দ্বিতীয় পর্ব: প্রেম, বিয়ে ইত্যাদি
মূল রচনা
বের্টোল্ট ব্রেখট
বঙ্গীকরণ
নীহার ভট্টাচার্য
পরিমার্জনা ও সম্পাদিত নাট্যরূপ
অনির্বাণ ভট্টাচার্য, প্রতীক দত্ত
নির্দেশকের বক্তব্য
২০১৯-এ আমরা (‘হাতিবাগান সঙ্ঘারাম’) ‘পন্তু লাহা ২.০’ মঞ্চস্থ করি।
পরিচালক হিসেবে তখন ব্যঙ্গ, বক্রোক্তির মিশেলে রাজনীতির একটা ‘মানে’ আমার কাছে ছিল, আমার মনে হত, জনমানসেও ছিল।
এখন সেসবের বালাই নেই। কোনও ‘মানে’-র আর কোনও মানে নেই। আশা, দুরাশাও ঢুকে বুকে গেছে।
এইরকম নিরাসক্ত সময়ে ডাকবাংলা.কম ‘পন্তু লাহা ২.০’-র স্ক্রিপ্ট ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের ধন্যবাদ। আমার ভাল লেগেছে। নিশ্চয়ই বাকিদেরও ভাল লাগবে, এই নাটকের কেন্দ্রে যে ছিল, এবং এখন টুকরো-টুকরো হয়ে আছে আমাদের সবার মধ্যে, সেই প্রসেনজিৎ (বর্ধন)-এরও ভাল লাগবে।


[Projection 3: রাধার পাছায় আয়ানের হাত দেবার স্নিপেডস]
(আয়ানের গলা শোনা যায়, গান গাওয়ার চেষ্টা করছে)
আয়ান: (গান) যতই করো বাহানা, যতই করো না না না, বিয়ের ফুল ফুটলে, লা লা লালালা লাআআ লা…
রাধা: বাজবে বিয়ের বাজনা… কতা জানে না, গান গাইতে এসেচে।
আয়ান: বাজবে বিয়ের বাজনা, বাজবে বিয়ের বাজনা… ইয়ে, তুমি কি এখনও আমার ওপর রাগ করে আছ রাধা?
রাধা: বললাম তো হ্যাঁ।
আয়ান: ওদিকে পিসিমাও রাগ করে আছে-
রাধা: কেন? তুমি কি পিসিমারও ওখানে হাত দিয়েছ?
আয়ান: এ মা, না না উনি রেগে আছেন তোমার বাবার ওপর।
রাধা: সে রাগ ভাঙাতে বাবার বেশিক্ষণ সময় লাগবে না, আমি জানি।
আয়ান: তুমিও তাহলে আর বেশিক্ষণ রেগে থেকো না। দু’দিন বাদেই আমাদের বিয়ে হবে…
রাধা: সে দু’দিন পরে হবে। বিয়ের আগে আমি একদম ওসব হাত দেয়াদেয়ি পছন্দ করি না।
আয়ান: তুমি ভুল বুঝেছ রাধা। তুমি যা ভাবছ, আমি তা করিনি।
রাধা: কী ভাবছি আমি? বলো আর তুমি কী করোনি? কী হল, বলো…
আয়ান: ইয়ে আমি আমি তোমার পাছায় হাত দিইনি।
রাধা: দাওনি?
আয়ান: দিয়েছি। কিন্তু ওই একটা মশা বসেছিল তোমার ওখানে, শুধু সেটাকে তাড়াবার জন্য। ডেঙ্গির মরশুম কিনা…
রাধা: তা হাত নেড়ে তাড়িয়ে দিলেই তো পারতে। মশাটাকে চেপে মারবার দরকার কী ছিল? বাজে কথা যত।
আয়ান: আরে দু’দিন বাদেই তো আমাদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তখন তো…
রাধা: তখন কী?
