যেকোনও ছোটগল্পে একটা নির্দিষ্ট কাহিনি বা প্লট থাকা কি বাধ্যতামূলক? যাঁরা মনে করেন হ্যাঁ, তাঁরা এ-লেখা পড়বেন কি না বিবেচনা করে দেখবেন; কেননা এই লেখায় মূলত সেরকমই কিছু কথাবার্তা উঠে আসবে, যা আপনাদের সাহিত্য-বিশ্বাস হয়তো ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। সুতরাং, সতর্কবাণী শুরুতেই। আমরা পিছিয়ে যাব গত শতকের ছয়ের দশকে, যখন বাংলা ছোটগল্পের পরিপাটি চলন ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে উঠছে, একদল তরুণের ছাঁচ-ভাঙা লেখালিখিতে— যা তাঁরা চিহ্নিত করবেন ‘শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন’ নামে। আন্দোলনের মুখপত্র, ‘এই দশক’ পত্রিকা। সে-সময়ে ‘শাস্ত্র’ অর্থাৎ প্রচলিত অনুশাসনের বিরোধিতা করে গল্প লিখতে চেয়েছিলেন রমানাথ রায়, সুব্রত সেনগুপ্ত, শেখর বসু, অমল চন্দ, কল্যাণ সেন, আশিস ঘোষ, বলরাম বসাক-সহ আরও অনেকে; এবং তাঁদের ঘোষণা ছিল, ‘গতানুগতিক সাহিত্যের বিরুদ্ধে ঘরে ঘরে প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলুন।’
আরও পড়ুন: মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে তুলে আনে জগদীশ গুপ্ত-র গল্প!
লিখছেন শমীক ঘোষ…
তাঁরা বিশ্বাস করতেন, শিল্পে কোনও ‘শাস্ত্রবিধি’ হয় না। ফলত, ছোটগল্প লেখা হবে সমস্ত শর্তের বিরুদ্ধে। যেভাবেই তা লিখিত হোক, তা ছোটগল্প। মার্ক টোয়েন তাঁর ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অফ হাকলবেরি ফিন’ বইয়ের শুরুতে যেরকম এক নোটিস ছাপিয়েছিলেন, তারই সূত্র ধরে শাস্ত্রবিরোধীরা ‘এই দশক’ পত্রিকার প্রথম সংকলনে (মার্চ ১৯৬৬) ছাপিয়েছিলেন তাঁদের চারটি বক্তব্য। সেগুলি কী কী? ১. গল্পে আমরা আমাদের কথাই বলব। ২. আমরা এখন বাস্তবতায় ক্লান্ত ৩. অতীতের মহৎ সৃষ্টি অতীতের কাছে মহৎ আমাদের কাছে নয়। ৪. গল্পে এখন যারা কাহিনি খুঁজবে তাদের গুলি করা হবে। একজন লেখকের নিজস্ব অস্থিরতাকে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে কীভাবে প্রকাশ করা যায়, তা নিয়ে সচেতন ছিলেন শাস্ত্রবিরোধীরা। সাহিত্যকর্ম যে-কোনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঊর্ধ্বে, কেননা তাঁদের মতে, ‘পরীক্ষামূলক সাহিত্য কথাটা নির্বোধের উক্তি। সাহিত্য আর যাই হোক, গবেষণাগার নয়।’ শাস্ত্রবিরোধীদের কাছে সাহিত্য তাহলে কী? সাহিত্য হল সমস্ত কার্যকারণবাদ, সংস্কার ও কুসংস্কারমুক্ত এক বয়ান— যা আমাদের মনোজগতের অস্পষ্ট-জটিল মানসিকতাকে তুলে ধরবে।
