ছোট্ট শিশুটিকে কোলে বসিয়ে প্রকাণ্ডদেহী বাবার তাকে নিজের ফেলে আসা যোদ্ধা জীবনের বীরত্বের গল্প শোনান। ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে পাহাড়ি জঙ্গলের সুঁড়িপথ ধরে বেড়াতে-বেড়াতে শোনান পুরাণের গল্প। শুনতে-শুনতে শিশুটির মনে হয়, তার বাবা বুঝি সেই পুরাণের পাতা থেকে উঠে আসা বীরপুরুষদেরই একজন। ঘুণাক্ষরেও সেই শিশু টের পায়নি প্রতি মুহূর্তে করাল কর্কটরোগের যন্ত্রণাময় কামড় কীভাবে ক্ষয় করে চলেছে তার পিতাকে। সে জানতে পারেনি যে, তার মহাবীর বাবার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁকে তিলে-তিলে মৃত্যুমুখে এগিয়ে দিচ্ছিলেন সম্রাট নেপোলিয়ন স্বয়ং। সে-সব কথা সে জেনেছিল বড় হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে। নেপোলিয়নের প্রতি এক বিতৃষ্ণা তৈরি হয়েছিল তার। ১৮০৬ সালের ফেব্রুয়ারির এক হাড়কাঁপানো রাতে সাড়ে তিন বছরের শিশুটি যখন এক প্রতিবেশীর বাড়িতে অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন, মাঝরাতে দরজায় কে যেন প্রবল ধাক্কা দিল। ঘুম ভেঙে কেঁদে শিশু বলে উঠল, ‘বিদায়, বাবা! বিদায়!’ দরজা খুলে দেখা গেল কেউ নেই। আশ্চর্য! ঠিক সেই সময়ই ভিলের্স-কত্রেৎস গ্রামের অন্য এক বাড়িতে ফ্রান্সের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সেনাপতি, দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রাক্তন জেনারেল টমাস-আলেকজান্দার দুমার উপন্যাসোপম জীবনের শেষে দাঁড়ি পড়ল।
আরও পড়ুন: বিশ্বসাহিত্যে নারী যৌনতার নীরব ভাষ্য কেমন? লিখছেন রবীনা মিত্র…
অনেক পরে যখন নামজাদা লেখক হয়েসেই শিশু রূপকথার মতো সোনায় মোড়া জীবন কাটাচ্ছে, যখন গোটা ফ্রান্স তার লেখা পড়ার জন্য আর তার লেখা নাটক দেখার জন্য মুখিয়ে থাকে, স্বয়ং রাজা লুই ফিলিপ যখনতাঁকে নিজের অন্যতম বন্ধু মনে করেন, তখনও সেই সাড়ে তিন বছর বয়সের সেই রাতের স্মৃতি মাঝরাতে তাঁর ঘুম ভাঙিয়ে দিত। ফরাসী সাহিত্যের রাজপুত্র আলেকজান্দার দুমা (২৪ জুলাই ১৮০২-৫ ডিসেম্বর ১৮৭০) মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে মরজগৎ ছেড়ে যাওয়ার আগে তাঁর বাবার আত্মা শেষবারের মতো দেখা করতে এসেছিল নিজের শিশুপুত্রের সঙ্গে। গল্পের কাঠামোয় ইতিহাসেরপ্রাণপ্রতিষ্ঠা করার শিল্পীআলেকজান্দার দুমার কাছে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ততাঁর বাবাই ছিলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বীর। এ কথাও তিনি স্বীকার করেছেন যে গল্পের নেশা, বীরত্বের কাহিনির নেশা, অ্যাডভেঞ্চারের নেশা, এবং সর্বোপরি জীবনকে জীবনের মতো বেঁচে নেওয়ার শিক্ষা ওই শিশুকালেই তাঁর বাবার থেকে তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত হতে শুরু করেছিল। পরে তিনি অনেক ভেবে দেখেছিলেন যে তাঁর বাবার কাছে পুরাণ ও ইতিহাসের শোনার নেশা আর তাঁর মৃত্যুদিনের ওই ‘অলৌকিক ঘটনা’ আসলে তাঁর গল্প বলার ভিত তৈরি করে দিয়েছিল।তাঁর বাবার ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি আর বীরত্বের রোমান্টিকআখ্যান যে কতখানি ফ্রান্সের জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তা দুমা বুঝেছিলেন বয়স বাড়লে। লেখকজীবনে প্রবেশ করে তিনিই যে ইতিহাস, রোমান্স আর মানুষের জীবনের মধ্যে এক রামধনুসেতু তৈরি করবেন, আর সেই জন্যই বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে থাকবেন, এ আর আশ্চর্য কী?
