অজিতেশ বনাম অজিতেশ

Ajitesh Bandyopadhyay

আসানসোলে জন্মেছি বলেই কাজী নজরুলের জন্মস্থান চুরুলিয়া গ্রামটিকে আমি পরতে-পরতে, নিবিড় আবেগ দিয়ে চিনি। এই অঞ্চলের আরও এক ব্যক্তিত্ব আমার এবং আমার সহনাগরিকদের শ্লাঘা, তিনি পশ্চিমবঙ্গের স্বনামধন্য নাট্যব্যক্তিত্ব অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। আসানসোল ও বরাকর-সংলগ্ন রামনগর কোলিয়ারির আশেপাশে শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত করা একজন রক্তমাংসের মানুষ। আসানসোল কলেজে (অধুনা বানওয়ারিলাল ভালোটিয়া কলেজ), যেখানে আমার বাবা ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন, সেখানে দু’বছর আইএসসি পড়েছিলেন অজিতেশ। তারপর বর্ধমান হয়ে ভবিষ্যৎ গড়তে কলকাতায় পাড়ি দিয়ে ভর্তি হন মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজে।

অজিতেশর বাবা কোলিয়ারিতে চাকরি করতেন। স্বচ্ছল সংসার ছিল তাঁদের। তবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কোলিয়ারিতে ঘুরে-ঘুরে কাজ করতে হয়েছে তাঁকে— এমনকী সেই চাসনালা খনিতেও, যেখানে মর্মান্তিক বিপর্যয়ে খনিগর্ভে জল ঢুকে বহু শ্রমিকের সলিলসমাধি হয়েছিল। অজিত পাণ্ডের সেই মর্মস্পর্শী গান অনেকেরই মনে থাকবে— ‘চাসনালা খনিতে মরদ আমার ডুব্যাহ গ্যালো গো’। অজিতেশের বাবা অবশ্য এই ট্র্যাজেডির সাক্ষী হননি। কিন্তু শৈশব পেরিয়ে কুলটি স্কুলে ভর্তি হওয়ার বয়সে কয়লাশ্রমিকদের চরম দুর্দশা আর নিরাপত্তাহীন জীবন অজিতেশের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। এই অধ্যায়টি বাদ দিলে তাই তাঁর জীবনদর্শন, কিংবা নিজেকে গড়ে তোলার অভিমুখ— কোনওটাই পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। তাঁর কিংবদন্তি হয়ে ওঠার কাহিনি নিয়ে লেখা বেশির ভাগ রচনায় দেখি, আসানসোল আর কল্যাণেশ্বরীর অদূরে কোনও কোলিয়ারি-অঞ্চলে শৈশব কাটানোর কথা তড়িঘড়ি সেরে ফেলেই জীবনকাহিনি শুরু হয়ে যায় কলকাতার মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজে ভর্তি হওয়া থেকে।

আরও পড়ুন: কোলিয়ারি অঞ্চলের মানুষ, তাদের সুখদুঃখ, জীবনযাপনের খুঁটিনাটি আমৃত্যু অজিতেশকে ভাবিয়েছে!
লিখছেন পৃথ্বী বসু…

অজিতেশ সেই অর্থে আত্মজীবনী লেখেননি। তুলনায় অনেক অল্প বয়সেই তাঁর মৃত্যু হয়। জীবনী আর আত্মজীবনীর তফাত হয়তো এখানেই— আত্মজীবনীতে তথ্যের সঙ্গে কল্পনা মিশে যায়, প্রকৃত সত্য নিয়ে তৈরি হয় নানান ধোঁয়াশা। সম্প্রতি, সম্ভবত তাঁর মৃত্যুর কোনো বিশেষ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে, তাঁকে নিয়ে অনেক চর্চা চলছে। একটি লেখায় দেখলাম, আসানসোল কলেজে অজিতেশের শিক্ষক প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ীর একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হচ্ছে— সম্ভাবনাময় তরুণ প্রতিভা হিসেবে অজিতেশের উচিত যত শিগগির সম্ভব আসানসোলের সীমাবদ্ধ জগৎ ছেড়ে কলকাতায় চলে যাওয়া। নিশ্চয়ই এই উদ্ধৃতির কোনও সুনির্দিষ্ট উৎস আছে। কিন্তু সেই উৎস কোন প্রেক্ষিতে, কোন ঐতিহাসিক উপাদানের ভিত্তিতে এসেছিল, আর আজ কোন আবহে তা উদ্ধৃত হচ্ছে— কথাগুলো একবার ভেবে দেখতে হয়।