উপরোক্ত এতগুলো কথা পড়ে, কেউ যদি ভেবে বসেন এই নাতিদীর্ঘ রচনাটি শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের সাহিত্যদর্শন নিয়ে, তাহলে ভুল হবে। কবুল করে নিই, এই গৌরচন্দ্রিকা করার কারণ একটি বই। বলরাম বসাক প্রণীত ‘কার্পেট’, যা অগ্রহায়ণ ১৩৭৭ বঙ্গাব্দে অব্যয় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। বইয়ের প্রকাশক এবং প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন একজনই— তপনলাল ধর। যে-১১টি গল্প নিয়ে এই বই, তা সবই লিখিত হয়েছিল ১৩৭২ থেকে ১৩৭৭-এর মধ্যে; অর্থাৎ যে-সময়ে বলরাম ‘এই দশক’ পত্রিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তাঁদের সমবেত মতাদর্শের একজন অংশীদার হিসেবে বলরামের গল্পকে পড়ার আগে তা-ই শাস্ত্রবিরোধীদের সম্পর্কে কিছু ন্যূনতম কথা বলে নেওয়া। একটা দরজা তৈরি করার চেষ্টা আসলে, যাতে প্রবেশে খানিক সুবিধা হয়। দিন কয়েক আগে তাঁর প্রয়াণের পর থেকেই মনে হচ্ছিল, তাঁর সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে দু’কথা লেখা একটা নৈতিক কর্তব্য।

‘এই দশক’ পত্রিকার দ্বিতীয় সংকলনে (১৩৭৩) ‘আধুনিক গল্পের ভূমিকা’ শীর্ষক রচনায় সুব্রত সেনগুপ্ত লিখেছিলেন, ‘… আমাদের মিশ্র অস্পষ্ট অনুভব প্রকাশে অক্ষম মনে হয়।… মলিন, বিবর্ণ ভাষা বাতিল করে নতুন ভাষার সন্ধান করতে হয়।… শব্দের নকল প্রতিমা ভেঙে ফেলার সময় এসেছে। সাহিত্যের ভাষা স্বগতোক্তির মতো সহজ, মিশ্র ও অস্পষ্ট হয়ে উঠুক। সর্বপ্রকার কৃত্রিমতাশূন্য অনুভবের ভাষাই সাহিত্যের ভাষা হতে পারে।’ বলরামও বিশ্বাস করতেন এই কথাগুলোই। পাশাপাশি, ‘এই দশক’ পত্রিকার ত্রয়োদশ সংকলনে (১৩৭৭) ছাপা একটি গদ্যে তাঁর বক্তব্য ছিল: ‘নবীন সাহিত্যের মূল্য শেষ পর্যন্ত নবীন সাহিত্য সৃষ্টির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তার মানে তথাকথিত কালের বিচার। তবে ‘নবীনত্বের বা নূতনত্বের বিশেষত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল’ পাঠকের দৃষ্টিতেই তা সম্ভব এবং কালের বিচারও হয় ন্যায়সঙ্গত। কেননা মাইকেল পাঠকই মাইকেলকে সঠিক চিনতে পেরেছিল। আধুনিক কবিতার পাঠক আধুনিক কবিদের। জয়েসের পাঠকই বুঝতে পারে জয়েসের যুগকে। সাহিত্যে সব রকমের নূতনত্ব বুঝে নেবার ক্ষমতা সব পাঠকেরই থাকবে এ রকম কখনওই করা যায় না।’ বোঝাই যাচ্ছে, তাঁর নিজের পাঠকপ্রিয়তা সম্পর্কে তিনি নিজেই সংশয়ী ছিলেন। আর সংশয়ী হবেন নাই-বা কেন? যে-পাঠক গল্পপাঠের গোড়ায় হাতে তুলে নেন আতসকাচ, এবং গোয়েন্দার মতো খুঁজতে থাকেন গল্পের কাহিনিসূত্র, তিনি তো সচেতনভাবেই বারংবার এই কাঠামোকে ভেঙেছেন; নস্যাৎ করেছেন ‘বর্ণনাকারী’ গল্পলেখককে!