এমন বহু মানুষকে দেখা যাবে যাঁদের তথাকথিত ইতিহাস পড়তে ঘোরতর অনীহা, কিন্তু ইতিহাসের আশ্রয় নিয়ে গড়ে তোলা নাটক-গল্প-উপন্যাস পড়তে পড়তে বুঁদ হয়ে যান। স্যার ওয়াল্টার স্কট,লেভ তলস্তয়, ভিক্তর উ্যগো, উমবের্তো একোর মতো দিকপালসাহিত্যিক থেকেবিপুল জনপ্রিয় রাফায়েল সাবাটিনি, ফিলিপা গ্রেগরি, বার্নার্ড কর্নওয়েল—ইতিহাসকে আশ্রয় করে কালিতে কলম ডুবিয়েছেন আরো অনেকেই।আমাদের বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ আর শরদিন্দুই বা বাদ যান কেন?রাজারাজড়ার নাম, সন-তারিখ আর ঘটনার ঘনঘটা মিলে ইতিহাসের বই যে নিরেট দেওয়াল তুলে দেয়, সাহিত্যিকের সার্থক কলম তার মধ্যে জীবনরসের স্রোত বইয়ে দেওয়ার মতো একটি ফাটল তৈরি করতে পারে। আলেকজান্দার দুমার সিদ্ধি এইখানেই।তিনি ওই ফাটল দিয়ে জীবনীরসের ষাঁড়াষাঁড়ি বান ডাকিয়ে দিলেন যেন। ইতিহাসকে করে তুললেন জ্যান্ত, ফ্রান্সের মানুষের বুকের ধন।বহুবর্ণময় দুমার চরিত্র, বহু বিচিত্র ঘটনার সমাহার তাঁর জীবনে, বিপুল তাঁর সাহিত্যকর্ম। তাঁর জীবনের কণামাত্রের সঙ্গে পরিচিতিওবুঝিয়ে দেয় যে, যে কোনো অবস্থাতে জীবনের উপচে পড়া পানপাত্র থেকে আনন্দরস পান করাই বুঝি ছিল তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য। ছোটবেলা থেকেই পুরাণের প্রতি তাঁর টান ছিল। ছিল অদম্য দেশপ্রেম, নেপোলিয়নের প্রতি ঘৃণা আর ফরাসী রাজতন্ত্রের প্রতি অকুণ্ঠ ভক্তি। জেনারেল দুমার ভাগ্যবিপর্যয়ের পিছনে নেপোলিয়নই দায়ী ছিলেন, তাঁর সাক্ষাতে জেনারেল দুমার নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করা নিষেধ করে দিয়েছিলেন, এমন কী জেনারেল দুমার বিধবা স্ত্রী তাঁর দ্বারস্থ হলে তিনি তাঁর সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে চাননি—এ সব কথা জানার পর আলেক্সান্দারের পক্ষে এমনটাই স্বাভাবিক ছিল।এই মানুষটাকেই কেন সাহিত্যের দেবী বেছে নিলেন ‘ইতিহাসের গপ্পো’ লেখার জন্য?
অথচ আলেকজান্দার দুমা যে প্রথম থেকেই ইতিহাসের প্রেমে পড়েছিলেন তা কিন্তু নয়।তাঁর জীবনে লেখক হিসেবে প্রথম খ্যাতি আসে রাজা তৃতীয় হেনরিকে নিয়ে ঐতিহাসিক নাটক লিখেই ১৮২৯ সালে। সেই যে রঙ্গমঞ্চে ইতিহাসের পথে তাঁর জয়ধ্বজা ওড়া শুরু হল, আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।এর আগে কি ফ্রান্সের ইতিহাস লেখা হয়নি? জুল মিশেলে দুমার সমকালেই বিখ্যাত ‘ফ্রান্সের ইতিহাস’ লিখছেন, কিন্তু সে তো নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাসই। ফরাসী ইতিহাস নিয়ে গল্প লিখে ফ্রান্সের জনসাধারণের কাছে তখনও পৌঁছে যাওয়া যায়নি। ইতিহাসের পণ্ডিত প্রস্পার মেরিমে অনেক ইতিহাসচর্চার পাশাপাশি লিখেছিলেন বেশ কিছু ইতিহাসগন্ধী উপন্যাসিকা। কিন্তু তাতে ইতিহাসের ওজন বড়ই বেশি আর চরিত্র কিংবা কল্পনার ওজন সেই অনুপাতে এমনই হাল্কা যে সেগুলো পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। সেই ইতিহাসগন্ধী মানুষের কাহিনি কই যাকে ইংরেজিতে সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন স্যার ওয়াল্টার স্কট? সেই ইতিহাস কই যে ইতিহাস মানুষকে ভয় দেখাবে না, বোর করবে না। বরং যা সমসাময়িক পাঠকের চোখে রঙিন করে তুলবে চলে যাওয়া সময়কে। ইতিহাসের পাতায় মিলিয়ে যেতে থাকা নামগুলোর মধ্যে লাল রক্ত বইয়ে দেবে। তলোয়ারের ঝনঝনানির শব্দে সে রক্ত পাঠকের বুকের মধ্যে নাচবে। সে বুঝবে যে সে সেই যুগেও বেঁচে ছিল এই মানুষগুলোর মধ্যে দিয়ে।
