হৃদয়ের চ্যাম্পিয়ন

পৃথিবীর মানচিত্রে কাবো ভার্দেকে খুঁজে পেতে অনেকেরই একটু সময় লাগে। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে অনেকটা দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি আগ্নেয় দ্বীপের দেশ। জনসংখ্যা মাত্র প্রায় পাঁচ লক্ষ। আমাদের বহু শহরের জনসংখ্যাও এর চেয়ে বেশি। কিন্তু এই ছোট্ট দেশটার গল্প কখনও ছোট ছিল না।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ছিল পর্তুগিজ উপনিবেশ। নিজেদের কোনও উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। খরা, দুর্ভিক্ষ, জলের সংকট, সীমিত কৃষি, দারিদ্র্য— এসব নিয়েই বড় হয়েছে দেশটা। এমনও সময় এসেছে, যখন দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জীবিকার সন্ধানে অসংখ্য মানুষ দেশ ছেড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন। আজও কাবো ভার্দের প্রবাসী মানুষের সংখ্যা প্রায় দেশের জনসংখ্যার সমান। অনেক দেশের পরিচয় তাদের অর্থনীতি। অনেক দেশের পরিচয় তাদের সেনাশক্তি। অনেক দেশের পরিচয় তাদের সাম্রাজ্যের ইতিহাস। কাবো ভার্দের পরিচয়?মানুষ। তাদের জেদ। তাদের হাসি। আর কখনও হার না মানার মানসিকতা।

১৯৭৫ সালে স্বাধীনতার পর দেশটি ধীরে-ধীরে এগোতে শুরু করে। আফ্রিকার অন্যতম স্থিতিশীল গণতন্ত্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানব-উন্নয়নের সূচকে অনেক বড় দেশের সঙ্গেও পাল্লা দেয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে, কিন্তু একটি জিনিসের কোনও অভাব ছিল না। স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় ভাষা হয়ে উঠল ফুটবল।

আরও পড়ুন : বন্ধুত্বের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করলেন লুকা মদ্রিচ! লিখছেন অর্পণ গুপ্ত…

কাবো ভার্দের ফুটবল ইতিহাস খুব পুরনো নয়। কোনও বিশাল লিগ নেই। শতবর্ষী ক্লাব সংস্কৃতি নেই। বিশ্বমানের পরিকাঠামোও নেই। বরং তাদের শক্তি এসেছে অন্য জায়গা থেকে। যে কাবো ভার্দিয়ানরা ইউরোপের নানা দেশে বড় হয়েছেন, ছোট-ছোট ক্লাবে খেলেছেন, জীবনের সঙ্গে লড়াই করতে করতেই ফুটবলার হয়েছেন— তাঁরাই একদিন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে পৃথিবীকে চমকে দিতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে নিজেদের পরিচয় তৈরি করল দলটি। বড় দলের সামনে লড়তে শিখল। হারতে শিখল। আবার উঠে দাঁড়াতেও শিখল।

তারপর এল এই বিশ্বকাপ। প্রথমবার। শুধু অংশগ্রহণ নয়, ইতিহাস লেখার সুযোগ। প্রথম ম্যাচেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে রুখে দেওয়া। তারপর উরুগুয়ের মতো ফুটবল পরাশক্তির বিপক্ষে মাথা উঁচু করে লড়াই। শেষে বিশ্বকাপের নকআউট। যে দেশটার নাম কয়েকদিন আগেও পৃথিবীর বহু মানুষ জানতেন না, আজ সেই দেশের পতাকা কোটি কোটি মানুষের মোবাইল স্ক্রিনে উড়ছে। এটাই ফুটবলের সবচেয়ে বড় জয়। কারণ ট্রফি একটা প্রজন্মকে আনন্দ দেয়। কিন্তু একটা দেশকে পৃথিবীর সামনে পরিচয় করিয়ে দিতে পারলে, সেটা ইতিহাস হয়ে যায়।

চল্লিশ বছর বয়সি ভোজিনহা। এটাই তাঁর প্রথম বিশ্বকাপ। হয়তো শেষও। ম্যাচের আগে সাংবাদিকরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির বিরুদ্ধে খেলতে নামছেন, কেমন লাগছে? ভোজিনহার উত্তর ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সরল। তিনি বলেছিলেন, ‘মেসির বিরুদ্ধে খেলতে পারাটাই আমাদের কাছে গর্বের। এমন একজন ফুটবলারের বিপক্ষে মাঠে নামার সুযোগ জীবনে একবারই আসে।’

