যৌনসুখ ও ক্যামেরা
লুকিয়ে দেখার সঙ্গে যৌনসুখের প্রশ্নে একটি বিশেষ সামাজিক উদ্বেগের জন্ম হয়েছিল বিশ শতকে। এবং এই উদ্বেগের সঙ্গে জুড়ে ছিল আধুনিক প্রযুক্তি। ১৯৩৩ সালে লিখিত জীবনানন্দ দাশ-এর ‘বিভা’ উপন্যাসে লুকিয়ে দেখার প্রশ্নে প্রযুক্তি হিসাবে ক্যামেরা, বাইনোকুলার এবং টর্চের কথা বলে হয়েছে। বিভা এমন এক মেয়ে, যাকে পুরুষের দল তাদের চেনা আবেগের বারান্দায় বাঁধতে পারে না। বিভার ভাবনা, কথা বলা, কার্যকলাপ সবটাই পুরুষের আকাঙ্ক্ষা এবং কামনা-বাসনার বাইরে। এক ডাক্তার মেসবাড়ির পুরুষদের বেলেল্লাপনার নিদর্শন হিসাবে ক্যামেরা ব্যবহারের কথা বলে বিভাকে। বিভার ঘরের পাশেই মেসবাড়ি। ডাক্তার বিভাকে ঘরের জানালা বন্ধ রাখার আর্জি করে। এইসব মেসবাড়ির লোকেরা নাকি অসঙ্গত অবস্থায় মেয়েদের ছবি তোলে, কেউ টেরও পায় না। আর এই ‘ফটো’-র শখ পূরণ করতে নিজেদের ভেতর চাঁদা তুলে চোরবাগান থেকে ক্যামেরা কেনে! অবশ্য কথাটা শুধু ক্যামেরা নিয়ে নয়, মেসের জানালার খড়খড়ির ভেতর বাইনোকুলার রেখে নারীশরীর উপভোগ করে। তবে ডাক্তার এতেই থামে না। আরও অতিরিক্ত তথ্য হিসাবে জানায়: মেসবাড়ির ছেলেরা ‘মাঝে মাঝে মেয়েদের শোবার অন্ধকার ঘরে টর্চ্চ ফেলে’। অন্ধকার আর ঘুমের সুযোগ নিয়ে টর্চের আলোয় দৃশ্যমান হয় নারীশরীর। অবশ্য বিভা ডাক্তারের এসব কথায় মোটেও কান দেয় না। শুধু তাই নয়, মেসের ছেলেদের এভাবে চিহ্নিত করার বিরুদ্ধে নিজের স্পষ্ট প্রতিবাদ রাখে সে। বিভার এই প্রতিবাদ, অস্বীকার— লুকিয়ে দেখার যৌনসুখ নিয়ে কিছু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনে। বিশেষত জীবনানন্দ, পুরুষ লুকিয়ে দেখে আর নারী উপভোগ্য হয় এই সরল বয়ানটিকে আক্রমণ করেন। বরং বাক্যে-বাক্যে বিভার মারফত তিনি ক্ষমতাতন্ত্রের একটি জটিল প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করেন, যেখানে লুকিয়ে দেখার সামাজিক উদ্বেগে জিজ্ঞাস্য হয়— কে দেখছে, কী দিয়ে দেখছে, এবং কে সেই দেখাকে অসঙ্গত বা অনৈতিক বলে চিহ্নিত করছে।
আরও পড়ুন: হোস্টেলের ভেতরে নজরদারির জানলা ঠিক কেমন? লিখছেন চন্দ্রিল ভট্টাচার্য…
নজর করা দরকার, কীভাবে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক বয়ানে— ক্যামেরা, বাইনোকুলার এবং টর্চের মুখ যান্ত্রিক চোখে পরিণত হয়েছে। যান্ত্রিক চোখ হিসাবে ক্যামেরা নারীশরীরকে লুকিয়ে দেখে। শুধু দেখা নয়— আলোকচিত্র মারফত সেই মুহূর্তটি ফ্রেমে বন্দি হয়, তারপর সেই ফোটোগ্রাফ পুরুষদের ভেতর প্রচার এবং উপভোগের বস্তুতে