বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না
ওই যে বাড়িটা, যেটাকে বলতাম ছ’নম্বর বাড়ি, বাড়ির একতলাটা একটা গুদাম, দোতলায় পরপর ঘর। বোধ হয় আটটি ঘর। আটটি ঘরে ছ’টি পরিবার। দু’টি ঘরে ভাগাভাগি রান্না। নীচে একটি মাত্র কলঘর। ওই বাড়িটাতেই তপন নন্দী, শিবাজী, সুজয় থাকত।
তপনের একটা শারীরিক সমস্যা ছিল। সাড়ে চার ফুট উচ্চতা, পিঠের হাড়ের গঠনের কোনও জন্মগত ত্রুটি, ফলে একটু কুঁজো, কিন্তু দারুণ ক্রিকেট খেলত। যেমন বল তেমন ব্যাট। ডাংগুলিতে দারুণ। গুলিতে অসাধারণ টিপ। তপনের বাবা, রেলে চাকরি করত। ‘পাস’ পেত। ওরা সপরিবারে বেড়াতে যেত। কাশি থেকে, প্যাড়া, পেয়ারা ইত্যাদি নিয়ে আসত। আমাকেও দিয়েছে।
তপনের তিন বোন— শিপ্রা, সীমা, শিখা। শিখাকে আমার বড় ভাল লাগত। রাস্তা থেকে, ‘তপন…এই তপন…’ ডাক ছাড়তাম। জানি, এই সময়ে তপন বাড়িতে নেই, জানলার দুটো লোহার শিক দু’হাতের মুঠোয় ধরে, শিখা বলবে, ‘দাদা বাড়ি নেই!’ ব্যস! এইটুকু শোনা, এক মুহূর্তের জন্য। এক পলকে একটু দেখার জন্যই— ওরকম ‘তপন-তপন’ হাঁক পাড়া।

ওই বাড়িতেই গান্ধীকাকু নামে একজন থাকতেন। গান্ধীকাকু, ‘বিদ্যাসাগর কলেজ’-এ পড়াতেন। গান্ধীকাকুর পুরো নাম আর মনে নেই, ওরা দু’ভাই থাকতেন। কাশিমবাজারের স্কুল-ম্যাগাজিনে, যখন আমার ‘ঝড়’ নামে বিচ্ছিরি কবিতাটা বের হয়, গান্ধীকাকু উৎসাহ দিয়েছিলেন। এরপর কবিতাটবিতা লিখলে, গান্ধীকাকুকে দেখাতাম। এই গান্ধীকাকুর উদ্যোগেই একটা হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। ওখানেই আমাদের অনেকে, তাদের ‘গুপ্ত-প্রতিভা’-র স্ফুরণ ঘটাতে থাকে। আমাকেও লেখা দিতে বলেন গান্ধীকাকু। লেখক হিসেবে ওটাকে আমন্ত্রণই বলব। এভাবেই বলতে হয়, ‘আমাকেও লেখার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।’ ওটাই বোধহয় আমার পাওয়া প্রথম আমন্ত্রণ। কী লিখেছিলাম এখন আর মনে নেই…
‘ক্লাস নাইন পাঁচ টাকা ফাইন ক্লাস টেন সোনার চেন’
পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ২২…
ওই পাড়ায় একটা ক্লাব ছিল। নাম, নবারুণ সংঘ। গান্ধীকাকুই সম্ভবত উদ্যোগ নিয়ে ক্লাবটা তৈরি করেছিলেন। যে-ছোট মাঠটায়, ক্রিকেট, ডাংগুলি, হাডুডু খেলা হত, ওখানেই প্যান্ডেল করে কয়েকবার রবীন্দ্রজয়ন্তী হয়েছিল। আমি আবৃত্তি করেছিলাম। ‘ওরা কাজ করে’। সেই যে মুখস্থ করেছিলাম, আজও মনে আছে। ছোটবেলায় মুখস্থ হওয়া কোনও কিছু, মানুষ সহজে ভোলে না।
সে-সময়ে, মানে ছ’য়ের দশকে শুধু পাড়ায়-পাড়ায় নয়, বাড়িতে-বাড়িতেও রবীন্দ্রজয়ন্তী আর নেতাজিজয়ন্তী হত। আমাদের ১২ নম্বর গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়ির বারান্দায়, মায়েদের শাড়ি দিয়ে স্টেজের স্ক্রিন বানিয়ে, সেই স্ক্রিন টেনে খুলে— কুটুদিদের উদ্যোগে রবীন্দ্রজয়ন্তী হত। ‘তালগাছ’, ‘এসেছে শরৎ’, ‘ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল’— এইসব স্কুলপাঠ্য বইয়ের কবিতা, দু’একটা অসুরো-বেসুরো গান এসব দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের একটা ছবি তো অবশ্যই।