বলরাম যে-সময়ে গল্প লিখতে শুরু করেন, তখন তাঁর চারপাশে এক জটপাকানো বাস্তব। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের জমে-ওঠা অস্থিরতা, সে-সময়ে ভোঁতা করে দিয়েছিল আমাদের সংবেদনশীলতা। স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় একদিকে যেমন ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল পরিপার্শ্ব, তেমনই খর্ব হচ্ছিল ব্যক্তি-মানুষের সামাজিক পরিচয়। খাদ্য-আন্দোলন, উদ্বাস্ত সমস্যা, বেকারত্ব— সব মিলিয়ে যে অস্থির সময়ের জন্ম হয়েছিল ছয়ের দশকে, তাকে যথার্থ মোকাবিলা করার ক্ষমতা গণতান্ত্রিক পরিসরে ছিল না। নানান দিক থেকে প্রশ্ন উঠছিল একাধিক, এবং ওই নৃত্যরত সময়ের প্রভাব পড়ছিল তৎকালীন শিল্প-সাহিত্যে। কোনও কিছুতে সন্তুষ্ট থাকার পরিবর্তে, নিরন্তর আত্মবিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে নিজেকে ভাঙতে-ভাঙতে জীবনের জটিল সমস্যাগুলোকে বুঝতে চাইছিলেন লেখক-শিল্পীরা। ‘তথাকথিত বাস্তবতা’কে তাঁদের তা-ই মনে হতে শুরু করে মেকি, কৃত্রিম; এবং জীবনের মতোই স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে সাহিত্য— যা উদ্দেশ্যহীন, গন্তব্যহীন। বাস্তবতা তাঁদের শিল্পকর্ম কিংবা লেখায় নতুন রূপ নিয়ে আসে, যা মনে হতে পারে অসংলগ্ন-অস্পষ্ট— কিন্তু মানবজীবনই যেখানে ‘একঘেয়ে’, ‘এলোমেলো’ ও ‘যুক্তিবিরোধী’, সেখানে সাহিত্যের ‘জ্ঞানগর্ভ নিটোলপনা’ কি নিতান্তই হাস্যকর নয়?
শীর্ণ সময়ের স্রোতে জেগে থাকে শুধু একতাল সংশয়, দোলাচল। ‘নাগরদোলা’ গল্পের প্রধান চরিত্র যখন এক নারীকে মাকড়সারূপে প্রত্যক্ষ করে, এবং তার যৌবনজালে নিজেকে পতঙ্গভুক অবস্থায় দেখার জন্য কিঞ্চিৎ উৎসুক হয়ে ওঠে— সে-ই আবার তার মুখোমুখি হলে ‘বিপন্ন’ হয়ে যায়। নারীটির যৌবনমাখা শাড়ির ওড়াউড়িতে ত্রস্ত হয়ে পড়ে। গুটিয়ে, কুঁকড়ে যায়। এই বিপন্নতার অজস্র টুকরোই নানান মোড়কে ‘কার্পেট’ বইয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
আপাত-উদ্ভট সংলাপ কিংবা ঘটনাক্রমের মধ্যে দিয়ে রূঢ় বাস্তবতাকে তুলে আনা, প্রতীক-অবচেতন-কল্পনার অপ্রত্যাশিত ঘটনাবলি, পরাবাস্তববাদ, যৌনতার নতুন প্রকাশ, শব্দ নিয়ে খেলা— এগুলোই বলরাম বসাকের ছোটগল্পের মূল ভিত্তি। ‘কার্পেট’ গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘নাগরদোলা’র গোড়ায় আমরা দেখি, ব্যক্তিমানুষের সামাজিক পরিচয়কে নস্যাৎ করে নির্মিত হচ্ছে এইরকম লাইন, “আমি যখন আমার বাড়ির গলিটা দিয়ে যাচ্ছিলুম তখন আমাকে লক্ষ্য করে কে যেন চিৎকার করে ডাকল, ‘মানুষ মানুষ!’” এবং এই ‘মানুষ’ই ‘দমবন্ধ’ গল্পে উপস্থিত হবে এক দম-দেওয়া ঘড়ির ভূমিকায়। অর্থাৎ, সংবেদনশীলতা মুছে গিয়ে, সব অনুভূতি-রহিত হয়ে মানুষ পরিণত হয়েছে একটি যন্ত্রে— এ-ই বলরামের বলবার কথা। মনুষ্যত্বের একটা দিক যে নির্মমতায় ভরা, যা আমরা সচরাচর স্বীকার করতে চাই না, তা-ও মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি। গল্পের মধ্যে দিয়ে টেনে বের করে এনে দেখিয়েছেন আমাদের মজ্জাগত স্বার্থপরতাকে। ‘দমবন্ধ’ গল্পেরই একটা ছোট অংশ উদ্ধৃত করছি—
