সুভাষচন্দ্র বসুর পরলোকগমন: জাপ নিউজ এজেন্সির সংবাদ
সিঙ্গাপুর হইতে টোকিওর পথে বিমান দুর্ঘটনা
জাপ হাসপাতালে জীবনদীপ নির্ব্বাণ
২৪ আগস্ট, ১৯৪৫। তৎকালীন অন্যতম প্রধান বাংলা সংবাদপত্র ‘যুগান্তর’-এর প্রথম পাতার শিরোনাম। মাত্র আগেরদিন, অর্থাৎ ২৩ তারিখই গোটা বিশ্ব জেনেছে বিমান দুর্ঘটনার কাহিনি। জেনেছে, ১৮ আগস্ট তাইহোকু থেকে মাঞ্চুরিয়া যাওয়ার পথে, তাইহোকু বিমানবন্দরেই ঘটে সেই দুর্ঘটনা ও প্রয়াত হন নেতাজি। এ-খবরের সত্যতা কতটুকু, তা নিয়ে পরবর্তী দশকগুলিতে বারবার তর্ক উঠেছে বাংলা তথা ভারতে। অধিকাংশ বাঙালি কোনওদিনই বিশ্বাস করতে পারেননি বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর বিষয়টি। আর, তথাকথিত বিমান দুর্ঘটনা ও ভারতের স্বাধীনতার মধ্যবর্তী সময়ে, বাঙালির কাছে তো বটেই, অবশিষ্ট ভারতবাসীর কাছেও নেতাজি ও তাঁর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (আইএনএ) থেকেছে আবেগ ও আলোচনার অন্যতম শীর্ষে।
সদ্য-স্বাধীন দেশেও প্রাসঙ্গিকতা হারাননি সুভাষ। বরং, তাঁকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা ও উদ্যোগ। ১৯৪৮-এ, ২৩ জানুয়ারি দিনটিকে প্রায় জাতীয় উৎসবের পর্যায়ে নিয়ে গেল বাঙালি। আজকের গতানুগতিক দিনপালনের যুগে কল্পনা করাও মুশকিল, কী আবেগ জড়িয়ে ছিল সেকালে। ওদিনই সুভাষকে কেন্দ্র করে মুক্তি পেল দু’টি চলচ্চিত্র। সে-কাহিনি কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও, স্বাধীনতা ও দেশভাগের টানাপোড়েনে বিহ্বল বাঙালি বিভিন্নভাবে ফিরে পেতে চাইছিল সুভাষকে। না, সশরীরে ফেরেননি তিনি। তবে বিনোদনের বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর উপস্থিতি ছিল অনতিক্রম্য। চলচ্চিত্র তো বটেই, পাশাপাশি কখনও থিয়েটারের আকারে, কখনও গ্রামাফোন রেকর্ডে সুভাষের ভাষণ প্রকাশের মাধ্যমে, কখনও আবার আইএনএ-র সংগীত প্রকাশের সূত্রে। স্বাধীনতার পর জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম-কেন্দ্রিক যে বিনোদনমাধ্যমগুলি পল্লবিত হচ্ছিল বাংলা ও বাকি দেশে, তারই অংশ সুভাষকেন্দ্রিক এই উদ্যোগগুলি। একইসঙ্গে, জাতির আবেগকে ব্যবহার করে ব্যবসায় মুনাফার লক্ষ্যও যে ছিল, তা অনুমেয়।

আরও পড়ুন: মহাভারতকে নৃতত্ত্বের চোখে দেখেছিলেন ইরাবতী কার্বে! লিখছেন সম্প্রীতি চক্রবর্তী…
বিশ শতকের রেঙ্গুনের এক প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী বি সি মেহতা। সুভাষচন্দ্র রেঙ্গুনে পৌঁছনোর পর, আইএনএ-কে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেন তিনি। ১৯৪৪-’৪৫-এ জাপানিদের সহায়তায় আইএনএ বার্মায় কিছু প্রাথমিক সাফল্য পেলেও, পরে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এদিকে, মতপার্থক্য সত্ত্বেও, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও আইএনএ-র ভেতরে প্রচ্ছন্ন যোগাযোগ ছিলই। রেঙ্গুন ছেড়ে পশ্চাদপসরণের আগে, আইএনএ-র প্রচার বিভাগের উদ্যোগে আজাদ হিন্দ ফৌজের ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মিত হয়। লক্ষ্য ছিল কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে তা পাঠিয়ে জনমত ও সমর্থন পোক্ত করা। জাপানিদের সহায়তায় নির্মিত সেই তথ্যচিত্রের নাম দেওয়া হয় ‘চলো দিল্লি’। সুভাষের অস্থায়ী স্বাধীন ভারত সরকারের ‘জাতীয় চলচ্চিত্র’-র আখ্যাও পেয়েছিল সেটি। আইএনএ-র মুখপত্র ‘আজাদ হিন্দ’-এর একটি সংখ্যায় (২৩ অক্টোবর ১৯৪৪) দেখা যায় এর উল্লেখ— ‘The screening of the national film— Chalo Delhi— which was preceded by a number of Nippon newsreels was viewed with undiminished interest and the various movements of Netaji sent the crowd into hysterical uproars.’