দুমার সঙ্গে একই বছরে জন্ম যাঁর সেই ভিক্তর উ্যগো হয়তো পারতেন লিখতে এমন কাহিনি, কিন্তু তিনি ইতিহাসের নয়, মানুষের আত্মার গভীরে ডুব দেওয়ার সাধনায় মেতেছেন।উ্যগো, বালজাক যখন সমকালীন মানুষের উপাখ্যান লিখছেন, দুমাও কিন্তু তখন ফিরে যাচ্ছেন সেই মানুষেরই কাছে—কিন্তু অতীতে। বালজাকেরই মতো পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা তাঁরও ভরসা। ১৮৩২-এদুমা যখন নাট্যকার হিসেবে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, তখনইতিহাসকে ভালোভাবে পড়ার স্পৃহা জাগল তাঁর মনে। এর আগে তিনি স্থানীয় ইতিহাসেই শুধু আগ্রহী ছিলেন, আর পড়তেন ঐতিহাসিক নাটক লেখার জন্য যেটুকু বিষয়বস্তুকেন্দ্রিক ইতিহাস পড়তে হয় সেটুকুই। আসলে বাণিজ্যিক রঙ্গমঞ্চের ফরমায়েশি ঐতিহাসিক নাটক লেখা ততদিনে তাঁর ভিতরে গুমরোতে থাকা লেখকসত্তার ক্ষুধা আর মেটাতে পারছিল না। ইতিহাস আর নাটকীয়তা মিশিয়েতাঁর কলম যে অন্য দিকে বাঁক নিতে চাইছে তা তিনি বুঝতে পারছিলেন। তিনি নিজেই লিখছেন, ‘সেই সময় উপন্যাস আর নাটকের মাঝামাঝি, অর্থাৎ যার ঝোঁক ইতিহাসের দিকে আর চলন নাটকের,এমন এক ধরনের সাহিত্য খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।একটানা বলে যাওয়া কাহিনি আর সংলাপ দুইই থাকত তাতে। ছোট-ছোট এই আখ্যানগুলিকে বলা হত ‘ঐতিহাসিক দৃশ্য’। নাটক তো আমি আগেই লিখতাম। এখনআমার যখন গল্প লেখার শখ হল তখন বার্গান্ডির ডিউকদের ইতিহাসখানা টেনে নিয়ে বসলাম। সেই ইতিহাসকে কেটেকুটে তার থেকে এক-একটা গল্প বার করে এনে সংলাপ জুড়ে এই ঢঙেই লিখতে শুরু করলাম একের পর এক কাহিনি।’

এই হল তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার সূত্রপাত। কালে কালে তাঁর প্রবল জীবনীশক্তি আর মানুষকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখার আতশকাচী চোখ তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসকে বদলে দেবে ঐতিহাসিক রোমান্সে। তখনতাঁর কলমের ডগায় রাজারাজড়ার চরিত্রের চেয়েও বড় হয়ে উঠবে মানুষগুলির বুকের ধুকপুকুনি আর মহাকালের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পদক্ষেপগুলি।সপ্তদশ শতাব্দীর যুদ্ধদীর্ণ ফ্রান্স (‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’) থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর ফ্রান্সের স্বর্ণযুগ (‘দ্য ম্যান ইন দি আয়রন মাস্ক’) হয়ে ট্রাফালগারের যুদ্ধে(দ্য নাইট অফ সেন্ট আরমিন’) নেপোলিয়ন-সূর্যের অস্ত যাওয়া পর্যন্ত তাঁর কলম স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছে। কখনও তিনি পাঠককে নিয়ে গিয়ে ফেলেছেন নেদারল্যান্ডসের টিউলিপ ফুলের বাগিচায় (‘দ্য ব্ল্যাক টিউলিপ’), কখনও বা নেপলসের নীল সমুদ্রতীরে(‘সানফেলিস’)। এমন কী ইতিহাসের পথ ধরে ফ্যান্টাসির জগতেও পা রেখেছেন তিনি, লিখেছেন ভ্যাম্পায়ার (‘দ্য পেল লেডি’) আর ওয়্যারউলফের (‘দ্য উলফ লিডার’) কাহিনিও।