২৩ জানুয়ারি, চেয়ারের উপর চাদর বিছিয়ে, নেতাজির ছবি, গাঁদাফুলের মালা এবং গাঁদাফুলের পাপড়ি দিয়ে সাজিয়ে, মেঝের উপর ‘জয়তু নেতাজি’ লেখা হত। শাঁখ বাজানো হত। নেতাজির জন্মদিন পালিত হত ওই মাঠেও। ওই পাড়ার সঙ্গে আমার যোগাযোগ বহুকাল পর্যন্ত ছিল। ওই পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যেতাম বিরাটি থেকেও।
বিরাটিতে আমার বাবা-মা ১৯৬৫-তে চলে যান। আমি পিসিমার বাড়ি থাকতাম। ১৯৭০ সালে আমি বিরাটি চলে যাই পাকাপাকিভাবে। কারণটা রাজনৈতিক। পরে বলা যাবে। গঙ্গারধারে একটা পরিত্যক্ত জেটি ছিল, ওখানে আমাদের আড্ডা ছিল। কিছু-কিছু খড় বোঝাই নৌকাও আসত। খড়-বিচালির উপরেও আড্ডা মেরেছি, শুকনো খড়ের গন্ধ মেখে।

১৯৬৯ সাল নাগাদ, আমি রবীন্দ্রনাথের ‘তোতাকাহিনী’-র নাট্যরূপ দিলাম। ওখানে স্টেজ বানিয়ে, অভিনয় হল। আমি পরিচালক এবং পণ্ডিতের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। মনে আছে, অনেক নতুন-নতুন সংলাপ লিখতে হয়েছিল, নাটকটিকে এক ঘণ্টা করার জন্য। রাজা-মন্ত্রীর সংলাপ, তোতাকে যা-যা শেখানো হচ্ছে, সেই সব। তোতাকে নামতা শেখানো হয়েছিল। পঞ্জিকা থেকে খনার বচন টুকে দিয়েছিলাম পাখিকে শেখানোর জন্য। সুকুমার রায়ের ‘হ য ব র ল’ থেকে— ‘ইয়াদি কির্দ অত্র কাকালতনামা লিখিতং… কার্যঞ্চাগে… ইমারত খেসারৎ দলিল-দস্তাবেজ। মোকাররী পত্তনী পাট্টা… কাওলা কবুলিয়ৎ’— ইত্যাদি ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম, যেখানে তোতাকে আইন শেখানো হচ্ছে।
বৈদ্য, সেপাই, সেনাপতিদের সংলাপ তৈরি করতে হয়েছিল। এবং অবাক লাগে, পাখিটির মৃত্যুর পর— রাজার হুকুমে সেপাইরা তরোয়াল নাচিয়ে মৃত পাখিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। যেমন এখনকার গানস্যালুট। আমার তো গানস্যালুট দেখার কথা নয়, তখন তো টেলিভিশন কালের গর্ভে । নেহেরু বিধান রায় এদের গানস্যালুট হয়েছিল কি না জানতাম না। তরবারি নাচানোর পর নাটক শেষ হল। তখনই স্টেজে একটি বাচ্চা মেয়ে ঢুকলো, যার পিঠে এক বস্তা বই, পিছন-পিছন তিনজন— মেয়েটির মা বাংলা ছড়া শেখাচ্ছে, বাবা ইংরেজি ছড়া, আর মাস্টারমশাই নামতা। এবার পর্দা পড়ে। আমি আশ্চর্য হলাম অনেক পরে, ইয়োনেস্কো-র ‘দ্য লেসন’ নাটকটা পড়ার পর। (১৯৭৩/৭৪ নাগাদ)। ওখানেও একটি ছাত্রীকে লেখাপড়া শেখাতে-শেখাতে মেরে ফেলা হয়। কী আশ্চর্য মিল! রবীন্দ্রনাথ অত আগে ‘তোতাকাহিনী’ লিখে রেখেছেন, আর আমি কী করে ‘তোতাকাহিনী’র সঙ্গে আধুনিক সময়ে তাকে মিলিয়ে দিতে পারলাম আমার ১৮ বছর বয়সে?

