প্রয়াত রঘু রাই। তাঁকে নিয়ে নির্মিত ‘রঘু রাই: অ্যান আনফ্রেমড পোর্ট্রেট’ ছবির কার্যনির্বাহী প্রযোজক ছিলেন অনুরাগ কাশ্যপ। রঘু রাইয়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ যোগাযোগ, তাঁর কাজে রঘু রাইয়ের প্রভাব নিয়ে ডাকবাংলা.কম-এর জন্য অনুরাগ কাশ্যপের একান্ত সাক্ষাৎকার, কথোপকথনে বিদিশা চট্টোপাধ্যায়।

রঘু রাই বলতে আপনার প্রথমেই কী মনে পড়ে?
অপূর্ব মানুষ ছিলেন রঘু রাই। ওঁর ছবি দেখতে-দেখতে দেশের ঐতিহাসিক মানচিত্রটাও যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অসম্ভব জীবনীশক্তি ছিল ওঁর, সবসময় ‘ফুল অফ লাইফ’।
ওঁর সঙ্গে প্রথম দেখা কবে হয়েছিল?
প্রায় ১৭ বছর আগে, ২০০৯ সালে, কালা ঘোড়ায় ওঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, মনে পড়ে।
দেখা হওয়ার আগেই নিশ্চয় ওঁর ছবির সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেছে?
অবশ্যই! দেখা হওয়ার আগে ওঁর ছবি দেখেছি, বই পড়েছি। ওঁর ছবি যখন প্রথম দেখেছিলাম, তখন সেসব ছবির ঐতিহাসিক তাৎপর্য যে বিরাটভাবে বুঝেছিলাম, তা নয়, তখন বয়স অনেকটাই কম। কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের চিহ্নগুলো ওই ছবিগুলোতে খুবই সুস্পষ্ট ছিল। তবে ওঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বুঝেছিলাম, ওই ছবিগুলোর আসল ওজন। যখন ওঁর থেকে গল্প শুনেছিলাম যে, কীভাবে ওই ছবিগুলো উনি তুলতে পেরেছেন, তখন বুঝেছি, কী মারাত্মক কাজ উনি করেছেন। ওগুলো সাধারণ ছবি নয়! যে-কোনও আলোকচিত্রী ওই ছবিগুলো তুলে ফেলতে পারবে না। ছবি তোলার ব্যাপারে খুবই কঠোর ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গেও কঠোর ছিলেন, বাকিদের সঙ্গেও।
আরও পড়ুন: পঁয়ত্রিশ বছর পর একাত্তর সালের নেগেটিভগুলি খুঁজে পেয়েছিলেন রঘু রাই! লিখছেন শহিদুল আলম…






ওঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে ওঁর ছবিগুলো শুধুই স্থিরচিত্র হিসেবে এসেছিল আমার কাছে। মনে হয়েছিল, একজন আলোকচিত্রী ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে ওই ছবিগুলো তুলেছেন, এইটুকুই। ওঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে ধীরে-ধীরে আমি ছবিগুলোর নেপথ্যকাহিনি জানতে পারি, এবং ছবিগুলোর গুরুত্ব বুঝতে পারি।
ক্যান্ডিড ছবি, স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি নিয়ে এখন এত কথা হয়, এই বিষয়টাকে ‘রেভোলিউশনালাইজ’ করার কাজটা তো প্রথম রঘু রাই-ই করেছিলেন…
এমন-এমন ছবি তুলেছিলেন রঘু রাই, যা আর কেউ তুলতে পারতেন না। ওঁর ছবিগুলোই কেবল বৈপ্লবিক ছিল না, ওঁর অ্যাটিটিউড ছিল বৈপ্লবিক, ওঁর সাহস ছিল বৈপ্লবিক, বৈপ্লবিক ছিল ওঁর ‘বিন্দাসনেস’। একটা ছবি তো ছবি হিসেবেই এসে পৌঁছয় আমাদের কাছে, কিন্তু ওঁর প্রতিটা ছবিতে একটা করে গল্প ছিল।
কিন্তু একটা ছবি দেখতে গিয়ে তো নিজের মনেও কিছু গল্প তৈরি হয়…
আমিও তো একজন ‘স্টোরিটেলার’, আমি হয়তো ছবিগুলো দেখে নিজের মতো করে একটা গল্প সাজিয়ে নিতে পারি, কিন্তু প্রতিটি ছবির নেপথ্যে আসল যে গল্পগুলো, সেগুলোই ছবিগুলোকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়।