কিন্তু শুধু জীবনের প্রতি অদম্য ভালোবাসা আর ইতিহাসের প্রতি প্রগাঢ় প্রেমই তো দুমার জাদুর সবটুকু নয়, তার সঙ্গে রয়েছে হাস্যরস। দুমা যেন এক বিরাট বালক—পৃথিবীতে নিত্য ঘটে চলা কাণ্ডকারখানা দেখে হাসি আর চেপে রাখতে পারছেন না। ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’-এ তাই যত মারামারি, যত মেলোড্রামা, যতই দুঃখ, ততই কমেডির চোরাস্রোত বয়ে যায়। বস্তুত এই বিপুল জীবনীশক্তি আর কৌতুকরসে জারিয়ে আমুদে ঢঙে গল্প বলাই দুমার নিজস্ব অভিজ্ঞান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সেই স্টাইলও তাঁর নিতান্ত অনায়াসসাধ্য ছিল না, ছিল রীতিমতো সাধনার ধন। ১৮৩২ নাগাদ সুইৎজারল্যান্ডে বেড়াতে যাওয়ার সময়ের কথা মনে করে(অর্থাৎ তখনও তাঁর বিখ্যাত ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাসগুলি লিখতেশুরু করেননি তিনি) দুমা লিখছেন, ‘নাটক আর ঐতিহাসিক টুকরো লেখা লিখতে লিখতে একটা উপকার হয়েছিল।লাগসই সংলাপ রচনা আর কাহিনি বিন্যাস—এইদুটো বড় গুণ আমি আয়ত্ত করে ফেলেছিলাম। মিথ্যা বিনয় করব না, এগুলো আমি আজও অন্যদের চেয়ে বেশি ভালো পারি। কিন্তু তখনও আরো দুটো একই রকম গুরুত্বপূর্ণ গুণ আমার লেখায় আমদানী করা বাকি ছিল। সেগুলো হল—স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণোচ্ছলতা আরহাস্যরস।এগুলো ছাড়া আমি নিজের স্টাইল খুঁজে পাচ্ছিলাম না।’
কথাটা খুব সত্যি, কারণ এই দুটি গুণই ছিল দুমার একেবারে নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।দুমার প্রাণোচ্ছলতা আর রসবোধের ফুল্কিযে তাঁর কথায় কেমন ঝরে পড়ততা তাঁর পরিচিতেরা আর চিঠিপত্রেরা জানায়। দু-একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। তুমুল প্রেমপর্বের পর অভিনেত্রী ইদা ফেরিয়ারকে বিয়ে করেন তিনি। বছরকয়েকের মধ্যেই সম্পর্কের আঁচ নিভে যায় কারণ দুজনেরই জীবনে রঙের বাড়াবাড়ি। দুজনেই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন একাধিক বার। দুজনের বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর ভদ্রমহিলা ফ্লোরেন্সে চলে যান। তারপর দুমা ফ্লোরেন্সের ফরাসী রাজদূতকে লেখেন, ‘মাদাম দুমার প্রতি আপনার আগে যে কৃপা ছিল এখনও তাই যেন বজায় থাকে। চাইলে আরও বেশিও কৃপা করতে পারেন এখন। আমাদের পরস্পরকে ধন্যবাদ দেওয়ার একটা ব্যাপার আছে। পরে কখনও আপনার অফিসে গিয়ে সে পর্বটা সেরে আসব।’
প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক বালজাক আর দুমা নাকি একে অপরকে দেখতে পারতেন না। এদিকে দুমার তখন নাট্যকার হিসেবে বৃহস্পতি তুঙ্গে। একদিন এক ডিনারে দুজন মুখোমুখি। যথারীতি বাক্যালাপ নেই দুজনের। একেবারে শেষে কী এক কথায় বালজাক বললেন, ‘নাটক কে লেখে? যেদিন আমার লেখার ক্ষমতা ফুরিয়ে আসবে সেদিন নাটক লিখব আমি।’ দুমা একগাল হেসে বললেন, ‘আজই বাড়ি ফিরে শুরু করে দিন না।’
একবার অন্য এক নাট্যকারের নাটক চলছে। দুমা পাশে বসে থাকা নাট্যকারকে ডেকে হাসতে হাসতে দেখালেন, এক দর্শক ঘুমোচ্ছেন। অন্য নাট্যকারটি মুখে কিছু না বললেও চটে গেলেন। পরের দিন সন্ধ্যায় দুমারই নাটক চলছে। সেখানেও একই দৃশ্য। ওই ভদ্রলোকই ঘুমোচ্ছেন। এবার অন্য নাট্যকারটি বুক ফুলিয়ে দুমাকে তাই দেখিয়ে বললেন, ‘দেখেছ? তোমার নাটক দেখেও ঘুম পায়।’ দুমা একঝলক দৃশ্যটা দেখে নির্বিকার গলায় বললেন, ‘ধুর! ও তো কালকের লোকটাই। এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। কালকের নাটকের রেশ কাটেনি ওর।’
আসলে দুমা ছিলেন জাত রোমান্টিক। পৃথিবীর সমস্ত রং-রসকে জীবনের সবটুকু দিয়ে শুষে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। আপাদমস্তক রোমান্টিক না হলে কেউ ‘দ্য কাউন্ট অফ মন্টি ক্রিস্টো’-র মতো মহাকাব্যিক এক উপন্যাস লিখতে পারে?