আমি এর পরে আরও একটা নাটক লিখেছিলাম। ‘পঞ্চানন ও বর্ষা ঋতু’ নাম দিয়ে। মূল চরিত্র পঞ্চানন। একজন কৃষক। বর্ষা এসেছে, বীজধান নেবে। গ্রাম সেবক-বিডিও এখানে-সেখানে দৌড়াচ্ছে। সবাই ওকে উপদেশ দিচ্ছে আর রঙিন কাগজ জড়িয়ে দিচ্ছে। সরস্বতী পুজোর প্যান্ডেল সাজানোর জন্য রঙিন কাগজের রিল কিনতে পাওয়া যেত, সেই কাগজ দিয়ে পেঁচিয়ে দেয়া হচ্ছে— এরকমই ভেবেছিলাম। শেষে সর্বাঙ্গে রঙিন কাগজের ফিতে দিয়ে বাঁধা অসহায় পঞ্চানন ফিতে মুক্ত হতে চায়। ততদিনে শীতকাল এসে গেছে, এটা সম্ভবত ১৯৭৭/৭৮ নাগাদ লিখেছিলাম। ততদিনে, ‘ভূমি-রাজস্ব দপ্তর’-এ কিছুদিন চাকরি করে ফেলেছিলাম। যাই হোক, এই নাটকটা হারিয়ে ফেলেছি অনেকদিন আগেই। লিখে কয়েকজন বাল্যবন্ধুকে পড়িয়েছিলাম। প্রয়াত সোমক দাস-কেও শুনিয়েছিলাম। কোনও নাটকের দলকে পড়ে শোনাবে বলে, কোনও এক বন্ধু নিয়েছিল। তখন জেরক্সের সুবিধা ছিল না, ওটা কাকে দিয়েছিলাম মনে নেই। সম্প্রতি, ২০২৫ সালে আমার একটা নাটকের বই বেরিয়েছে, ‘ধর্ম পুতুল ও অন্যান্য নাটক’। ওখানে পাঁচটি নাটক আছে, তিনটির মঞ্চে অভিনয় হয়েছিল। ‘আকাশবাণী’তে কাজ করার কারণে, আমাকে অনেক ছোট নাটিকা লিখতে হয়েছিল। কোনওটাই নিজের কাছে রাখিনি, সবই হারিয়ে গেছে।
ওই পাড়াটার আরও কত স্মৃতি মনে পড়ছে, সব লিখতে ইচ্ছে করে, কিন্তু বেড়েই চলেছে আয়তন। গোপাল নামে একটি ছেলে ছিল। ও মাঝে-মাঝে সিনেমার ডায়লগ বলত। ‘রাজদ্রোহী’ সিনেমায়, উত্তমকুমার আর অঞ্জনা ভৌমিক ছিল। শেষদৃশ্যে নায়িকা চিন্তা বাঈ, আহত-রক্তাক্ত ও পড়ে যাচ্ছে, অঞ্জনা ভৌমিক মানে চিন্তা বাঈ। উত্তমকুমার ‘চিন্তা…চিন্তা’ বলে ছুটে আসবে, জড়িয়ে ধরে আদর করবে। আরও ডায়লগ ছিল। রোমান্টিক। মনে নেই। একটা ল্যাম্পপোস্টকে চিন্তা বাঈ সাজানো হত। গোপাল ছুটে এসে, ল্যাম্পপোস্টটাকে জড়িয়ে ধরে ডায়লগ বলত। একবার সেই ল্যাম্পপোস্টে গোবর মাখিয়ে রাখা হয়েছিল। গোপালের মুখে, গোবর লেপে গিয়েছিল। গোপাল বুঝেছিল, এটা আমাদের কাজ। ওরই মধ্যে বলেছিল… ‘চিন্তা… চিন্তা…তোমার গায়ে এত বিচ্ছিরি গন্ধ কেন চিন্তা…?’