ভাই-বোনেদের পাশে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার প্রথম স্ত্রী লীলা বন্দোপাধ্যায়
(ছবির মাঝখানে সাদা শাড়ি পরিহিতা)

প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী আসলে কে? অকৃতদার, স্বাধীনতা সংগ্রামে বহু বছর কারাবাস করা সেই মানুষটি পরে আসানসোল কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মার্কসবাদী আদর্শে। তাঁর মতো একজন মানুষ অজিতেশকে কালবিলম্ব না করে মফস্‌সল ছেড়ে মহানগরের পথে ঠেলে দিয়েছিলেন— ইতিহাসের এই উপাদান কোন প্রাথমিক তথ্যসূত্রের ওপর ভর করে রচিত, সেই প্রশ্নটিও বিচার্য। কথাটা বলছি এই কারণে যে, জ্ঞান হওয়া ইস্তক, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ীকে আমি প্রতিদিনের বেড়ে ওঠার মধ্যে পেয়েছি। একটি ভঙ্গুর দেয়ালের দু’পাশে, পৃথক দুটি জমিতে ছিল দুটি নেহাতই অনাড়ম্বর বাড়ি— একটি আমার বাবা অব্যয় দাশগুপ্তের, আসানসোল কলেজের ইতিহাস বিভাগের আরেক অধ্যাপকের; অন্যটি তাঁর অগ্রজ সহকর্মী প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ীর। প্রাচীরের ওপারে ছিল তাঁর ভাইপো-ভাইঝিদের নিয়ে অকিঞ্চিৎকর সংসার। এহেন ব্যক্তিত্ব ঠিক কোন অনুভবের বশে পরিপার্শ্বের লড়াই একরকম অসম্পূর্ণ রেখে, তার সহজাত দ্বান্দ্বিকতা কাটিয়ে শহরের পথে ঠেলে দিলেন অজিতেশকে, সে-সম্পর্কে তলিয়ে ভাবারও একটা দায় থেকে যায় অজিতেশ-অনুরাগীদের। বিশেষত যেখানে খ্যাতির শীর্ষে থেকেও নিজের শিকড়কে স্মৃতি থেকে এক লহমার জন্য মুছে যেতে দেননি অজিতেশ। শহর থেকে মফস্‌সলে ফিরে-ফিরে এসেছেন বার বার। আমাদের ওই ছোট্ট একফালি বাড়িটার ছাপোষা চৌকিতে জীবন্ত-কিংবদন্তি অজিতেশ বসে থেকেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এসেছেন তাঁর ‘স্যার’-এর কাছে। আমার বাবার কাছে। আমার কৈশোরে, যৌবনের উন্মেষে। তারই কিছু স্মৃতি অনিবার্যভাবে উপচে পড়ছে; না লিখে উপায় নেই।

আমার জন্ম ছয়ের দশকে, আসানসোলে। বড় হয়েছি তুলনামূলক উন্নততর পরিবেশে। আর অজিতেশকে আসতে হত অনেক দূরের সেই গ্রাম ছাড়িয়ে, রামনগর কোলিয়ারি থেকে। কাজী নজরুলের মতোই বহু কষ্টে, বহু পথ পেরিয়ে। নজরুল আসতেন আসনসোলের হাটন-রোডের একটি কেক-রুটির কারখানায় কাজ করতে, রোজগারের তাড়নায়। আর অজিতেশ? তিনি আসতেন অজানা জ্ঞানের ক্ষুধায় তাড়িত হয়ে। শিল্পাঞ্চলে। নিজের শিক্ষা, মেধা আর বড় হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে চরিতার্থ করতে লম্বা এতটা রাস্তা ছুটতেন প্রতিদিন।