আয়ান: না, মানে তখন…
আয়ান: তখন তুমি আমার পাছায় বসা মশা মারবে, এই তো? ইডিয়ট।
আয়ান: তুমি এই একটা বিষয় নিয়ে এত রেগে আছ না… আমি কিন্তু তোমার বাবাকে অনেকবার দেখেছি, তোমাদের ওই রান্না করে যে মেয়েটি, তার পাছায় হাত বোলাতে।
আয়ান: না, বাবার সাথে কারও তুলনা করতে এসো না, বুঝলে? বাবা শুধু ওদের পাছায় নয়, মাথাতেও হাত রাখেন। তাই ওরা দিব্যি খেয়ে-পড়ে আচে।
আয়ান: আমিও তো তোমার মাথায় হাত রাখব। দু’দিন পরেই তো…
(অডিওতে গাড়ি এসে দাঁড়ানোর শব্দ। পন্ত লাহার ডাক ‘রাধিকাআআ’)
রাধা: ওই, বাবারা এল বোধহয়। এই, তুমি কোতায় যাচ্চ?
আয়ান: অ্যাঁ!? আমি, হাআআ উমম (হাই তুলে) আমি শুতে যাচ্ছি। কাল সারারাত ডিউটি করেছি তো। চারটে এনকাউন্টার করেছি, চারটে। তুমি আর রাগ করে থেকো না রাধি, আর ওই পাছার ব্যাপারটা পন্তুবাবুকে বোলো না। আমার পাছার দিব্যি, ইয়ে সরি, আমার মাথার দিব্যি।
রাধা: যাও, পাছা উল্টে ঘুমোও গিয়ে। যাও, যাও…
(পন্তু, মতি, উকিলের প্রবেশ)
পন্তু: (গান) তুনাক তুনাক ধুন তুনাক তুনাক ধুন তা না না ঢোলনা ভাজ্জে তুম্বে ভালি তার, না না নানানানা না ঢোলনাআআআ… কী রে, কেমন আছিস?
রাধা: সুন দিলদি পুকার, আজা কর লইয়েহ প্যার… কতা জানে না গান গাইতে এসেচে!
পন্তু: (রাধা প্রণাম করে) থাক থাক, এখন আর কাউকে ডাকাডাকি করতে হবে না। আমি এখানেই একটু বসে আরাম করে একটা, নাহ! একটা তো অনেক বেশি হয়ে যাবে… দুটো বোতল খেয়েই গিয়ে শুয়ে পড়ব। ভাল আছিস তো মা? গুড।

রাধা: আমি শালা তোমার জন্য তিনদিন ধরে বসে আছি এখানে। এখানে আচেটা কী বলো তো? একটা মান্ধাতা আমলের পুরনো গল্পের বই, অর্ধেক পাতা নেই, ওই দারোগা আর তার পিসি।
পন্তু: আরে আমিও তো এলাম সাততাড়া করে। (আয়ান ঢোকে) তোদের বিয়ের আগে, পাকা দেখার আগে, ওই ছাগলা আয়ান দারোগার সাথে আমার দুটো কথা সেরে নেওয়া দরকার।
রাধা: হুঁহ!
উকিল: হুঁহ। দারোগার সাথে ঝগড়া করেছিস না কি রাধি?
রাধা: কী জনি বাপু, ওর সাথে ঝগড়া করা যায় না।
পন্তু: ঠিক ঠিক। তাহলে তোকে বলি শোন। ওই দারোগা গোল্লায় যাক। ওটা মানুষ না, ওটা একটা পোঁদমোটা লোমওঠা ছাগলের বাচ্চা। (মতি হেসে ওঠে, আয়ান গলা খাঁকরায়) এই এটা কে?
রাধা: ও কেউ না।
আয়ান: গুডনাইট, রাধা।
রাধা: গুডনাইট!
আয়ান: গুডনাইট বাবা।
পন্তু: গুডনাইট সন।
আয়ান: যতীনবাবু গুডনাইট।
উকিল: হ্যাঁ হ্যাঁ, গুডনাইট।
আয়ান: হ্যালো ব্রাদার!
