‘সকলে সমস্বরে /একরাশ ঘৃণাভরে /চিৎকার করে বলে চোর চোর চোর…!’
প্রাক্তন শাসক দলের সংস্কৃতি-গোষ্ঠীর পরিচিত মুখ হওয়ার অনেক আগেই একটি গানে লাইনগুলো লিখেছিলেন গায়ক নচিকেতা। কে জানত, সেই দল ক্ষমতাচ্যুত হতে না হতেই এইভাবে ‘চোর চোর’ স্লোগান ঘিরে ধরবে তাদের সব নেতা-কর্মীকে। আক্রমণের লক্ষ্য বিবিধ নেতানেত্রী তো বটেই, স্লোগান-সংক্রমণ এমন যে, কলকাতা হাই কোর্টের চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা খোদ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত বাদ যাননি কুকথার রোষ থেকে। সম্প্রতি আইনজীবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে বারংবার ধেয়ে এসেছে ‘চোর’ স্লোগান। গোলমালের মধ্যে তাঁকে সরিয়ে নিতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছে পুলিশকে।
তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা বা দলীয় কর্মীরা বিভিন্নভাবে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করছেন। কেউ সরাসরি আঙুল তুলছেন বর্তমান শাসক দলের দিকে। তাদের সংস্কৃতি কতটা সংকীর্ণ, তা বোঝানোর চেষ্টা করছেন আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য। কেউ তলে তলে ভাবছেন বা বলেও ফেলছেন, এ তো হওয়ারই ছিল! এতদিন ধরে দলের অধিকাংশ নিচুতলার কর্মী থেকে শুরু করে উঁচুতলার দাদা-দিদিরা যেভাবে নির্লজ্জের মতো দু’হাত পেতে কেবলই অর্থ/সুবিধা/খ্যাতি ছিনিয়ে নিয়েছেন, তাতে ‘চোর’ অপবাদ ছাড়া এখন আর কী-ই বা প্রাপ্য!
তবে বিষয় হল, রাজনীতিতে কুকথা কিংবা অপবাদের প্রয়োগ শুনে-শুনে আমাদের কান এতদিনে যথেষ্ট অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। বাম আমলে তাবড় নেতাদের মুখনিঃসৃত বাণী নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। নাগরিক প্রতিবাদের স্রোতে বাঁধ দিতে বিনয় কোঙার, অনিল বসুর কুকথার প্রয়োগ নিয়ে বহুবার আপত্তি উঠেছে। গতবারের নির্বাচনে অর্থাৎ বিধানসভা ভোটের প্রচারে বাংলায় এসে প্রধানমন্ত্রীর ‘দিদি ও দিদি…’ বলে তৎকালীন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে সম্বোধন করা মোটেই ভাল চোখে দেখেননি সাধারণ মানুষ। বস্তুত, তা বুঝে এবারের নির্বাচনী প্রচারে সেই ধরনের ব্যক্তি-আক্রমণ থেকে সরে এসেছিলেন বিজেপি নেতারা। মনে করা হচ্ছে তাঁদের সেই কৌশল কাজেও দিয়েছে।
আরও পড়ুন : এআই ডেকে আনবে জলসংকট? ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৩১…
দেশ থেকে বিদেশ— রাজনীতির অলিন্দে সমালোচনার নামে কুকথা অনেক সময়ই হয়ে উঠেছে প্রতি-আক্রমণের অস্ত্র। কিন্তু এই মুহূর্তে যা ঘটছে, তাতে দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে ধরে সরাসরি সম্মানে আঘাত দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এখন প্রকাশ্যে ‘চোর’ স্লোগান দিচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকতেই পারে। যেসব জায়গায় এ-ধরনের বিক্ষোভ সংগঠিত হচ্ছে, সেখানে কোনও না কোনও রাজনৈতিক দল আলাদা করে মদত দিচ্ছে, এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু জনতার সংঘবদ্ধ ক্ষোভ যখন-তখন আছড়ে পড়লে সবটাই সবসময় পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না।
কুকথার নানাবিধ ধরন। কোনওটি মারাত্মক রূঢ়। কোনওটা হয়তো তুলনায় কম আগ্রাসী। এইটি বিচার করা কিছুটা আপেক্ষিকও। ব্যক্তি-পরিসরে প্রত্যেকের চিন্তনের ধরন অনুযায়ী সে বুঝবে, কোন কথাটি দুর্বল জায়গায় আঘাত (বিলো দ্য বেল্ট) আর কোনটি রাজনৈতিক ভাষ্যে মেনে নেওয়া চলে। কিন্তু কুকথার স্রোতের মধ্যে ‘চোর’ অপবাদটির আলাদা একটা অভিঘাত আছে আমাদের মননে। আপনি হয়তো বদমেজাজি হতে পারেন, লোভী হতে পারেন, রাগ দেখিয়ে জিনিস ভাঙচুর আপনার স্বভাব হতে পারে, সর্বদা চেঁচিয়ে কথা বলে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে চাইতে পারেন, অন্যের সমালোচনা সহ্যই করতে পারেন না, এমনকী, মিথ্যেবাদী পর্যন্ত হতে পারেন… কিন্তু চোর! এই অপবাদটি আজও এই সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েও কোথাও একটা সজোরে ধাক্কা দেয়।
