প্রাণীজগতে বৈচিত্রের শেষ নেই। মানুষ এবং পাখি সংগীতের বিষয়ে অবশ্যই প্রথম সারিতে থাকবে, কিন্তু জীববিজ্ঞানে শুধু মানুষ এবং পাখিই নয়, তারা ছাড়াও এই জগতে অনেকেই সংগীতের নিয়িমিত চর্চা করে থাকে। শুধু চর্চা নয়, তারা গায়ক হিসেবেও বেশ সমাদৃত। যেমন, ব্যাং। ব্যাঙের গান মানুষের ভাল না-ই লাগতে পারে, কিন্তু ব্যাঙের স্বজাতীয়দের মধ্যে তাদের গানের কদর রয়েছে। বর্ষাকালে ব্যাঙেদের মধ্যে রীতিমতো সংগীতের প্রতিযোগিতা চলে। পুরুষ এবং স্ত্রীদের মধ্যে আকর্ষণের জন্য তারা গানকেই বেছে নেয়। যে যত ভাল গান গাইতে পারে, তার প্রতি আকর্ষণের তীব্রতা বেড়ে যায়।
কীটপতঙ্গরাও নাকি সুগায়ক। শুধু সুগায়ক নয়, তারা যন্ত্রসংগীতেও বেশ পারদর্শী। পৃথিবীতে কত কীটপতঙ্গ আছে, তার সঠিক হিসেব এখনও বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। তবে গবেষকদের অনুমান, পৃথিবীতে প্রায় ৫৫ লক্ষ প্রজাতির কীটপতঙ্গ থাকতে পারে, যার মধ্যে মাত্র প্রায় ১০ লক্ষ প্রজাতি এখনও বিজ্ঞানসম্মতভাবে শনাক্ত ও বর্ণিত হয়েছে। এই বিপুল পোকামাকড়ের জগতের একটি আশ্চর্য ক্ষমতা হল, অনেক কীটপতঙ্গ নিজেদের শরীরকে বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে শব্দ তৈরি করতে পারে। মানুষের ভাষায় তাকে গান বলা যায়, যদিও বিজ্ঞানের ভাষায় এগুলিকে বলা হয় ‘অ্যাকুস্টিক কমিউনিকেশন’ বা শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ।
ঝিঁঝিঁপোকা তার সামনের দুই ডানা পরস্পরের সঙ্গে ঘষে পরিচিত ঝিঁ-ঝিঁ শব্দ তৈরি করে। সাধারণত পুরুষ ঝিঁঝিঁ পোকার এই ডাকের উদ্দেশ্য, স্ত্রীকে আকর্ষণ করা। সিকাডা পোকা আবার একেবারে অন্য কায়দায় গান গায়। তার পেটের দু’পাশে থাকা টিম্বল নামের বিশেষ অঙ্গ পেশির সাহায্যে দ্রুত কাঁপিয়ে প্রচণ্ড জোরালো শব্দ তৈরি করে। ক্যাটিডিড বা ঝিঁঝিঁ-জাতীয় আর একদল কীটপতঙ্গ সামনের ডানার বিশেষ অংশ ঘষে ছন্দময় ডাক তৈরি করে; কিছু প্রজাতির সেই শব্দ মানুষের শ্রবণসীমারও ওপরে পৌঁছে যায়।
ঘাসফড়িংয়ের অনেক প্রজাতিও পা, ডানা কিংবা শরীরের বিশেষ অংশ ঘর্ষণের মাধ্যমে শব্দ তৈরি করে। এমনকী, কিছু ‘বিটল’ বা গুবরে পোকা শরীরের অংশ ঘষে কিংবা কম্পনের মাধ্যমে শব্দ করে, আর কিছু মথ বাদুড়ের অতিস্বনক শব্দ শনাক্ত করে পাল্টা আলট্রাসনিক সংকেত তৈরি করতে পারে।

অর্থাৎ, কীটপতঙ্গের জগতে গান কেবল সুরের আনন্দ নয়; কখনও তা প্রেমের আহ্বান, কখনও নিজের এলাকা জানানোর উপায়, কখনও আবার শত্রুর হাত থেকে বাঁচার অস্ত্র। মানুষের কানে যেটা রাতের নীরবতা, প্রকৃতির কাছে আসলে তা অসংখ্য ক্ষুদ্র গায়কের এক বিশাল অর্কেস্ট্রা। কিছু পিঁপড়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ পরস্পরের সঙ্গে ঘষে ক্ষীণ শব্দ তৈরি করতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘স্ট্রিডুলেশন’। সাধারণত, এই শব্দ মানুষের কানে শোনা যায় না, কিন্তু পিঁপড়েরা এর মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সংকেত আদানপ্রদান করতে পারে। অন্যদিকে, লিফহপার বা গাছফড়িং-জাতীয় কিছু পোকা উদ্ভিদের কাণ্ডে সূক্ষ্ম কম্পন তৈরি করে যোগাযোগ করে। এই কম্পন গাছের শরীরের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং কাছাকাছি থাকা অন্য পোকা তা অনুভব করতে পারে।
