ইতিহাসে উপেক্ষিতা

Ila Mitra

১৯৯৬ সালের ৫ নভেম্বর, বাংলাদেশের নাচোল অঞ্চলে সমবেত হয়েছিল লক্ষ-লক্ষ আদিবাসী আর কৃষক। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলছেন: 

‘আদিবাসী মেয়েরা তাদের সবথেকে সুন্দর জামাটি পড়ে উপস্থিত হয়েছে। মাথায় ফুল গুঁজে তারা যেন এসেছে কোনো উৎসবে, রানিমাকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে। যাঁকে তারা প্রায়শই দেবীরূপে দেখে নিজেদের স্বপ্নে। তিনি স্টেজে উঠতেই সকলে উলুধ্বনি দিতে আরম্ভ করলো… ছেলের দল ঢোল, তীর, ধনুক, বল্লম সাথে করে এনেছে, চোখেমুখে তাদের উত্তেজনা… যেন রানিমার একটা আদেশের জন্যই অপেক্ষা করে আছে সকলে, পুরোনো বিপ্লবের দিনগুলি আবার একবার ফিরে পাওয়ার জন্য।’

যে রানিমাকে দেখার জন্য হাজার-হাজার সাঁওতাল পরিবার জড়ো হয়েছিল শীতের সকালে, তিনি হলেন বাংলার মেয়ে ইলা মিত্র। আজ তাঁর ১০১তম জন্মবার্ষিকী, কিন্তু তাঁকে নিয়ে চর্চা করতে গেলে বড়ই বিপদে পড়ে বাঙালি মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক। আজকের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে তারা বুঝে উঠতে পারে না, ইলা মিত্রকে ঠিক কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ঠাঁই দেবে! ভারত না বাংলাদেশ? পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার সদস্য, না কি নাচোলের রানি মা? যাঁকে নিয়ে আদিবাসীদের উদযাপনের শেষ নেই, যাঁকে নিয়ে নাচোলে গান বাঁধা হয়েছিল ষাট বছর আগে, কিশোর-কিশোরীরা মুখিয়ে থাকে যে-রানিমাকে একবারটি দেখবে বলে— তাঁকে নিয়ে ভারতীয়দের মধ্যে খুব বেশি আগ্রহ দেখা যায় না।

ইলা মিত্র

আরও পড়ুন: ফ্রান্স উত্তাল হয়েছিল কৃষক নারীদের উদ্যোগেই!
লিখছেন দোয়েলপাখি দাশগুপ্ত…

এই উপেক্ষার দৃষ্টান্ত আমাদের আশেপাশেই রয়েছে, যেমন তেভাগা আন্দোলন নিয়ে গত কয়েক দশকে প্রচুর লেখালেখি হলেও ইলা মিত্রর বৈপ্লবিক অভিজ্ঞতা অ্যাকাডেমিক আলোচনায় অত্যন্ত বিরল। তাঁর চিঠিপত্র, প্রবন্ধ বা বক্তৃতা নিয়ে বাংলাদেশে দু’টি বই বেরলেও (মালেকা বেগম এবং শারমিনুর নাহার সম্পাদিত) পশ্চিমবঙ্গে এতদিন পর, অতি-সম্প্রতি তাঁর জেলখানার চিঠি প্রকাশ পেল (২০২৫ সালে)।  ১৯৫০ থেকে ২০২৪ সাল অবধি এ-পারের ভদ্রবিত্ত বাঙালি মনেই করেনি, ইলা মিত্রকে নিয়ে সুদূরপ্রসারী আলোচনার প্রয়োজন আছে। মহীয়সী নারী, বীরাঙ্গনা— এমন সব শব্দবন্ধে দু-তিনটে সম্পাদকীয় লেখা পাওয়া যায় বটে (আগের বছর তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে), কিন্তু এই অনুষ্ঠানসর্বস্বতা বা নিয়ম করে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন খানিক দৃষ্টিকটু লাগে। এমন চিন্তার আকাল আমাদের ভাবায় যে, ঠিক কেন এই দৈন্যদশা? ইলা মিত্রর নিজের লেখা পড়তে গেলে কেন আমাদের ওপার বাংলা থেকে বই আনিয়ে পড়তে হয়? তাঁর বায়োগ্রাফি, চিঠি বা অন্যান্য বই এই দেশে দুর্লভ, সেটা কি লিঙ্গের চিরাচরিত ইতিহাসের জন্য, না কি পূর্ব পাকিস্তানে আদিবাসীদের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছিলেন বলে? এই বিবিধ জটিল প্রশ্নগুলির মাঝেই অনুধাবন করার চেষ্টা চলবে ইলা মিত্রর সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন।