মফস্‌সল ও গ্রামে থাকার সুবিধা-অসুবিধা দুইই থাকে। সত্তর-আশি বছর আগে অসুবিধার দিকটা ছিল একটু বেশিই। পড়াশোনার সুযোগও ছিল সীমিত। তারই মধ্যে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা জিগীষা, মেধা আর নিষ্ঠার জোরে নিজেদের পৌঁছে দিতেন কল্পনাতীত উচ্চতায়। অজিতেশ তাঁদেরই একজন। মনে রাখা দরকার, কল্যাণেশ্বরী-সংলগ্ন এক গ্রাম আর আসানসোল শিল্পাঞ্চলে পড়াশোনার যেটুকু রসদ জুটত, তাকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল অজিতেশের অগাধ পাণ্ডিত্য, দেশ-বিদেশের নানা ভাষার সাহিত্য ও নাটকে তাঁর গভীর ব্যুৎপত্তি— আর তার বিস্তারও ঘটেছিল গ্রাম-মফস্‌সলেই। কলকাতার বিস্তৃত সুযোগ-সুবিধার প্রত্যক্ষ পরিচয় তিনি পেলেন স্নাতক স্তরের মাঝামাঝি, যখন আসানসোল কলেজে পাঠ সম্পূর্ণ না করেই কলকাতার ট্রেনটা ধরে ফেললেন। তারপরের পর্বটা তো ইতিহাস! অথচ তার আগের পর্বটিও ইতিহাসই, কিন্তু অধিকাংশ অজিতেশ-জীবনীতে তা উপেক্ষিত।

বাংলার সর্বকালের অন্যতম নট-নাট্যকার, খলনায়কের ভূমিকাতেও আকাশছোঁয়া সাফল্য অর্জনকারী এই মানুষটির প্রতিভা স্ফুরিত ও বিকশিত হওয়ার নেপথ্যে ছিল এই আসানসোল, কুলটি, বরাকর, চিত্তরঞ্জনের পনেরো-ষোলোটা বছর। এ-চত্বরের অজিতেশকে জানতে সহনশীলতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত এক ধরনের বোঝাপড়া লাগে, যা সেলিব্রিটি অজিতেশকে নিয়ে দুনিয়াজোড়া অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ লেখা, সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণে সচরাচর মেলে না। তাঁকে জানতে যেমন আসানসোল কলেজের ইতিহাসের দুই অধ্যাপক— প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী ও অব্যয় দাশগুপ্তের কথা অপরিহার্য, তেমনই জরুরি এই পর্বে তাঁর অন্যতম বন্ধু সুশীল সিংহের কথা জানা। জানা দরকার আসানসোল কলেজের আরেক অধ্যাপক, বাংলা সাহিত্যে বিকল্প ধারার, প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাহিত্যের আরেক দিকপাল উদয়ন ঘোষের কথাও। জানা দরকার অজিতেশের মা লক্ষ্মীরাণী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দুই ছোটভাই মোহিত ও সুনীত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। আবার ফিরে দেখা দরকার, নজরুলের মতোই অজিতেশকেও ঘিরে আসানসোল-সন্নিহিত কোলিয়ারি ও শিল্পাঞ্চলের মানুষের আবেগ। অজিতেশের প্রয়াণের পর দিশেরগড় অঞ্চল থেকে প্রকাশিত সাহিত্যপত্রিকা ‘অনুবর্তন’ বিবি কলেজেরই ছাত্র অমিতাভ ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। অজিতেশ-গবেষণায় সেটি একটি আকরগ্রন্থ হতে পারে; যা আজকের অজিতেশ-গবেষকদেরও সংগ্রহে থাকা একান্ত প্রয়োজন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত আরও একটি আকর সংকলন ‘প্রসঙ্গ অজিতেশ’। কথাকৃতি-র পক্ষ থেকে ১৯৯৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এই স্মারকপত্র প্রকাশিত হয়। উভয়ই অজিতেশ হওয়ার আগের অজিতেশকে জানা-বোঝার মূল সূত্র।

মণিমাণিক্যখচিত কেরিয়ার গড়ে, তাবড় নাট্যপ্রেমীদের চমৎকৃত করতে-করতেই, সেলিব্রিটি হওয়ার পরও, বাংলায় ও সারা দেশে তাঁর নান্দীকার— পরে নান্দীমুখ— নাটকের কল-শো’র তারিখ পাওয়া যখন দুষ্কর, তখনও এক ডাকে বহুবার, বহুবার অজিতেশ আসানসোলে চলে এসেছেন! এমন অনেক শো-তে সহশিল্পীদের সেকেন্ড ক্লাস ট্রেনভাড়া আর সামান্য আনুষঙ্গিক খরচটুকুই শুধু নিয়েছেন; নিজেও যাতায়াত করেছেন সেকেন্ড ক্লাসে, তার খরচ নিতে রাজি হননি। এভাবেই আসানসোলের মহীশিলায় এক সরকারপোষিত স্কুলে— যেখানকার বেশির ভাগ শিক্ষার্থী নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের— সেই স্কুলের রজতজয়ন্তীতে এসে তিনি একটি নয়, দুটি নাটক মঞ্চস্থ করে গিয়েছিলেন। সকলের অনুরোধে একটি পর্বে মঞ্চে কয়েকটি কবিতাও আবৃত্তি করেছিলেন। আমি তার প্রত্যক্ষ্যদর্শী। সে-ইস্কুলের তদানীন্দন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী।