মতি: হ্যালো হ্যালো।
রাধা: কী, তখন থেকে গুডনাইট গুডনাইট করছ! যাও না, ভেতরে যাও। যাও, যাও…
(আয়ান চলে যায়)
রাধা: আমি কি বলেছি ও গোল্লায় যাক? ও একটা পোঁদমোটা লোম ওঠা ছাগল? আমি কেবল বলেছি ওর সঙ্গে বসে গল্প করা যায় না। আমার বিশ্রী লাগে।
পস্তু: ঠিক বলেছিস, ঠিক। আরে আমিও তো তাই বলি। কিন্তু এইবার আমি যা একটা বুদ্ধি বের করেছি না— এমন একটা প্ল্যান করেছি… এই যে, এই হল মতি, নাহ, হ্যাঁ, এই হল মতি রায়।
মতি: সরকার।
পন্তু: হ্যাঁ, মতি সরকার। এই মতিকে দ্যাখ। ওর সাথে বসে কথা বলে সবাই আনন্দ পায়। চেহারা দেখেছিস? ভালো করবে। তুই ওকে বিয়ে কর।
রাধা: কী যা-তা বলছ বাবা! আমি কেবল বলেছি আমার বিশ্রী লাগে। (মতিকে) বাক্সটা ভেতরে নিয়ে যাও।
পন্তু: দাঁড়াও দাঁড়াও। একটা বোতল… নাহ, একটা অনেক বেশি হয়ে যাবে, ২টো বোতল রেখে যাও। রাধি, তোর সঙ্গে আমার কথা আছে।
রাধা: (মতিকে) কী হল, ছাড়ো, দেখছ তো ডাকছে। ছাড়ো?
পন্তু: তুই ওর সঙ্গে কথা বলেছিস?
রাধা: কার সঙ্গে?
পন্তু: ওই গান্ডু দারোগার সাথে।
রাধা: কী ব্যাপারে?
পন্তু: তোদের বিয়ের ব্যাপারে।
রাধা: না না, ওসব কিছু কথা হয়নি।
পন্তু: এই তিনদিন ধরে তাহলে কী করলি তোরা? মতি, লোকটাকে আমার সুবিধের মনে হচ্ছে না। (মতিকে) হ্যাঁ, হুম, ওকে। গুড। বিয়ের কথা বলতে আমার তিন মিনিটও সময় লাগে না। দেখবি? তুই ডেকে আন ওকে, আমি ডেকে আনছি রাঁধুনি মেয়েটাকে। দেখিয়ে দিচ্ছি, কী করে বিয়ের কথা পাকা করতে হয়। (মতিকে) দাও তো, একটা বোতল দাও।
রাধা: এএএএইইই… বাক্সটা আমার ঘরে রেখে আসতে বলছি না? আমি জেগে বসে আছি যাতে তুমি ওইসব করতে না পারো! ঝি-চাকরের সাথে ওসব কী?
পন্তু: বেশ, তাহলে আয়ানের পিসিকে ডেকে দে। তার সঙ্গেই বসে একটু গল্প করি তাহলে।
উকিল: পিসির গল্প?
রাধা: যতীনকাকু তুমি চুপ করো।
পন্তু: যতীনবাবুর তো ঘুম পেয়েছে, উনি শুতে যান। পিসির সাথে আমার একটু দরকার আছে।
রাধা: যাও না পিসির কাছে। পিসিমা র্যাগে আগুন।
পন্তু: র্যাগে আগুন? ঠিকাছে, আমি যাচ্ছি, র্যাগ ঠান্ডা করে আসছি। আমি জানি কী করে ওর র্যাগ কমাতে হয়। তুই ওসব বুঝবি না।
রাধা: নাআআআ, তুমি যাবে না। তোমার এখন যা অবস্থা, কোনও মহিলা তোমার সঙ্গে বসে কথা বলবে না।
পন্তু: এই একটা বোতল দাও।
রাধা: (মতিকে) এই, বাক্সটা ভেতরে নিয়ে যেতে বলিনি? যাও, যাও…
পন্তু: বেশ, তুই যখন বলছিস না-হয় যাব না। তাহলে ওই মোটাসোটা মেয়েটা, বোধহয় গোয়ালের কাজ করে, ওকে পাঠিয়ে দে, ওর সাথেই দুটো গল্প করি।
উকিল: গোয়ালের গল্প?
