দীক্ষিত শিল্পীর সত্যাগ্রহ

কিশোরগঞ্জ শহরের হিন্দু বাসিন্দাদের কাছে আমি ছিলাম— ‘ম্লেচ্ছ’। বাল্যকালে প্রথম ইস্কুলে ভর্তি হবার পর ওখানকার হিন্দু ছেলেদের দ্বারা আমি ‘ম্লেচ্ছ’ বলে অভিহিত হতাম। এমনকি প্রথম আমি যে বেঞ্চিতে বসতাম সে বেঞ্চিতেও কোনো হিন্দু ছেলে বসত না।’ নিজের ছেলেবেলার এই অভিজ্ঞতা লিখছেন দেবব্রত বিশ্বাস, তাঁর আত্মকথা ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত’ বইতে। আমাদের মনে পড়বে আর একটি সংবেদী বালকের কথা, যার বয়ানে শুনি, ‘অধিকাংশ ছেলেরই সংশ্রব এমন অশুচি ও অপমানজনক ছিল যে, ছুটির সময় আমি চাকরকে লইয়া দোতলার জানলার ধারে একলা বসিয়া কাটাইয়া দিতাম। মনে মনে হিসাব করিতাম, এক বৎসর, দুই  বৎসর, তিন বৎসর— আরো কত বৎসর এমন করিয়া কাটাইতে হইবে (‘জীবনস্মৃতি’/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

অনেকটা সময়ের ব্যবধানে দুই বালক, দুজনেই ব্রাহ্ম পরিবারের সন্তান, অপরায়ন-এর অপমান বুকে নিয়ে চলেছে। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে তা ছিল কুৎসিত নিগ্রহ, দেবব্রতর ক্ষেত্রে ছিল সামাজিকভাবে ‘একঘরে’ বোধ হবার ব্যথা। আর উত্তরজীবনে ‘বাঁশি সংগীতহারা’ হয়ে যাবার গাঢ় বাস্তবতা। এই ‘সংগীতহারা’ হওয়া কিন্তু দেবব্রত বিশ্বাসের শিল্পীজীবনে কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক কণ্ঠরোধের কারণে নয়। আমরা জানি, বিশ্বভারতী সংগীত সমিতি তাঁর গান রেকর্ড করার ক্ষেত্রে কোনও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। দেবব্রত গান রেকর্ড করা বন্ধ করেছিলেন সংগীত সমিতির আধিপত্যবাদের প্রতিবাদে এবং ওঁরই অনুজ একাধিক গাইয়ের প্রতি গভীর অভিমানে। এ যেন এক দীক্ষিত শিল্পীর সত্যাগ্রহ।

আরও পড়ুন: দেবব্রত বিশ্বাসের দুর্লভ কয়েকটি চিঠি…

আমরা ফিরে যাই ওঁর তরুণ জীবনের রাজনৈতিক ইতিহাসে। কিশোরগঞ্জে ছাত্রকালেই তিনি যোগ দিচ্ছেন ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে, এবং সেটা কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। সভায়-সভায় গেয়ে বেড়াচ্ছেন মুকুন্দদাস, নজরুল এবং রবীন্দ্রনাথের লেখা স্বদেশি গান। তাঁর মা, যিনি ব্রাহ্মসমাজে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলেন, তখন কিশোরগঞ্জে গড়ে তুলছেন মহিলা সমিতি; বাড়িতে একটি তাঁত বসিয়ে  গ্রামের গরিবঘরের মেয়েদের কাপড় বুনতে শেখাচ্ছেন যাতে তারা স্বনির্ভর হতে পারে। যে-রবীন্দ্রনাথ গান লিখেছেন নিভৃত একান্তে আবার একই নিষ্ঠায় শ্রীনিকেতন তৈরি করেছেন গ্রামের মানুষের কল্যাণকল্পে, সেই  সর্বত্রগামী রবীন্দ্রনাথ গভীরে প্রবেশ করেছিলেন দেবব্রতর অস্তিত্বের শিকড়জুড়ে। এদিকে হিন্দু বন্ধু প্রায় না থাকায় কিশোর দেবব্রত ঘনিষ্ট হচ্ছেন একাধিক উদারমনা মুসলিম পরিবারের সঙ্গে, প্রান্তিক সমাজের অনেকেই  হয়ে উঠছেন তাঁর স্বজন। এবং তাঁর মধ্যে জন্ম নিচ্ছে মানবধর্ম ও সাম্যের বোধ।

