‘ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক’ নামে চিন্তাবিদ আবু সয়ীদ আইয়ুবের একটি প্রবন্ধ-সংকলন আছে। ‘আলিবাবা’ নাটক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সেই বইয়ের কথা মনে পড়ল। প্রথমে ‘ব্যক্তিগত’ বিষয়টা বলে নিই। পরেরটা পরে। যে-বাংলা নাটকের আদ্যোপান্ত আমার প্রায় কণ্ঠস্থ, যে-নাটকের প্রত্যেকটি গান আমার প্রায় পুরোটাই চেনা, ঘটনাপরম্পরা গুলে খাওয়া, তার নাম ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ (১৮৬৩-১৯২৭)-এর হাতে তৈরি ‘আলিবাবা’ (১৮৯৭)। এখন এমন একটা বয়স, যখন সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়, দূরেরটা বিলক্ষণ স্পষ্ট, শুধু কাছেরটাই ঝাপসা দেখায়। এ-সময়ে ‘আলিবাবা’ নাটকের কথা ভাবলেই স্মৃতি ছুঁয়ে বয়ে যেতে থাকে বৃষ্টিগন্ধী হাওয়া। আমার ঠাকুর্দা প্রয়াত মণি মজুমদার পাবলিক স্টেজে অভিনয় করতেন, রেডিওতে নাট্যবাচনের শিল্পী, সেনোলা কোম্পানির 78 RPM রেকর্ডে ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’, ‘কর্ণার্জুন’ অথবা ‘আলিবাবা’-র দাপুটে চরিত্র। আমার বাবা-পিসি-পিসেমশাই সকলেই নাটক-পাগল। ফলে, নানাভাবেই ছেলেবেলা জুড়ে
‘আলিবাবা’ নাটক ছিল আমাদের বাড়ির ছোটদের শিরা-ধমনিতে প্রবাহিত রক্তের ঝমঝম আওয়াজের মতো। আমার বড়পিসি এবং এমনকী, ঠাকুমাও ঘুম পাড়াতেন— ‘ভোঁ বনবন সোঁ সনসন ভোঁপপো ভোঁপপো ভোঁ’ দিংবা ‘চাঁদ চকোরে অধরে অধরে পিয়ে সুধা প্রাণভরে’।
ধু-ধু স্মৃতি— ছোটপিসি আর বাবার সঙ্গে দেখতে গেছি তিন ভাইবোন মিলে মধু বসু-সাধনা বসুর ‘আলিবাবা’, হাতিবাগানের কোনও হলে। কাশেমের হত্যাদৃশ্যে চোখ ঢেকে বসে আছি। তখনকার দিনে, মনোরঞ্জনের একমাত্র চালু উপায় ছিল, গল্প বলা আর শোনা। সেই সূত্রে দুপুরে বা রাতে, হাঁ করে শুনতুম ‘আলিবাবা’-র গল্প। পিসিরা তো গান-সহ শোনাতেন। সে এক দুর্দান্ত ব্যাপার! উৎকণ্ঠা, রোমাঞ্চ আর উত্তেজনায় ঠাসা সেইসব দিন মনে জ্যান্ত হয়ে ওঠে। মাঝে-মাঝে গ্রামোফোনে শোনা হত ঠাকুর্দার কণ্ঠ-সমন্বিত সেইসব রেকর্ডগুলি। ঠাকুর্দা এসে বসতেন। দস্যুসর্দারের ভূমিকা ছিল তাঁর। মাঝে-মাঝে তিনি আপনমনেই গুনগুন করতেন, ‘এসে হেসে কাছে এসে/ সোহাগ-বাঁধন বেঁধেছে সে’ অথবা, ‘আয় রে ভাই কাঠ কাটি গে কটাকট’। মঞ্চে বেশ কয়েকবার এই নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছিলেন। ফলে, সংলাপ আগাগোড়া মুখস্থ ছিল।
আরও পড়ুন: ঠাকুরবাড়ির ছায়ায় ঢাকা পড়া স্বর্ণকুমারী দেবী! লিখছেন অপরূপা ঘোষ…