পুজোর পর পরই গ্রামে-মফস্‌সলে লাগাতার যাত্রাপালা হত— পর পর চার-পাঁচদিন কলকাতার অপেরা যাত্রা করতে আসত। চারদিক-খোলা মঞ্চে কয়েক হাজার দর্শকের সামনে, রাত ন’টায় শো শুরু হয়ে শেষ হত রাত বারোটা পেরিয়ে। ফরম্যাটটা একেবারেই স্বতন্ত্র। কিয়দংশে বেশি চ্যালেঞ্জিংও। এই মাধ্যমকেও কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন অজিতেশ; কয়েক বছর গ্রামেগঞ্জে ঘুরে-ঘুরে যাত্রায় অভিনয় করেছেন। ছকে বাঁধা প্রয়োগরীতিগুলির বিপ্রতীপেও, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে কসুর করেননি কোত্থাও।

‘রাবণ’ নামে একটি যাত্রাপালা করেছিলেন একেবারে ধ্রুপদী আঙ্গিকে, সংলাপও ছিল তার তৎসম শব্দে ঠাসা— কিছুটা গৌতম হালদার অভিনীত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র মতো। গ্রামের দর্শকের সামনে এমন প্রযোজনা উপস্থাপন করতে ভিন্নধর্মী একটা সাহস লাগে। গ্রামবাংলার যাত্রার দর্শক ‘রাবণ’ নিতে পারেননি। আমি নিজে এই যাত্রা দেখতে গিয়েছিলাম আসানসোলের ন’কড়ি রামকৃষ্ণ ময়দানে। ফরাসের আরেক প্রান্তে, একেবারে সামনের সারিতে, অতিথির আসনে বসেছিলেন অজিতেশের ইতিহাসের সেই অধ্যাপক— আমার বাবা— সপরিবার। যাত্রা খানিক গড়াতে-না-গড়াতেই অজিতেশ মঞ্চে এসে ধ্রুপদী বাংলায় সংলাপ বলতে শুরু করলেন। একটা লাইন এখনও মনে আছে, রাবণ বলছেন: ‘শুধু কেশে ধ’রে টেনেছিনু অঙ্গস্পর্শ করি নাই’। এমন সংলাপ আরও কিছুক্ষণ চলার পরই তুমুল চিৎকার-চেঁচামেচি— ‘বন্ধ করুন’, ‘এই জিনিস দেখতে পয়সা দিয়ে আসিনি’… ইত্যাদি-ইত্যাদি। আমাদের মাথা টপকে মঞ্চে গিয়ে পড়ছিল চটিজুতো। ছাত্রের এই বিপন্ন মুহূর্তে বাবা কিন্তু চেয়ার আঁকড়ে, আমাদের নিয়ে, ওই বিক্ষোভের মধ্যেও ঠায় বসে রইলেন। যাত্রা থেমে গেল। অনতিবিলম্বেই দেখলাম, অজিতেশ মঞ্চে ফিরে এসেছেন। তারপর এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে একা অজিতেশ উপহার দিলেন নানা অভিনয়ের এক অনবদ্য কোলাজ— কখনও ‘নানা রঙের দিন’-এর রজনী চাটুজ্জের সংলাপ, কখনও ‘হাটেবাজারে’ সিনেমায় ছিপলির উদ্দেশে বলা লছমনলালের বাংলার ঘরে-ঘরে পৌঁছে যাওয়া টুকরো-টুকরো উক্তি; কখনও ‘শের আফগান’, কখনও ‘সওদাগরের নৌকো’ থেকে একের পর এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। সেই অশান্ত দর্শকরাই এক ঘণ্টারও বেশি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসে রইলেন তারপর। সঙ্গে আমরাও।

রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত ও অজিতেশ

অজিতেশ একবার আক্ষেপের সঙ্গে তাঁর মাস্টারমশাইকে বলেছিলেন, কিছু নাক-উঁচু মানুষ যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন সিনেমায় খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করতে তাঁর খারাপ লাগে কি না, তিনি তাঁদের বলেন, ‘এক-একটা সিনেমায় আমি একবার করে চোখ নাচাই, আর আমার একটা করে বোনের বিয়ে হয়ে যায়।’ ‘প্রসঙ্গ অজিতেশ’ স্মরণিকায় ‘আমাদের সেই অজিত’ শীর্ষক স্মৃতিচারণে অব্যয়কুমার দাশগুপ্ত লিখছেন, ‘… একদিন কথাচ্ছলে বলেছিল— বড় মাপের চরিত্রে অভিনয় করতে গেলে অভিনেতাকে বড় মাপের মানুষ হতে হয়। অজিতেশের কথা লিখতে গিয়ে সেই কথাই বারবার মনে আসছে। ওর মতো খুব বড় মাপের অভিনেতা, পরিচালক ও নাট্যকারের সম্বন্ধে কিছু লিখতে গেলে ঐ ধরনের বড় মাপের যোগ্যতা থাকা দরকার। আমার মতো শুধু শিক্ষকতার সুবাদে যে সান্নিধ্যলাভ করেছে এবং শিল্পী যাঁকে নিজস্ব গুণে শিক্ষকের স্বীকৃতি দিয়েছে, তার পক্ষে এ কাজ খুবই কঠিন।’ এই লেখারই অন্য এক অংশে ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত অজিতেশ-বিষয়ক সেই বিশেষ সংখ্যা ‘অনুবর্তন’-এর উল্লেখ আছে অজিতেশের আজীবন বন্ধু ও সাহিত্যিক সুশীল সিংহের করা স্মৃতিচারণের। সুশীল সিংহের লেখাটির নির্দিষ্ট একটি অংশের উল্লেখ করছেন অব্যয়কুমার দাশগুপ্ত। যেখানে সুশীল লিখছেন— ‘চাসনালা, রামনগর, কুলটি, আসানসোল, বর্ধমান হয়ে অজিত পায়ে পায়ে হেঁটে কলকাতায় গেছে। মহানগরীর কোনো পক্ষপাত বা প্রশ্রয় কোনোভাবেই তার জন্য বরাদ্দ ছিল না।’

সে-কথা মাথায় রেখেই বোধহয় অব্যয়কুমার দাশগুপ্ত আরও লিখছেন, ‘অজিত সেই হাঁটাপথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে (বিদ্যাসাগরের মাইলস্টোনের মতো) নাট্যশিল্পের উপাদানগুলো চিনেছিল। ভাবতেও অবাক লাগে, গিরিশ ঘোষ, শিশির ভাদুড়ীর পর গণনাট্যের জোয়ারে যখন বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র ও উৎপল দত্ত বাংলার নাট্যজগতে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো বিরাজ করছেন, ঠিক সেই সময় অজিতেশ সুদূর মানভূম থেকে পরিক্রমা শেষে কলকাতায় এসে শুধু স্বকীয় নিষ্ঠা, সাধনা ও প্রতিভাবলে তাঁদেরই পাশে একটুখানি স্থান করে নিতে পেরেছিল।’ লেখাটির স্বল্প পরিসরে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রসঙ্গের সূত্র এসেছে। ১৯৫১ সালের ভারত-চীন মৈত্রী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আবহে আয়োজিত নানা আসরে শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, সলিল চৌধুরী, দেবব্রত বিশ্বাস, নির্মলেন্দু চৌধুরীর মতো শিল্পীদের আসানসোলে আসার প্রেক্ষাপট তাতে ধরা আছে।