পতঙ্গবিদ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, যাঁর বই পড়ে বহু বাঙালিই শৈশবে চিনেছে কীটপতঙ্গদের, তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছিল একটি চমকপ্রদ তথ্য। তিনি মাকড়সাদের নিয়ে একটা ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, তাঁর পরিচিত এক বেহালাবাদক প্রতিদিন একই সময়ে বেহালা বাজাতেন। সেই বাজনা শুনে এক মাকড়সা সুতো বেয়ে নেমে আসত এবং বাজনা শেষ হলে আবার ফিরে যেত। বেহালাবাদক এবার সময়ের পরিবর্তন করে দেখলেন। কিন্তু সেই মাকড়সা আবার সুতো বেয়ে নেমে বাজনা শুনে ফিরে গেল। এবার বেহালাবাদক সুরের পরিবর্তন করলেন। কিন্তু সেই মাকড়সা সেই বাজনা শুনতে এল এবং ফিরেও গেল। ঘটনাটি নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। কিন্তু প্রশ্ন হল, মাকড়সাটি কি সত্যিই বেহালার সুর বুঝতে পারত? না কি বেহালার শব্দে তৈরি হওয়া কোনও নির্দিষ্ট কম্পনই তার কাছে ছিল সংকেত?
আধুনিক গবেষণা বলছে, মাকড়সারা অত্যন্ত সূক্ষ্ম কম্পন অনুভব করতে সক্ষম। বিশেষ করে জালে বসবাসকারী মাকড়সাদের কাছে জালের প্রতিটি সুতো যেন এক একটি সংবেদনশীল তার। সেখানে সামান্য কম্পনও তাদের শরীরে পৌঁছে যায়। শিকার, বিপদ কিংবা অন্য মাকড়সার উপস্থিতি বিভিন্ন ধরনের কম্পনের মধ্যে তারা পার্থক্য করতে পারে।
অন্য একটি ঘটনায় গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য উল্লেখ করেছেন তাঁর গান গাওয়ার কথা। কোনও এক গোধূলিলগ্নে তিনি দীঘির ধারে বসে গান গাইছিলেন। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজনও ছিল। তাঁরাও সুর মেলাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরে কিছু ঝিঁঝিঁ পোকা তাদের গায়ে এসে বসতে শুরু করল। একে-একে অনেকগুলো ঝিঁঝিঁ পোকা আসতে শুরু করল। তাঁরা হঠাৎ গান থামিয়ে দিতেই ঝিঁঝিঁ পোকাগুলো চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে তাঁরা আবার গান ধরলে ঝিঁঝিঁ পোকার উৎপাত শুরু হল। ঘটনাটি কি নিছক কাকতালীয়? না কি সত্যিই সেই গান কোনওভাবে ঝিঁঝিঁ পোকাগুলিকে আকৃষ্ট করছিল?

আজকের বিজ্ঞান দিয়ে ঘটনাটিকে দেখলে প্রশ্নটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ঝিঁঝিঁ পোকার নিজেরাই শব্দ তৈরি করে এবং সেই শব্দ তাদের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশেষ করে পুরুষ ঝিঁঝিঁ পোকা ডানা ঘষে যে ছন্দময় ডাক তৈরি করে, তা স্ত্রী-কে আকর্ষণ করার কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে শব্দ ও কম্পনের প্রতি তাদের সংবেদনশীলতা যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু গোপালচন্দ্রের দেখা সেই ঘটনায় তারা মানুষের গান শুনে কেন কাছে এসেছিল, তার নিশ্চিত উত্তর দেওয়ার মতো প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। হতে পারে, গানের কোনও নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক বা কম্পন তাদের স্বাভাবিক সংকেতের সঙ্গে কিছুটা মিলে গিয়েছিল; আবার এমনও হতে পারে, আলো, পরিবেশের পরিবর্তন বা অন্য কোনও কারণ তাদের আকৃষ্ট করেছিল। তিনি লিখেছেন যে, সবুজ রঙের ঝিঁঝিঁ পোকার অদ্ভুত স্বভাব যে, ক্রমাগত কোনও শব্দ শুনলে সেখানে তারা সেখানে ছুটে আসবে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন পল্লিবাংলার ছেলেমেয়েরা নারেকেলের খোল বাজিয়ে ঝিঁঝিঁ পোকার ছড়া গাইলে সেখানে ঝিঁঝিঁ পোকা ভিড় করত।
