ছবির ‘মন’

Representative Image

আটের দশকের কলকাতা। ইন্দিরা গান্ধী এসেছেন এআইসিসি-র (অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি) মিটিঙে। সে-বছর ‘নেতাজি ইন্ডোর’-এ এআইসিসি-র সভা হয়েছিল। আমি গিয়েছিলাম ‘আজকাল’-এর তরফ থেকে কভারেজে। ইন্দিরা গান্ধী মঞ্চে বসে, লিখছিলেন। এ-কথা অনেকেই জানেন, উনি চিত্রগ্রাহকদের জন্য আদর্শ ‘সাবজেক্ট’। তখন তো কংগ্রেসের নেতামন্ত্রীদের ঘিরে এত সিকিউরিটি থাকত না, কংগ্রেসের সেবাদল পাশে থাকত। সে-দিন উনি বুঝতে পারছিলেন, ওঁর ছবি তোলা হচ্ছে, ফলত নানাভাবে পোজও দিচ্ছিলেন। কখনও লিখছেন, কখনও পেন্সিল মুখে দিয়ে ভাবছেন— এমন আর কি…সুযোগ পেয়ে ছবিও তুলেছিলাম নানাভাবে। স্বাভাবিকভাবেই খুব ভিড় হয়েছিল। একটা সময়ে, সামনে রাখা ফুলদানি আমার হাত-লেগে পড়ে যায় হঠাৎ। সঙ্গে-সঙ্গে সেবাদল এসে আমাকে ধরে নিল। ইন্দিরা গান্ধী সেটা দেখতে পেয়ে মাথা নেড়ে, স্টেজ থেকে নিষেধ করে, আমায় ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেছিলেন। রঘু রাই তখন উঠে এসে পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে সাপোর্ট করেছিলেন, ওঁর দাঁড়িয়ে থাকটাও তো একটা বড় সাপোর্ট! সেই ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। তারপরে দিল্লি এআইসিসি-কভার করতে যাওয়ার সময়ে, কাজের সূত্রেই আলাপ-পরিচয় আরও এগিয়েছে।

নানা সময়ে কলকাতা এসেছেন রঘু রাই। ’৯২ সালে সত্যজিৎ রায় মারা যাওয়ার পর, মাদার টেরেজা যখন অসুস্থ ছিলেন তখন, সে-সময়ে রঘু রাই-ই একমাত্র অনুমতি পেয়েছিলেন, হাসপাতালের ভেতরে অসুস্থ মাদারের ছবি তোলার। ক’বছর আগে, আমরা একসঙ্গে ব্রিটিশ কাউন্সিল আয়োজিত এক প্রতিযোগিতার বিচারক মণ্ডলীতে ছিলাম। বছর দু-এক আগে, মায়া আর্ট স্পেস একবার একটা আন্তর্জাতিক স্তরের স্থিরচিত্র-প্রদর্শনী করেছিল, তখন একসঙ্গে কাজ করেছিলাম আমরা।

আরও পড়ুন: কলকাতা মন ভাল করা শহর, সবার মুখেই যেন হাসি, এমনই অনুভূতি ছিল রঘু রাইয়ের! লিখছেন গৌতম ঘোষ…

রাজীব গান্ধী মারা গেলেন ১৯৯১ সালে। মে মাসের দিল্লি। কাঠফাটা রোদ্দুর। সে-সময়ে কলকাতা থেকে দিল্লিতে গিয়েছিলেন দু’জন চিত্র-সাংবাদিক। আমি আর তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়। দিল্লিতে কিছুই তেমন চিনি না, হুইলার্সের স্টল থেকে একটা ম্যাপ কিনে সব জায়গা দেখে রাখছি। রাজীব গান্ধীকে দাহ করা হয়েছিল রাজঘাটে। সেই মেমোরিলাল এখন ‘বীরভূমি’ নামে পরিচিত। প্রসঙ্গত, বীরভূমির কাছেই শক্তিস্থল, যা ইন্দিরা গান্ধীর দাহস্থল ও স্মৃতিফলক। যাই হোক, গেটে ঢোকার মুখে রঘু রাইয়ের সঙ্গে দেখা। বললেন, ‘যাও, তুমহারা স্ট্যান্ড লাগাকে রাখ্‌খো।’ অর্থাৎ, আগে গিয়ে জায়গা রাখার কথা বলছিলেন।    