রাধা: আহ যতীনকাকু তুমি চুপ করো না।
পন্তু: যতীনবাবুর তো ঘুম পেয়েছে, উনি শুতে যান।
রাধা: বাবা, তুমি কিন্তু বড্ড বাড়াবাড়ি করছ। তুমি কী চাও, আমি ভেতরে যাই আর সবক’টা বোতল ভেঙে ফেলি?
পন্তু: বাবার সঙ্গে এই ব্যবহার! যতীনবাবু, চলুন—
উকিল: কোথায় যাবেন?
পন্তু: এখান থেকে চলে যাব। এখানে ভাল লাগছে না। এত তাড়াহুড়ো করে এলাম রাতদুপুরে, আর এই ব্যবহার? কোথায় আদর-যত্ন করবে, তা না, কেবল কথা শোনানো? এখানে থাকবই না।
উকিল: কোথায় যাবেন?
পন্তু: আরে কী করে একথা জিজ্ঞেস করছেন, তাই বুঝি না। দেখতে পাচ্ছেন না? আমার নিজের মেয়ে আমায় একটা বোতল দিল না! যাই, দেখি, বোতল কেউ দেয় কিনা আমাকে।
উকিল: আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে? এই রাত্তির আড়াইটের সময় কে বসে আছে আপনার জন্য মদ নিয়ে? কোথায় পাবেন?

(মিঠুন ঢোকে ব্লেজার নিয়ে)
পন্তু: বসে-শুয়ে-দাঁড়িয়ে আছে,
মদ নিয়ে হাত বাড়িয়ে আছে,
শুধু পন্তু লাহা যাবে।
রাত-বিরেতে প্রেম-পিরিতে কে আমায় আটকাবে!
তোর ওই গান্ডু আয়ানের পিসিকে বলিস আমার বয়ে গ্যাছে বুড়ির ঘরে যেতে। এই চললাম আমি। মাটি কাঁপবে, রাস্তাগুলো সব ভয়ে সোজা হয়ে যাবে। পন্তু-উ….
মিঠুন: উউউউউ…
পন্তু: (মিঠুনের মুখ চেপে ধরে) লাহা আসছে….
(পন্তু ও মিঠুন কথা বলতে-বলতে বেরিয়ে যায়)
রাধা: যতীনকাকু, বাবাকে আটকাও না—
উকিল: পন্টুবাবু কোতায় যাবেন?…
রাধা: বাবাকে আটকাও, শিগগির। (মতিকে) আটকাও না…
মতি: পন্তুবাবু… sir… আর লাভ নেই। অনেক দূর চলে গেছে।
উকিল : আমার ঘরটা দেখিয়ে দাও, আমি শুইগে।
রাধা: কোণের ঘরটা।
(উকিল চলে যায়)
রাধা: (মতিকে) আর কী! এবার জেগে বসে থাকি আর এই যে লিসেন, ওই যে দারোগাবাবুর সম্পর্কে যেসব কথা হয়েছে (আয়ান ঢোকে) সেসব মনে রাখাটা আমি চাই না। ঠাট্টা করে কী বলেছে, তা আবার সবার কাছে বলে বেড়িও না।
মতি: কোন কথা? দারোগাবাবু মানুষ না, একটা পোঁদমোটা, লোমওঠা ছাগল— এই কথাটা? (আয়ান বেরিয়ে যায়) কে মানুষ, কে মানুষ না, সব নির্ভর করে কে বলছে তার ওপর। আপনাকে একটা গল্প বলব? শুনুন। আমি তখন একটা বাড়িতে কাজ করি। সে-বাড়ির মেয়ে একদিন হঠাৎ বাথরুমের ভেতর থেকে ডাক দিল— মতি, আমার শুকনো কাপড়-রাউজ নিয়ে আয় তো। নিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি, ভিজে গামছা পরে দাঁড়িয়ে। বলল, ‘এভাবে উঠোন দিয়ে গেলে লোকগুলো সব গোলমাল গিয়ে দেখি, ভিজে গামছা পরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এভাবে উঠোন দিয়ে গেলে লোকগুলো সব হাঁ করে তাকিয়ে দেখবে।’ এই বলে বাঁ-হাতে ভিজে গামছাটা আমাকে দিল। আর ডানহাতে শুকনো কাপড়-ব্লাউজ নিলো।
রাধি: এ মা! কী বলতে চাও!
