ভাষাসাগরের প্রবাল

মাত্র কয়েকদিন আগেই যাঁকে আগুনের পরশমণির হাতে সঁপে দিয়ে এলাম, সেই তাঁরই জন্মদিন উপলক্ষে লিখতে বসে এক অদ্ভুত অভাববোধ যেন ঘিরে ধরছে রহস্যজনক কুয়াশার মতো। এই অভাববোধটি হল আত্মজীবনীর অনুপস্থিতি। বিশেষ করে যিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘দশ বছর বয়সে সেই যে খানিকটা ঘটনাচক্রে ভাষাতত্ত্বকে বরণ করা হয়ে গেল, সেই সম্পর্কটাই এত ঝড়ঝাপটার মধ্যে অটুট থেকেছে’, তখন দশ বছর বয়স এবং সেই বয়সে কেমন করে ‘ভাষাতত্ত্ব’ ব্যাপারটা জানা গেল, তা নিয়ে মনের মধ্যে গভীর ঔৎসুক্যের জন্ম হয় বইকি! প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা মেনে চললে দশ বছর মানে ক্লাস ফাইভ, যখন ব্যাকরণ সবে স্বরধ্বনি-ব্যঞ্জনধ্বনি বা বাক্যের পদ পরিচয়ের বেশি কিছু জানার অবকাশ থাকে না, তখন কীভাবে একজন ‘বরণ’ করে নিতে পারে ভাষাতত্ত্বকে!

যদি সে ছাত্রের নাম হয় প্রবাল (দাশগুপ্ত), তাহলে এই অসম্ভবও সম্ভব হতে পারে। আর সেটা হতে পারে বোধহয় একবারই, এই পৃথিবী একবারই পায় তারে!

এখন মনে হতে পারে, হঠাৎ দশ বছরে কী এমন ঘটল, যে কারণে বালক প্রবাল এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আরও অবাক হতে হয়। বাবার পড়ানোর সূত্রে মার্কিন মুলুকে পাড়ি দিয়েছিলেন বলে তাকেও যেতে হয়েছিল সেখানে, ইথাকা শহরে। এই বিদেশবাসে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন, স্কুল আর বাড়ি মিলিয়ে তাঁর যে পড়ার জগৎ, সেখানে ইংরেজি ভাষাচর্চার পাশাপাশি বাড়িতে বাংলা পড়া চলত। আট বছর বয়সেই সেই বালক বুঝতে পেরেছিল যে, ‘বাংলা ছাড়াও দেশে হিন্দির গুরুত্ব আছে’, তাই সেই বয়সে সে শিখে ফেলল দেবনাগরী লিপি এবং হিন্দি ভাষা। এই সময়ে কলকাতায় ফিরে একদিকে চলতে থাকে ফরাসি আর জার্মান ভাষা শেখা আর নিজেই খেয়াল করল যে, ‘ভাষার উনিশ-বিশ বুঝতে চাইলে ভারতীয় পরিবেশে সংস্কৃত শিখতে হবে। ইস্কুলে শেখাচ্ছে না? ঠিক আছে, অন্য জায়গায় সাহায্য চেয়ে নাও, দশ বছর বয়সেই।… নিয়মিত শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না? নিজের খুশিতে খাপছাড়া সংস্কৃতচর্চা করো। বয়ঃপ্রাপ্তির পর পোশাকি সংস্কৃতশিক্ষার সুযোগ পরে জুটেছে খুবই সামান্য, তাতে দরকার মিটেছে, খিদে মেটেনি।’

প্রবাল দাশগুপ্ত (১৯৫৩-২০২৬)

আরও পড়ুন: নিজের কবিসত্তাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন কেতকী কুশারী ডাইসন! লিখছেন সুশোভন অধিকারী…

পাঠক, আপনি কি কল্পনাও পারেন, এক দশ বছরের বালক এতগুলো ভাষা নিয়ে কাজ করে চলেছে পরবর্তী সময়ে ভাষাতত্ত্বকে বরণ করবে বলে! মোৎসার্ট, বরিস বেকার বা শচীন তেন্ডুলকরের মতো তাঁকেও ‘বিস্ময়বালক’ বলে সহজেই আখ্যা দেওয়া যায়। ওইটুকু বয়সেই আবার তিনি এমন একটা কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, যা ভাবা যায় না বাকিদের ক্ষেত্রেও! নিজের নাম নিজেই অভিধান ঘেঁটে বদলে ফেলেছিলেন, এক্কেবারে ছোট্টবেলায়। প্রসঙ্গত বলে রাখি, তাঁর পুরনো নাম ছিল মুকুর।