অজিতেশের মাস্টারমশাইয়ের এই নিবন্ধের কথায় আমার লেখার উপসংহারে আবার ফিরব। তার আগে কতগুলো দৃশ্যর কথা বলি, যা চোখে ভাসে এখনও— একজন কিংবদন্তিপ্রতিম নট ও নাট্যকারকে একেবারে কাছ থেকে, অসংখ্যবার আমাদের মহীশিলার বাড়িতেই দেখতে পাওয়ার সুবাদে। আসানসোল বা আশপাশে কোথাও কল-শো থাকলে নাটকশেষে অজিতেশ এবং অনেক সময়ে কেয়া চক্রবর্তী, কখনও রাধারমণ তপাদার বা রণজিৎ চক্রবর্তী, আমাদের বাড়িতে এসেছেন। অনেক রাত অবধি নাটক নিয়ে আলোচনা করেছেন স্যারের সঙ্গে। দারুণ-দারুণ সব কথা শুনতে পেতাম তখন। অবাক হয়ে সেইসব আসরেই জেনেছি, টলস্টয়ের ‘পাওয়ার অফ ডার্কনেস’-এর গল্প, যা নিয়ে অজিতেশ ও সন্ধ্যা দে ‘পাপপুণ্য’ নাটকে কালজয়ী অভিনয় করেছিলেন। বাড়িতে বসেই প্রথম শুনেছি, অজিতেশ স্যারকে টলস্টয়ের একটি গল্প বলছেন— ‘How Much Land Does a Man Need?’ পাহোম নামে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী কৃষকের গল্প, যে প্রচুর জমির মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখে, ভাবে বৈভবের চূড়ায় পৌঁছলে শয়তানকেও আর পরোয়া করবে না। এক সময়ে পাহোমের কাছে জমি পাওয়ার এক অদ্ভুত প্রস্তাব এল: সকাল থেকে সূর্যাস্তের মধ্যে যতটা পরিধির জমি পারি দিয়ে সে নিজের জায়গায় ফিরতে পারবে, ততটা জমিই তার। শেষ পর্যন্ত বিপুল দূরত্ব ঘিরে, লালসায় অনেক দূর চলে গিয়ে, শর্ত পূরণে সূর্যাস্তের আগে মরিয়া হয়ে ছুটে সে যখন ফিরল, অসুস্থ হয়ে সেখানেই তার মৃত্যু হল। আদতে ছ’ফুটের এক ফালি জমিই বরাদ্দ ছিল পাহোমের জন্য, যেখানে তাকে শুইয়ে দেওয়া হবে।

‘পাপপুণ্য’ নাটকে অজিতেশ ও সন্ধ্যা দে

দেখেছি, অত বড় মাপের একজন মানুষ নাটকশেষে গ্রিনরুমে কী আকুতি নিয়ে প্রবীণ দর্শক থেকে তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী— সবার কাছে জানতে চাইতেন নাটকটা কেমন লাগল; আর সেসব শুনতেন গভীর মনোযোগের সঙ্গে। সবার অনুরোধ রাখার মতো অগাধ উদারতা আর ধৈর্য ছিল তাঁর। তখন আসানসোলে অজিতেশের এক ভক্ত ছিলেন সৌরেন মিত্র (লালু)— তৎকালীন কলেজছাত্র, এখন আসানসোলের প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। অভিনয় করার শখ ছিল সৌরেনের। অজিতেশের ‘নানা রঙের দিন’ অজিতেশের সামনেই অভিনয় করে দেখানোর বাসনাও ছিল তাঁর। অব্যয় দাশগুপ্ত তাঁরও স্যার। ইচ্ছেটা জানানো হল; স্যারও কথায়-কথায় তাঁর অজিতকে বিষয়টা বললেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, স্যারের বাড়িতে ছোট্ট সেই ঘরের চৌকিতে বসে, অজিতেশ সত্যিই সেই নাটক দেখেছিলেন। দেখেছিলেন সদ্য-যুবক, স্বপ্নালু সৌরেন বলছেন— ‘ওহ, তুমি কালীনাথ। তাই বলো? বলো কালীনাথ, তুমি, কী হয়েছে জানো-আজকের শো-তে আমি সাতটা ক্ল্যাপ্ পেয়েছি-দু-বার তো স্পষ্ট শুনেছি, ‘মাইরি, এই না হলে অ্যাকটিং।’ কে যেন একবার বললে, ‘দেখেছ, রজনী চাটুজ্জে ইজ রজনী চাটুজ্জে-মরা হাতি সোয়া লাখ।’ তাহলেই বুঝলে কালীনাথ, পাবলিক এখনও কীরকম ভালোবাসে আমাকে?’ এই যে মানুষটি— তাঁর ব্যক্তিত্বের সংবেদনশীলতা, দয়া ও কমনীয়তা, সব কিছুর অন্তঃস্থলে ছিল তাঁর অভিনয় ও নাটকের প্রতি নিষ্ঠা আর প্যাশন। সেই জায়গায় কোনওদিন আপোস করেননি তিনি; সাধনায় খাদ থাকতে দেননি কণামাত্র।