যদিও, বলে রাখা ভাল, ‘আলিবাবা’ নাটকটা আমার কোনওদিন মঞ্চে দেখা হয়নি। কিন্তু, পরবর্তীকালের ‘মর্জিনা আবদাল্লা’ (১৯৭৩/ দীনেন গুপ্ত/ মিঠু মুখার্জি-রবি ঘোষ) দেখেছি হই-হই করে। এমনকী, ১৯৮০ সালের ‘আলিবাবা অউর চল্লিশ চোর’ নামক, বিপুল ব্যয়ে, ইন্দো-সোভিয়েত যৌথ নির্মাণে পরিবেশিত ছবি। ধর্মেন্দ্র, জিনাত আমন অভিনীত এবং রুশী কুশীলবদের একত্রে নিয়ে নির্মিত সে-ছবিতে গল্প অবশ্য বেশ খানিকটা আলাদা। যদিও কাঠামো বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ। এরও পরে বাংলা অভিনয় জগতের বাঘা-বাঘা দিকপালদের নিয়ে তৈরি অডিও ক্যাসেট ছিল আমার সঙ্গী। সেখানে, আলিবাবা সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, মর্জিনা হিসেবে অপর্ণা সেন, ডাকাত সর্দার হিসেবে শেখর চট্টোপাধ্যায়, আবদাল্লা হিসেবে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় আর গান গেয়েছিলেন, মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। কোনও শ্রুতিনাটকের ক্যাসেটের জন্য এত বড় শিল্পী-সমম্বয় আমি অন্য কোনও ক্ষেত্রে দেখিনি। আটের দশকের গোড়ার দিকে এই রেকর্ডিং হয়েছিল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সে-যুগের শিল্পী-শ্রোতা এবং নাট্যমোদীদের তরকে এই পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিল ‘আলিবাবা’ নাটকটিকে একটি ট্রিবিউট দেওয়া। এত জমজমাট, মানবিক এবং রোমাঞ্চকর নাটক বাংলা নাটকের ইতিহাসে দুর্লভ। এখনত ইউটিউবে এই নাটকটি রাখা আছে। কেউ চাইলে শুনতে পারেন। তখনও এইচএমভি ছিল।
২
একটা যুগের এই ‘ট্রিবিউট’ থেকেই অন্য দু-একটি প্রসঙ্গ এসে পড়ে। ‘আলিবাবা’ নাটক সূত্রে প্রকৃতপক্ষে প্রায় একটা শতক জুড়ে বাঙালি ‘শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, শহুরে’ জনগোষ্ঠী তাদের সাংস্কৃতিক পছন্দ ব্যক্ত করেছে। এই পরিচয় তথা নাট্যমনোরঞ্জনের বাইরের কিছু আকার-প্রকার আছে, আবার অভ্যন্তরীণ কয়েকটি মাত্রাও বর্তমান। এই নাটকের মধ্য দিয়ে বাঙালি মধ্যবিত্তের গূঢ় ঈপ্সা যেমন ব্যক্ত হল, আবার নাচগানের বহুল ব্যবহারে মঞ্চে জমজমাট ‘স্পেকটাকল’ তৈরিও হল। এ-প্রসঙ্গে, নাটকের গোড়ার গানটির তাৎপর্য গভীর। জানা যাচ্ছে, প্রস্তাবনার এই গানটি লিখেছিলেন স্বয়ং গিরিশচন্দ্র। ‘বাজে কাজে মিনসেকে আর যেতে দেব না/ নিত্যি বনে পাঠিয়ে দেব, পরব কত সোনাদানা/ বনের ভেতর মোহরের বাগান। মোহর ফলেছে থান খান…’— এই যে কপালজোরে গুপ্তধন প্রাপ্তি ও গরিবের হঠাৎ নবাব হয়ে ওঠা, গুপ্ত-সুপ্ত ওমরাহ-আমির হওয়ার বাসনা সত্যি হয়ে ওঠা, এ যেন বিশ শতকের বাঙালির এক জাতিগত ইচ্ছাপূরণ!
