শুধুই অঘটন নয়

বিশ্বকাপে একের পর এক বড় দল হোঁচট খাচ্ছে। জার্মানি প্যারাগুয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিচ্ছে। নেদারল্যান্ডস হারছে মরক্কোর কাছে। উরুগুয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিচ্ছে। আফ্রিকার একের পর এক দল— মরক্কো, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, ঘানা, মিশর, আলজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, কাবো ভার্দে, কঙ্গো—নকআউটে পৌঁছে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও হয়তো এগুলোকে ‘অঘটন’ বলা হত।

কিন্তু এখন?

এখন আর এই শব্দটা ঠিক মানায় না। কারণ অঘটন বারবার ঘটলে, সেটা আর অঘটন থাকে না। সেটা হয়ে যায় নতুন বাস্তবতা।

একটা সময় বিশ্ব ফুটবল ছিল কয়েকটা দেশের সম্পত্তি। ব্রাজিল, জার্মানি, ইতালি, আর্জেন্টিনা, পরে স্পেন, ফ্রান্স। বাকি দেশগুলো যেন শুধু অংশগ্রহণ করত। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্যই হল, এই খেলাটা কখনও চিরকাল কারও একার থাকে না। জ্ঞান যেমন ছড়িয়ে পড়ে, প্রযুক্তি যেমন ছড়িয়ে পড়ে, তেমনই ফুটবলের শৈলীও ছড়িয়ে পড়ে। আজ আফ্রিকার ছোট দেশ, এশিয়ার ছোট দেশ, ক্যারিবিয়ানের ছোট দেশ—সবাই ভিডিও বিশ্লেষণ করতে পারে, বিশ্বের সেরা কোচদের পদ্ধতি শিখতে পারে, নিজেদের পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে। কৌশল আজ আর ধনী দেশের একচেটিয়া সম্পদ নয়।

মেসি কি নিজেই একটি প্রকল্প?
লিখছেন অর্পণ গুপ্ত…

অনেকে বলেন, ‘ইউরোপে খেলে বলেই এসব দল ভাল করছে।’ আংশিক সত্যি। কিন্তু পুরো সত্যি নয়। কারণ কাবো ভার্দে, কঙ্গো, কিংবা আফ্রিকার আরও অনেক দলের বেশ কিছু ফুটবলার ইউরোপের বড় ক্লাবে খেলেন না। তবুও তারা লড়ছেন।

কেন?

কারণ ফুটবল শুধু ক্লাবের মানে নির্ধারিত হয় না। ফুটবল নির্ধারিত হয় দলগত বিশ্বাসে। শৃঙ্খলায়। পরিকল্পনায়। একজন আর-একজনের জন্য কতটা দৌড়তে প্রস্তুত, সেটাতে।

আসলে গত বিশ বছরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে আর-এক জায়গায়। আগে ছোট দলগুলো মাঠে নামত হার না মানার জন্য। এখন তারা মাঠে নামে জেতার জন্য। এই মানসিক পরিবর্তনটাই সবচেয়ে বড় বিপ্লব। মরক্কো আর ভাবে না, ‘নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে সম্মানজনকভাবে হারব।’ প্যারাগুয়ে ভাবে না, ‘জার্মানির সঙ্গে ড্র হলেই ভাল।’ কাবো ভার্দে ভাবে না, ‘বিশ্বকাপে এসেছি, এটাই অনেক।’ কঙ্গোও ভাবে না, ‘প্রথমবার এসেছি, অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরব।’ তারা জেতার জন্যই মাঠে নামে।

আর-একটা পরিবর্তন হয়েছে, যা নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়। একসময়ে বড় দলগুলোর একটা ভয় ছিল। জার্সির ভয়। জার্মানির জার্সি দেখেই অনেকে অর্ধেক হেরে যেত। ব্রাজিলের হলুদ জার্সি দেখেই অনেকে রক্ষণে নেমে পড়ত। আজ সেই ভয় নেই। কারণ আজকের ফুটবলার ছোটবেলা থেকেই ইউটিউবে, টেলিভিশনে, ক্লাব ফুটবলে সেই তারকাদের বিরুদ্ধে খেলে বড় হয়েছে। তার কাছে প্রতিপক্ষ মানুষ। দেবতা নয়।

