শেষের ভয়ংকর
একজনকে জ্যোতিষী বলল, ‘পরশু মরবে’, আর সে নির্বিকার পিংপং খেলতে লাগল— সিনেমায় দেখালে লোকে বলবে, চিত্রনাট্য ফেল! অথচ আমাদের পৃথিবী নিজ ধ্বংসের সংবাদে মূলত কাঁধ ঝাঁকায় ও মুখ বাঁকায়। সম্প্রতি এক বিশারদ বললেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে এআই সমস্ত মানুষকে মেরে ফেলতে পারে। তা শুনে কিছু হইচই হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তৃণমূলের প্রতীক বা দোকানের সামনে সাইকেল রাখা নিয়ে ব্যস্ত। অথচ, এআই বিজ্ঞানের গবেষণাগার থেকে গুচ্ছের মারণ-ভাইরাসকে ছেড়ে দিতে পারে, কিংবা অনেকগুলো মিসাইলকে ফটাফট নিধনযজ্ঞে রওনা করে দিতে পারে। তার মনে হতেই পারে, শুধু-শুধু এই বিশ্বে এই সবজান্তা নিতম্বপাকা প্রাণীটাকে (যে আবার তার পিতা, বা মাতা— মোদ্দা কথা অভিভাবক, এবং কে না অভিভাবককে পিটিয়ে লম্বা করে দিতে চায়?) টিকিয়ে রেখে লাভ নেই, বরং এ-ব্যাটা নিকেশ হলে অবশিষ্ট গ্রহ অনেক সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন পথে গড়গড়াতে পারে (কথাটা খুব মিথ্যে নয়)। তাই সার্বিক কল্যাণের জন্য, সে হয়তো এদের একদানে ডিলিট করার সিদ্ধান্ত নিল।
এমন সিনেমা দেখেছি, যেখানে দু’জন বৈজ্ঞানিক যতই টিভি চ্যানেলে ও অন্যত্র জোরসে বলে, ওরে ভাই ছ-মাসের মধ্যে ধূমকেতু আছড়ে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, লোকের কোনও হেলদোল নেই। টিভি অ্যাংকররা একগাল হেসে বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ তা-ই তো, ভাআরিইই দুশ্চিন্তার কথা, বলেই ফ্যাশন-মডেলের কেচ্ছায় ডুব দেয়। আরেকটা ছবিতে, নায়িকার এডস হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা, রিপোর্ট দেবে সোমবার, কিন্তু অ্যাত্ত কাজ পড়ে যায়, আজ মিটিং, কাল অ্যাপো, পরশু পেল্লায় ডিসকাউন্ট— সে রিপোর্ট আনতে আর গিয়েই উঠতে পারে না। আমাদের মধ্যে কি তবে সংকট-এড়ানো একটা টিকটিকে যন্ত্র বসানো, যা আমাকে টানা বলে, ধুর সব বাজে কথা, আসলে কিস্যু হবে না?
লিপস্টিকের দাগ ও চুমুওয়ালা গাড়ি!
