অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত। অবসান হল বাংলা ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের। বিষ্ণুপুর ঘরানার অন্যতম প্রতিভূ ছিলেন। পিতা সংগীতাচার্য সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বিষ্ণুপুর ঘরানার বিশিষ্ট সাধক, তাঁর কাছেই অমিয়রঞ্জনের সংগীত-শিক্ষায় হাতেখড়ি।
অমিয়রঞ্জন বলতেন, সুর তাঁর পেশা নয়, জীবনযাপনের ভাষা। উনিই একমাত্র মানুষ ছিলেন, যিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি একই দক্ষতায় গান করে গেছেন। ঐতিহ্যকে আধুনিক সময়ের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন এত বছরের সাধনায়। ঈশ্বরের অশেষ আশীর্বাদ না থাকলে এ-হেন প্রতিভা সম্ভব নয়, এমন প্রতিভা অল্পই আসে। না-হলে শতবর্ষ ছুঁয়েও কেউ অমন ‘দম’, ‘তান’, ‘লয়’ ‘মাত্রা’, ‘দানা’ ধরে রেখে গাইতে পারেন! পাশাপাশি, নিজের সাংগীতিক মেধা-মনন দিয়ে কত প্রজন্ম-প্রজন্মান্তর ধরে শিষ্য তৈরি করেছেন, তা সংখ্যায় গোনা যায় না। ওঁর শিষ্য-শিষ্যাদের মধ্যে কারও বয়স পঁচাত্তর, কারও আশি। সহজেই অনুময়, প্রায় শতবর্ষব্যাপী জীবৎকালে নিজে মহীরুহ হয়ে আরও কত সংগীত-বীজ লালন করেছিলেন। ভারতের অন্যতম প্রবীণ গায়ক চলে গেলেন।
আরও পড়ুন: মহাকাব্যিক প্রতিরোধের শিল্প রচনা করেছিলেন তীজন বাঈ! লিখছেন শ্রুতি ঘোষ…
ওঁর অগুনতি শিষ্য-শিষ্যা আজ স্ব-নামে, স্ব-মেধায় ওঁর ঘরানার উত্তরাধিকার বহন করে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে। প্রায় ছ’প্রজন্ম ছাত্রছাত্রী বহন করছে ওঁর উত্তরাধিকার, পুত্র শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় তো রয়েছেনই। ওঁর চলে যাওয়া ভারতের উচ্চাঙ্গ সংগীতের জগতে অপূরণীয় ক্ষতি। আমি ব্যক্তিগতভাবে ওঁকে খুব শ্রদ্ধা করতাম। ওঁর জন্মদিনে আমাকে বাজাতে বলেছিলেন, আমি বাজিয়েছিলাম— সে আমার কাছে আজীবনের প্রাপ্তি। আমার সংস্থা, ‘শ্রীরঞ্জিনী ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট’-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘স্বরসম্রাট ফেস্টিভ্যাল’-এ, আমরা ওঁকে ‘জীবনকৃতি পুরস্কার’ ও ‘স্বরসম্রাট’ সম্মানে, ভূষিত করেছিলাম। এ-সম্মান ওঁকে দিতে পেরে নিজদেরই সৌভাগ্যবান মনে হয়।
সারাজীবন অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ জীবনযাপন করছেন, ওঁকে কখনও দেখিনি ভুল সময়ে খাওয়াদাওয়া বা অনুষ্ঠান করছেন। উচ্চাঙ্গ সংগীতকে আত্মস্থ করার জন্য যে-অনুশাসন লাগে, নিজের জীবনকেও সেই অনুশাসনে বেঁধে এনেছিলেন। তারই ফলস্বরূপ উনি সারাজীবন সংগীত-সাধনায় মগ্ন থাকতে পেরেছেন।
ওঁর অগুনতি শিষ্য-শিষ্যা আজ স্ব-নামে, স্ব-মেধায় ওঁর ঘরানার উত্তরাধিকার বহন করে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে। প্রায় ছ’প্রজন্ম ছাত্রছাত্রী বহন করছে ওঁর উত্তরাধিকার, পুত্র শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় তো রয়েছেনই। ওঁর চলে যাওয়া ভারতের উচ্চাঙ্গ সংগীতের জগতে অপূরণীয় ক্ষতি।
বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন, যেগুলির মধ্যে অন্যতম— ‘সঙ্গীতের শিল্পদর্শন’, ‘স্মৃতির আলোয় আমার জীবন ও গান’, ‘সঙ্গীতের সৌন্দর্য চিন্তা’। এই বইগুলির বিষয়ভাবনা প্রমাণ করে, তাঁর সংগীতিক মননের ‘গবেষক’ সত্তাকে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ‘নন্দনতত্ত্ব’ নিয়ের কাজও তাঁকে স্ব-ক্ষেত্রে মর্যাদা দিয়েছে। তিনি যেন, ‘একজীবন বহু স্বরের সমাহার’। রবীন্দ্রভারতীতে অধ্যাপনা করেছেন বহু বছর। রবীন্দ্রভারতীর বহু শিষ্য-শিষ্যা আছেন, যাঁরা এখনও বলেন ওঁর কথা। শুধুই সংগীতচর্চা নয়, সংগীতের সারস্বত চর্চাতেও ওঁর অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে রইল।

আমরা এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম, আর হয়তো ওঁকে বেশি দিন ধরে রাখতে পারব না আমরা, সে-আশঙ্কাই সত্যি হল। কাকতালীয় হলেও, গুরুপূর্ণিমার দিনই গেলেন উনি। সংগীতের গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা আর প্রণতি ছাড়া কী-ই-বা জানাতে পারি…