এই বালক বয়স থেকে যখন হয়ে উঠলেন রীতিমতো প্রবাল দাশগুপ্ত, ততদিনে ইংরেজি ভাষায় প্রবন্ধ লিখেছেন প্রায় আড়াইশোটি, বাংলায় প্রায় দেড়শোটি আর এসপেরান্তোতে একশোর বেশি; ইংরেজিতে বইয়ের সংখ্যা সাতটি, বাংলায় ছয়টি, এসপেরান্তোয় একটি, বাংলা থেকে এসপেরান্তোয় অনুবাদ করেছেন চারটি, এসপেরান্তো থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন দু’টি, এসপেরান্তোয় বই সম্পাদনা করেছেন, ‘ইন্ডিয়ান লিঙ্গুইস্টিকস’ জার্নালটি সম্পাদনা করেছেন দীর্ঘদিন ধরে। বাদল সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এসপেরান্তোয় অনুবাদ করেছেন সুকুমার রায়ের ‘হ য ব র ল’।

এই সংখ্যার হিসেব বাদ দিয়ে শুধু বাংলায় লেখা বইগুলি যদি পড়ার চেষ্টা করা যায়, তাহলেও তা যথেষ্ট সময় এবং শ্রমসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানকে যদি বহুশাখাবিশিষ্ট একটি গাছের সঙ্গে তুলনা করা যায়, তাহলে তার অনেক শাখাতেই তাঁর নিবিড় স্পর্শ লেগে আছে। বাক্যতত্ত্ব হোক কিংবা হোক শব্দ তৈরির কৌশল, শব্দকোশ বা ধ্বনির এলাকাতেও তাঁর অবাধ ঘোরাঘুরি।

কিন্তু যদি এই ব্যাপক বৈচিত্রকে কয়েকটি খোপের মধ্যে ভরে দিতে চাই, তাহলে একটা খোপ হবে ‘স্যাবস্ট্যানটিভিস্ট’ ভাষাতত্ত্ব বা কায়াবাদী ভাষাতত্ত্ব। ভাষাতত্ত্বের সঙ্গে যথেষ্ট যোগ না থাকলে এই কায়াবাদী তত্ত্বের ধারণাকে রপ্ত করা কঠিন হবে। এই পরিসরে সেই চেষ্টা করা মুশকিল। অতি-সরলীকরণের সমস্যা মেনে নিয়েও শুরু করা যায় ‘সাবস্ট্যানটিভ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ দিয়েই। যে-কোনও সাধারণ অভিধানে এর অর্থ হল, স্বাধীন সত্তাযুক্ত, সামগ্রিক, স্বতন্ত্র অস্তিত্ত্বযুক্ত বা স্বয়ংতন্ত্র ইত্যাদি। নোয়াম চমস্কি-র সংবর্তনী ও সঞ্জননী ব্যাকরণের হাত ধরে বাক্যকে বোঝার একটা পথ তৈরি হল যেখানে বাক্যকে ভাষার সর্বোচ্চ একক ধরে, তাকে বিভিন্ন খণ্ড অংশে ভাগ করেন, পদগুচ্ছ বা পদগুচ্ছর মধ্যে বিভক্তি ছাড়িয়ে শব্দ আর শব্দের মধ্যে ‘রূপিম’ বা আরও খণ্ডিত এইসব উপাদান কীভাবে কাজ করে, তাকে ফরমুলায় বাঁধতে চান আকরণবাদীরা।

আকরণবাদীদের দেখার এই সরঞ্জামগুলোকে নস্যাৎ না করেও বাক্যে কীভাবে শব্দের বিন্যাস ঘটছে, তাকে বাস্তবের মাটিতে রেখে কথ্যভাষা বা সাহিত্যের নানা রূপকে বা ভাষার চেহারাকে সামগ্রিকভাবে দেখার কথা বলেন কায়াবাদীরা। ভাষার আলোচনা শুধু বাক্যের গঠনের মধ্যে সীমার মধ্যে আটকে না রেখে প্রসঙ্গ বা কনটেক্সটকেও টেনে আনে, আঁটোসাটো ব্যাকরণের চেয়ে পছন্দ করে বাচকতার স্তরে পৌঁছতে এবং সেখানে উপাদানগুলো কীভাবে বাক্যের রূপ নিচ্ছে, তা সামগ্রিকতায় বুঝতে।