একদিকে আদিবাসীদের পাশে দাঁড়িয়ে নাচোল বিদ্রোহের অংশীদার, তারপর রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা বারবার ধর্ষণ এবং শেষে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসে এক নতুন রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ‘সাঁওতালদের পাশে দাঁড়িয়ে অংশগ্রহণ’ কথাটি খুব সন্তর্পণেই ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন ইলা মিত্র; তাঁর আদিবাসী বিদ্রোহে উপস্থিত থাকার ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসে— শহুরে ভদ্রমহিলার গ্রামের চাষিদের নেতৃত্ব দেওয়ার বয়ানটা এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে না কি বিদ্রোহে শামিল হওয়ার প্রেক্ষিত বেশি জরুরি? এই নিয়ে ইতিহাসতত্ত্ব বা হিস্ট্রিওগ্রাফি গত চল্লিশ বছর ধরে তর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু তেভাগা, তেলেঙ্গানা নয়, বরং ভারতের সমস্ত কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে এই দ্বন্দ্ব দেখা যায় ইতিহাস রচনায়। নাচোলে রানিমা-র ভূমিকায় তেভাগা নেত্রী হিসেবে তাঁকে ধরা হবে, না কি সাঁওতালদের বিপ্লবে একজন অন্যতম অংশগ্রহণকারী হিসেবে?

রণজিৎ গুহ বা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক বিশ্লেষণ করেছেন যে, বাঙালি মধ্যবিত্ত কীভাবে আদিবাসী বিদ্রোহকে ধারাবাহিকভাবে ‘appropriate’ করেছে, নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে ইতিহাসের পাতায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চালিয়েছে। ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক’-এর মতো জনপ্রিয় প্রবন্ধ এই প্রয়াসের কথাই বিশ্লেষণ করে। কিন্তু ইলা মিত্রর নিজের বয়ানে এই মধ্যবিত্তর ‘appropriation’ (নিজেদের শ্রেণিচেতনা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা) খুব কম চোখে পড়ে। তিনি নিজেকে বা তাঁর পার্টিকে আদিবাসীদের মসিহা হিসেবে দেখেননি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কবিতা পাঞ্জাবি ইলা মিত্রর জবানবন্দি থেকে তাঁর সমাজচেতনা বোঝার চেষ্টা করেছেন। পাঞ্জাবি দেখিয়েছেন যে, ইলা মিত্র নাচোলের লড়াইকে তার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে টেনে বের করে শুধুমাত্র ভদ্রলোকের নেতৃত্বে হওয়া কৃষক আন্দোলন বলেননি। বরং, আদিবাসীদের এই লড়াইকে তিনি সাঁওতাল বিদ্রোহের উত্তরসূরি বলে মনে করেছেন। এই ক্ষেত্রটা আমাদের বিশেষ করে ভাবায়; রানিমা খেতাব পেলেও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে সাঁওতালদের ক্ষমতা প্রদান করতে যাননি। লড়াই করার অদম্য সাহস, স্পৃহা বা কৌশল সাঁওতালদের যে আগে থেকেই রয়েছে, এ-কথা তাঁর সাক্ষাৎকারে বারবার উঠে এসেছে। নাচোল আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলছেন: 

তরুণ বয়সে

‘সিপাহী বিদ্রোহের অনেক আগে ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহ হয়েছিল… তখন যেভাবে ব্রিটিশরা সেই বিদ্রোহ দমন করেছিল, সেই নৃশংস গাঁথা মৌখিক ঐতিহ্যের ধারায় সাঁওতালরা বহন করে চলেছে। বাবা তার ছেলেকে গান শোনায় (বিদ্রোহ নিয়ে), এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্মে হাজার হাজার সাঁওতালদের মৃত্যু, যন্ত্রণা বা অত্যাচারের কথা প্রচার হয়। জিতু সর্দার নামে এক সাঁওতাল চাষী মালদা জেলায় বিদ্রোহের আহ্বান জানায়। এক স্বাধীন সাঁওতাল রাষ্ট্র গঠন করার ডাক দিয়েছিল তারা… ১৯৪৭ সালে আবার সেই দাবি মাথা চারা দিয়ে ওঠে।’ 