কীটপতঙ্গের মধ্যে ছলনাও বিশেষভাবে দেখা যায়। যে-বিষয়কে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য পতঙ্গদের লুকোচুরি বলে উল্লেখ করেছেন। ফড়িং ধরা পড়লেই প্রথমে প্রবল বেগে ডানা ঝাপটানোর চেষ্টা করে। তারপর মরার ভান করে পড়ে থাকে কিছুক্ষণ। যখন শিকারি ভাবে, সে মৃত এবং কাছে এসে ভক্ষণ করতে যায় তখন তখন ফড়িংটা আবার প্রবল বেগে ডানা ঝাপটে পালানোর চেষ্টা করে। চারপাশে তাকালে হয়তো মনে হবে, সামনে শুধু একটি পাতা, শুকনো ডাল কিংবা ফুল পড়ে আছে। অথচ একটু ভালও করে দেখলেই বোঝা যায়, সেই পাতাটি আসলে একটি পোকা, সেই ডালটি জীবন্ত লাঠিপোকা, কিংবা ফুলের আড়ালে ওত পেতে রয়েছে এক শিকারি ম্যান্টিস বা ধর্মপোকা। আত্মগোপনের এই অসাধারণ কৌশলকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ক্যামোফ্লাজ বা ছদ্মবেশ। এর উদ্দেশ্য মূলত দু’টি। নিজে যাতে শিকারির চোখে না পড়ে এবং প্রয়োজনে নিজেই যাতে শিকারের চোখে ধরা না পড়ে। অর্থাৎ কখনও আত্মরক্ষা, কখনও আবার শিকারের জন্য নিখুঁত আড়াল।
পাতাপোকা এই লুকোচুরির অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী। তার শরীরের আকার, রং এবং ডানার নকশা অনেকটা সবুজ পাতার মতো। শুধু দেখতে পাতার মতো হলেই অবশ্য কাজ শেষ নয়; বাতাসে পাতা যেমন দুলতে থাকে, পাতাপোকাও চলাফেরার সময় শরীরকে ধীরে-ধীরে দোলায়। ফলে দূর থেকে তাকে জীবন্ত প্রাণী বলে বোঝা কঠিন। একইভাবে লাঠিপোকা নিজের সরু ও লম্বা শরীরকে শুকনো ডালের সঙ্গে এমনভাবে মিলিয়ে নেয় যে, গাছের ডালে বসে থাকা অবস্থায় তাকে আলাদা করে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। বিপদ টের পেলে অনেক সময় সে দীর্ঘক্ষণ একেবারে স্থির হয়ে থাকে, যেন সে কোনও প্রাণী নয়, গাছেরই একটি অংশ।

আবার আত্মগোপনের সঙ্গে কখনও যুক্ত হয় শিকারের কৌশল। অর্কিড ম্যান্টিস-এর শরীরের রং ও গঠন অনেকটা ফুলের মতো। ফুলের কাছে খাবারের সন্ধানে আসা ছোট পোকা বুঝতেই পারে না যে, ফুলের মতো দেখতে বস্তুটির আড়ালে একজন শিকারি অপেক্ষা করছে। এক্ষেত্রে ছদ্মবেশ শুধু আত্মরক্ষার ঢাল নয়, বরং শিকারের জন্য এক নিখুঁত ফাঁদ। অনেক মথের ডানার নকশাতেও দেখা যায় একই কৌশল। গাছের বাকল, শুকনো পাতা কিংবা ছত্রাকের মতো নকশা তাদের ডানায় এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে, গাছের গায়ে বসে থাকা অবস্থায় তারা প্রায় পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়। আরও চমকপ্রদ হল, কিছু কীটপতঙ্গ শুধু চেহারা দিয়ে নয়, আচরণ দিয়েও নিজেদের লুকিয়ে রাখে। কেউ পাতার মতো দুলতে থাকে, কেউ ডালের মতো স্থির হয়ে যায়, কেউ আবার মৃত পোকা বা শুকনো পাতার মতো পড়ে থাকে। অর্থাৎ, তাদের ছদ্মবেশ কেবল শরীরের রং বা আকারের ব্যাপার নয়; পরিবেশকে বুঝে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এক সম্পূর্ণ কৌশল।
গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর বর্ণনায় লিখেছেন কমা প্রজাপতি নামক এক অদ্ভুত আকারের প্রজাপতির কথা। যার ডানাগুলো ছিন্নবিচ্ছিন্ন। তারা যদি ডানা মুড়ে গাছের পাতার ওপর বসে তাহলে তাদের শনাক্ত করা মুশকিল হয়ে পড়ে। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন, একপ্রকার সুতলি পোকা নিয়ে। যে সুতলিপোকা মথজাতীয় এক প্রজাপতির বাচ্চা। এদের দেহের সম্মুখ এবং পশ্চাৎভাগে পা থাকে। এরা জোঁকের মতো চলাফেরা করে। গাছের পাতা খায়। চড়ুই পাখি এদের পরম শত্রু। এরা চড়ুইয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য এক বিশেষ উপায় অবলম্বন করে। সরু ডালের গা বেয়ে এমনভাবে ঝুলে থাকে মনে হবে পাতাবিহীন এক বোঁটা। কাঠপোকারা গাছের পায়ে ডিম পেড়েই খালাস। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে, সেই বাচ্চা গাছের পাতা খেয়েই বাঁচে। কিন্তু পাখিদের ভয়ে এরা এক কৌশল অবলম্বন করে। গাছে ফলের আকৃতির মতো গুটি তৈরি করে তারা সেখানে অবস্থান করে।