একজন চল্লিশ বছরের গোলরক্ষক, যিনি কোনওদিন বিশ্বের আলোচিত ক্লাবের নায়ক ছিলেন না, তিনি নিজের স্বপ্নকে এতটাই বিনয় দিয়ে দেখেন যে, প্রতিপক্ষের মহত্ত্বকে স্বীকার করতে তাঁর একটুও দ্বিধা নেই। ভোজিনহা, পিনা, দুয়ার্তে, ভারেলা, দালসিও, বেবে, রায়ান মেন্ডেস এরা প্রত্যেকেই যেন একটাই কথা বলছিলেন, ‘আমাদের নাম আগে শোনেননি? আজ মনে রাখবেন।’

তারপর এল সেই ম্যাচ। সামনে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। সামনে লিওনেল মেসি। সামনে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। সামনে এনজো ফার্নান্দেজ। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় বড় নাম। শুধু মাঠের লড়াই নয়, গ্যালারির গর্জন, কোটি মানুষের প্রত্যাশা, স্নায়ুর অসহনীয় চাপ— সবই যেন আর্জেন্টিনার পক্ষে। আর ওপারে? মাত্র কয়েক লক্ষ মানুষের এক দ্বীপরাষ্ট্র। যাদের পৃথিবী অনেক দিন ধরেই ‘ছোট দেশ’ বলে ডেকে এসেছে। কিন্তু সেদিন মাঠে কোনও ছোট দেশ ছিল না। ছিল এগারোটা অদম্য মানুষ। ম্যাচের ২৯ মিনিটে মেসির জাদুকরী গোল যেন সবাইকে মনে করিয়ে দিল বিশ্বসেরা এখনও বিশ্বসেরাই। অনেকেই ভাবলেন, এবার হয়তো ভেঙে পড়বে কাবো ভার্দে। কিন্তু তারা ভাঙেনি। তারা আরও সংগঠিত হয়েছে। আরও বিশ্বাস নিয়ে খেলেছে। পরিকল্পনা থেকে এক ইঞ্চিও সরে যায়নি পিনা, দুয়ার্তে, ভোজিনহারা। যে দেশের মানুষের কাছে সম্পদ বলতে খুব বেশি কিছু নেই, সেই দেশের ফুটবলাররা বিশ্বের সেরা দলকে বারবার থামিয়ে দিল। বিশ্বসেরা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে অসহায় করে গোল করলেন দুয়ার্তে। অন্যদিকে চল্লিশ বছরের ভোজিনহা যেন সময়কেই থামিয়ে দিলেন। মেসির সঙ্গে এক-এক পরিস্থিতিতে তাঁর দুর্দান্ত সেভ। বক্সের বাইরে থেকে মেসির সেই ধূর্ত ফ্রি-কিক, গোলপোস্টের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গোলরক্ষককে দেখে চটজলদি অন্য কোণে শট। অনেক গোলরক্ষক হয়তো প্রতারিত হতেন। ভোজিনহা হলেন না। ঝাঁপিয়ে পড়ে আবারও বাঁচিয়ে দিলেন দলকে।

নব্বই মিনিটেও ফল বেরল না। খেলা গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। আর্জেন্টিনা আবার এগিয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এখানেই বুঝি শেষ হয়ে গেল কাবো ভার্দের রূপকথা। কিন্তু রূপকথার নায়কেরা এত সহজে হার মানে না। বরং আরও জ্বলে ওঠে।

তারপর, সম্ভবত এই বিশ্বকাপের অন্যতম সুন্দর গোল। ‘গোল অফ দ্য টুর্নামেন্ট’ হওয়ারও দাবিদার। নাম— সিডনি লোপেজ ক্যাব্রাল। আজকের আগে হয়তো পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ তাঁর নামই জানতেন না। আজ সবাই মনে রাখবে। একটি চোখধাঁধানো গোল। সুন্দর। নিখুঁত। মনে হচ্ছিল, কয়েক লক্ষ মানুষের একটা দেশের সমস্ত স্বপ্ন যেন এক শটে জড়ো হয়ে জালে গিয়ে পড়ল। মেসিও যেন কিছু মুহূর্ত বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মাঠে তখন মনে হচ্ছিল এগারোটা ঘায়েল বাঘ ছুটে বেড়াচ্ছে। এ যেন শুধু ফুটবল নয়। এ যেন বহু শতাব্দী ধরে উপেক্ষিত, অবহেলিত, ছোট বলে তুচ্ছ করা মানুষগুলোর আত্মমর্যাদার দৌড়।