ইলা মিত্র বলতে চেয়েছেন যে, ১৮৫৫-তে সাঁওতাল বিদ্রোহ, ১৯৩২ সালে মালদায় চাষিদের উত্থান এবং ১৯৪৬-এ নাচোল আন্দোলন, এই সবই আসলে এক সূত্রে বাঁধা। জিতু সর্দারের মতো নেতারা তাদের বিপ্লবের গান, মৌখিক ঐতিহ্য বা লোকছড়ার মাধ্যমে সাঁওতালদের ইতিহাস শতকের পর শতক বাঁচিয়ে রেখেছে। সেখানে ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েরা এসে লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে বটে, কিন্তু তারা হঠাৎ ত্রাতা হয়ে যায় না। ইলা মিত্রর এই সমাজবোধ হয়তো তাকে আর পাঁচজন শহুরে সাধারণ নেতার থেকে আলাদা করে দেয়। তিনি তাঁর তেভাগার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বারবার বলেন, হরেক নামে এক আদিবাসী যুবকের কথা। নাচোলে তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছিল আরও অনেক সাঁওতাল ছেলে, তার মধ্যে হরেকের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে ইলা মিত্রর। পঁচিশ বছর বয়সে যখন ইলাকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানি পুলিশ, সঙ্গে ছিল হরেক, যার পাঁজরে ফুটবলের মতো লাথি মেরেছিল উর্দিধারীরা। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রাণ হারায় বাচ্চা ছেলেটি, কিন্তু শেষ অবধি রানিমার বিরুদ্ধে সে একটা কথাও বলেনি। ইলা মিত্র জানাচ্ছেন যে, তার ওপর আর যা যা অত্যাচার হয়েছে কারাগারে, তার মধ্যে কেবল সহায় ছিল হরেকের সেই অমানুষিক সাহস।

অধুনা বাংলাদেশের দিনাজপুরের তেভাগা চত্বরে
ইলা মিত্রর স্মারক

সাহস যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ, একজায়গায় থাকলে বাতাসে উড়ে অন্যকে বল দিতে বিশেষ সময় লাগে না। ইলা বলেছেন, তাঁর ওপর হওয়া যৌন অত্যাচারের কথা; কীভাবে নগ্ন করে, তাঁর পায়ের মাঝে লাঠি রেখে চাপ দেওয়া হয়েছে। কম্বল দিয়ে সম্পূর্ণ মুড়িয়ে পেটানো হয়েছে মোটা লাঠি দিয়ে। এমন প্রহারের কৌশল (blanket beating) না কি অত্যন্ত জনপ্রিয় পুলিশদের মধ্যে। এতে শারীরিক আঘাত দেওয়া যায় যথেচ্ছ, কিন্তু গায়ে কোনও দাগ থাকে না প্রমাণস্বরূপ। ধর্ষণের পাশাপাশি গরম সেদ্ধ করা ডিম যোনিপথে ঢোকানো হয়; এই সব পুঙ্খানুপুঙ্খ (explicit) বিবরণ ইলা মিত্র নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। এমনকী, তাঁর দলের পক্ষ থেকে এই পশুবৎ অত্যাচারের কথা জানানো হয় সকলকে। ২০২৬ সালেও যেখানে ধর্ষিতার মডেস্টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে সর্বত্র, সেখানে প্রায় সত্তর বছর আগেকার এই প্রকাশ্য বয়ান আমাদের ভাবায়। কোর্ট প্রসিডিংসে যা যা বর্ণিত, সবই জনপরিসরে তুলে ধরা হয়। ইলা নিজেও এগুলি সর্বসমক্ষে বলেছেন কয়েকবার, সুতরাং, নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তাঁর কোনও ব্যক্তিগত আপত্তি ছিল না বলেই মনে হয়।