অজিতেশের কৈশোর থেকে তাঁর মা-বাবা, ভাইবোন, বাবার কোলিয়ারির চাকরির জীবন, কুলটির স্কুল, আসানসোল কলেজ, চাসনালা ও রামনগর কোলিয়ারি— যে-পথ ধরে গড়ে উঠেছিল তাঁর জীবনদর্শন, বিকশিত হয়েছিল তাঁর নাট্যপ্রতিভা, যা পরে আপামর দর্শক ও শ্রোতা তাঁকে বাংলার সর্বকালের অন্যতম নট ও নাট্যকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে— তাঁর শৈশব, কৈশোর এবং কিছু অন্তরঙ্গ ইতিহাসের অবতারণা না করলেই নয় এবার। ‘প্রসঙ্গ অজিতেশ’ সংকলনে অজিতেশের মা ও দুই ভাইয়ের আন্তরিক স্মৃতিচারণে যার হদিশ মিলছে। তাঁর মা লিখছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কথা, যখন তাঁর স্বামী রামনগর কোলিয়ারিতে কাজ করছেন। অজিতেশের বয়স সবে নয় বছর। তিনি আরও লিখছেন, তাঁর প্রথম সন্তান অজিত কলেজ হোস্টেলে থাকার সময়ে মাইনের সব টাকা এদিক-ওদিক দান করে কার্যত পরীক্ষায় না বসতে পারার পরিস্থিতি ডেকে এনেছিল।

অজিতেশের এক ভাই মোহিত বন্দ্যোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলছেন (মোহিত তখন বিদেশে থাকেন), ‘আমার বেশ মনে আছে, আমি একবার দাদাকে বললাম যে তোমরা কয়েকজন নান্দীকার থেকে এখানে এসো। পুরো গ্রুপকে তো নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই তোমরা কয়েকজন এলে খুব ভালো হয়। মাস-দুই ধরে এখানকার কয়েকটা শহরে বেশ কিছু শো-র ব্যবস্থা করা যাবে। এটা আমার ভীষণ শখ ছিল। তা এটা শুনে দাদা বললো যে, ‘দেখ্, এতগুলি ছেলেমেয়ে এখানে আসে, আমরা একসঙ্গে কাজকর্ম করি এবং তারা কিছুটা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। যে অজিত-দা এটা করবে ওটা করাবে— তাদের ফেলে দু’মাসের জন্য বিদেশ গিয়ে… না না, এটা সম্ভব নয়।’

‘তিন পয়সার পালা’ নাটকে অজিতেশ

আরও এক ভাই, সুনীত বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বড়দার জন্যে’ শীর্ষক লেখাটিতে বলছেন, জ্ঞান হওয়ার পর সুনীত অজিতেশকে দেখেননি। স্মৃতিতে আছে ১৯৬১ সালে বিয়ের পর অজিতেশের ‘বৌদি’-কে (শ্রীমতি লীলা বন্দ্যোপাধ্যায়) নিয়ে রামনগরে আসার ঘটনা। সেই নবকলেবরে দাদাকে দেখার অভিজ্ঞতার মর্মস্পর্শী বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলছেন, ‘দুপুর তখন দুটো কি তিনটে হবে। দূরে বাবুকে (বাবাকে আমরা বাবু ডাকতাম) দেখতে পেলাম। ঠিক তারপরে বাবুর থেকেও লম্বা আর একজন। আস্তে আস্তে চেহারাগুলো স্পষ্ট হলো। বাবা ও বড়দার চেহারার পেছনে বৌদি ঢেকে গিয়েছিলো। লোহার গেট পেরিয়ে দাদা আমাদের কাছে এলেন। দুর্গাপুজোর মতো আনন্দ পেলাম। মা বারান্দায় এসে দাঁড়ালো।’ প্রারম্ভিক এই উত্তেজনার বর্ণনা দিয়ে তিনি আরও বলছেন, ‘প্রায় সন্ধ্যায় হাতমুখ ধুয়ে বড়দাকে ঘিরে বসলাম। আর বড়দা হাসিমুখে নানা গল্প করলো আমাদের সাথে। সন্ধ্যে থেকে পাড়ার লোকজন, বাবুর বন্ধুরা আসতে লাগলো বড়দা ও বৌদিকে দেখবার জন্য। ভিতরের ঘরে দিদিদের, দিদিদের বন্ধুদের নিয়ে বৌদি তো একটা জলসার আসর বসিয়েছেন। মনে আছে বৌদি নাচ করছিলো, নির্মলেন্দু চৌধুরীর একটা গান গাইছিলো… আমরা তখন ভীষণ দোটানায় পড়েছিলাম। বারান্দায় বড়দার সুন্দর গল্প আর ঘরে বৌদির মজার ফাংশন— কোনটায় কে উপস্থিত থাকবো, তাই একবার ঘর একবার বারান্দা এই করতে লাগলাম।’