ঘোরতর সাধারণ বস্তুকে বিস্ময়ের চোখে দেখা, কল্পনার পাখা মেলে দিয়ে বিস্ময়কর অ্যাডভেঞ্চারের চাদর বুনে দেওয়া, চরিত্র আর ঘটনার ঘনঘটা দিয়ে রহস্যের খাসমহল তৈরি করা—এ সবইইয়োরোপিয়ান রোমান্টিক সাহিত্যের অন্যতম মার্কা মারা চিহ্ন (আরো অনেক আছে)।যে সময়ে ‘মন্টি ক্রিস্টো’ লেখা সে সময়ে রোমান্টিক সাহিত্যের স্বর্ণসূর্য পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে—‘মন্টি ক্রিস্টো’-য় সেই রোমান্টিক অস্তগোধূলির আভা খেলে যায়। ‘মন্টি ক্রিস্টো’-য় তাই উঠে আসে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ হওয়ার গল্প; সমকালীন প্যারিসিয়ান সমাজের পাশাপাশি সদ্য অতীত হওয়া নেপোলিয়নের আমলের ছবি; এডমন্ড দান্তেসের নানান অভাবনীয় অ্যাডভেঞ্চারের গল্প, যার মধ্যে প্রধানতম অবশ্যই জেল থেকে পালিয়ে ডাকাতদলে ভিড়ে গুপ্তধন উদ্ধার করার কাহিনী; আরব্য রজনীর মতো রূপকথার দেশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্ণনা—আরো কত কী। বিশেষ করে কাউন্টের চরিত্রের রহস্যময়তা পশ্চিম ইয়োরোপের সংস্কৃতির কাছে এতটাই ‘এক্সোটিক’, এতটাই আলাদা হয়ে উঠেছিল যে তার প্রভাব হয়ে দাঁড়ায় সুদূরপ্রসারী।
দুমাকে নিয়ে কিছু বলতে গেলে ‘দ্য কাউন্ট অফ মন্টি ক্রিস্টো’ নিয়ে কয়েকটা কথা বেশি বলতেই হবে। ১৮৪২ সালে ভূমধ্যসাগরে নৌবিহার করতে গিয়ে প্রবল ঝড়ের মধ্যে দুমা আবিষ্কার করেন এক ছোট্ট ন্যাড়া পাথুরে দ্বীপ—নাম তার ‘মন্টি ক্রিস্টো’। দ্বীপে নামা নিষেধ, তাই নৌকা নিয়ে দ্বীপ প্রদক্ষিণ করেই ক্ষান্ত দিতে হল। কী যে মায়া বিস্তার করল সেই দ্বীপ, দুমা দেশে ফিরে এসেও তাকে ভুলতে পারলেন না। মনে পড়ল কিছুদিন আগে পুলিস আর্কাইভের গল্পে এক রোমাঞ্চকর ঘটনা পড়েছিলেন। দুর্ধর্ষ অপরাধীটি সেখানে ছদ্মবেশে ফিরে এসে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিচ্ছিল অন্যায়কারীদেরই বন্ধু সেজে। ‘মন্টি ক্রিস্টো’ নামখানি আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুমা ফেঁদে ফেললেন গল্প। তারপর বন্ধু ও সহলেখক অগুস্ত ম্যাকের পরামর্শে নিতান্ত নিমরাজি হয়েই যেন জুড়ে দিলেন মন্টি ক্রিস্টোর রহস্যময় কাউন্টের জীবনের পূর্ব-ইতিহাসের কাহিনি। জন্ম নিল মার্সেইয়ের সমুদ্রদুর্গ শ্যাটোড্’ইফের কারাগার থেকে এডমন্ড দান্তেসের পালানোর রোমহর্ষক আখ্যান।প্রতিশোধের এই চিরপুরাতন-চিরনবীন গল্প এতটাই শাশ্বত যে আজও দেশবিদেশের বহু ভাষায় তা অনূদিত হয়ে চলেছে, বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন মাধ্যমে হয়ে চলেছে এর অ্যাডাপ্টেশন।



‘দ্য কাউন্ট অফ মন্টি ক্রিস্টো’ উপন্যাসকে অনেকগুলো স্তরে পড়া যায়, ভাবা যায়, বিচার করা যায়। এ এডমন্ড দান্তেস নামের কোনো একজন বিশেষ মানুষের গল্প নয়। পৃথিবীর প্রতি দেশে প্রতি কালে প্রতিটা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের গল্প, এমন কী হেরে যাওয়া মানুষেরও গল্প। এ উপন্যাস ডুবতে থাকা মানুষকে আশ্বাস দেয় যে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়, মৃত্যুর পরপার থেকেও ফিরে এসে পৃথিবী জয় করা যায়—দরকার শুধু নিজের উপর এতটুকু বিশ্বাস। এ উপন্যাস দেখায় যে