তাঁর জীবনকাহিনি পড়লে প্রশ্ন জাগে, ২৫ বছরের মেয়ের এমন পরিণতির পরেও পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আবারও নিজের নতুন জীবন শুরু করা কীভাবে সম্ভব! এর উত্তরেও ইলা মিত্র স্মৃতিচারণ করেছেন সাঁওতালদের সঙ্গে থাকা দিনগুলির। তাদের সঙ্গে খেয়ে, একখাটে শুয়ে, কারাগারে থেকে যে জীবন তিনি দেখেছেন; নির্ভীক, নিষ্ঠা বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার, সেই অসামান্য অভিজ্ঞতা যেন এক প্রবল ঝাঁকুনির মতো। তাঁর শরীর ভেঙেছে লাঠি পেটা খেয়ে, মন বিষিয়ে গেছে ধর্ষণের পরে, কিন্তু হরেকের দুঃসাহসিক মৃত্যু তাঁর মধ্যে যেন শেষ জীবনীশক্তিটুকু দিয়ে গেছে। ওইটুকু ছেলে যদি পারে, তাহলে জমিদারবাড়ির গৃহবধূ, কমিউনিস্ট দলের প্রতিনিধি, ২৫ বছরের ইলা মিত্র পারবে না কেন? যৌন অত্যাচারে নিজেকে লজ্জিত মনে করেননি তিনি, আজকের টিভিতে যেমন ব্লার করে দেওয়া হয় নির্যাতিতার মুখ, তেমন আব্রু পরতে অস্বীকার করেছেন ইলা। 

স্বামী রমেন্দ্রনাথ মিত্রর সঙ্গে

শুধু সাঁওতাল যুবক নয়, তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া মুসলিম কৃষকদের কথাও বলেছেন তিনি। নবাবগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের অফিসার রহমান সাহেব আর ডক্টর আলম তাকে বাঁচিয়ে রেখে পশ্চিমবঙ্গে পাঠাতে তৎপর হন। ছোটবেলা থেকেই তিনি আর পাঁচটা সাধারণ বাঙালি মেয়ের মতো বেড়ে ওঠেননি, শৈশবের সেই মুক্তমনা পরিবেশকেও দায়ী করেছেন ইলা তাঁর ব্যতিক্রমী জীবনের জন্য। তিনি বলছেন: 

‘আমি ভীষণ মুক্ত পরিবেশে বড় হয়েছি, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাড়ির ক্ষেত্রে যা বিরল ছিল। আমার স্কুল ও কলেজ জীবনে প্রচুর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বন্ধু ছিল, তারা স্পোর্টস বা আউটডোর খেলায় মেতে থাকতো, আমিও এই চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলাম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং খেলাধুলা করতাম… স্প্রিন্টার হিসেবে আমার বেশ নাম হয়েছিল। এছাড়াও ১৯৪৩ সালের পর থেকে মাস ফিলানথ্রপিক সংস্থাগুলিতে যোগদান করতে থাকি, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিতে নাম লিখিয়ে মন্বন্তরের ভারতে ঘুরেছি… মেদিনীপুরের হারিকেন ঝড় বা বন্যা দুর্গতদের সাহায্য করেছি।’ 

 এই সাক্ষাৎকার থেকে বোঝা যায় যে, মানুষের মাঝে থেকে কাজ করার অভিজ্ঞতা স্কুল-কলেজে পড়ার সময় থেকেই তাঁর হয়েছিল। রমেন মিত্রর সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর কমিউনিস্ট আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন ইলা মিত্র। তারপর নাচোল আন্দোলনে যোগ দেওয়া, গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং সবশেষে ১৯৫৪ সালে ভারতে ফিরে আসা। জেলে যাওয়ার সময় তাঁর ছেলের বয়স ছিল দেড় বছর, ফিরে এসে ইলা পান তাঁর সাত বছরের পুত্রকে। বন্দিদশাকালীন বীভৎস অবস্থাকে পিছনে ফেলে তিনি এমএ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হন। সাউথ সিটি কলেজে কিছু বছর পড়ান, তারপর মানিকতলা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক হন। পড়াশোনা ও অধ্যাপনার মধ্যে থাকাকালীন অনুবাদ করেছেন রুশ-সহ বিভিন্ন বিদেশি সাহিত্য। ‘হিরোশিমার মেয়ে’ বইটি অনুবাদ করে সোভিয়েত-নেহরু প্রাইজ পান। বাংলাদেশের দিনাজপুরে তৈরি হয়েছে তেভাগা চত্বর, যেখানে ইলা মিত্রের মস্ত মুরাল আঁকা হয়েছে শহরের মাঝে।