হয়তো এই কারণেই তিনি প্রথাগত ব্যাকরণ শিক্ষা এবং শিক্ষক সম্বন্ধে ‘জুলুম’ শব্দ ব্যবহার করেন। ‘ছিন্ন কথায় সাজাই তরণী’ বইয়ের ভূমিকাংশে লেখেন, ‘আমাদের কারবার তাহলে দুটো বিষয়ের সঙ্গে। প্রথম বিষয় মানুষের মুখের ভাষার নিজস্ব আসল প্রকৃতির অন্দরমহল, যেখানে জুলুম নাও থাকতে পারে। আর দ্বিতীয় বিষয় ব্যবস্থিত সমাজের লিখিত ভাষার অনুশাসনের সেই দরবার যার সঙ্গে শিক্ষকরা ছড়ি ঘুরিয়ে ঘুরিয়েই ছাত্রদের আলাপ করিয়ে দেন প্রত্যেক প্রজন্মে, অথচ যেখানে জুলুমের বিকল্প চালু করা এমন কিছু অসম্ভব নয় যদি আমরা সাহিত্যের দিকে, সমাজের দিকে ধৈর্যের সঙ্গে তাকাতে রাজি থাকি। লিখিত ভাষার ব্যাকরণ শেখানোর গোলমেলে জায়গাটাতে বিষয়-দুটো মিলে-মিশে একাকার হয়ে যায়।’

বিশেষ ঘরানার এই তত্ত্বের অন্তর্গত প্রযুক্তির কথা সরিয়ে যদি এর বাইরের দিকে তাকানো যায়, তাহলে প্রবাল দাশগুপ্তের চিন্তাজগতের আরেকটি খোপের সন্ধান পাওয়া যাতে পারে। সেখানেই বোধহয় রয়েছে এসপেরান্তোর প্রতি তাঁর টানের কারণ। ছোটবেলাতেই শিখেছিলেন এসপেরান্তো, তারপর শান্তিনিকেতনবাসী লক্ষ্মীশ্বর সিংহের সঙ্গে তাঁর আলাপ। তাঁর রাজনৈতিক সত্তার মিলে যাচ্ছিল এসপেরান্তোভাষী মনীষী কথা। ব্যক্তির সঙ্গে শুধু ব্যক্তির নয়, সমাজ বা দেশ, গোটা পৃথিবীর মানুষ যোগাযোগ স্থাপনে এমন একটি ভাষিক মাধ্যমের দরকার ছিল, যার অভিমুখ নিখিল মানবতার দিকে। এর উত্থানভূমিতে আছে পাশ্চাত্যের তথাকথিত উন্নত দেশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘৃণা, অত্যাচার আর যুদ্ধ। প্রতিটি মানুষ যে একটি বৃহত্তর মানবগোষ্ঠীর অংশ, সে-কথা প্রতিফলিত হয় এসপেরান্তো ভাষার গড়নে। তাই এসপেরান্তো মানুষের তৈরি একটি কৃত্রিম ভাষামাত্র নয়, ভাষার সীমানা দিয়ে বাঁধা ভেদাভেদ সরানোর প্রয়োজনেই একদিন হাতিয়ার হয়ে এসেছিল এসপেরান্তো। যে-কোনওরকম ভাষিক আগ্রাসনের বিপরীতে হাঁটার প্রতিশ্রুতি ছিল সেখানে। আর ছিল অনেক ভাষা মিলিয়ে এমন একটা ভাষা, যা মানুষ শিখবে সহজে, বলবে অনায়াসে, ব্যবহার করতে পারবে দেশ-কাল-ভূগোল-ইতিহাসের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বমানবের সংযোগসূত্র হিসেবে।

এই সেদিনও একটি বক্তৃতায় স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘এসপেরান্তোয় সকলেরই অধিকার। নানারকম রুচির মানুষ, নানারকম রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ঝোঁকের মানুষ, গোড়া থেকেই ব্যবহার করে আসছে ভাষাটা। সেজন্যেই ১৩৫ বছর ধরে চলছে এসপেরান্তো। আপনার রুচি বা পক্ষপাত যাই হোক না কেন, এই ভাষাটাকে গোলমেলে কোনো শিবিরের কুক্ষিগত ভাষা বলে ভয় পাবেন না।’

পরবর্তীতে, ইউনিভার্সাল এসপেরান্তো অ্যাসোসিয়েশন বা আকাদেমিও দে এসপেরান্তো-র প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো বিরল সম্মানও অর্জন করেছেন।