পড়ুন ‘সামথিং সামথিং’ পর্ব ৮১…
মানুষ যে পূর্ণ সর্বনাশকে মগজে ধারণ করতে পারে না, তার একটা কারণ অবশ্যই: সে এই ভয়ংকর সম্ভাবনাকে গায়ের জোরে ভাবনা থেকে সরিয়ে রাখতে চায়। যেমন ক্যানসার রোগীকে দেখে হাসপাতাল থেকে বেরনোর পরে ‘আমারও তো হতে পারে’ আতঙ্ক ভুলতে তাড়াতাড়ি সে গুঁতিয়ে ঢুকে পড়ে ওয়েব-সিরিজে। কিন্তু আরও একটা ব্যাপার সম্ভব: মানুষ হয়তো বিশ্বাস করে, এই বিশাল জগৎ ও বিশেষত, মানুষ-জাতটাকে সৃষ্টির একটা উদ্দেশ্য আছে। যতই সে শুনুক, একটা ধূমকেতু পৃথিবীতে আছড়ানোর ফলে ডাইনোসররা সব দড়াম লোপাট হয়ে গেছিল, যতই পুরাণে মহাপ্রলয়ের কাহিনি পড়ুক— তবু সে ভাবতে পারে না, একটা মহা-ঝাপটায়, বা তেত্রিশ ঝাপটাতেও, মানুষ, এই কীর্তিমান অঘটনঘটনপটীয়ান গরগরে-গরীয়ান এবং সারাক্ষণ জিতে-যাওয়া মানুষ, পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ‘তাহলে এত সবের মানে কী হল? পুরোটা তো অর্থহীন হতে পারে না?’— এ হল তার প্রকৃত তর্ক। মানে, সে মানুষকে অনেক প্রাণীর মধ্যে স্রেফ অন্যতম প্রাণী মনে করে না, ভাবে: মানুষই প্রধান প্রাণী, সুতরাং সে উবে গেলে গোটা সৃষ্টি-নাট্যটার প্রতি, লীলা-বন্দোবস্তের প্রতি, বিকট অবিচার হবে।
সোজা কথায়, সে ভাবে: ঈশ্বর আছেন। এই গ্রহে এই জীবন খামকাই, হুট করে, কোটি-কোটি বছরের পারমুটেশন ও কম্বিনেশনের পর সহসা এক বিশেষ খচাৎ ঝং ঘটে গিয়েছিল বলে উৎপন্ন হয়নি, বরং একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই তা ঘটানো হয়েছিল, অ্যামিবা প্রস্তুত করা হয়েছিল একদিন ধাপে-ধাপে রবীন্দ্রনাথ তৈরি করা হবে বলেই। পুরো সৃষ্টিটার মধ্য দিয়ে আসলে একটা সুচারু সংকল্প প্রবাহিত হচ্ছে, আপাতভাবে সাঁইসাঁই ঘনঘটাকে যতই আকস্মিক এলোপাথাড়ি মনে হোক, প্রখর (ও আমাদের পক্ষে অননুমেয়) গণিত-নকশা মেনেই তৃণকণা থেকে নক্ষত্রধুলো অবধি সবকিছু চলছে, যা অবশ্যই ক্লাইম্যাক্সে সমন্বয় ও সুষমায় ঝলমলাবে। অন্য প্রাণীরা শুধু খুর, শিং ল্যাজ চর্চা করে কাটিয়ে দিল এবং এই একটা প্রাণী গড়ে তুলল সভ্যতা, তর্ক, কাব্য, বিজ্ঞান, দর্শন, এমনকী, অন্যের জন্য আত্মত্যাগ— এ-জিনিস শুধু বিবর্তন আর অদ্ভুত বুড়ো আঙুলের কেরামতি নয়, এর পিছনে বৃহৎ পরিকল্পনা ও নিয়ত নজর রয়েছে। মানুষ মহাবিশ্বে এসেছে নায়ক হিসেবেই, সে-ই তার চারপাশকে ছুঁয়েছেনে দেখবে এবং ওল্টাবে-পাল্টাবে, এবং সে না থাকলে পরমেশ্বরের গোটা অভিপ্রায়টাই অ্যাক্কেরে ফক্কা হয়ে যাবে। তাই উত্তমকুমারকে বাদ দিয়ে ‘সপ্তপদী’ শুটিং করার উদ্ভট আখ্যান ফেঁদে লাভ নেই।