১৩ বছর বয়সি ইলা মিত্র, স্প্রিন্টার হিসেবে পাওয়া স্মারকগুলির সঙ্গে

নাচোলে তৈরি হয়েছে ইলা মিত্র সংগ্রহশালা। আর্কাইভাল ছবি, পদক বা আরও নানা ঐতিহাসিক ঘটনাকে তুলে ধরেছে এই মিউজিয়াম। ১৯৯৬ সালের সাঁওতাল পরিবেষ্টিত জনসভা থেকে মুরাল, মিউজিয়াম, বই, প্রবন্ধ— বাংলাদেশের জনমানসে যেভাবে ইলা মিত্র-র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড উঠে এসেছে, ভারতে তার কিয়দংশও হয়নি। অথচ ছোটবেলায় বেথুন কলেজ থেকে পরবর্তীকালে সিটি কলেজে অধ্যাপনা; সাঁতারু, অ্যাথলেটিক এবং কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে বহু বছর বিধায়ক পদে থাকা— এই সবই ইলা মিত্রর বেশিরভাগটা জুড়ে রয়েছে। কেন শুধু শতবর্ষ উপলক্ষে দু-তিনটে আনুষ্ঠানিক লেখা ছাপা ছাড়া আর বিশেষ কিছু হয়নি এই দেশে, এর ব্যাখ্যা তলব করা দরকার। ইলা মিত্রর জেলের জবানবন্দি, চিঠি বা বক্তৃতামালা লিঙ্গের ইতিহাস নির্মাণে এক অভিনব দিক খুলে দিতে পারে। রাষ্ট্র যখন ধর্ষক, এক মহিলা রাজনীতিবিদের শরীর যখন রাষ্ট্রের ক্ষমতা দেখানোর আধার হয়ে ওঠে, সেই নির্যাতনের বিবরণ যখন প্যামফ্লেটে লিখে বিলোনো হয় আপামর জনতার মধ্যে, তখন স্টেট, জেন্ডার, পলিটিক্স— এই সবকিছুর এক অতি জটিল সমীকরণ খুঁজে পাওয়া যায়। একদিকে রাষ্ট্রের ঘৃণ্য চরিত্র, অপরদিকে মহিলা নেত্রীর ওপর হওয়া অত্যাচারের প্রকাশ্য আলোচনা।

শুধু লিঙ্গ-আলোচনা নয়, ইলা মিত্রর জীবন আমাদের শহর-গ্রাম কিংবা আদিবাসী-মধ্যবিত্তের টানাপোড়েনের কথাও বলে। আজকের দিনে প্রান্তিকতা, লিঙ্গের ইতিহাস বা রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ে যেভাবে চর্চা বেড়ে চলেছে, সেখানে ইলা মিত্রর জীবন নিয়ে আগামীতে হয়তো গবেষণা আরও বাড়বে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ভারত থেকে অলিম্পিকে যাওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছিলেন ইলা (১৯৪০-এর হেলসিংকিতে)। নাৎসি বাহিনীর আগ্রাসনে সেবার বাতিল হয় অলিম্পিক। তারপর তাঁর জীবনে শুরু হয় রাজনীতির নতুন অধ্যায়। ৪৩ এর মন্বন্তর, সি পি আই এর হয়ে ত্রাণ শিবিরগুলোতে ঘুরে বেড়ানো, কমিউনিটি কিচেন আয়োজন করা, তারপর তেভাগা, নাচোল, গ্রেপ্তার, এপারে ফিরে অধ্যাপনা ও বিধায়ক হওয়া। ইলা মিত্রর দীর্ঘ ও বৈচিত্রপূর্ণ জীবন নিয়ে উদাসীনতা বা উপেক্ষার চিত্রটি আগামীতে হয়তো পাল্টাবে, এমন আশা রাখা ছাড়া উপায় নেই।