অন্যায়কারীর মুক্তি নেই—ঈশ্বরের ন্যায়বিচারের হাত এড়িয়ে পালানো সহজ নয়; শেখায় যে ঈশ্বরের হয়ে এই পৃথিবীতে ন্যায়বিচার নিয়ে আসতে পারে একমাত্র মানুষই—প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত যে মানুষ। আবার একই সঙ্গে এই উপন্যাস এও শেখায় যে অর্থ আর ক্ষমতা কেমন করে মানুষকে অমানুষে পরিণত করতে পারে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, যে প্রতিশোধস্পৃহা ডুবন্ত মানুষকে জলে ভাসিয়ে রাখতে পারে সেই একই প্রতিশোধস্পৃহা কেমন করে মানুষকে দানবে রূপান্তরিত করতে পারে। চরিত্র হিসেবেই হোক বা উপন্যাস হিসেবে, ‘দ্য কাউন্ট অফ মন্টি ক্রিস্টো’ বিশ্বসাহিত্যের একটি অন্যতম বড় ধাঁধা।
দুমার নিজের সঙ্গেও এই অচিনলোকের মানুষ মন্টি ক্রিস্টোর যথেষ্ট মিল ছিল। দুমাও কাউন্টের মতোই ঘুরেছিলেন বহু দেশ, ছিলেন প্রবল প্রেমিক পুরুষ। কাউন্টের মতো তাঁরও ছিল হাশিশের নেশা। এমন কী ১৮৪৭ সালে পাঁচ লক্ষ ফ্রাঁ খরচ করে এক চোখ-ধাঁধানো প্রাসাদ বানিয়েদুমা তার নাম দেন ‘শ্যাটো ডি মন্টি ক্রিস্টো’—তাঁর নিজের কথায় ‘মর্ত্যের স্বর্গ’।সেই প্রাসাদে ছিল চল্লিশজনের বেশি ভৃত্য, একাধিক প্রেয়সী ও প্রায় পনেরো রকমের পোষা পশুপাখি। তার মধ্যে একটি পোষা শকুনও ছিল যে থাকত একটা বালতির মধ্যে। দুমা তার নাম রেখেছিলেন ‘ডায়োজিনিস’, কারণ প্রবাদপ্রতিম গ্রিক দার্শনিক ডায়োজিনিসও থাকতেন একটি প্রকাণ্ড কলসীর ভিতর। কাউন্টেরই মতো মেজাজী দুমা ভবিষ্যতের কথা না ভেবে টাকাপয়সা স্রেফ ওড়াতেন।মন্টি ক্রিস্টো প্রাসাদে নিত্য লেগে থাকত পার্টি-বলডান্স আর মোচ্ছব, ফোয়ারা ছুটত শ্যাম্পেনের।তেমনই আবার বন্ধুবান্ধবদের বিপদে তো প্রাণ লড়িয়ে দিতেনই, সম্পূর্ণ অচেনা সাহায্যপ্রার্থীদেরও পাশে দাঁড়াতেন। একবার তাঁর হাতের কাছে নগদ টাকা ছিল না বলে নিজের কোমর থেকে সোনা-বাঁধানো পিস্তলজোড়া খুলে দিয়ে দিয়েছিলেন এক দুঃস্থ মানুষকে। লোকে তাঁর এই স্বভাবের সুযোগও নিত। একবার একজন মন্টি ক্রিস্টো প্রাসাদে এসে হাজির হয় হাতেএকটা গোখরো সাপের ছাল নিয়ে। জেনারেল টমাস-আলেকজান্দার দুমা মিশরে যুদ্ধ করতে গিয়ে নাকি এই সাপটি মেরেছিলেন। পরম পিতৃভক্ত রোমান্টিক লেখক সে কথার সত্যাসত্য বিচার করার ধার দিয়েও না গিয়ে বহু স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে ছালটি কিনে তো নেনই, উপরন্তু লোকটিকে প্রচুর উপহার সমেত ফেরার রাহাখরচ পর্যন্ত দিয়ে দেন।
এই সব খামখেয়ালীপনার পথ ধরেই একসময় লক্ষ্মী বিদায় নিতে শুরু করেন।এর মধ্যে দুমানিজেই ‘দ্য মাস্কেটিয়ার’ নামে এক পত্রিকা চালু করেছেন। এ ছিল তাঁর নিজেরই পায়ে কুড়ুল মারা, কারণ তিনি আর যাই হোক বিষয়ী ব্যবসাদার ছিলেন না কোনোদিনই।একসময় নিজেই হয়ে পড়েন কপর্দকশূন্য, পাশ থেকে সরে যায় মোসাহেবের দল, বাড়ি ভরে উঠতে থাকে পাওনাদারে। সে কাহিনি হয়ে উঠতে পারে আর এক উপন্যাসের বিষয়বস্তু।অনেক দিন আগেই মন্টি ক্রিস্টো প্রাসাদ বিক্রি করে দিয়ে ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তবু সেখানেও তাঁকে ঘিরে থাকতেন সাহিত্য আর নাট্যজগতের তাবড় ব্যক্তিত্বেরা আর ভক্তকুল—এবং পাওনাদারের দলও। ১৮৬৮ থেকে তাঁর শরীর-মন ভাঙতে শুরু করে। দেখা দিতে শুরু করে শোথ আর হৃদরোগের লক্ষণ, স্মৃতিশক্তিও মাঝেমাঝেই বিশ্বাসঘাতকতা করতে থাকে। লেখালিখি হয়ে যায় প্রায় বন্ধ। তাঁর নিকট বন্ধুবান্ধবরাও ইতোমধ্যেই পাড়ি দিতে শুরু করেন পরপারে।