এইখানে এসে কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করা প্রয়োজন। বেশ কয়েক বছর আগে আমরা এসপেরান্তো শিখতে শুরু করি ‘এফলু’-র রাশিয়ান ভাষার অধ্যাপক সজল দে-র কাছে। প্রসঙ্গত বলি, সজলদা লক্ষ্মীশ্বর সিংহের এসপেরান্তো ভাষায় লেখা আত্মজীবনী ‘Jaroj Sur Tero’ অনুবাদ করেন বাংলায় এবং সেই অনুবাদ ‘পৃথিবীর বুকে দিনগুলি’ যখন বই আকারে প্রকাশ পেল, তখন সেই বইয়ে একটি অসাধারণ ভূমিকা লিখেছিলেন প্রবালবাবু। একেবারে সাধারণ মানুষের জন্য এসপেরান্তো সম্বন্ধে চমৎকার ঝরঝরে সে-লেখা। যাই হোক, আমার লক্ষ্য ছিল, ভাষার দর্শনের পাশাপাশি ভাষার গড়নে কীভাবে সাম্যের আদর্শ কীভাবে জুড়ে যায়, তা দেখা। এদিকে সজলদা মারফৎ তিনি শুনেছিলেন আমাদের এসপেরান্তো শেখার কথা, এবং তারপর থেকেই পথপ্রদর্শকের মতো আলো দেখাতে লাগলেন। সমাজমাধ্যমে আমার অকিঞ্চিৎকর লেখাগুলো তিনি পড়তেন এবং প্রতিক্রিয়া জানাতেন। আলাপও হয়েছিল অদ্ভুতভাবে, তাঁরই আগ্রহে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্ব বিভাগের একটি সভায় গেছি, সবে ঢুকেছি, হঠাৎই নিজের চেয়ার থেকে উঠে এলেন আমার দিকে, ‘আপনিই ঋত্বিক তো?’ আমি খানিক চমকিতই হয়েছি, আমায় চিনলেন কী করে প্রবাল দাশগুপ্ত! আলগা একটা ঘাড় নাড়লাম বটে, কিন্তু আমার অভিব্যক্তিতে নিশ্চয় সেই হতচকিত ভাব স্পষ্ট হয়েছিল, সুরসিক প্রবালবাবু উত্তরও দিয়েছিলেন আমার সঙ্গিনীটির দিকে তাকিয়ে। বলেছিলেন, ‘এই তো, ওর সঙ্গে ঢুকলেন যেই, আপনাকে দেখেই অমনি চিনতে পেরেছি, আপনিই নিশ্চয় ঋত্বিক!’ বলেই আবার আমাদের দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ হাসি! মনে মনে ভাবছিলাম, এটাই বোধহয় এসপেরান্তোর শিক্ষা— এত সহজে মানুষের কাছে চলে আসতে পারেন।

একবার এসপেরান্তো-সংক্রান্ত একটি সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ‘ইউনিভার্সাল এসপেরান্তো অ্যাসোসিয়েশন’-কে (UEA) ঠিক কীভাবে দেখেন তিনি? প্রবালবাবুর উত্তরে উঠে এসেছিল অপূর্ব একটি এসপেরান্তো শব্দ— ‘ĉielarko’, যার আক্ষরিক অর্থ ‘রংধনু’; বলেছিলেন, মাথার ওপর আকাশে বিশাল রংধনুর মতো হয়ে থাকবে এসপেরান্তো, যার নিচে খেলা করবে নানা রঙের শিশুর দল, চেয়ে থাকবে আকাশের দিকে আর অপেক্ষা করবে, কখন নামবে বৃষ্টি! এই উত্তরটাই আমি ঘুরিয়ে দিতে চাই তাঁর দিকেই। তাঁর শরীরী অনুপস্থিতিতে এই প্রথম তাঁর জন্মদিন। আবার ফিরে পড়ছি তাঁর লেখা, আরও একটু রাঙিয়ে নিচ্ছি নিজেকে তাঁর ভাবনার রঙে। পড়তে বাকি আছে তাঁর বেশিরভাগ লেখাই— আরও রং লুকিয়ে আছে সেখানে।

প্রবাল দাশগুপ্ত আমাদের আকাশে থাকুন ‘ĉielarko’ হয়েই। আর থাক সেই অনন্ত বৃষ্টির চিরকালীন অপেক্ষা, যার ধারাবরিষণটুকু নিয়ে চলে গেছেন এমন একজন, যাঁর সঙ্গে কোনওদিন আর দেখা হবে না আমার।