ান: খেলব! চলুন আমরা ভেতরের ঘরে গিয়ে কথা বলি। ওরা এখানেই খেলুক বরং।
পন্তু: বড়বাবু আসছেন তো বিয়েতে?
আয়ান: অবশ্যই।
পন্তু: হাবিলদার-টাবিলদারদেরও ব’লো। যারা পুলিশের চাকরির পরীক্ষা দিয়েছে তাদেরও ডাকো।
(পন্তু বেরিয়ে যায়)
আয়ান: নিশ্চয়ই। আসছি, রাধা।
(আয়ান বেরিয়ে যায়)
রাধা: শালা হ্যাংলা।
মতি: আপনি যতটা ভাবছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি। দারোগা পুরো জাতঢ্যামনা সাপ। যাক গে, কী করবেন বলুন। বাকিটা খেলবেন ?
রাধা: হ্যাঁ…
মতি: তাস।
রাধা: ধুর ! বিয়েটা মনে হচ্ছে ওই ছাগলটাকেই করতে হবে।
মতি: ম্যায়্যাআ্যা…
রাধা: ওই করো। আমি দারোগাকে বিয়ে করি, তুমি পাতা চেবাও। (বেরিয়ে যায়, সানাই)
(চলবে)