গোপালের একটা স্টেশনারি দোকান ছিল বাগবাজার স্ট্রিটে। পৈত্রিক। বাবা গত। দোকানে গোপাল কিংবা গোপালের মা বসত। উল্টোদিকেই মেয়েদের ইস্কুল। তখন কিছু কিনলে, ফাউ চাইলে, একটু দিত। গোপাল মেয়েদের ফেরাত না। ফাউ দিয়ে-দিয়ে, গোপালের দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। ‘সাদা কাক’-এ নিয়ে লিখেছি।

কতসব চরিত্র! সবই এক-একটা গল্প। তারাদা নামে একজন ছিল। ওর ছিল একটা পান বিড়ির দোকান। ‘নররাক্ষস’-এর খেলা দেখিয়েছিল দু’বার। কী করে যেন ও রাক্ষসের মতই হয়ে যেত। চোখ বড়-বড়, লাল, জিভ বেরিয়ে যেত। একটা মুরগির গলা ছিঁড়ে নিয়ে, গলগলানো রক্ত চেটে নিত, মুখে মাখত। দু’হাতে পালক ছিঁড়ত। সে এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার! মিনিট ১৫ এরকম অবস্থায় থাকত, তারপর শুয়ে পড়ত। তারাদাকে জিজ্ঞেসা করেছিলাম— কী করে এমন করেন? তারাদা বলেছিলেন, শনিবারে ভর করে গুরুকৃপা। এটা নাকি ওঁর দেশের বাড়িতে, কোন গুরু শিখিয়েছিলেন। এর একটা মনোবিজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অবশ্যই আছে।
খোকা নামে একটি ছেলে ছিল, ও ঠিক ওই পাড়ার ছেলে নয়, বে-পাড়ার। ও সকালবেলা এসে, একটা ফুটবল নিয়ে নানারকম কায়দা করত, পায়ে নাচাত। পা থেকে মাথায়, মাথা থেকে কাঁধে, কাঁধ থেকে মাটিতে ফেলে, পায়ের পাতায় কয়েকবার নাচিয়ে, মাথায় কয়েকবার ছোট হেড মেরে— মাটিতে। ময়ূর পেখম তুলে নাচে, ময়ূরীর মন ভোলাবার জন্য। খোকাও তাই করত। গঙ্গারধারের একটা বাড়ি থেকে, এই মাঠটা দেখা যেত। একটি মেয়ে, মুগ্ধ চোখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে— এই পেখম নাড়ানো, থুড়ি বল নাচানো দেখত। প্রায় সব পাড়ার মতো ওই পাড়াতেও একজন স্বঘোষিত গার্জিয়ান দাদা ছিল, অজয়দা। খোকাকে বলেছিল, এখানে বল নাচালে, ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব। অনেক পরে নয়ের দশকে, অঞ্জন দত্তর একটা গান শুনি। ‘পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব, বলেছে পাড়ার দাদারা।’ খোকা আর আসেনি, তবে ওই মেয়েটাও চলে গিয়েছিল। ওরা ওই বাড়ির ভাড়াটে ছিল।