এআই নিয়ে কেউ-ই কিছুই স্পষ্ট জানে না, কিন্তু ১০ বছরের মধ্যে সবাই ফৌত হবে, শুনে অনেকেরই মনে হচ্ছে, ধুর, বাড়িয়ে বলেছে। এখনও অবধি এআইয়ের এমন অসামান্য ক্ষমতার পরিচয় অন্তত সাধারণ মানুষ পায়নি যে, হলিউড সিনেমার মতো তিন-সিনে হু-হু রোবট-সাম্রাজ্য গজিয়ে উঠবে কিংবা কম্পিউটারের অন্তর-চেতনা তলে তলে মানুষকে টুঁটি টিপে মারার চক্রান্ত পাকাবে। তার আরেকটা ভরসা আছে, তেমন কিছু হলে পৃথিবীময় ক্ষমতা-ব্যক্তিরা বৈজ্ঞানিকদের ডেকে গজল্লা পাকিয়ে ঠিক একটা চুক্তিটুক্তি বাগাবেন, যাতে এআই সংক্রান্ত কাজকর্ম, তাকে বলীয়ান করার গবেষণা, সব আটকে দেওয়া যায়, বা অন্তত বিলম্বিত করা যায়। কিন্তু মুশকিল হল, মানুষ চূড়ান্ত বদ-পরিণতি বুঝতে পারলেও, আজ অবধি প্রযুক্তির প্রগতিকে থামায়নি, ধীরও করেনি, কারণ যারা অতিদানবও তৈরি করছে, তাদের উদ্ভাবনের লকলকে নেশা আছে।
নেশা যুক্তি মানে না, এবং সৃষ্টির মত্ততা অন্য সবকিছুকেই প্রত্যাখ্যান করে। যে-লোকটা অ্যাটম বোমা আবিষ্কার করে, সে অলৌকিক স্ব-ক্ষমতায় এমন নার্সিসাস-বুঁদ, এর ফলে কী অকল্যাণ ঘটবে দিব্যি বুঝেও সে ভাবে, সেটা আমার দায় নয়। যে কামান বানিয়েছে, সে-ও নিজেকে নিরস্ত করেনি, যে এআই পরিচালিত ড্রোন তৈরি করেছে (যা ইউক্রেনের মানুষকে মারছে), সে-ও না। মানুষ যখন প্রতিভার বশে অভূতপূর্ব বস্তু বা কর্মকে নিজ করতল থেকে উৎসারিত হতে দ্যাখে, সে তুরীয় হিল্লোল ও অহংস্নানের একটা ঢাল বেয়ে গড়াতে শুরু করে, সে-গতি রোধ করতে গেলে তাকে মানুষী প্রবণতার গোড়ার নাড়িভুঁড়ি ধরেই টান মারতে হয়। যা অন্য কেউ ভাবতে অবধি পারে না, তা গড়ার সময় মানুষের নিজেকে ঈশ্বর মনে হয়, তখন কেউ যদি এসে বলেও, তুমি তো বড়-ঈশ্বরের ব্লু-প্রিন্ট বিগড়ে দিচ্ছ হে, সে তুড়ি মেরে সেই বিবেক-বচন উড়িয়ে দেয়। তাই, আমরা যদি ভাবি মানুষজাতের লুপ্তি ভেবে এআই-কারিগর স্বেচ্ছা-সুপ্তি বেছে নেবে, ভুল। রেলগাড়ি লাখ মানুষকে চাপা দিলেও জেমস ওয়াট কেটলি-ভাবনা প্রকাশ্যে ছলকাবেই।
তাই, ‘যা হবার তা হবে’ মার্কা মনোভাব নিয়ে, ভাল মিউজিকের তালে-তালে কপালে করাঘাত করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিছু মানুষ সাংঘাতিক বুদ্ধি খাটিয়ে এমন বুদ্ধি তৈরি করে ফেলল, যা মানুষকেই মাইনাস করে দিল, এর মধ্যে পরিহাস রয়েছে, কিন্তু তার প্রতিরোধ ফেসবুকে বিপ্লব করেও সম্ভব নয়, রাজপথে বিদ্রোহ করেও খুব একটা নয়। এআই কী, তা ভাল বোঝার আগেই এআই যদি আমাদের সটাসট নিকেশ করে ছাড়ে, তখন ২৯৯-এ এসে আচমকা হিট-উইকেট হয়ে যাওয়ার মন নিয়ে প্যাভিলিয়নের দিকে গুটিগুটি যাত্রা। বরং সতর্কীকরণ সত্ত্বেও আমরা যে বিপদ পাত্তা না দিয়ে ক্যাটরিনা কাইফের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম, তাতে কিছু টেনশন-হীন মুহূর্ত রোজগারের তৃপ্তি আমাদের সান্ত্বনা-চকোলেট বিলোবে।