সীমাহীন আবেগ আর আপোসহীন একাগ্রতা— এই দুইয়ের সমন্বয়েই একজন মহান শিল্পী কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। আর এইসব ক্ষণজন্মা মানুষ সর্বদা নিজেদের শিকড়কে মান্যতা দিয়েছেন, শিকড়কে লালনপালন করেছেন, যেমনটা করেছিলেন অজিতেশ। কলকাতায় নাট্যসাধনার জীবনও তার তেমনি নানা বৈচিত্রে, কালের নিয়মের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে ভরপুর ছিল। যশস্বী টিভি-ধারাবাহিক, তথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং অভিনেতা রাজা সেনের অভিনয় ও নির্দেশনার জীবনেও অজিতেশ ছিলেন অন্যতম শিক্ষক। অভিনয় ও নির্দেশনার স্বপ্নে বিভোর তরুণ রাজা সুযোগ পান অজিতেশের সান্নিধ্যে আসার। নিজের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘কী করে ক্যামেরায় চোখ রাখলাম’-এ তিনি লিখেছেন, অজিতেশের সংস্পর্শ তাঁর জীবনদর্শনকে কতটা প্রভাবিত করেছিল। অজিতেশের নাটকের দলে মাসিক ২০০ টাকা পারিশ্রমিকে সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন রাজা। ওই বইয়েরই এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘কিছুদিন পরে আস্তে আস্তে ওঁর নাটকের গ্রুপে যোগ দিলাম। সেই সময় উনিও একটা টারময়েলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। নান্দীকার ভেঙে গেছে। অজিতেশ ‘নান্দীমুখ’ গঠন করেছেন। সেই সময়ে আমি দেখতাম উনি ডায়েরীতে লিখে রাখতেন পরের দিন কী কী কাজ, পরশুর, তার পরদিনের কী কী কাজ— আর ইন্টারেস্টিং ব্যাপার ছিল এই যে, এক একটা দিন যেত আর ডায়েরীতে তিনি এক এক করে সেগুলি কাটতেন।’

সব মহৎ শিল্পীই তাঁর গৃহীসত্তা আর শিল্পীসত্তার বাইনারিকে অতিক্রম করে এক অমৃতলোকে পৌঁছে যান— সৃষ্টির কালোত্তীর্ণ শিখরে, অজিতেশের মতো। পরিশেষে তাই অজিতেশের ইতিহাসের শিক্ষকের রচনায় ফিরে আসি, যেমনটা কথা ছিল। তিনি লিখছেন, ‘গণনাট্য সংঘ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর তাদের নাচ, গান ও নাটক দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সমাজ-সচেতন উন্মাদনা এনে দিয়েছিল। তার ক্রম-অবলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে গণনাট্যের ভাবে উদ্বুদ্ধ উত্তরসূরি হিসেবে শম্ভু মিত্রের পরিচালনায় নাটক এবং উৎপল দত্তের পরিচালনায় ‘লিটল থিয়েটার’ বাংলার নাট্য আন্দোলনের জোয়ার এনে দিয়েছিল। তারই পলিমাটিতে দাঁড়িয়ে ‘নান্দীকার’ ও ‘নান্দীমুখে’র সকল নাট্যপ্রযোজনা এক নবজাগরণ সৃষ্টি করেছিল।’

আর নিশ্চিতভাবে অজিতেশই ছিলেন তার অন্যতম পথিকৃৎ।

ছবিঋণ:
১. ব্রাত্যজন নাট্যপত্র (সেপ্টেম্বর ২০২৬)
২. বৃন্দা দাশগুপ্ত