তথ্যচিত্রটি কংগ্রেসের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পান বি সি মেহতা। ব্রিটিশ গোয়েন্দা-বিভাগের চোখে ধুলো দিয়ে, ফিল্ম ক্যানগুলি রেঙ্গুন থেকে বম্বেতে নিয়ে এসে, তুলে দেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের হাতে। প্যাটেল সেই ক্যানগুলি দিল্লিতে নিয়ে আসেন ও কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতারা সেই তথ্যচিত্রটি দেখেন। সিদ্ধান্ত হয়, আরও দৃশ্য ও তথ্য সংযুক্ত করে, সেটি সারা ভারতে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে।
কী ছিল আইএনএ-নির্মিত সেই প্রাথমিক তথ্যচিত্রে? আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যরা জঙ্গলে ট্রেনিং নিচ্ছেন, রানি ঝাঁসি রেজিমেন্টের ক্রিয়াকলাপ, রেঙ্গুন ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন নেতৃত্বের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের আলাপচারিতা, নেতাজির বিভিন্ন বার্তা ও সৈন্যদের উদ্দীপিত করা ইত্যাদির ফুটেজ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ‘দ্য ইন্ডিয়ান মোশন পিকচার প্রোডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন’-এর সহায়তায়, বল্লভভাই প্যাটেলের পুনঃপ্রযোজনায় (প্রাথমিক প্রযোজক হিসেবে বিজ্ঞাপনে নাম ছিল প্রভিনশিয়াল আজাদ হিন্দ গভর্নমেন্ট-এর) নির্মিত হয় সুভাষের জীবনকেন্দ্রিক একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্র। তাতে যেমন ভারতে গৃহীত বিভিন্ন ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছিল, সেইসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় আইএনএ-র ধারণ করা বিভিন্ন দৃশ্য। ক্যামেরাবন্দি করা হয় নতুন দৃশ্যাবলিও। তৎকালীন চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক সাময়িকপত্র ‘রূপমঞ্চ’-র কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৫৪ সংখ্যায় এই খবর মেলে— “সম্প্রতি ভারতের শিক্ষামূলক খণ্ডচিত্র নির্মাতা ‘দি টপিক্যাল ফিল্মস অব ইণ্ডিয়া’ মণিপুরে গমন করে আজাদ হিন্দ ফৌজের বহু স্মৃতিচিহ্ন ও মণিপুরের বিখ্যাত নৃত্যকলার চিত্র গ্রহণ করে এনেছেন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ বুকের রক্ত দিয়ে একদিন ইম্ফলের রণাঙ্গনে যে-বীরত্বের নিদর্শন রেখে গেছেন, এই চিত্রে তার পরিচয় মিলবে।” অবশেষে, ওই বছরেরই শেষে সম্পূর্ণ হয় তথ্যচিত্রটি। নাম— ‘নেতাজী সুভাষ’। পরিচালক ছোটুভাই দেশাই, ভাষা হিন্দি।
১৯৪৭-এ নির্মিত হয়ে গেলেও, সাধারণ মানুষ সেটি দেখার সুযোগ পান ১৯৪৮-এর ২৩ জানুয়ারি থেকে। তারও আগে, জানুয়ারির গোড়ায় কলকাতার বীণা প্রেক্ষাগৃহে সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের জন্য একটি স্পেশাল স্ক্রিনিং-এর ব্যবস্থা করা হয়। অমৃতবাজার পত্রিকার মতে, এটি ছিল ‘the first true Indian documentary of its type in full length’. একইসঙ্গে এ-ও জানায় তারা, ‘The film may be technically poor at times, but its historic values must be traced elsewhere.’ নেতাজি ও আইএনএ-র বিভিন্ন দৃশ্যের পাশাপাশি, শেষাংশে ছিল মেজর জেনারেল শাহনওয়াজ খানের বক্তব্যও। লালকেল্লায় আইএনএ-র ট্রায়ালের স্মৃতিচারণ করেন তিনি। ‘বসুমতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদটি (৪ জানুয়ারি, ১৯৪৮) তুলে ধরলে, তথ্যচিত্র সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা জন্মাতে পারে—
“সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল প্রযোজিত ‘নেতাজী সুভাষ’ গত শুক্রবার ‘বীণা’ চিত্রগৃহে নিমন্ত্রিত অতিথি ও সাংবাদিকেদের নিকট প্রদর্শিত হয়েছে। হরিপুরা ও ত্রিপুরা কংগ্রেসের দৃশ্য থেকে ছবিটি আরম্ভ হয়েছে। এই ছবির মধ্যে কোনও ঘটনা অতিরঞ্জিত বা বিকৃত না করে কর্তৃপক্ষ সুবিবেচনার কাজ করেছেন। যাঁরা সুদূর প্রাচ্যে নেতাজীর কার্যকলাপ স্বপ্নেও কখনও দেখবেন ভাবেননি, আশা করি এই ছবি তাঁদের কতকটা ঔৎসুক্য মেটাতে পারবে। নেতাজীর কুখ্যাত আন্দামান জেল পরিদর্শন, টোকিও কনফারেন্সে নেতাজীর যোগদান, ভারতীয় সৈন্যদের ইম্ফল রণাঙ্গনে জীবন-মরণ যুদ্ধ ও নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজের শাসনভার গ্রহণ যখন ছবিতে আমরা দেখি, আমাদের মন একই সঙ্গে আনন্দ ও বিষাদে ভরে ওঠে। নেতাজী যখন ঘোষণা করলেন— ‘তুম্ মুঝকো খুন দেও, হাম তুমকো আজাদী দুঙ্গা’ সেই সময় সমবেত দর্শকদের চিত্ত যেন শিউরে ওঠে। আমাদের দেশে এই জাতীয় Documentary ছবি অতি বিরল। আশা করি, প্রত্যেক বাঙালী এই ছবিখানি দেখে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করবেন।”



২৩ জানুয়ারি কলকাতার একাধিক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় তথ্যচিত্রটি। সেকালের সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনী বিবরণে লেখা—
“দেশজননীর বিদ্রোহী পুত্র— ‘নেতাজী’র জার্ম্মানী, জাপান, চীন, আন্দামান, সিঙ্গাপুর, ইম্ফল প্রভৃতি স্থানে জন্মভূমির মুক্তিসংগ্রামের বীরত্বব্যঞ্জক বাস্তবচিত্র।”
প্রথম দিন বিশেষ প্রদর্শনী হয় লাইটহাউস ও বসুশ্রী প্রেক্ষাগৃহে। উপস্থিত ছিলেন আইএনএ-র মেজর জেনারেল শাহনওয়াজ খান ও কলকাতার মেয়র সুধীরচন্দ্র রায়চৌধুরী। পূর্বোক্ত দু’টি প্রেক্ষাগৃহ ছাড়াও রূপবাণী, প্যারাডাইজ, দীপক, ভবানী, অজন্তা-সহ ১২টি প্রেক্ষাগৃহে প্রত্যহ একাধিক শো-এর ব্যবস্থা করা হয়। এমনকী, রূপবাণী-র কর্তৃপক্ষ অন্য চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী স্থগিত রেখে, এক সপ্তাহ শুধু ‘নেতাজী সুভাষ’ দেখানোরই সিদ্ধান্ত নেন। অন্যদিকে প্রযোজকরা সিদ্ধান্ত নেন যে, প্রথম সপ্তাহের প্রথম ও শেষ প্রদর্শনীর টিকিট বিক্রি থেকে সংগৃহীত সমস্ত অর্থ আইএনএ-র শহিদদের দুঃস্থ পরিবারকে দান করা হবে।