রূপান্তরের পালা। অন্যদিকে বাইনোকুলার দূরত্বকে হ্রাস করে। যা দূরের, তাকে কাছের বস্তুতে পরিণত করে। আর টর্চের আলোর সঙ্গে জুড়ে আছে স্পর্শসুখ। টর্চের আলো যেন ত্বকের সাথে সরাসরি কথা বলে। তবে এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে আলোচনার জন্য শুধুমাত্র ক্যামেরা-র ক্ষেত্রটিকেই বেছে নিচ্ছি। কিন্তু লুকিয়ে দেখা প্রসঙ্গে ক্যামেরা বিষয়ে কোনও সরল আখ্যান পেশ করতে চাইনা। কে, কবে, কোথায়, কখন— ক্যামেরা দিয়ে লুকিয়ে নারীশরীরের আলোকচিত্র তুলেছিল, তার ইস্তাহার লেখা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। বরং ক্যামেরা কীভাবে লুকিয়ে দেখার প্রশ্নে যৌনসুখের প্রেক্ষিতে একটি নতুন দুনিয়ার জন্ম দিচ্ছিল, তার তত্ত্বতালাশ এই নিবন্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য। আর এই নতুন দুনিয়া হিসাবে পর্নোগ্রাফিকে বেছে নিয়েছি কিছু কথালাপ গড়তে। তবে পর্নোগ্রাফি এবং লুকিয়ে দেখা বলতে কেউ যেন ভেবে না বসেন, এমন কোনও আবহের কথা বলছি, যেখানে পর্নোগ্রাফির কুশীলবরা পরস্পরকে লুকিয়ে দেখছে। বরং আমার জিজ্ঞাসা উৎপাদিত পণ্যকে ঘিরে।
মার্চ ১৯৭১ সালে প্রকাশিত ‘রূপোলী প্রজাপতি’ নামক ‘যৌন পত্রিকা’য় সংযুক্ত ছিল ‘ন্যুডছবির সুট্যিং’ নামক একটি ক্ষুদ্র আলোকচিত্রের অ্যালবাম। অ্যালবামটির মুখ্য উপজীব্য ছিল, পর্দায় মানুষ যে-নগ্নদৃশ্য দেখে, সেই দৃশ্য প্রস্তুতির ছবি— পাঠক/দর্শকের সামনে হাজির করা। ধরা যাক, স্টুডিয়োতে পর্নোগ্রাফির শুটিং হচ্ছে, পর্নোগ্রাফি ছবিটির পর্দায় দেখার অধিকার রয়েছে দর্শকের। কিন্তু গোলমাল বাধবে যদি দর্শক শুটিং দেখতে চান। পরিচালক রাজি হবে না দর্শকের এমন দাবির কাছে, যদি-না দর্শকের বিশেষ ক্ষমতা বা যোগাযোগ থাকে। এমতাবস্থায় কোনও উৎসাহী দর্শক লুকিয়ে পর্নোগ্রাফির শুটিং দেখার বন্দোবস্ত করতে পারেন। কিন্তু ধরা পড়লে আইন-আদালত জুড়ে কেলেকাঙ্কারি কাণ্ড। কিন্তু মানুষের লুকিয়ে দেখার অভ্যাস রয়েছে। আর এই লুকিয়ে যৌনক্রিয়া দেখার বিশেষ প্রক্রিয়াটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘ভয়ারিজম’।

ভয়ারিজম নিয়ে মনোবৈজ্ঞানিক এবং যৌনবিজ্ঞানীদের ভাবনার অন্ত নেই। বিশ শতকের বাঙালি যৌনবিজ্ঞানী আবুল হাসনাৎ-এর লেখায়ও ভয়ারিজম বা লুকিয়ে দেখার তত্ত্বতালাশ করা হয়েছে। ‘রূপোলী প্রজাপতি’তে প্রকাশিত অ্যালবামের একেবারে প্রথম পাতায় তিনটি ছবির মাঝে লেখা হয়েছে: ‘আমেরিকার কোন এক প্রাইভেট স্টূডিও ফ্লোরে একটি ন্যুড ছবির স্যুটিংয়ে ক্ল্যাপাস্টিক