প্রসঙ্গত, কারও মনে পড়তে পারে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘পরশপাথর’ (লেখক: পরশুরাম) ছবিটির কথা। মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫৮ সালে। আমি এই দুইয়ের মধ্যে একটা সাদৃশ্য খুঁজে পাই। এক মার খেতে-খেতে কোণঠাসা জাতি, বিশেষত নিম্নবিত্ত, অংশের পূরণ না-হওয়া স্পৃহার বাস্তব, কঠিন দৈনন্দিন, দেশভাগ আর দুর্ভিক্ষ, বড়সাহেবের ধমক আর ক্ষমতার টুঁটি চেপে ধরা, অপমান আর চোখরাঙানির ত্রাস— এইসব সিনেমা-থিয়েটারে এক ধরনের ক্ষণস্থায়ী মুক্তি খুঁজত। অবস্থার পরিবর্তন তারা খুঁজে পেত আলিবাবার নসিবের দৃষ্টান্তে। সেই ইচ্ছেপূরণের কাহিনি ছিল, আলিবাবা আর চল্লিশ চোর। এমনকী ওই কাহিনিতে গরিবের স্বর্ণপ্রাপ্তি কোনও পাপকর্ম থেকে আহরিত নয়, সে হল চোরের তথা লুঠের ধনকে আত্মসাৎ! কোনও বিবেক দংশনও সেখানে নেই। কাহিনি বিন্যস্ত হয়েছে মাত্র তিনটি অঙ্কে। সরল কিন্তু চিত্তাকর্ষক। নানা উত্তেজক উপাদান সেখানে ঢুকেছে। ডাকাত সর্দারের প্রতিশোধস্পৃহা, ফতিমার বোকামি, মর্জিনার চমকপ্রদ বুদ্ধি, কাসেমের ক্রূরতা, জঙ্গলে জাদুগুহা এবং শেষের সব ভালর জয়, নাটকে নানা উপভোগ্য মুহূর্ত তৈরি করেছে। দর্শক একমুহূর্ত একঘেয়েমিতে আক্রান্ত হয় না। তার সঙ্গে আছে ইস্পাহান-কান্দাহার-হিরাটের অনুষঙ্গ— যাতে বাস্তবতা প্রায় রূপকথায় পর্যবসিত।

লক্ষ করা যাবে, বহু দশক জুড়ে ‘আলিবাবা’ নাটক কত না অনুষঙ্গে আমাদের সারস্বত জগতে ফিরে-ফিরে আসে। কখনও পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল সাক্ষাৎকারে গেয়ে দেন, বাবা মোস্তফার বাড়িতে মর্জিনার গান, কখনও শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বইয়ের নাম দেন ‘আলিবাবার গুপ্ত ভাণ্ডার’। আবার অঞ্জন দত্তের গানে ঢুকে পড়ে বালক, যার নাম ‘আলিবাবা’।
৩
ভাববার কথা হল, অপেরাধর্মী এ-নাটকের চোরা সব বার্তা আর তার অভিঘাতের প্রসঙ্গগুলি। এই ধরা যাক, পুরোটাই কিন্তু মুসলমান এক পরিবার-সমাজের গল্প। তারপর এগুলো এক বাঁদির ধারালো বুদ্ধি, গভীর প্রেম, চটকদার ব্যক্তিত্ব এবং উপস্থিত বুদ্ধির গল্প। এমনিতেই বাংলা মঞ্চনাটকে, সে ‘যাত্রা’ থেকে ‘প্রসেনিয়াম’ বা ‘থার্ড থিয়েটার’— নারী কেন্দ্রিক নাটকের সংখ্যা হাতে গোনা এবং প্রান্তিক, সংস্কৃত নাটকের ‘বসন্তসেনা’ আর ‘মাধব-মালঞ্চী কইন্যা’ বেশ ছাঁচ ভাঙা। রবীন্দ্রনাথ, ব্রেখ্ট, মনোজ মিত্র— এমন নামও প্রসঙ্গত মনে পড়তে পারে, তবে তাঁরা