একটি কাহিনিচিত্রও মুক্তি পায় ওই একই তারিখে— ১৯৪৮ সালের ২৩ জানুয়ারি। নাম— “সোলজার’স ড্রিম” ওরফে ‘সিপাহী কা সপনা’। ভাষা, হিন্দি। তবে চলচ্চিত্র হিসেবে মুক্তি পেলেও, এর শুরুর ইতিহাস খানিক ভিন্ন। স্বাধীনতার পর, ‘আইএনএ অর্কেস্ট্রা অ্যান্ড ড্রামাটিক পার্টি’ পশ্চিমবঙ্গের মঞ্চে একটি গীতিনাট্য উপস্থাপন করে। নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন রাম সিং ঠাকুর। তিনি ছাড়াও আইএনএ-র একাধিক সদস্য অংশ নেন সেই গীতিনাট্যে। প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনী হয় কলকাতার ‘রঙমহল’ থিয়েটারে, ১৪ নভেম্বর ১৯৪৭ তারিখে। পরে, দর্শকদের অনুরোধে আরও দু-দিন মঞ্চস্থ হয় ‘সিপাহী কা সপনা’। ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় (১৬ নভেম্বর ১৯৪৭) এর সংক্ষিপ্ত বিবরণী প্রকাশ পায়—
“গত শুক্রবার, ১৪ই রঙমহলে আই এন এ অর্কেষ্টা এণ্ড ড্রামাটিক পার্টির ‘সৈনিকের স্বপ্ন’ অপূর্ব্ব সাফল্যের সহিত অভিনীত হয়েছে। অভিনয় দেখতে দেখতে শুধু এই কথাই বারংবার মনে হয় যে, এ শুধু সৈনিকের স্বপ্ন নয়, সারা ভারতবাসীর স্বপ্ন এই ছিল একদিন। সেই স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করবার জন্য যে সমস্ত ভারতবাসী ক্ষুধায়, তৃষ্ণায়, রোগে, যন্ত্রণায় হাসিমুখে মৃত্যুর পথের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন এবং ভারতের বহু শতাব্দীব্যাপী পরাধীনতার নাগপাশ মোচনের জন্য মৃত্যুর কাছে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, এতে অভিনয় করছেন তাঁরাই।
আজ ভারতের বন্ধন মোচন হয়েছে কিন্তু এই শৃঙ্খল ছিন্ন করতে যে জনগণের নেতা উন্মুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে মৃত্যুর পথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, সেই নেতারীর সাধনার রূপ প্রতিফলিত হয়েছে এই নাটকে।…”
কলকাতার রঙ্গমঞ্চে সাফল্যের পর, ‘সিপাহী কা সপনা’-কে চলচ্চিত্রে রূপায়ণের উদ্যোগ নেন প্রযোজকদ্বয় ভি ডি স্বামী ও সুশীল মজুমদার। পরিচালনায় এ কে চ্যাটার্জি ও ননী মজুমদার। ফিল্ম ট্রেডারস অব ইন্ডিয়া-র ব্যানারে মুক্তি পায় চলচ্চিত্রটি। বিজ্ঞাপনী বয়ানে লেখা ছিল— ‘আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম নিজস্ব ছবি’। সেইসঙ্গে বিবরণ— ‘নেতাজীর নিজস্ব আজাদ হিন্দ সৈনিকের রক্তের আখরে লেখা জীবন-মরণের আলেখ্য!’ মূল ভাষা হিন্দি হলেও, প্রচারের স্বার্থে বাংলায় ‘সৈনিকের স্বপ্ন’ ও ইংরাজিতে “সোলজার’স ড্রিম” হিসেবেও বিজ্ঞাপিত হয়েছিল। বুকলেট থেকে এর কাহিনি সম্পর্কে আভাস পাওয়া যায়। নেতাজির ‘দিল্লি চলো’ আহ্বান, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আইএনএ-র মরণপণ লড়াই, ইম্ফলে তেরঙ্গা ওড়ানো ইত্যাদির পর, বার্মা আর ভারতের মধ্যে একটি সেতুর দূরত্ব। সেই সেতু জয় করতে গিয়ে, শত্রুপক্ষের বোমা ও গুলিবর্ষণের মুখোমুখি হওয়া। ‘আক্রমণ… মৃত্যু না-আসা পর্যন্ত লড়াই চালাও, স্বাধীনতার জন্য’— ধ্বনি ওঠে সৈনিকদের মুখে। ঈশ্বর সিং সহ বহু সৈনিক রণাঙ্গনেই শহিদ হন। রানা নামের এক সৈনিক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, কিন্তু সেখান থেকেও দেশকে স্বাধীনতার স্বপ্ন ছাড়তে পারেননি তিনি। তারপর?