“ভিড় ঠেলে কবীর রোডের কাছে নামল পরিমল। একরকম দৌড়ে দৌড়ে বাড়ি ঢুকলে। বারান্দায় জেঠুকে দেখতে পেলে। গড়গড়া টানছেন। পাশে তার কুকুরটা জিব্ বার করে চোখ বুজে ঝিম্ ধরে আছে।
‘জেঠু আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে…।’
জেঠু কোনদিকে তাকাল না। একমনে ঘ্রোৎ ঘ্রোৎ করে গড়গড়া টানতে লাগল। কুকুরটা শুধু একবার আড় চোখে পরিমলকে দেখে নিয়েছিল। বারান্দা পেরিয়ে চৌকাঠ ডিঙিয়ে বড় কাকীমার দেখা পেয়ে ছুটে গিয়ে তাকে বললে, ‘কাকীমা… আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।’ ‘আঃ সর দিকিনি… এখন অত তামাসা করার সময় নেই’… বড়ো কাকীমা মার্কেট যাচ্ছেন। গাড়ি প্রস্তুত।
বাঁদিকের ঘরে বাবার চেম্বার। মক্কেলদের নিয়ে বাবা সবসময় কেমন যেন ব্যস্ত ত্রস্ত। ‘বাবা আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে।’
‘আঃ এখন যাও দিকি এখান থেকে…।’”
মানুষ মানুষকে কী চোখে দেখে, সেই ‘দেখা’রও নানান সূক্ষ্ম বয়ান আমরা বলরাম বসাকের গল্পে পাই। ‘দমবন্ধ’ গল্পে পরিমলকে যেমন তার আত্মজনেরা উপেক্ষার চোখে দেখেছিল, ‘স্কাইস্ক্র্যাপার’ গল্পের প্রধান চরিত্র তেমনই একদিন জনৈক সুনীলবাবুর খোঁজে গিয়ে এমন এক ভদ্রমহিলার মুখোমুখি হন, যার অপরূপ নজরটানে তৈরি হয় মায়া। গল্পের শুরুটা হয় এইভাবে— ‘আমি দোতলার বারান্দায় দাঁড়ানো ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, সুনীল বাবু আছেন? আকাশ কিছুটা রৌদ্র-প্রদীপ্ত ছিল বলে ভদ্রমহিলা হয়ত তার বিভিন্ন বয়সি শাড়িগুলি মেলে দিচ্ছিলেন। শাড়িগুলির নিচের সূক্ষ্ম সুতির ঝালর থেকে জলবিন্দুগুলি ঝিলমিল ঝিলমিল করছিল। টুপ্টাপ পড়ছিল। আমি সেই ভদ্রমহিলার নানা বয়সি শাড়ি মেলার বৃষ্টিতে ভিজে যেতাম। যদি না সাবধান হয়ে সরে দাঁড়াতাম, আমার পাঞ্জাবির গায়ে লাল নীল হলুদ সবুজ ছোপ লাগতে থাকত।’ এরপর আমরা কী দেখব? দেখব, ওই ভদ্রমহিলা চরিত্রের সাবধানতাকে ক্রমশ তছনছ করে তার প্রতি এক ধরনের আচ্ছন্নতা তৈরি করছে এবং গল্পের মুখ্য চরিত্র দেখতে পাচ্ছে ওই ভদ্রমহিলা দোতলা থেকে তিনতলা, তিনতলা থেকে পাঁচতলা, পাঁচতলা থেকে সাততলায় উঠে যাচ্ছে। এবং আস্তে-আস্তে চলে যাচ্ছে দৃষ্টির নাগালের বাইরে।