রঘু রাই ও অমিত ধর

আসলে রঘু রাই সম্পর্কে লিখতে গেলে তো অনেক কথা ভিড় করে আসে, ক্যামেরা-কাঁধে জীবন কাটিয়েছেন। কী সৃষ্টিশীল জীবন! অপূর্ব এক ফ্রেমকাহিনি! কলকাতাকে চিনেছেন মনে-প্রাণে, একাগ্রভাবে। বহু বিখ্যাত মানুষ ওঁর সঙ্গে কলকাতা ঘুরেছেন, সে-কথা বহুল আলোচিত। স্ট্রিট-ফটোগ্রাফিতে ওঁর তুলনা নেই বললেই চলে! আমি শুধু একটা উদাহরণ দিই। আমা স্ট্রিটের লোহাপট্টিতে যে-লোহাগুলো বের করা হয়, সেই যে দৃশ্য… একসঙ্গে কুড়িটা লোক লোহা বের করছে, পথচারীরা যাচ্ছে পাশ দিয়ে, এ-ধরনের ছবি, রঘু রাই-ই নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। আসলে ছবির কাজই তো তাই, ছবি একটা নতুন সৃষ্টি। খুব সাধারণ বিষয়ের ছবি যে কীভাবে স্বতন্ত্র করা যায়, সে-বিষয়ে ওঁর প্রায়োগিক ধারণা ছিল অদ্বিতীয়। ওঁর মনোযোগও ছিল আশ্চর্য! কোথাও ছবি তুলতে গেলে, সেখানে দাঁড়িয়ে— নিজের সাবজেক্টটুকু ছাড়া আর কিছুই দেখতেন না! একসঙ্গে দু’তিনটে ক্যামেরা ব্যবহার করতেন, আর একটু বেশি এক্সপোজারে— পরপর প্রচুর ছবি তুলতেন। এটাই বিশেষ করে দিয়েছে ওঁর ফ্রেম-কম্পোজিশনকে। সাংবাদিক-সত্তার দিক থেকে ভাবলেও, স্বতন্ত্র একটা ‘ঘরানা’ ছিল ওঁর, যার প্রভাব এসে পড়েছে ওঁর ফ্রেমে।

ভারতীয় জাদুঘরে রঘু রাই ও যোগেন চৌধুরী। ছবি অমিত ধর

শেষের দিকে হুইল চেয়ারে বসে যখন পুরস্কার নিতে যাচ্ছিলেন, মন খারাপ হয়েছিল এই ভেবে, অত বড়, ছ’ফুট লম্বা লোকটার কী করুণ অবস্থা! নানা মজার-মজার কথা বলতেন। সেন্স অফ হিউমার ছিল অভূতপূর্ব! তিরুপতিতে একবার এআইসিসি-র কনফারেন্স হয়েছিল। সেখানে মিডিয়াসেন্টার হয় মরুভূমির মতো জনমানবহীন একটা জায়গায়। এদিকে, কনফারেন্সের জন্য স্থানীয় পানশালাগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। রঘু রাই তখন মজা করে বলেছিলেন, ‘চলো, মিডিয়া সেন্টারেই আমরা বার খুলে নিই!’

শেষের দিকে ‘মন’ নিয়ে খুব কথা বলতেন; একবার বলেছিলেন, মন ভাল না থাকলে ভাল ছবি তোলা যায় না। মানুষের মন খারাপ থাকলে ‘ইমেজ’-এ তার প্রভাব পড়বেই। ছবি তোলার ক্ষেত্রে, ‘মাইন্ড-ম্যানেজমেন্ট’ খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ওঁর কাছে। ওঁর ছবির মধ্যে থাকা এই ‘মন’টুকুই চিরন্তন হয়ে থাকবে।