বাকিটুকু রহস্য রাখা হয়েছে বুকলেটে। তবে এ থেকেও কাহিনির গতি সম্পর্কে অনেকটা ধারণা পাওয়া যায়। সংগীত পরিচালক ক্যাপ্টেন রাম সিং ঠাকুর, সংগীত রূপায়ণে আইএনএ অর্কেস্ট্রা। ‘সুভাষজি সুভাষজি’, ‘হাম দিল্লি দিল্লি জায়েঙ্গে’, ‘কদম কদম বাড়ায়ে যা’, ‘শুভ সুখ চৈন কি বরখা বরষে’-সহ মোট আটটি গান ছিল এই চলচ্চিত্রে। পূর্ণ, মিনার্ভা, আলোছায়া, নিউ এম্পায়ার-সহ মোট ১২টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়, ২৩ জানুয়ারি তারিখে। শেষাবধি বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করেনি ছবিটি। ফলে, অচিরেই তলিয়ে যায় স্মৃতির অতলে।
সাময়িক পত্রিকা ‘রূপমঞ্চ’-তে (সপ্তম বর্ষ নবম সংখ্যা, ১৩৫৪) আলোচ্য দুটি চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত ছোট্ট সমালোচনা প্রকাশ পায়—
“নেতাজী সুভাষ ও সিপাহী কা স্বপ্ন
কলকাতায় নেতাজী জন্মদিবসে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে নেতাজী সুভাষচন্দ্র সম্পর্কীয় দু’খানি চিত্র মুক্তিলাভ করেছে। প্রথমখানি প্রযোজনা করেছেন শ্রীযুক্ত বল্লভভাই প্যাটেল। আজাদ হিন্দ সরকার গৃহীত চিত্রের সঙ্গে ত্রিপুরী কংগ্রেস-এর পর থেকে নেতাজীর বিভিন্ন কার্যকলাপ এই চিত্রের সঙ্গে সংযোজিত হ’য়েছে। দ্বিতীয় চিত্রখানি নির্মিত হ’য়েছে কলকাতায়। আই, এন, এ, অর্কেষ্ট্রা এণ্ড ড্রাম্যাটিক পার্টির সদস্যরা এই চিত্রে অংশ গ্রহণ করেছেন। ভারতের বাইরে নেতাজী ও আজাদ হিন্দ সরকারের বিভিন্ন প্রচেষ্টাই এই চিত্রে সংযোজিত হ’য়েছে। এই শেষোক্ত চিত্রখানি প্রযোজনা করেছেন শ্রীযুক্ত ভি, ডি, স্বামী ও সুশীল মজুমদার। আমরা এই উভয় চিত্রের প্রযোজক, পরিচালক পরিবেশক, প্রদর্শক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। নেতাজীর জন্মদিনে দর্শকসাধারণকে নেতাজীর কীর্তিকলাপ চিত্রের মারফত দেখিয়ে তাঁরা আমাদের কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। আশা করি ভবিষ্যতে আমাদের চিত্র জগতের কর্তৃপক্ষ এমনি ভাবে জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সৈনিকদের জীবনী ও আদর্শ চিত্র মারফত জাতির সামনে তুলে ধরে নিজেদের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার পরিচয় দিতে পিছু হটবেন না।”
সদ্য-স্বাধীন দেশে নেতাজির জন্মদিবসকে কেন্দ্র করে মুক্তি পাওয়া এই দু’টি চলচ্চিত্রই ছিল মুখ্য। তবে এ-ছাড়াও আরও দু’টি চলচ্চিত্রের হদিশ মেলে। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির প্রথম সপ্তাহেই অরোরা ফিল্মস প্রযোজিত ও প্রযোজিত ‘জয়তু নেতাজী’ নামের একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয় বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে। তবে এটি স্বতন্ত্রভাবে মুক্তি পায়নি তখনও, বরং পূর্বনির্ধারিত চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংযোজন হিসেবে দেখানো হয়। নেতাজির বিভিন্ন খণ্ডদৃশ্য দেখানো হয় এতে। প্রায় কাছাকাছি সময়েই, কালীমাতা ফিল্মস নেতাজির ভাষণ-সমৃদ্ধ একটি ছোট্ট ফিল্ম ‘মুক্তির অভিযান’ নির্মাণ করে। তবে সে-দু’টি