প্রায় সাঁইত্রিশ বছর আগে চোর স্লোগান শোনা গিয়েছিল প্রয়াত কংগ্রেস নেতা এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে। ‘গলি গলি মে শোর হ্যায়/ রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়’— ১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বফর্স কেলেঙ্কারিতে নাম জড়ানোয় রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে এই স্লোগান দিয়েছিলেন বিরোধীরা। দেওয়ালে লেখা থাকত এই লিখন। বহু বছর পর রাফাল বিতর্কে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও আক্রমণ করে রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধীরা স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘চৌকিদার চোর হ্যায়।’
কিন্তু মনে রাখতে হবে, আদানি-আম্বানিদের কাছে যা মহাবিদ্যা, তা আমজনতার কাছে মহা-অপমানের সমান। যখন সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে নেতা-নেত্রীরা সরকারে থেকে নিজের পকেট যেনতেনপ্রকারেণ ভরে ঔদ্ধত্যের পরিচয় দেন, তখন ভোটবাক্সে তার জবাব দেয় মানুষ। প্রকাশ্য রাস্তায় নেমে নির্বাচনে পরাজিত নেতানেত্রীদের ‘চোর চোর’,বলে চিৎকার করে স্লোগান দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হয়। জনতা জানে, দু’দিন বই তো নয়। হয়তো আবার অন্য দলে ঢুকে নিজের পিঠ বাঁচিয়ে নেবেন দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা বা নেত্রী। তার আগে যতটা মনের জ্বালা মিটিয়ে নেওয়া যায়!
মার্কিন সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ-এর ‘জার্নাল ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন’-এ গত বছর লেখা একটি প্রবন্ধে (‘স্পিচ রিপ্রেশন অ্যান্ড থ্রেট ন্যারেটিভস ইন পলিটিক্স-সোশ্যাল গোলস অ্যান্ড কগনিটিভ ফাউন্ডেশনস’) লেখক আতোঁয়া মেরি দেখিয়েছেন, ‘জনমানসে আগে থেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত কোনও আইনলঙ্ঘনকারীর (এক্ষেত্রে নেতা) বিরুদ্ধে মানুষ যখন সংঘবদ্ধ হয়ে স্লোগান দেয়, সেটা একটা সামাজিক লক্ষ্যপূরণ হিসেবে কাজ করে। সকলের মনে হয়, এটাই হল গিয়ে নৈতিক শাস্তি।’ তা সে তাৎক্ষণিক সময়ের জন্য হলেও। চোর স্লোগান আমি একা দিচ্ছি না, আরও পাঁচজন একইভাবে আমার সঙ্গে তিতিবিরক্ত হয়ে রাজনৈতিক নেতানেত্রীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে। এটা একটা বৈধতা তৈরি করে আমাদের মনে। দুর্নীতিগ্রস্ত নেতানেত্রী নিজেদের যতই শিক্ষিত, সৎ বলে দাবি করুন না কেন, জনতার কাছে তাঁদের নৈতিকতা, বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যে এসে ঠেকেছে। তাঁরা নিজস্ব দুষ্কর্মের দ্বারা সেটা প্রমাণ করেছেন। তাই চোরের মতো নিকৃষ্ট শব্দ প্রয়োগ করে সেই নেতা বা নেত্রীকে এক পলকে টেনে নামিয়ে ফেলা যায় জঘন্য অপরাধীর স্তরে। এটুকুই সাময়িক স্বস্তি দেয় জনতাকে।
তাই ডিজে-র ছন্দে বানানো গান ‘শওকত তো মাছ চোর’ ভোটের ফল বেরনোর আগে এত ভাইরাল হয়। বোমা বাঁধুক, নটোরিয়াস ক্রিমিনাল হোক, ভাঙড়ের তৃণমূল নেতা শওকত মোল্লার মান যায় কুখ্যাত মাছ চোর হয়ে! বিজেপি নেতাদের বিজয় মিছিলে সেই গান একই সুরে বাজে, তবে শওকতকে ছেড়ে ‘ফাইল চোর— পিসি চোর— ভাইপো চোর’-এ তা পর্যবসিত হয়।
সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হয় রাজনীতিবিদদের। তবে তাঁদের মাথায় রাখা উচিত, ক্ষমতার অপব্যবহার করতে করতে এমন দিনে এসে নিজেকে না দাঁড় করান, যেখানে যে কেউ এসে জুতো কিংবা কাদা ছুড়ে চলে যেতে পারে। চিৎকার করে বলে যেতে পারে— চোর চোর চোর! মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলে কী কী হয়, কিচ্ছু বলা যায় না।