সংখ্যালঘু। এ-ধরনের নাট্যরচনায় ‘মর্জিনা’ সেদিক থেকে ব্যতিক্রম। পুরো বিশ শতক মহা উৎসাহে এই মেয়েটিকে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোতে মেনে নিয়েছে, বাঙালি সমাজে এ এক আশ্চর্য! তার একটা কারণ কি সে বাঁদি? নাটকের সংলাপ সূত্রে জানা যায় যে, মনিব কাসেমের হাতে সে নিয়মিত ‘প্রহার’-এ অভ্যস্ত। কাসেম বলেছে— ‘দুশো কোড়া লাগব’ উত্তরে আলি বলেছে— ‘রাগ করো না ভাই! ও স্ত্রীলোক— তায় বালিকা।’ নারী ব্যক্তিত্বময়ী হলেও মনিবের প্রতি তার অচলা ভক্তি। ফলে, এ-ধরনের চরিত্র বাঙালি পুরুষ দর্শকের ‘মনমতো’। ‘বুদ্ধিমতী বাঁদি’-র কদর এ-সমাজে স্থায়ী। বিশেষত সে যদি সুন্দরী এবং কল্পদেশের বাসিন্দা হয়।
৪
তৎসত্ত্বেও এ-নাটকের তুলনা হয় না। লক্ষণীয়, নাটকে সরাসরি কোন দৈব অনুপ্রবেশ বা অলৌকিক হস্তক্ষেপ নেই। দ্বিতীয়ত, এক ধরনের নিয়তিতাড়িত দরিদ্র অথচ সৎ মানুষের কপাল খুলে যাওয়া আছে। সেখানে হয়তো সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের আশীর্বাদ আছে। সেই ইসলাম এবং আল্লাহর প্রতি বাঙালির কোনও উদারতার অভাব ঘটেনি। মুক্ত এক ধর্মদৃষ্টির ফল্গুস্রোত না থাকলে, ‘আলিবাবা’ কিছুতেই এত জনপ্রিয় হতে পারত না। অন্যদিকে এ-কথাও মনে হয়, গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল- সুভাষ থেকে চিত্তরঞ্জন বা যতীন দাস সূর্য সেনদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক ধরনের পরোক্ষ প্রভাব হয়তো এই জাতিগত মনের গভীরে কাজ করেছে। ক্ষীরোদপ্রসাদের নাট্য রচনার অভিমুখও তার বাইরে নয়। তিনি ‘বৃন্দাবনবিলাস’ লেখেন, ‘পদ্মিনী’ লেখেন, ‘নরনারায়ণ’ লেখেন, আবার ‘আলমগীর’ লেখেন, আবার ‘চাঁদবিবি’, ‘আলাদিন’ কিংবা ‘বাদশাজাদী’ লেখেন। এখানেই তাঁর মুক্ত, স্বাধীন, উদার সারস্বত চর্চার মানবিক ‘রসায়ন’। (তিনি সফল রসায়নের অধ্যাপকও ছিলেন।)
ক্ষীরোদপ্রসাদের প্রপৌত্র কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গভীর প্রবন্ধ, ‘ওঁ নমো ভগবতে মহাম্মদায়’ (ফকির লালন শাহের সৃষ্টিতত্ত্বের গান। শব্দার্থ, টীকা, পরিচায়ন, ধ্যানবিন্দু ২০১৭) থেকে জানা যাচ্ছে, ‘স্বদেশপ্রেমী’ এবং ‘তত্ত্বদর্শীপুরুষ’ ক্ষীরোদপ্রসাদ মুর্শিদাবাদের নিমতিতায়, একটি ইসলামি ধর্মসভায় কথা শুরু করেন— ‘ওঁ নমো ভগবতে মহাম্মদায়’ বলে। পরে, শ্রুতি, কোরান, বাইবেল গীতা থেকে তুলে-তুলে ধর্মীয় প্রক্রিয়ার সাদৃশ্য দেখান মুগ্ধ শ্রোতাগণকে। বোঝা যায় ‘আলিবাবা’-র স্রষ্টা কোনও সাধারণ নাট্যকার ছিলেন না। তাঁর এই নাটক শুধু কালজয়ী নয়, এক সম্প্রীতিবাদী নাট্যচর্চার উজ্জ্বল প্রতিনিধি। বিশ শতক জুড়ে বাঙালি জাতিমননকে সে ‘অনুচ্চ’ সংকল্পে স্থিত রেখেছিল। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকটি (শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত) আমার মতে এর অন্যতম উত্তরসূরি।
সেই ইসলাম এবং আল্লাহর প্রতি বাঙালির কোনও উদারতার অভাব ঘটেনি। মুক্ত এক ধর্মদৃষ্টির ফল্গুস্রোত না থাকলে, ‘আলিবাবা’ কিছুতেই এত জনপ্রিয় হতে পারত না। অন্যদিকে এ-কথাও মনে হয়, গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল- সুভাষ থেকে চিত্তরঞ্জন বা যতীন দাস সূর্য সেনদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক ধরনের পরোক্ষ প্রভাব হয়তো এই জাতিগত মনের গভীরে কাজ করেছে।
একইভাবে ভিন্ন একটি ‘বৈপ্লবিক’ প্রসঙ্গ। এই নাটকে শেষপর্যন্ত মনিবের ছেলের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে বাঁদি মর্জিনার। যখন বিয়ে হচ্ছে, তখন হুসেন মোটেই দরিদ্র পরিবারের বুদ্ধি কম বাউন্ডুলে নয়, বরং বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারী। যুবরাজ। আলিবাবা এবং হুসেন কিন্তু মর্জিনার প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা এবং অঙ্গীকারকে ভোলেনি। এক বিশেষ পাঠে, এদের ‘ভাল’ বা ‘হৃদয়বান’ কপালফেরা ‘উচ্চবর্গ’ হিসেবে দেখা চলে। না কি, নিছকই কষ্ট কল্পনা? এখানেও উদারতার ব্যতিক্রম থাকে না।
নাটকের এবং গানের ভাষা নিয়ে দু’কথা না বললেই নয়। সেটি এই নাটকের সব থেকে বড় উদ্ভাবন। এই গানগুলির সুর দিয়েছিলেন, পূর্ণচন্দ্র ঘোষ। নাট্যব্যক্তিত্ব অমরেন্দ্রনাথ দত্তের উদ্যোগে ‘ক্লাসিক থিয়েটার’-এ নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল ১৮৯৭ সালের ২০ নভেম্বর। পশ্চিম এশিয়ার পশ্চাৎপট মনে রেখে, আফগানিস্তান-কান্দাহার অঞ্চল কল্পনা করে, আরব্য রজনীর জাদু-তোরঙ্গ খুলে তিনি বাংলায় এক নতুন নজির তৈরি করলেন। এখানে ইতিহাস নেই, পুরাণ নেই, ধর্ম বা রাজ্য জয় নেই, ঘৃণা নেই— আছে স্নিগ্ধ এক প্রেমের কাহিনি। নানা টানাপোড়েন। মানুষের সততা আর মমত্বের কথা। গানের ভাষায় তাই, হিন্দি-উর্দু-বাংলার সুষম মিশ্রণ। চমৎকার এক মিশ্র ভাষার প্রয়োগ তৈরি হল বাংলায়। ‘ছি ছি এত্তা জঞ্জাল’ তো আজ বাঙালির প্রবাদে পরিণত হয়েছে। এমনকী ‘মর্জিনা-আবদাল্লা’ সিনেমার গানেও ‘আলিবাবা’ নাটকের গানের অনুষঙ্গ বারংবার ঢুকে পড়েছিল। ১৮৯৭ তে নাটক আর ১৯৭৩ সালে সিনেমা! ‘মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝেঁটিয়ে বিদায় কর’ গানের মধ্যে, ‘না না না না মর্জিনা/ তার চেয়ে তুই বল / ছি ছি এত্তা জঞ্জাল!’ সবিতা চৌধুরী-অনুপ ঘোষালের কন্ঠে এই গানটি ইঙ্গিত করে নাটকের দিকে। আবার, নাটকে ব্যবহৃত কাঠুরেদের গানের— ‘জঙ্গলে জঙ্গলে যাইরে/ কাটি কাঠ কাটি কাঠ কাটি কাঠ… ’ পাশাপাশি, আশ্চর্য মসৃণতায় বাংলা শব্দপ্রধান গান—‘ আমার কেমন কেমন করছে কেন মন’ আর আরবি-ফারসি শব্দপ্রধান গান, ‘হামে ছোড়ি দে রে সেঁইয়া/ ছোড়ি দে রে/ মেয় নেহি জানে দুনিয়াদারি’ মিলেমিশে যায়, বাংলা গানের ধারণ ক্ষমতা অনেক দূর বেড়ে যায়।
আমার তো মনে হয়, তৎসম, তদ্ভব ও বাংলা, বিদেশি শব্দের অবিরাম মিলমিশে সুরের আগুন পরবর্তীকালে প্রাণে জ্বলবে এই ধারাতেই, কাজী নজরুল ইসলামের গানে। ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন/ দিল ওহি মেরা ফাস গয়ি… ’ চমৎকার এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সার্থক সূত্রপাত ঘটেছে ক্ষীরোদপ্রসাদের হাতে। সংলাপে অত্যন্ত সাবলীলতায় মিশে গেছে দেশি-বিদেশি অভিব্যক্তি। কোথাও ‘চোরে-গ্রেপ্তারে’ ঠোকাঠুকি লাগেনি। এই তো বহুস্বরিক, বহুশরিকের বহু ভাষা! গানের মধ্যে সংলাপের যে-স্পষ্ট কাঠামো, সে-ও ক্ষীরোদপ্রসাদের অতুল কীর্তি। মর্জিনা-আবদালা কথোপকথন চালায় গানে— ‘আয় বাঁদি তু্ই বেগম হবি/ খোয়াব দেখছি’, উত্তরে মর্জিনা বলে, ‘বেশ হয়েছে আয় তবে তোর ল্যাজটা কেটে দিই…’ ইত্যাদি। গানের শেষ লাইন, ‘বাদশা বেগম ঝমঝমাঝম বাজিয়ে চলেছি।’
৫
কাফ্রি, খোজা আবদালা, আমির-ওমরাহ, নর্তকী, ডাকাতদল, ‘ চিচিংফাঁক’ খড়ির দাগ, তেলের জালায় ডাকাত, লোভী কাসেম হত্যা থেকে নুন না খাওয়া দরবেশবেবেশী দস্যু সরদার, মর্জিনার হাতে তার ক্রূরতার মৃত্যু— সব রোমাঞ্চ-রহস্য ছাপিয়ে শেষপর্যন্ত এই নাটক হয়ে ওঠে— মর্জিনা-হুসেনের প্রেম কাহিনি! সাচ্চা সদাশয় আলিবাবার জিদ আর খুন-লুঠের দস্যুবৃন্দের পরাজয়। ঘৃণার সাম্রাজ্যে এ যেন ভালবাসার পসরা। ‘আলিবাবা’ মঞ্চে-মঞ্চে ফিরে আসুক।
পুনশ্চ: বাঙালি মধ্যবিত্তের একটা সুপ্ত মনস্কামনা হল, বিনা পরিশ্রমে নিয়তির কৃপায় বিপুল ধন-সম্পত্তির মালিক হওয়া। সে খোয়াব আজও আছে, মনে হয় থাকবেও। ফলে এ-নাটকে জনপ্রিয়তা চিরন্তন। তবে মনে রাখা ভাল, ‘যেত্তা রূপেয়া তেত্তা দিগ্দারি!’