পূর্ণ ও স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র ছিল না, বরং খণ্ডচিত্র বলাই শ্রেয়। কয়েকমাস বাদে, ১৯৪৮-এর ২৩ জানুয়ারি সন্ধেবেলা ‘জয়তু নেতাজী’ ও ‘মুক্তির অভিযান’ একত্রে দেখানো হয় কলকাতার শ্রী সিনেমায়। ওই একই প্রেক্ষাগৃহে কলকাতার মেয়রের প্রযোজনায় অভিনীত হয় নাটক ’২৩-শে জানুয়ারী’, অভিনয় করেন ক্যাপ্টেন রাম সিং ঠাকুর। সামগ্রিক আয়োজনে প্রাপ্ত অর্থ আইএনএ-র শহিদদের পরিবারের সাহায্যার্থে ব্যয় করা হয়। ওই একই তারিখে হিন্দুস্থান রেকর্ডস প্রকাশ করে একটি গান— ‘কদম কদম বাড়ায়ে যা’; সংগীত পরিচালনায় পঙ্কজকুমার মল্লিক। সমবেত কণ্ঠে গানটি গেয়েছিলেন নেতাজিরই ভ্রাতুষ্পুত্র ও ভ্রাতুষ্পুত্রীরা।
অন্যদিকে, ১৯৪৭-এর সেপ্টেম্বরের একটি বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, অরণি পিকচার্স লিমিটেড নামের এক প্রযোজনা সংস্থা নেতাজি ও আইএনএ-কেন্দ্রিক একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চলেছে—
“দিল্লী চলো, দিল্লী চলো, দিল্লী চলো, দিল্লীর পথ মুক্তির পথ’—এই মুক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত হ’য়ে অগাণিত লাঞ্ছিত, পরাধীন হিন্দু-মুসলমান-শিখের মিলিত আজাদ হিন্দ বাহিনী, সারা ভারতের তরুণের পূজারী নেতাজীর আহ্বানে কেমন ক’রে রক্তস্নাত কোহিমা-ইম্ফল রণাঙ্গন অতিক্রম ক’রে এগিয়ে এসেছিল দিল্লীর পথে—জানেন কি? সেই ঐতিহাসিক কাহিনী রূপালী পর্দায় বিভিন্ন চিত্রগৃহে রূপায়িত করতে যাচ্ছেন— অরণি পিকচার্স লিমিটেড।”
তবে এই চলচ্চিত্রটি শেষাবধি নির্মিত হয়েছিল কি না, তার হদিশ মেলে না।
বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু বাঙালি বিশ্বাস করতে পারেনি। ভাঙা বাংলা ও স্বাধীনতা-পরবর্তী নানা সংকটে জাতি যখন জর্জরিত, নেতাজিকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল তারা। সশরীরে না-ফিরলেও, বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখে, কণ্ঠ শুনে ও তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজের বীরত্বগাথার স্বাদ নিয়ে এক অর্থে সুভাষকেই কাছে পেয়েছিল বাঙালি। সঙ্গত দিয়েছিল একাধিক থিয়েটার ও গ্রামাফোন রেকর্ডও। সব মিলিয়ে, স্বাধীনতাপ্রাপ্তির কয়েক মাসের মধ্যেই বিনোদনমাধ্যমে সুভাষচন্দ্র বসু হয়ে উঠেছিলেন অন্যতম মুখ্য চরিত্র। পরবর্তীতে তাঁকে ও আইএনএ-কে কেন্দ্র করে আরও অনেক চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও, প্রথম বছরের এই উদ্যোগগুলি ইতিহাসের পাতার এককোণে থেকেই গেছে। তবে বিশেষ আলোচিত হয়নি ভবিষ্যতে, বলাই বাহুল্য। ‘নেতাজী সুভাষ’ তথ্যচিত্র ও ‘সিপাহী কা সপনা’ কাহিনিচিত্রের বিভিন্ন দৃশ্য ও গান আমরা পরবর্তীতে বিক্ষিপ্তভাবে পেয়েছি সমাজমাধ্যমের সূত্রে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখার উপায় নেই কোনও। সম্ভবত হারিয়ে গেছে চিরতরে। যে-জাতি সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে আজও প্রবল স্পর্শকাতর, চলচ্চিত্রদু’টি সংরক্ষণের উদ্যোগটুকু সেকালে নিতেই পারত। এ-আফসোস মেটার নয়।