দেবব্রত গান রেকর্ড করা বন্ধ করেছিলেন সংগীত সমিতির আধিপত্যবাদের প্রতিবাদে

অনেক পরে, ’৪৬-এর দাঙ্গার ভয়ংকর হিংস্র দিনে, বিপন্ন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কলিম শরাফিকে তিনি গোপনে আশ্রয় দিচ্ছেন নিজের বাসায়, তারপর তাঁকে একটা গান্ধী টুপি পরিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে, সকলের কাকাবাবু মুজফ্‌ফর আহমেদের নিরাপদ আশ্রয়ে। এর ঠিক বছর দশেক আগে কলকাতা শহরে তিনি যুক্ত হচ্ছেন বাম রাজনীতির সঙ্গে। নিজেই লিখছেন, ‘১৯৩৮ সাল থেকে আমার মনটি বেশ বাঁয়ে হেলে চলতে শুরু করল… ১৯৩৯ সনে দ্বিতীয় বিশ্বমহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সেই সময় থেকেই নানা ধরনের সঙ্ঘের উৎপত্তি হতে লাগল। ইউথ কালচারাল ইনস্টিটিউট, ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পীসংঘ ইত্যাদি।’ ওই সংঘের আমন্ত্রণে দেবব্রত নানা গানের সঙ্গে কণ্ঠে নিতেন রবীন্দ্রনাথের গান। যে-দেবব্রত  ভারতীয় গণনাট্য সংঘে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গভীর সাহচর্যে কণ্ঠ দিচ্ছেন ‘নবজীবনের গান’-এ, তিনিই ১৯৪৭ সালে ‘রক্তকরবী’ নাটকে শম্ভু ও তৃপ্তি মিত্রের সহকর্মী হিসেবে বিশু পাগলের ভূমিকায় অভিনয় করছেন, দরাজ কণ্ঠে গেয়ে উঠছেন, ‘চোখের জলের লাগল জোয়ার দুখের পারাবারে…’। তাঁর জীবনে রবীন্দ্রনাথকে জড়িয়ে  নিচ্ছেন এমন এক বিরোধবিহীন আলিঙ্গনে, যেখানে বিপুলা পৃথিবীর মানুষের ঐকতান শোনা যায়। সভ্যতার সংকটকালে। ১৯৩৯ সালে কনক বিশ্বাসের সঙ্গে যৌথ স্বরে তাঁর প্রথম রবীন্দ্রগানের রেকর্ড-এ গাইছেন ‘সঙ্কটের কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মাণ…’।

দেশভাগ মেনে নিতে পারেননি দেবব্রত। তাঁর জন্মমাটি বিদেশ হয়ে যাওয়ায় একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। পাঁচের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে রাজনীতি নিয়ে সংশয়, এবং তারপরে ১৯৬২-তে বাম রাজনীতির আঙিনায় ‘বিরোধ ও বিদ্বেষের আগুন’ ছড়িয়ে যেতে দেখা। একই কারণে নিজের কর্মস্থল জীবনবীমার ইউনিয়নের অভ্যন্তর থেকেও নিরুপায় হয়ে সরে যেতে হল তাঁকে। আর গান, মূলত রবীন্দ্রনাথের গান হয়ে উঠল তাঁর আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। তাহলে কি গাইয়ে দেবব্রত বিশ্বাস গানকে প্রকাশ করছেন না, গানের চেয়ে গাইয়ে বড় হয়ে উঠছেন? এর উত্তরে বলা যায়, দেবব্রতর নন্দনবোধ তাঁকে করে তুলেছিল রবীন্দ্রগানের এমন এক ব্যাখ্যাতা, যিনি গান গাইবার সময়ে নিজেকে গানের আড়ালে রাখতেন না। গানকে যেন আয়ুধ হিসেবে ব্যবহার করে তিনি শ্রোতাকে সরাসরি কমিউনিকেট করতেন। তিনি যেন নিছক গান গাইতেন না, গান ‘বলতেন’। স্বরক্ষেপণে নিয়ে এসেছিলেন এমন এক অভিনয়ধর্মিতা, যাতে তাঁর কণ্ঠে গানের বাণী বিশ্বাস্য হয়ে ওঠে।

দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে গানের বাণী বিশ্বাস্য হয়ে ওঠে

এক ধাপ এগিয়ে সুধীর চক্রবর্তী বলছেন, দেবব্রত বিশ্বাস যেন রবীন্দ্রসংগীতের অনুবাদক, সাধারণ শ্রোতা তাঁর গান শুনে যেন গানের মর্মে প্রবেশ করতে পারে, গানের বার্তাটির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারে। ‘সাধারণ’ শ্রোতার প্রতি তাঁর এই দায় তিনি অর্জন করেছেন তাঁর রাজনৈতিক দীক্ষা থেকে। তিনি তথাকথিত রাবীন্দ্রিক এলিটিজম-কে ভাঙছেন যেন এক উদ্দাম কৌতুকে। তিনি কি তবে সরে গেলেন ব্রাহ্মসমাজের খোলা গলায় গান গাইবার ভঙ্গিটি থেকে? একেবারেই যে তা নয়, সে-কথা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন সত্যজিৎ  রায়, একটি ভিডিয়ো সাক্ষাৎকারে। বলছেন, ‘সকলেই মাইকটার ব্যবহার করে গলাটা অনেকটা মিনমিনে করে নিয়েছিল, যাকে ক্রুনিং বলে। জর্জদা কখনওই সেটা করেননি। সেটা আমাদের কাছে সবচেয়ে ভালো লাগার ব্যাপার ছিল, কেননা খোলা গলায়, দরাজ গলায় জর্জদা গান করতেন। সে-ধরনের রবীন্দ্রসংগীত কলকাতা থেকে ক্রমশ কমে আসছিল।’ দেবব্রত সম্পর্কে এতটা সপ্রশংস সত্যজিৎ কিন্তু নিজের কোনও ছবিতে তাঁর জর্জদার কণ্ঠকে গ্রহণ করেননি। বরং ছবিতে খুব জোরালোভাবে দেবব্রত বিশ্বাসকে ব্যবহার করলেন ঋত্বিক ঘটক। তিনিও দেশভাগের বেদনায় দীর্ণ, কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নির্বাসিত।