মতি: কিছু না। শুধু কথা বলে যাচ্ছি সময় কাটানোর জন্য। (গান গায়) ‘জুম্মা চুম্মা দে দে’… (রাধা তাকাতেই) মেরি ভিগি ভিগি সি, পলকা সে রহে গায়ে…
রাধা: য্যায়সে মেরে সপনে বিহরকে …কথা জানে না, গান গেয়ে যাচ্ছে। আয়ান দারোগাকে সবাই খাতির করে। মনে রেখো, ওর ইয়ে খুব ভাল।
মতি: এইটা?
রাধা: ধ্যাৎ!
মতি: ও তাহলে ভবিষ্যৎ।
রাধি: হ্যাঁ, ভবিষ্যৎ খুবই ভাল। ও প্রতিদিন চারটে করে এনকাউন্টার করে। ওর জন্যই লাহাপুরে সবাই সুখে-শান্তিতে বাস করে। ওর মতো বুদ্ধিমান লোক পুলিশে খুব কমই আছে। বাবা তোমার কথা প্রস্তাব করল, তাই ভাবছিলাম তোমার সাথে একবার কথা বলে দেখব কি না।
মতি: ম্যাডাম, ভাব থেকেই ভালবাসা হবে, ভালবাসা থেকে দু’-একবার ইয়ে হবে, আর ইয়ে হলেই বিয়ে করতে ইচ্ছে করবে।
রাধা: তোমার ইয়ে করলেই বিয়ে করতে ইচ্ছে করে?
মতি: হ্যাঁ ম্যাডাম।
রাধা: সো অর্থোডক্স!
মতি: হ্যাঁ ম্যাডাম, গরিব তো—
রাধা: চুপ করো তো। ইয়ের আবার গরিব-বড়লোক কী? আচ্ছা ধরো, আমি ইয়ে-বিয়ে দুটোতেই রাজি। তাহলে সমস্যা কোথায়?
মতি: সমস্যা আছে ম্যাডাম। পন্তুবাবু আর আয়ান দারোগার নজর লাহাপুরের সবদিকে। ধরুন আপনি, একটু ওইদিকে যান— ব্যাগ গুছিয়ে, চুল বেঁধে, লাল শাড়ি পরে আমার সঙ্গে বিয়ে করে পালাবার জন্য রেডি। আমরা দু’জন..
দু’জন: বিয়ের ফুল ফুটলে বাজবে বিয়ের বাজনা …
মতি: গানটা গাইতে-গাইতে পালাচ্ছি। এবার যদি আয়ান দারোগা পেছন থেকে গুলি করে দেয় (পেছনথেকে দু’বার গুলি চালানোর আওয়াজ) সেটা কি ভাল হবে ম্যাডাম?
রাধা: একদম না।
মতি: হুম। (সেট নিয়ে এক্সিট)

[Projection 4: গাড়ি চালানো/মানুষ মারা।]
শাকিল আনসারি: (গান) জরুরি হ্যায়, জরুরি হ্যায়, জরুরি হ্যায়
এত রোজগারের পরে, ট্যাক্স-এর ভারে
হালকা কামের মালিশ
জরুরি হ্যায়, জরুরি হ্যায়, জরুরি হ্যায়
ও ভাই এই গণতন্ত্রে, উন্নয়ন মন্ত্রে
ঘোমটার ভেতরে খ্যামটা নাচা…
পন্তু: (শাকিলকে) বাহ! বাহ! খুব ভাল!