দিচ্ছেন ছবির কাহিনীকার। ক্যামেরা প্রজেক্ট হল দুটি মিলন দৃশ্যে’। ক্ল্যাপস্টিক অর্থাৎ চলচ্চিত্র শুটিং-এর সময়ে ব্যবহৃত একটি বোর্ড, যা ক্যামেরার সামনে ধরে ঠাস করে বন্ধ করা হয়। অ্যালবামের এই ছবিতে, ক্ল্যাপস্টিক হাতে পুরুষের অবস্থান এবং সামনে নগ্ন নারীশরীর, ‘রূপোলী প্রজাপতি’-র পাঠক/দর্শকের কাছে ভিন্ন এক সুখের আবহ তুলে ধরে। যৌন পত্রিকার পাঠকের জন্য একেবারে একটি লুকিয়ে দেখার মঞ্চ প্রস্তুত হয়। লুকিয়ে দেখার যে-সুখ গোপন, যে-সীমা পেরোলে আইন চেপে ধরবে, সেই সীমা ভাঙতে ক্যামেরা হয়ে উঠছে প্রধান সহকারী।
আমার জিজ্ঞাসা কিন্তু ক্যামেরা দিয়ে নগ্ন নারীর সরাসরি ছবি বা ফিল্ম তোলা নিয়ে নয়। বরং যখন একটি ক্যামেরা নগ্ন নারী বা পুরুষদেহের শুটিং করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে অন্য একটি ক্যামেরা ধরে রাখছে শুটিং-মুহূর্তের বিশেষ দৃশ্য। এক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফির উৎপাদনের প্রক্রিয়াটিই হয়ে ওঠে উপভোগের বিশেষ ক্ষেত্র। তবে পাশাপাশি আরও প্রশ্ন জাগে, দ্বিতীয় ক্যামেরাটিকে ঘিরে। এই দ্বিতীয় ক্যামেরা কি আসলে ভয়ারিজমের একটি বৈধতার ইতিহাস তৈরি করতে চাইছে? ‘বৈধতা’ শব্দটি নিয়ে ভুল বোঝার সম্ভাবনা আছে। তাই খানিক বিস্তারে কথা বলা দরকার। ‘রূপোলী প্রজাপতি’ গোছের যৌন পত্রিকা সামাজিকভাবে অশ্লীল এবং আইনত অবৈধ পরিগণিত হত। কিন্তু যাঁরা এই পত্রিকাগুলি পড়ছেন বা দেখছেন, সেখানে কি পাঠক/দর্শক এবং পত্রিকার ভেতর বিশেষ একটি বৈধ সম্পর্কজোট তৈরি করে? যৌনকর্ম লুকিয়ে দেখার জন্য যে-ব্যক্তিকে বাস্তবের রোমাঞ্চকর অভিযানে নামতে হত, সেই যাত্রাপথের সমাধান হিসাবে একটি মঞ্চ প্রস্তুত হয় ন্যুড অ্যালবামে, যেখানে গোপন মুহূর্তে মিলতে পারে সুখের প্রবেশপথ। এই কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত মঞ্চটি বৈধতা এবং অবৈধতার প্রশ্নটিকে যেন নতুন করে ভাবার ইঙ্গিত দেয়।
তবে শুধুমাত্র নগ্ন নারীদেহ নয়, ক্ল্যাপস্টিক নামক প্রযুক্তিটিও এক্ষেত্রে এই লুকিয়ে দেখার যাত্রাপথে উত্তেজনাবৃদ্ধির উপকরণ হিসাবে হাজির হয়। উপকরণ শব্দটি শুধুমাত্র সহযোগী অর্থে বলছি না। বরং সুখের আবহটি নারীদেহ এবং ক্ল্যাপস্টিকের সম্পর্কের রসায়নে মোড়া। ক্ল্যাপস্টিক এখানে শুধুমাত্র চলচ্চিত্র উৎপাদনের প্রযুক্তি নয়। বরং ভয়ারিজমকে ঘিরে যে-মঞ্চ বাঁধা হয়েছে, সেই মঞ্চের প্রামাণ্য উপাত্ত হিসাবে হাজির হয়েছে। একইভাবে সমান জরুরি, ছবির কাহিনিকার পুরুষটি। যে-দর্শক/পাঠক লুকিয়ে দেখার সুখ নিতে চান, এই অ্যালবামের ছবি মারফত তার কাছে এই কাহিনিকার পুরুষটির আবির্ভাব বিশেষ ঈর্ষার আবহে। এই ঈর্ষার নানান অক্ষ রয়েছে। প্রথমত, যে লুকিয়ে দেখার সুখ নিচ্ছে ছবি থেকে, সে কি ক্ল্যাপস্টিক হাতের পুরুষটিকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে? আবার হতে পারে, ক্ল্যাপস্টিক হাতের পুরুষটির সাথে কেউ নিজের এক রকম সাদৃশ্য খুঁজে নিতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সম্ভাবনাও আছে। যাকে আমরা ভয়ারিস্ট নামে চিনি, যে লুকিয়ে দেখার আনন্দ নেয়— সে হয়তো এমন সুরক্ষিত পরিবেশে অ্যালবামের ছাপা ছবি মারফত তেমন কোনও সুখ পেল না। মনে হতে পারে তার, এমন কৃত্রিম মঞ্চে জমে না তার চাহিদার পরত। তবে এমনটা নয় যে, তাতে পুরো প্রক্রিয়াটি বাতিল হয়ে যায়। বরং যৌন পত্রিকার অ্যালবাম এমন এক কৃত্রিম মঞ্চ তৈরি করে, যা লুকিয়ে দেখার বিশেষ এক তাৎপর্য প্রস্তুত করে।

সেই লুকিয়ে দেখাকে যে হুবহু ভয়ারিজিমের সঙ্গে মিলিয়েই পড়তে হবে এমন কোনও কথা নেই। অ্যালবামের প্রথম ছবির ক্যাপশনে ‘প্রাইভেট স্টূডিও’, ‘আমেরিকা’ এবং ‘ক্যামেরা’ এই তিন শব্দের বিশেষ তাৎপর্য আছে। এখানে প্রাইভেট স্টুডিয়ো কথাটি ব্যবহার করে গোপনতার সেই বিশেষ আবহটিকে আরও শক্তিশালীভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলার পাঠক/দর্শকের সাথে যৌনতার প্রশ্নে আমেরিকার সাক্ষাৎ এমন এক বিশেষ স্থান হিসাবে, যেভাবে সুখের অ-চিহ্নিত পরতগুলির বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। আর ক্যামেরা-র আলাদাভাবে উল্লেখের কথা বুঝিয়ে দেয়, বিজ্ঞানের এই প্রযুক্তি জনপরিসরে কীভাবে যৌনতার অভ্যাসকে চিহ্নিত করতে এবং নতুন করে গড়তে বিশেষ কার্যকর হয়ে উঠছিল। পর্নোগ্রাফি দর্শকের জন্য দৃশ্যমান হয় নানান পরিসরে, কিন্তু এক্ষেত্রে একটি যৌন পত্রিকা পর্নোগ্রাফি-কে উৎপাদনের মাধ্যমে দ্বিতীয়বার দৃশ্যমান করে— কল্পিত প্রবেশাধিকার এবং দর্শকের লুকিয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা— নতুন সূত্রমালায় হাজির হয়।
অ্যালবামের দ্বিতীয় ছবিটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। দুটি নগ্ন নারীদেহ বিছানায় শুয়ে আছে। অ্যালবামের প্রথম ছবিগুচ্ছে এক ধরনের হেটেরোসেক্সুয়াল অর্থাৎ বিষমকামী যৌনসুখের আবহ চিত্রিত হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় ছবির বেলায় এক ধরনের নারী-নারী প্রেম অর্থাৎ লেসবিয়ান বা সমকামের আবহকে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। যদিও ক্যাপশনে লেখা হয়েছে: ‘কম বাজেটের ন্যুড ছবির প্রযোজকগণের বিশ্বাস ছবির ডায়লগ হওয়া চাই অশ্লীল, বহির্দৃশ্যের প্রয়োজনীয়তা নেই, কষ্ট্যুমের চিন্তা না করাই শ্রেয়—কারণ যেখানে নারীদেহ ছবির বিষয়বস্তু সেখানে অন্য কিছুর অবতারণা কেন?’ সরাসরি এখানে সমকামিতার কথা লেখা হয়নি। কিন্তু ক্ষেত্রটি যেন অনেকটাই খোলা। পাঠক-দর্শক তার নিজের সুখের আবহ অনুপাতে চয়ন করবে দুটি দেহের সমীকরণ। ছবির কৃত্রিম মঞ্চ— আলোকচিত্রের নির্দিষ্ট অর্থ এবং দর্শকের দেখার আকাক্ষার ভেতর বিশেষ এক ছেদ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে।

মনে রাখতে হবে, এ-সময়ে বাংলা যৌন পত্রিকায় নারী-সমকামিতা নিয়ে নানান আলোচনা উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। ১৯৭১ সালের শারদীয়া ‘নায়িকা সঙ্গিনী’ পত্রিকায় ‘দুই সমকামী নারীর ক্রিয়া কলাপ’ নামের একটি ফোটো অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। বাংলা ক্যাপশন-সহ মোট আটটি আলোকচিত্র প্রকাশিত হয়, যেখানে এমিল এবং লিলি নামের দুই নারী যৌনসুখের প্রশ্নে নানান শারীরিক ক্রিয়াকলাপে মত্ত। এখানে অবশ্যই জড়িয়ে আছে দুই ভিন্ন পত্রিকা, তাদের প্রকাশের ধরনের ভিন্নতা এবং চিহ্নিতকরণের সরব-নীরব প্রশ্ন। আখ্যানটি ভাল করে সাজালে, ‘ন্যুডছবির সুট্যিং’ নামক ১৯৭১-এর অ্যালবামটির দুই নারীর নিষ্ক্রিয়ভাবে শয়নের ভেতরও লুকিয়ে দেখার প্রশ্নে সীমা ভাঙার এক ভিন্ন বয়ান দানা বেঁধেছে।
এই অ্যালবামের তৃতীয় আলোকচিত্রটিও বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। ক্যাপশন হিসাবে লেখা হয়: ‘ভৌতিক ছবি ‘হেলেস বেলেসের’ একটি নাটকীয় দৃশ্য ক্যামেরায় ধরে রাখছেন’। ক্যাপশনের ‘ভৌতিক ছবি’ এবং ক্যামেরা শব্দদুটির বিশেষ তাৎপর্য আছে। বৃহত্তরভাবে এই তর্কে লুকিয়ে দেখার প্রশ্নে ক্যামেরার ভূমিকা, অ্যালবামটি নিজেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে উপস্থাপিত করছে। আলোকচিত্রে— নগ্ন নারীদেহ, পুরুষ কর্মী এবং ক্যামেরার উপস্থিতি বিশেষভাবে দৃশ্যমান। ক্যামেরাকে কৃত্রিম মঞ্চের যৌনবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। ক্যামেরাই যে যৌনসুখের দৃশ্যগুলি তুলে ধরে এই কথাটি যেন পাঠক/দর্শক-কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হচ্ছে। ক্যামেরা প্রাণহীন নির্জীব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হলেও, এই আখ্যানে যৌনতার সাথে ক্যামেরার সম্পর্ক বিশেষভাবে প্রকাশিত। ক্যামেরা, ক্যামেরার সামনে থাকা দেহ এবং সেই দৃশ্যের আলোকচিত্র— এই পারস্পরিক সম্পর্কের তন্তুজালেই লুকিয়ে দেখার দুনিয়া পরিপুষ্ট হয়।