সেই প্রবল জীবনীশক্তির তেল যে ফুরিয়ে আসছিল, জোর করে যৌবনের উদ্দামতাকে যে আর ধরে রাখা যাবে না,এ কথা দুমা বুঝতে পারছিলেন। স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য নানান জায়গায় ঘুরলেন তিনি। তাঁর ছেলে আলেকজান্দার দুমা জুনিয়র (ফরাসীতে ‘ফিল্স’) উত্তর ফ্রান্সের সমুদ্রতীরে এক বাড়ি করেছিলেন।১৮৭০-এর সেপ্টেম্বরে স্থবির, রোগজর্জর দুমা শেষবারের মতো প্যারিস ছেড়ে চলে গেলেন সেখানেই। প্যারিসে তাঁর বই পড়ার লোক রইল প্রচুর, কিন্তু তাঁর কথা মনে রাখার মতো লোকপড়ে রইল গুটিকয়েক মাত্র। শেষের দিনগুলো তাঁর নিজের ফেলে আসা সোনালী সময়ের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।এককালে ধুলো মুঠোকে সোনা মুঠো করা মানী লেখকেরজাগতিক সম্পদ বলতে তখন একটি মাত্র স্বর্ণমুদ্রা।ছেলেকে তিনি একদিন বিষণ্ণ রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘যেদিন প্যারিসে প্রথম পা রেখেছিলাম সেদিন আমার পকেটে ছিল একটা মাত্র স্বর্ণমুদ্রা।এই দ্যাখ, আজও সেটা আছে, খরচ করে ফেলিনি। তাও যে লোকে আমাকে কেন খামখেয়ালী, অপব্যয়ী বলে তা জানি না।’ শেষের দিনগুলোয় তাঁকেতাড়া করে বেড়াত এক দুঃস্বপ্ন—তাঁর নিজেরই নাম লেখা এক প্রকাণ্ড পিরামিডের তলায় চাপা পড়ে যাচ্ছেন তিনি। বারবার ছেলেকে জিজ্ঞাসা করতেন, ‘আমার কথা লোকে মনে রাখবে তো? আমাকে ভুলে যাবে না তো ওরা?’ ছেলেরআশ্বাসপেয়ে বৃদ্ধ বাবা শিশুর মতো ঘুমিয়ে পড়তেন। ৫ ডিসেম্বরেররাত্রে সেই রকমই ঘুমের মাঝে হানা দিল সন্ন্যাসরোগ। ইতিহাস আর জীবনের লেখক নিজেই ইতিহাসের গায়ে মিশে গেলেন।

আলেক্সান্দার দুমার প্রকাণ্ড দেহের মতোই জীবনের ব্যাপ্তিও সুবিশাল আর চোখধাঁধানো। যেমন ধূমকেতুর মতো তাঁর উত্থান, তেমনই আশ্চর্য তাঁর ফুরিয়ে যাওয়াও। ‘লা প্রেস’ কাগজকে তিনি লিখেছিলেন, ‘আলেকজান্দার দুমা আপনাদের জন্য নয়, লেখে নিজের জন্য।কাজেই আপনাদের ফরমায়েশমতো আমি তো লিখব না। পাঠকদের কথা আরটানবেন না, তাদের আমি আপনাদের চেয়ে ঢের ভালোবুঝি।’
এই হচ্ছে আলেকজান্দার দুমার স্পিরিট! যতদিন বেঁচেছেন, একেবারে নিজের শর্তে রঙিন হয়ে বেঁচেছেন—যার টুকরোটাকরা ভাগ আজও পানতাঁর পাঠকেরা।বিতর্ক কোনোদিন তাঁর পিছু ছাড়েনি। তাঁর অপব্যয়, খামখেয়াল, শৌখীনতা, নারীসঙ্গ, সহলেখক দিয়ে লেখানো, জনপ্রিয়তা, শাসকঘনিষ্ঠ হয়ে থাকা—সব কিছুর দিকেই আঙুল উঠেছে। পিতৃসূত্রে পাওয়া বাদামী গাত্রবর্ণও চিরশত্রু হয়ে থেকেছে তাঁর। তাঁর শত্রুরা তাঁকে বর্ণসংকর ‘মুলাটো’ বলে বারবার তাঁর সাফল্যকে খর্ব করতে চেয়েছে। খোদ বালজাক একবার এক সম্পাদকের সঙ্গে তুলকালাম ঝগড়া করে বলেছিলেন, ‘কী! আলেকজান্দার দুমাকে আপনি উপন্যাসের জন্য যে টাকা দেন আমাকেও তাই দেবেন? ওই মুলাটোটা আর আমি এক হলাম? আমার পাণ্ডুলিপি ফেরত দিয়ে দিন।’ তবুও আলেকজান্দার দুমার জয়রথ থামানো যায়নি। অমন বিপুল যাঁর রচনাসম্ভার তাঁকে আটকায় কোন মানুষের সাধ্য?