শাকিল আনসারি: জরুরি হ্যায়, জরুরি হ্যায়, জরুরি হ্যায়…
পন্তু: আরেহ! সুরটা ঠিক করে, আরেহ!
কোরাস: একো দুইও তিনো চারো (মিউজিকের সাথে)
পন্তু: আমার জমি, আমার টাকায় দোকানগুলো চলে
আর আমিই শালা মদ পাবো না রাত হয়েছে বলে?
এই কে আছিস?এই কে আছিস, বোতল বেচিস
সামনে এসো ভাই।
একটা, দুটো, তিনটে… আমার চারটে বোতল চাই।
চামেলি: রাতদুপুরে, মদকাতুরে, কে গো তুমি ছেলে
ভাল মদের সোয়াদ পাবে, আমার ঘরে এলে।
আমি উঃ চামেলি। (গান)
পাউয়া চড়াকে আয়ি চিকনি চামেলি, চুপকে আকেলি
পন্তু: উঃ চামেলি, কোথায় ছিলি, কেমন আছিস বল
কদ্দিন দেখা হয়নি মাগি, দেখব তোকে চল্—
চামেলি: বোতল তো সব ফুরিয়ে গ্যাছে…
কোরাস: এহ বাবা! মদ নেই! কী হবে ওর কাছে গিয়ে…
চামেলি: আনিয়ে নেব পরে,অন্য নেশায় মাতবে এসো, এসো আমার ঘরে।
পন্তু: মদ নেই তোর কাছে? পরে তোকে দেখব। দেখি, কার কাছে মদ আছে…
চামেলি: আরে! আরে! আসবে বলে যাচ্ছ চলে? পোড়া কপাল বটে
দুখী মেয়ের জীবন যখন, সুখ কখনও জোটে?
কোরাস: মা, মা—
চামেলি: চুপ কর।
পন্তু: আরে, জোটে, জোটে, জোটে।
দুঃখ যা সব ঘুচিয়ে দেব, আর ক’টা দিন মোটে।
আসছে রবিবার, না এই রবিটা ছাড়—
এর পরের রবি ধর—
আসবি চলে লাহাবাড়ি, তুই কনে, আমি বর।
(বিয়ের বাজনা ও মিউজিক)
শাকিল: বাতিল নোটের এই জামানাতে
ভোট বাতিল হবে না কোনোমতে,
ব্যালটে তারই আঙুল যাবে,
সময়মতো প্রেম যে বিলোবে,
হো হো হো হো…
ছেঁড়া সায়া-শাড়ি-ত্যানা, পন্তু লাহা জাত দেখে না,
একটু গতরখাকি হলেই, ক্যায়া বাত হে!
জরুরি হ্যায়, জরুরি হ্যায়… মলহার…
পন্তু: মলহার তোমার পেছনে ঢুকিয়ে দেব…
কোরাস: একো দুইও তিনো চারো (মিউজিকের সাথে)
সুলেখা: আরে পন্তুবাবু নাকি?
এসো নাগর ঘরে এসো, রাত বাকি, বাত বাকি। (গান)।
রাত বাকি, বাত বাকি।
হোনা হ্যায় যো, হো যানে দো
আমি আঃ সুলেখা।
কোরাস: আঃ সুলেখা
পন্তু: আঃ সুলেখা, একা-একা ঘুরে মরছি বোন,
পরে যাব ঘরে, আগে আমার কথা শোন।
একটু মদ হবে ভাই?