গোপালচন্দ্র ছিলেন আত্মভোলা এক বিজ্ঞানী। আর্থিক কারণে ইন্টারমিডিয়েট অবধিই পড়াশোনা করেছেন। বাংলার গাছপালা, কীটপতঙ্গ, পশুপাখিদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে তিনি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, গবেষণা চালিয়ে ফলাফল লিখেছেন। ১৯২১ থেকে ১৯৭১— বসু বিজ্ঞান মন্দিরে তিনি গবেষণা চালিয়েছেন ব্যাং, পিঁপড়ে, মৌমাছি আর মাকড়সা নিয়ে। সামান্য উপকরণ দিয়ে কত অসামান্য মণিমুক্তো যে খুঁজে বের করেছেন তিনি! যেমন, পিঁপড়ের ডিম থেকে রানি, পুরুষ না কর্মী কোন ধরনের পিঁপড়ের জন্ম হবে, তা বুঝতে টবে রাখা আমগাছে বাসা বানিয়েছিলেন। যেখানে শুধুই থাকবে কর্মী পিঁপড়ে। টবের চারদিকে জল থাকায় সেখানে প্রবেশ নিষেধ অন্য পিঁপড়ের। ছ’সপ্তাহ পর দেখা গেল, ডিম পাড়া হয়েছে, লার্ভা রয়েছে এবং পিঁপড়ের সংখ্যাও বেড়েছে। স্ত্রী পিঁপড়ের অনুপস্থিতিতে কী করে সম্ভব হল এটা? ১৯৩৯ থেকে ১৯৪১ সাল অবধি খাবার, বাসা এবং পিঁপড়ের প্রকৃতি পাল্টে তিনি বুঝতে চাইলেন ডিম পাড়ার ধরন।

এই ঘটনাটিই আসলে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের কাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যটিকে সামনে আনে। তিনি প্রকৃতিকে দূর থেকে দেখেননি, তার সঙ্গে যেন কথোপকথন করেছেন। একটি মাকড়সা কেন বেহালার শব্দে এগিয়ে আসে, ঝিঁঝিঁ পোকা কেন মানুষের গানের সময় কাছে চলে আসে, একটি পোকা কীভাবে নিজেকে পাতার আড়ালে এমনভাবে লুকিয়ে ফেলে যে চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য হয়ে যায়, কিংবা একটি পিঁপড়ের শরীরে এমন কী রহস্য আছে, যা তাকে এক বিশেষ ভূমিকা নিতে সাহায্য করে। এই সামান্য বলে মনে হওয়া প্রশ্নগুলিই তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল বড় বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বিষয়।
আজ আমরা জানি, কীটপতঙ্গের পৃথিবী আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি জটিল। তারা শব্দে কথা বলে, কম্পনে সংকেত পাঠায়, গাছের শরীরকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, ছদ্মবেশে নিজেদের আড়াল করে, আবার কখনও সেই ছদ্মবেশকেই শিকারের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, মানুষের চোখে যে-জগৎ প্রায় নীরব এবং স্থির, তার ভেতরেই প্রতিমুহূর্তে চলছে অসংখ্য সংকেত, কৌশল, আকর্ষণ, ভয় এবং বেঁচে থাকার লড়াই।
গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই তিনি সেই অদৃশ্য জগতের দিকে আমাদের চোখ ফেরাতে পেরেছিলেন। তাঁর কাছে একটি ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুধু রাতের শব্দ ছিল না, একটি মাকড়সার আচরণ নিছক কৌতূহলের বিষয় ছিল না, কিংবা একটি পোকা পাতার মতো হয়ে থাকা শুধুই প্রকৃতির খেলা ছিল না। প্রতিটি আচরণের পিছনে তিনি খুঁজেছেন কারণ, সংকেত এবং জীবনের নিজস্ব যুক্তি।
প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বিস্ময় হয়তো এটাই তার সবচেয়ে ছোট প্রাণীদের জীবনও কোনও অংশে ছোট নয়। মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সেই ক্ষুদ্র পৃথিবীতেও রয়েছে গান, ভাষা, প্রেম, প্রতারণা, আত্মগোপন এবং বেঁচে থাকার অসাধারণ বুদ্ধি।