এই হচ্ছে আলেকজান্দার দুমার স্পিরিট! যতদিন বেঁচেছেন, একেবারে নিজের শর্তে রঙিন হয়ে বেঁচেছেন—যার টুকরোটাকরা ভাগ আজও পানতাঁর পাঠকেরা। বিতর্ক কোনোদিন তাঁর পিছু ছাড়েনি। তাঁর অপব্যয়, খামখেয়াল, শৌখীনতা, নারীসঙ্গ, সহলেখক দিয়ে লেখানো, জনপ্রিয়তা, শাসকঘনিষ্ঠ হয়ে থাকা—সব কিছুর দিকেই আঙুল উঠেছে। পিতৃসূত্রে পাওয়া বাদামী গাত্রবর্ণও চিরশত্রু হয়ে থেকেছে তাঁর।
তিনি ইতিহাসের হৃদ্স্পন্দনের মতোই মানুষের নাড়ীও বুঝতেন।একবার শেষ মুহূর্তে এক নাটকের দুটি দৃশ্য তিনি পাল্টে নতুন করে লিখলেন, কারণ দুজন আলাদা দর্শকের সেই দুটি দৃশ্য পছন্দ হয়নি। তাঁদের একজন এক রাজপুরুষ, আর অন্যজন নাট্যমঞ্চের এক সামান্য দারোয়ান। কিন্তু লেখক দুমার কাছে দর্শক হিসেবে দুজনেই সমান। এই লেখককে যে গণদেবতারূপী মহাকাল স্বয়ং আশীর্বাদ করবেন তাতে আর আশ্চর্য কী? শুধু গণদেবতা তো নন, প্যারিসের চিন্তকমহলের দিকপালেরাও ছিলেন তাঁর গুণগ্রাহী। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলেকে লেখা চিঠিতে স্বয়ং ভিক্তর উ্যগো যে ভাষায় দীর্ঘকালের বন্ধুর চলে যাওয়ায় শোকজ্ঞাপন করেছেন তা পড়লে মন ভারী হয়ে আসে।স্বনামধন্য বর্ষীয়ান দার্শনিক আলফোঁস লামার্তিনের দুমাকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘প্রিয় দুমা, তুমি তোমার নতুন কাগজ সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চেয়েছ।লৌকিক বা মানুষ-সম্বন্ধীয় যা কিছু সম্পর্কে আমি মতামত দিতে পারি, কিন্তু মির্যাক্ল সম্পর্কে নয়। তুমি তো নেহাৎ মানুষ নও, তুমি অতিমানব।পৃথিবী অবিরাম ঘুরে চলেছে বটে, কিন্তু তুমি যা করছ তা তার চেয়েওবড় আশ্চর্য। তুমি ক্রমাগত পৃথিবীকেইমুগ্ধ করে চলেছ। তুমি বেঁচে থাকো—মানে, লিখে যাও! অনবরত লিখে যাও। পড়ার জন্য আমি মুখিয়ে রইলাম।’
কথাগুলি লামার্তিনের কলম থেকে নয়, স্বয়ং মহাকালের মুখ দিয়ে বেরোনো সার্টিফিকেট বলেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়। মৃত্যুর পর একশো-পঁচিশ বছর পেরিয়েও আলেকজান্দার দুমা আমাদের ঠিক একই রকম বিস্মিত, মুগ্ধ করে চলেছেন যে।