আরও এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমাদের দেখা হয় ‘ঘড়ি’ গল্পে, যার চোখের দিকে তাকালে সময় স্তব্ধ হয়ে যায়। তার চোখদুটো ‘বাঙালী মেয়ের মত কালো’ এবং সানগ্লাস খোলার পর তারা ‘খাঁচা-ছাড়া পাখি’র মতো উড়তে শুরু করে। কালো চোখ কখনও নীল হয়, কখনও বিচিত্র রঙে রঙিন হয়— এবং তার তাকানোর বহুস্তরীয় অর্থে গল্পের প্রধান চরিত্র স্নায়ুকে আশ্বস্ত করতে পারে না। শুরুতে এই গল্প যে-সূত্র ধরে এগিয়েছিল, অর্থাৎ ওই ভদ্রমহিলার কাছে ‘এখন ক-টা বাজে?’ এই প্রশ্ন দিয়ে, তা খানিক পরেই তালগোল পাকাতে শুরু করে। ভদ্রমহিলার সঙ্গে দৃষ্টি-বিনিময় হতেই ওলটপালট হতে আরম্ভ করে সব; সময় কিছুতেই জানা হয়ে ওঠে না। এবং একদম শেষে যখন ভদ্রমহিলার হাতঘড়ি টেনে নিয়ে সময় দেখার চেষ্টা করা হয়, দেখা যায় ঘড়িতে কোনও ডায়াল নেই— আছে তারই একটা চোখ। পরাবাস্তবতার আদলে বলরাম আসলে পাঠককে নিয়ে যেতে চান অনুভবের অতলে।

অবলোকন-দুনিয়ার দর্শনের গল্প এখানেই শেষ নয় অবশ্য। ‘নিষেধ’ গল্পে বলরাম এমন এক চরিত্রকে নিয়ে এসেছেন, যে এক যুবতীর চোখের দিকে সহজভাবে তাকিয়ে থেকে অন্য এক যুবকের কাছে মার খায়। এবং মারের প্রকৃত কারণ ঠিক বুঝেও উঠতে পারে না। খানিক হতভম্ব হয়ে যায়। নাকের রক্ত মুছতে-মুছতে হেসে ফেলে। এমনকী কেন সে হাসছে, তারও কোনও সদুত্তর তার কাছে থাকে না। তারপর বলরাম ওই চরিত্রের বয়ানে লেখেন—
‘আমি গাছের ওপর পাখির দিকে তাকিয়েছি।
বেড়ালের দিকে তাকিয়ে থেকেছি।
শিশুদের দিকে তাকিয়ে থেকেছি। অনেকক্ষণ।
তখন আমার মনে হয়নি এতে কোন অপরাধ হয়। এতে যে অপরাধ হয়—হয়ত হয়—কিন্তু সেকথা আমাকে কেউ বলে দেয় নি। জন্মের পর অন্ততঃ আমার মায়ের বলে দেওয়া উচিত ছিল। আমি মায়ের মুখে অনেক তাকিয়েছি। মা বাধা দেয় নি। কিন্তু মায়ের উচিত ছিল। কারণ মা আমার জন্মের পর থেকে আমাকে অনেক বিষয়ে বারণ করেছে।’
একদিকে জীবনের জটিলতার প্রতি প্রশ্নবাণ, অন্যদিকে নিজের শৈশবের প্রতি অভিযোগ— যে-শৈশব আর পাঁচজনের মতো সহজ নয়। বেড়ে ওঠার পথে চতুর্দিকে অন্তরায়, এমনকী নিজের মায়ের থেকেও। যে-অস্থির সময়কে জাপটে ধরে বড় হচ্ছিলেন স্বয়ং লেখক, তার দায় এড়াতে পারেন না কেউই। না সমাজ, না পরিবার। শীর্ণ সময়ের স্রোতে জেগে থাকে শুধু একতাল সংশয়, দোলাচল। ‘নাগরদোলা’ গল্পের প্রধান চরিত্র যখন এক নারীকে মাকড়সারূপে প্রত্যক্ষ করে, এবং তার যৌবনজালে নিজেকে পতঙ্গভুক অবস্থায় দেখার জন্য কিঞ্চিৎ উৎসুক হয়ে ওঠে— সে-ই আবার তার মুখোমুখি হলে ‘বিপন্ন’ হয়ে যায়। নারীটির যৌবনমাখা শাড়ির ওড়াউড়িতে ত্রস্ত হয়ে পড়ে। গুটিয়ে, কুঁকড়ে যায়। এই বিপন্নতার অজস্র টুকরোই নানান মোড়কে ‘কার্পেট’ বইয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
তথ্যঋণ: সৌম্যব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়