সুলেখা: আরে…
পন্তু: মদ হবে ভাই, এক্ষুনি চাই,
তারপরে তোর ঘরে,
সারাটা রাত ধরে,
সারা, সারা, সারা, সারা,
সারাটা রাত ধরে,
শুনব আমি তোর জীবনে দুঃখ আছে যত,
ভাই-বোনেতে থাকব বসে যম-যমুনার মতো।
সুলেখা: ধ্যাত্ কি যে পোড়ার মাথা বলো না! আমি আঃ সুলেখা।
কোরাস: আঃ সুলেখা…
সুলেখা: আমি যমুনা নই, নিলীমা নই, বোন তো নই কারও,
তবু দেখি, কতেক প্রহর বোন ভাবতে পারো!
পন্তু: আমি বোন বলেছি নাকি?
কোরাস: হ্যাঁ। তাই তো বললেন…
পন্তু: ইশশশ…মদ না খাওয়ার ঘোরে আমি কী যে করে বেড়াই,
উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে,
চড়া সুদে চড়াই।
কর অবহেলা—
সুলেখা: এ আর কী ঝামেলা!
অবহেলা সারাবেলা
জোটে এই কপালে,
তবু জানি মিটবে জ্বালা
পন্তুবাবু এলে।
কোরাস: মা, মা—
সুলেখা: চুপ কর।
কোরাস: টুগুডুগ টুগুডুগ টুগুডুগ ঢিস…
পন্তু: আরে কীসের জ্বালা?
তোকে মালা
পরিয়ে দেব গলে,
ভাতারখাগি?
Problem-টা কী?
রাখব খাসমহলে।
আসছে রবিবার, না এই রবিটা ছাড়।
তুই পরের রবি ধর।
আসবি চলে লাহাবাড়ি, তুই কনে, আমি বর।
(বিয়ের বাজনা ও মিউজিক)
শাকিল: ধর্মের দেশে আছে কর্মখালি,
পেটের নামে জুড়ে দে বাওয়ালি,
খালি পেট হলে, হাত তুলে দাঁড়া,
পন্তু লাহা সে হাতে দেবে তালি।
হো হো হো হো…
পন্তু লাহা পড়লে সরে,
ঝাঁপ দিস ফের ওই অন্ধকারে,
ভোটের পরেই জ্বলবে আলো, ক্যায়া বাত হ্যায়!
পন্তু: কী হল? গাও…
শাকিল: (সুর ছাড়া) জরুরি হ্যায়, জরুরি হ্যায়, জরুরি হ্যায়।
পন্তু: সুর কোথায়? আরেহ! হেলে গেল তো!
কোরাস: একো দুইও তিনো চারো (মিউজিকের সাথে)
মালা: মদ নেবে নাকি?
ঠিক চারটে বোতল বাকি
সেই সন্ধে থেকে বসে আছি,
কতক্ষণ আর থাকি?
আমি আউচু রাধা— (গান)
বোল রাধা বোল তুনে ইয়ে ক্যায়া কিয়া—
কোরাস: এ বাবা, ইশশ, যাহ, কী নাম বলল?
পন্তু: থাম, থাম। এই নামটা চলবে না।
অন্য নাম থাকলে বল, নইলে বরফ গলবে না।
শাকিল: তুঝে পাতা নেহি ইয়ে পন্তুজি কা বেটি কা নাম হ্যায়?
পন্তু: তুমি যাও তো!
শাকিল: Thank you পন্তুবাবু!
মালা: নামের আমার দোকান নাকি?
এটা বাপের দেওয়া নাম।
নাম দিয়েছে, ভাত দেয়নি, তাই হতেছি বদনাম।
পন্তু: তোর বাপের…
কোরাস: ইয়ে মারি!
পন্তু: হ্যাঁ। শোন তোর নাম আউচ্ মালা। কেমন?
কোরাস: অসাধারণ! সুপার!
পন্তু: এবার ছেনালিটা পদ্য করে শুরুর থেকে চালা।
মালা: বাজাও—
মদ নেবে নাকি?
ঠিক চারটে বোতল বাকি।
সেই সন্ধে থেকে বসে আছি,
কতক্ষণ আর থাকি?