আবার বড় দলগুলোরও একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাদের খেলোয়াড়রা বছরে ৬০-৭০টা ম্যাচ খেলছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। লিগ। কাপ। ন্যাশনস লিগ। ক্লাব বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ। প্রায় সারা বছরই প্রতিযোগিতা। শারীরিক ক্লান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনই কমে যাচ্ছে ক্ষুধাও। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত ছোট দেশের অনেক ফুটবলারের কাছে বিশ্বকাপই জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। সেখানে তারা নিজেদের শেষ শক্তিটুকুও উজাড় করে দেয়। এই ক্ষুধার মূল্য অনেক। তার জন্যই প্রস্তুতি চলে পুরোদমে। ছোট দলগুলি এখন কারিগরি জায়গাটার মূল সূত্রটা বুঝতে চাইছে। ফুটবল তো কেবলই আবেগে খেলা হয় না। মাঠে দল কীভাবে নামবে, কোন ছকে খেলবে, কোন নীল নকশা তাদের জেতানোর দিকে নিয়ে যাবে, কেবলই লো ব্লক, না কি প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক হতে পারে তারা, কেবলই রক্ষণ শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন, না কি রাইট ব্যাক-লেফট ব্যাক থেকে রাইট উইঙ্গার-লেফট উইঙ্গারদের ওপর বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন, পাসিং ফুটবল খেলা কৌশলগতভাবে ঠিক হবে কি না, এই সমস্ত কিছুই বিবেচ্য হয়ে ওঠে তাদের পরিকল্পনায়।

আরও একটা বিষয় আছে। অনেকেই শুধু ট্যাকটিকসের কথা বলেন। কিন্তু ফুটবল কখনও শুধু বোর্ডে আঁকা তীরচিহ্নের খেলা নয়। এটা সংস্কৃতিরও খেলা। মরক্কোর জন্য ফুটবল জাতীয় পরিচয়। কঙ্গোর জন্য ফুটবল আশা। কাবো ভার্দের জন্য অস্তিত্ব। ঘানার জন্য আত্মসম্মান। আইভরি কোস্টের জন্য ভবিষ্যৎ। জাপানের জন্য শৃঙ্খলা। দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য পরিশ্রম। যখন একটা দেশের সামাজিক ইতিহাস মাঠে নেমে আসে, তখন সেই দলকে হারানো শুধু ট্যাকটিকসের প্রশ্ন থাকে না। উরুগুয়ের বিদায়ও সেই কথাই বলে। একটা সময় গার্রা চারুয়ার আত্মা, আগ্রাসন আর জেদের প্রতীক ছিল উরুগুয়ে। এবার সেই একই জেদ অন্যরা দেখাল। ফুটবলে ইতিহাসকে সম্মান করা যায়। কিন্তু ইতিহাস দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না।

আফ্রিকার দলগুলো এই বিশ্বকাপে হয়তো সবাই ট্রফি জিতবে না। কিন্তু তারা একটা কাজ করে ফেলেছে। তারা প্রমাণ করেছে, আফ্রিকান ফুটবল আর কোনও ‘চমক’ নয়। এটা এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী বাস্তবতা। মরক্কো, সেনেগাল, মিশর, আলজেরিয়া, আইভরি কোস্ট, ঘানা, দক্ষিণ আফ্রিকা, কাবো ভার্দে, কঙ্গো— প্রতিটি দেশের পথ আলাদা। ইতিহাস আলাদা। ভাষা আলাদা। কিন্তু একটা জায়গায় তারা এক। তারা বিশ্বাস করতে শিখেছে।

সম্ভবত এটাই এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। ফুটবলে ছোট দেশ বলে কিছু নেই। ছোট হতে পারে অর্থনীতি। ছোট হতে পারে জনসংখ্যা। ছোট হতে পারে স্টেডিয়াম। কিন্তু স্বপ্নের কোনও মানচিত্র হয় না।

হয়তো এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গল্প হল— বিশ্ব ফুটবল অবশেষে সত্যিই ‘বিশ্ব’-র হয়ে উঠছে।