ক্যামেরা নামক যে-যন্ত্র দিয়ে নগ্ন দেহকে দৃশ্যমান করা হয়, সেই ক্যামেরাও একইভাবে অন্য এক ক্যামেরার সাহয্যে লুকিয়ে দেখার সুখে দৃশ্যমান বস্তু হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ‘ভৌতিক ছবি’-র প্রশ্নটিও বিশেষভাবে জরুরি। আলোকচিত্রে ক্যামেরার সামনাসামনি সরাসরি একটি নগ্ন নারীদেহ রয়েছে। খানিক দূরে আর এক নারীর নগ্ন দেহ দেখা যায়। প্রযুক্তির এমন কারসাজিতে ছবিটি তোলা, মনে হয় দুটি মেয়ের ভেতর এক পার্থিব-অপার্থিব ব্যবধান রয়েছে। এই অন্য মেয়েটির উপস্থিতি আলোর থেকে দূরে। সে দৃশ্যমান কিন্তু ক্যামেরার সামনে থাকা মেয়েটির মতো আলোকিত নয়। আলো, দূরত্ব এবং আবহ মিলেই ভৌতিকতার প্রেক্ষিতটি গড়া। ভৌতিকতার সঙ্গে যৌনতার এক আশ্চর্য মিল রয়েছে, যা আসলে অদৃশ্য। যৌনতা এবং ভৌতিকতা দুটিই এমন কিছু তৈরি করে, যা সম্পূর্ণরূপে ধরা বা জানা যায় না।

অ্যালবামের শেষ আলোকচিত্রের ক্যাপশনে লেখা হয় ‘ ‘সার্ফ টাইড ৭৭৭’ ছবির পরিচালক মেঝেতে খড়ির দাগ দিচ্ছেন যেখানে নগ্ন নায়িকা দাঁড়াবে ছবির দৃশ্যে’। আলোকচিত্রে দেখা যায়, এক নগ্ন নারী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে আর তার নিতম্বের কাছে ঝুঁকে রয়েছে এক ব্যক্তি। ক্যাপশন অনুপাতে, খড়ির দাগ পড়ছে। কিন্তু লেখা যাই থাক— যা দেখা যাচ্ছে, তা লুকিয়ে দেখার এক বিশেষ তাৎপর্য প্রকাশ করে। আলোকচিত্রের পুরুষটির সাথে নারীটির পাছার একটি বিশেষ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। একটি বৃহৎ প্রশ্ন তোলে এই ছবি— লুকিয়ে মানুষ কী দেখে? সে কি পুরো শরীরটাই দেখে, না কি মানুষভেদে বদলে যায় স্বাদ! এক্ষেত্রে যেমন যৌন আহ্লাদের প্রশ্নে নারীর পাছা হয়ে উঠছে অন্যতম অন্বিষ্ট। এই পুরো অ্যালবামটি শুধুমাত্র লুকিয়ে দেখার সুখের কথা বলে না। বরং বলে লুকিয়ে দেখার ভেতর যে-নানান রং আছে, নানান বৈচিত্র আছে, তার কথা— সর্বোপরি এই দেখায় আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার বা প্রযুক্তির ভূমিকা কী, তার নানান বয়ান তৈরি হয়।
লুকিয়ে দেখার প্রেক্ষিতটি আসলেই অনেক বড়। তাকে কোনও স্থির চৌহদ্দিতে বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রযুক্তি এবং বাঙালির বিশেষ এক সাংস্কৃতিক সামাজিকতা লুকিয়ে দেখার প্রশ্নটিকে ঠিক কীভাবে ধরতে চেয়েছিল, তার কিছু টাটকা কথা লেখা এই নিবন্ধের সামান্য উদ্দেশ্য।