১৯৫৫ সালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ঋত্বিককে বহিষ্কার করে। এর ঠিক পাঁচ বছর পরে মুক্তি পায় ‘মেঘে  ঢাকা তারা’, দেবব্রত বিশ্বাস আর গীতা ঘটকের দ্বৈত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’ গানটি উপাসনার সকল আবহ ছিন্ন করে স্থাপিত হয় এক ছিন্নমূল বাঙাল পরিবারের ঘরভরা  দৈন্যের বুকের ওপরে। ঠিক তার পরের বছর রবীন্দ্র-শতবর্ষে মুক্তি পায় ‘কোমল গান্ধার’। গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন এবং সমাজ বদলের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের আবহে দেবব্রত বিশ্বাসের মূলত তানপুরার সঙ্গে গাওয়া  ‘আকাশভরা সূর্য-তারা’ গানটি রবীন্দ্রনাথের গানকে, তাঁর ভিতরকার মহাজাগতিক উপস্থিতিকে, এক লহমায় আমাদের সামনে উন্মোচিত করে। দেবব্রত আর ঋত্বিক, দুই নির্বাসিত সৈনিক পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যান যেন কোন অমোঘ টানে।

রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ে প্রখ্যাত সংগীতশিক্ষক ও গবেষক সুভাষ চৌধুরী সত্যজিৎ রায়ের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন বিজয়া রায়ের উপস্থিতিতে। সাক্ষাৎকারটি ইউটিউবে পাওয়া যায়। সেখানে সুভাষ চৌধুরী মশাই  দেবব্রতর গানে উচ্চারণ নিয়ে সশ্লেষ সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, দেবব্রতর ‘আকাশ ভওরা’ উচ্চারণ নিয়ে তিনি গায়ককে প্রশ্ন করায় গায়ক উত্তর দেন, ‘করসি, করসি’। আমরা যদি সাক্ষাৎকারটি শুনি, লক্ষ করব, সত্যজিৎ বলছেন, ‘তাও মানে ওখানে একটু বিলিতি মেজাজ নাকি? বোধহয়।’ এই ‘বোধহয়’ শব্দটি  সত্যজিৎ উচ্চারণ করছেন সন্ধিৎসার স্বরে। কিন্তু প্রশ্নকর্তা সেটি এড়িয়ে চলে যাচ্ছেন সুচিত্রা মিত্রের  উচ্চারণের প্রশংসায়। তার আগে তিনি বলছেন, ‘সবচেয়ে মজা দেখুন, দেবব্রত বিশ্বাসের যে-রেকর্ডটা সবচেয়ে পপুলার হল, সেটাই ডিফেক্টিভ উচ্চারণ।’ এখানে প্রশ্নকর্তা ‘আকাশভরা সূর্য-তারা’ রেকর্ডটি  কথা বলছেন। উচ্চারণনিষ্ঠ সুচিত্রা মিত্রও যে তাঁর জনপ্রিয়তম গান ‘কৃষ্ণকলি’-র সারেগামা প্রকাশিত রেকর্ডে ‘মেয়ে’কে ‘মেইয়ে’ উচ্চারণ করেন এবং তাতেও যে অন্তত এই গানের সিদ্ধিতে তিনি অনতিক্রম্য থেকে যান, এই সত্য আমরা, রবীন্দ্রসংগীতের সাধারণ অথচ মুগ্ধ শ্রোতারা ভুলে যাই না কখনও। পূর্ণ গায়নসক্ষম দেবব্রত, জনপ্ৰিয়তার তুঙ্গে থাকাকালীন রেকর্ডের পরিসর থেকে নিজেকে চিরকালের জন্য সরিয়ে নেবার পরও   থেকেছেন নিন্দার লক্ষ্যটি  হয়ে, ঠিক যেমন থেকেছেন নাটমঞ্চ থেকে স্বেচ্ছানির্বাসিত শম্ভু মিত্র। মনে হয় নিজেকে ‘ব্রাত্যজন’ হিসেবে ঘোষণা করা জর্জ বিশ্বাস আজও হয়তো এইসব নিন্দামন্দের জবাবে আটপৌরে পরিচ্ছদে অলক্ষ্যে বসে গাইছেন: ‘দাও না ছুটি, ধর ত্রুটি,   নিই নে কানে/ মন ভেসে যায় গানে গানে/… কেন   তোমরা আমায় ডাকো,   আমার মন না মানে/ পাই নে সময় গানে গানে।…’