আগেরদিন যে ভোজিনহা বলেছিলেন, মেসির বিরুদ্ধে খেলতে পেরে তারা গর্বিত, সেদিন মেসির সামনে দাঁড়িয়ে সেই ভোজিনহা-ই একের পর এক সেভ করলেন। বিশ্বের সেরা আক্রমণভাগকে থামিয়ে দিলেন। চল্লিশ বছরের দু’টি হাত যেন কয়েক লক্ষ মানুষের স্বপ্নকে আগলে রাখল।

শেষ পর্যন্ত হয়তো স্কোরবোর্ড বলবে আর্জেন্টিনা জিতেছে। কিন্তু সব জয় কি স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে? সব পরাজয় কি সত্যিই পরাজয় হয়? আর্জেন্টিনাও জানে, এই জয় সহজ ছিল না। ফুটবল-বিশ্বও জানবে, এই ম্যাচের প্রকৃত বিজয়ী শুধু একটি দল নয়, একটি মানসিকতা। একটি জাতির আত্মবিশ্বাস। একটি ছোট দেশের অসীম সাহস।

কাবো ভার্দে ট্রফি জিতবে না। তাদের এই বিশ্বকাপ এখানেই শেষ। কিন্তু তারা ইতিমধ্যেই এমন কিছু জিতে নিয়েছে, যা কোনও ট্রফির চেয়েও মূল্যবান। কোটি কোটি মানুষের হৃদয়। সম্মান। আর ইতিহাস। কাবো ভার্দে মাথা নত করে মাঠে নামেনি। তারা মাথা উঁচু করে নিজেদের পরিচয় লিখেছে। হয়তো এটাই ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা। এখানে রাজা হয়ে জন্মাতে হয় না। এখানে নিজের রাজত্ব নিজেকেই গড়ে নিতে হয়।

আগেরদিন যে ভোজিনহা বলেছিলেন, মেসির বিরুদ্ধে খেলতে পেরে তারা গর্বিত, সেদিন মেসির সামনে দাঁড়িয়ে সেই ভোজিনহা-ই একের পর এক সেভ করলেন। বিশ্বের সেরা আক্রমণভাগকে থামিয়ে দিলেন। চল্লিশ বছরের দু’টি হাত যেন কয়েক লক্ষ মানুষের স্বপ্নকে আগলে রাখল। ম্যাচ শেষে হয়তো ভোজিনহা এখনও বলবেন, মেসির বিরুদ্ধে খেলতে পারাটাই তাঁর গর্ব। কিন্তু আজ গল্পটা আর একপাক্ষিক নয়। আজ গোটা পৃথিবী গর্বিত, কাবো ভার্দের মতো একটি দেশকে বিশ্বকাপে দেখতে পেরে। গর্বিত ভোজিনহাদের মতো মানুষদের জন্য, যাঁরা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ফুটবল শুধু তারকাদের খেলা নয়; ফুটবল সেই মানুষগুলোরও, যারা স্বপ্নকে বয়সের কাছে হারতে দেয় না। ভোজিনহা, একবার মাথা তুলে চারদিকে তাকান। দেখবেন, শুধু কাবো ভার্দে নয়; আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, ইউরোপ, পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী আপনাদের দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাচ্ছে। আপনারা বিশ্বকাপ জেতার চেয়েও কঠিন একটা কাজ করে ফেলেছেন। আপনারা প্রমাণ করেছেন, সম্মান কেনা যায় না, অর্জন করতে হয়।

স্যালুট, ভোজিনহা। স্যালুট, কাবো ভার্দে। তারা বিশ্বকাপ জিততে আসেনি, তারা পৃথিবীকে নিজেদের চিনিয়ে দিতে এসেছিল। আর সেই কাজ তারা করে ফেলেছে। তাই বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেলেও, এই কয়েক লক্ষ মানুষের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রকে ফুটবল কোনওদিন ভুলবে না।