আমি আউচ মালা।
পন্তু: আহা দুঃখ কত তোর,
এখন তো প্রায় ভোর
না না দুঃখ করিসনে,
তোর যা আছে সব দে আমায়, সব নেব কিনে।
(মিউজিক)
মালা: একদিনে কি দুঃখ যাবে? দুঃখ থাকবে লেগে।
স্বামীহারা মেয়ে গো আমি, মদ বেচি রাত জেগে।
কোরাস: মা আ আ আ…
মালা: ওরে তোরা চুপ কর…
পন্তু: আরে, ওকে ওকে ওকে।
স্বামী নেই তো আমি আছি,
বিয়ে করব তোকে।
(বিয়ের সানাই)
আসছে রবিবার/ না— এই রবিটা ছাড়/
তুই একটা কাজ কর/ তুই পরের রবি ধর
আসবি চলে লাহাবাড়ি, তুই কনে, আমি বর।
(বিয়ের বাজনা ও মিউজিক)
কোরাস: জরুরি হে জরুরি হে জরুরি হে (২)…
মেয়েরা: স্বপ্নের ভেতর কপাল খোলে, ভবের ঘরে আলো জ্বলে
কোরাস: জরুরি হে জরুরি হে জরুরি হে…
মেয়েরা: আর দুঃখ হবে না, আর কষ্ট হবে না
ভাতার হবে পয়সা-আলা মিটবে বাসনা
কোরাস: জরুরি হে জরুরি হে জরুরি হে…
মেয়েরা: ভাতের ফ্যান আর গিলব না,
চেবাব বাঁশকাঠি মুরগির মাংস
দাঁতের ফাঁকে,
চলবে না চচ্চড়ি-ডাঁটি।
কোরাস: জরুরি হে জরুরি হে জরুরি হে…
মেয়েরা: নে তাড়াতাড়ি কর—
পাউডার দিয়ে লিপস্টিক মেখে তুলব রূপের ঝড়
বড়লোকের বউ হতেছি, দুঃখগুলো স-অ-অ-র… নে তাড়াতাড়ি কর।
পন্তু-মিঠুন-শাকিল: অব আয়া মর্দ কা বাচ্চা—
বরেরা: হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ (৪)
খাবি নাকি চড়?
কানের গোড়ায় আলতো করে এইসান একখান ঝাড়ব,
যতটুকু বেঁচে আছিস, সেই বাঁচাটাও কাড়ব।
মেয়েরা: জরুরি হে জরুরি হে জরুরি হে…
বরেরা: এই রবিটা ছাড়,
নে টিফিন কৌটো ধর
পরের রবিবারেও আমরাই থাকব তোদের বর।
মেয়েরা: জরুরি হে জরুরি হে জরুরি হে…
বরেরা: পোলাও নিবি, কালিয়া নিবি, নিবি ভরে খাসি
গোড়ায় গিয়ে দেখিয়ে দিবি বুকের খাঁজের হাসি।
মেয়েরা: জরুরি হে জরুরি হে জরুরি হে…
বরেরা: মাংসের ঝোলটা বেশি করে নিয়ে আসিস কৌটো ভরে
মদের চাটে জমবে ভাল ৬-৭-৮ দিন ধরে।
মেয়েরা: জরুরি হে জরুরি হে জরুরি হে…
পন্তু-মিঠুন-শাকিল: অব আয়া মর্দ কা বাচ্চা—
বরেরা: এই পোশাকটা ছাড়,
এই নাইটিগুলো পড়
সারাজীবন রবিবার আর আমরাই তোদের বর
বর ২: কী সুরেন, তাই তো? হ্যারিকেনে তেল আছে?
(সবাই হাসতে-হাসতে বেরিয়ে যায়)
শাকিল: ভাইয়ো অউর বেহনো— দেখতেই পাচ্ছেন, শোষণ এবং অত্যাচার কীভাবে সমাজের গভীরে ঢুকে তাকে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এরকম সময়েই প্রয়োজন হয় আন্দোলনের। পন্তু লাহা চললেন সেই আন্দোলনের জুগাড় করতে—