এসব যখন হচ্ছে, নবারুণ সংঘের রবীন্দ্রজয়ন্তী, ‘তোতাকাহিনী’ অভিনয়, হাতে লেখা পত্রিকা, ততদিনে অন্য একটা ব্যাপারও ঘটে চলেছে। যেখানে মারহাট্টা খালটা গঙ্গায় মিশেছে, ওখানে কিছুটা জায়গা ছিল সরকারি। ওখানে একটা লম্বা মতো বাড়ি উঠে গেল, আর ওখানে থাকতে লাগল কিছু সাহেব। গঙ্গায় দুটো বড় জাহাজ ভাসল। খাল বরাবর মোটা পাইপ বসতে লাগল। আসলে তখন সল্টলেক তৈরি হতে শুরু করেছে।
১৯৬৪ সাল হবে। একটা যুগোশ্লাভ কোম্পানি, সল্টলেক বানাবার ভার পেয়েছিল। কোম্পানিটার নাম, ‘ইনভেস্ট ইমপোর্ট’। গঙ্গা থেকে পলিমাটি কেটে, আরও জলের সঙ্গে মিশিয়ে, পাম্প মেশিনে ঠেলে একেবারে সল্টলেকে পাঠাত। পলিমাটি ওখানে থিতিয়ে যেত এবং জলটা খাল দিয়ে ফের গঙ্গায় ফিরে আসত। সল্টলেক এলাকা ছিল, ‘বিদ্যাধরী নদী’র পরিত্যক্ত খাত এবং খাঁড়ি। বহু আগেই, বিদ্যাধরী সরে গিয়েছিল। এলাকাটা ছিল অগভীর জলাভূমি। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি গ্রাম, মাছ ধরাটাই ছিল ওদের কাজ। এলাকাটা নস্কর পরিবারের। বিধান রায়, নস্করদের কাছ থেকে এই বিরাট জমি সহজেই পেয়ে যান এবং নতুন উপনগরী তৈরির পরিকল্পনা করেন ১৯৫৮ নাগাদ। ১৯৬৪ থেকেই কাজ শুরু হয়ে যায়।
উল্টোদিকেই মেয়েদের ইস্কুল। তখন কিছু কিনলে, ফাউ চাইলে, একটু দিত। গোপাল মেয়েদের ফেরাত না। ফাউ দিয়ে-দিয়ে, গোপালের দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। ‘সাদা কাক’-এ নিয়ে লিখেছি।
সাহেবদের মধ্যে এমন কয়েকজন ছিল, যাদের বেশ কম বয়স ১৮-১৯-২০ হতে পারে। দু’তিনজনের সঙ্গে আমাদের ভাব হয়ে গিয়েছিল। আমাদের এক বন্ধু ছিল ভেবলো, ওর সঙ্গে পাবলো নামের এক সাহেবের খুব ভাব হয়ে যায়। ভেবলোর তিন আঙুলে গুলির নিশানা, আর লাট্টু-লেত্তির কায়দাতেই পাবলো ফিদা হয়ে যায়। ভেবলোর বাংলা, পাবলোর বুঝতে অসুবিধা হত না। আবার পাবলোর ভাষাও ভেবলো বুঝে যেত। এখন জানি, যুগোশ্লাভিয়া মানে একটা দেশ নয়। গায়ে-গায়ে লেগে থাকা অনেকগুলো দেশ নিয়ে যুগোস্লাভিয়া তৈরি হয়েছিল। ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, শ্লোভানিয়া, মেসাভোনিয়া— এরকম সাতটা দেশ একসঙ্গে ছিল। তখন ভেঙে গিয়ে সব আলাদা হয়ে গেছে। পাবলো ক্রোয়েশিয়ান ছিল, না সারবিয়ান ছিল, নাকি শ্লোভানিয়ান ছিল, আমরা জানতাম না। একই রকম পোপোভিচ ভ্রাগন, চিসিকু— এরা সব ছিল, যারা আমাদের সঙ্গে কথা বলত। কে যেন বলেছিল, ‘চিসিকু, খায় গু’। চিসিকু বলেছিল, ‘থ্যাংকিউ-থ্যাংকিউ।’ এরপর অনেকেই বলত। চিসিকু হয়তো কিছু বুঝতে পারত, এটা কোনও মজা। তাই ও নিজেও প্রতিধ্বনির মতো বলত, ‘কায় গু…’ আমরা হেসে উঠতাম, হাততালি দিতাম। পরে হয়তো গূঢ়ার্থ বুঝেছিল। ও তখন নিজের ভাষায় কিছু বলত। ‘মেসিসো ওকে চান্দা’। এর গূঢ়ার্থ আজও জানি না। হাততালি দিতাম।

ওরা আমাদের কয়েকজনকে, ওদের ড্রেজারে নিয়ে গিয়েছিল। যেখানে গঙ্গা থেকে পলিমাটি তোলা হয়। পাহাড়ের কাছে বেঁধে রাখা অন্য একটা জাহাজ থেকে, সেই পলিমাটি ঠেলে পাঠানো হত সল্টলেকে। খাল বরাবর লালরঙের লোহার মোটা পাইপ, খাল বরাবর সল্টলেকের জলাভূমিতে গিয়ে পড়ত। কয়েকটা বুস্টিং পাম্পের ব্যবস্থাও ছিল। পলিমাটি থিতিয়ে, জলটা আবার খালেই ফিরে এসে, গঙ্গায় পড়ত। ড্রেজারে ইলেকট্রিকের কিছু গণ্ডগোল হয়ে, ভ্রাগন নামের এক জন সাহেব, শক খেয়ে গঙ্গায় ছিটকে পড়েছিল। গঙ্গা থেকে তোলার পর, ওর সেই শান্ত শুভ্র চেহারাটা মনে পড়ে।
এই যে এখন সল্টলেক সিটি, এত ঘরবাড়ি, পার্ক, বিউটিপার্লার, শপিংমলের নীচের বালির ভিতরে, গভীরে-গোপনে আছে— সেই সব পোপোভিচ, পাবলো, বুকাননদের উচ্ছ্বাস। মেসিসো, ওকে চান্দা, আমাদের হাততালি আর— পাম্পিং ইঞ্জিনিয়র ভ্রাগনের সেই শান্ত-শুভ্র লাশ। ওই সব যুগোশ্লাভিয়ান সাহেবরা, বন্ধু বলতে যা বোঝায়, ঠিক তাই ছিল না। কিন্তু ওদের কথা না বললে, কিছু বাকি থেকে যেত।
আরও কিছু বাল্যবন্ধু ছিল। একজনের নাম সন্তোষ। আমাদের বাড়িতে ওর মা কাজ করত। মা-ঠাকুর্মারা বলত, ‘সন্তোষের মা’। সেই ‘সি’-এর ছেলে, সন্তোষ। সন্তোষর মুখটা মনে আছে আজও স্পষ্ট। সন্তোষ গান গাইত, “এক পলকে একটু দেখা আর একটু বেশি হলে ‘খেতি’ কি?” সন্তোষের কাছেই শুনেছিলাম, ‘বেঘোবুড়ি’র কথা। যে নাকি, ‘ঝঙ্গলে’ থাকে। ‘ঝঙ্গলে ঝারা ক্যাঁকড়া ধরতি যায়, তাদের ভুলিয়ে বাঘের ডেরায় নিয়ি যায়।’ তখন বুঝিনি তেমন, অনেক পরে সুন্দরবনের কত কথা জেনেছি— ‘বনবিবি’, ‘দক্ষিণরায়’, ‘ধনা-মনা’, ‘শাজঙ্গুলি’— এদের কথা। সন্তোষের কথা তখন বারবার মনে পড়েছে। আরও কয়েকজনের সিপিয়া হয়ে যাওয়া ছবি ভিড় করল। আসছেই একে-একে। দেবকুমার, তেপো, পাঁচু… তোরা কেমন আছিস রে?