আপনার চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে রঘু রাইয়ের প্রভাব আছে?
আমি ক্যান্ডিড ছবি থেকেই চলচ্চিত্র নির্মাণের পাঠ নিয়েছি। আমার ফিল্মমেকিংয়ের মূল চাবিকাঠি হল ‘অথেন্টিসিটি’, যা আমি সত্যিকারের ফোটোগ্রাফি থেকে শিখেছি। রঘু রাইয়ের থেকে শিখেছি, শিখেছি কার্তিয়ের ব্রেসঁ-র থেকে। রঘু রাইয়ের সাদা-কালো ছবির বই আমাকে খুবই অনুপ্রাণিত করেছে। ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ দেখলে বোঝা যাবে, আমার অবচেতনে রঘু রাইয়ের অনুপ্রেরণা কতটা ভর করে ছিল।
আপনার ছবি দেখতেন রঘু রাই?
দেখতেন। খুব প্রশংসাও করতেন। এটাও মনে আছে, রঘু রাই একবারই আমার থেকে সাহায্য চেয়েছিলেন, ওঁর মেয়ে অভনি রাই-য়ের জন্য।
সেটা বোধহয় ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’-এর সময়?
‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’-এর পোস্ট প্রোডাকশনের জন্য রঘু রাই অভনিকে পাঠিয়েছিলেন আমার কাছে। বলেছিলেন, ‘ইসকো তুম সামহালো’। কিন্তু এমনিতে অভনির খুব একটা সাহায্যের প্রয়োজন ছিল না। ততদিনে অভনি রীতিমতো পরিণত একজন আলোকচিত্রী। আমি আমার মতো করে যা পারি, তাই করেছিলাম। রঘু রাইকে নিয়ে অভনির নির্মিত তথ্যচিত্রটির (রঘু রাই: অ্যান আনফ্রেমড পোর্ট্রেট) কার্যনির্বাহী প্রযোজক ছিলাম আমি। অভনির কাছে তখন স্পষ্ট ছিল না, কে রঘু রাই। অভনিও ধীরে-ধীরেই বুঝেছে বাবার কাজগুলোকে। যখন অভনির সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে, তখন অভনি ওর বাবার ওপর খানিক ক্ষুব্ধও ছিল, কারণ বাবা ওকে সময় দেননি। আমি ওকে একটা টাস্ক দিয়েছিলাম, বলেছিলাম, তুমি তোমার বাবাকে, বাবার কাজগুলোকে বোঝার চেষ্টা করো। একটা তথ্যচিত্র বানাও, আমি ফান্ড করছি। ওই কাজটার মধ্য দিয়েই ও ধীরে-ধীরে ওর বাবাকে বুঝল, ফোটোগ্রাফি সম্পর্কে ওর ধারণা আরও পরিষ্কার হল। ওটা ওর বাবাকে বোঝার জন্য একটা যাত্রাপথ ছিল। পরে তো আন্তর্জাতিক প্রযোজকরাও এই কাজটার সঙ্গে যুক্ত হলেন।
রঘু রাই বলেছিলেন, ‘ইউ নিড আ কুল মাইন্ড উইথ আ ওয়ার্ম হার্ট’। আপনার কি মনে হয়, সৃষ্টি যিনি করেন, তাঁর এই মানবিক অনুভবটা থাকা জরুরি?
প্রথমেই বলি, রঘু রাইয়ের হৃদয় এতটাই মাখনের মতো নরম ছিল, যে তা দিয়ে পরোটা বানানো যায়। সৃষ্টি যিনি করেন, তাঁকে অনেককিছু মেনে নিতে হয়। আমি সৃষ্টি যেমন করছি, তেমন ক্যাপচারও করছি। আর ক্যাপচার করতে গেলে আমাকে চুপচাপ অপেক্ষা করা শিখতে হবে। নেপথ্যে থেকে জীবনকে তুলে ধরাই আসল।
রঘু রাই ‘সাইলেন্স’ বা নীরবতার কথাও বলতেন…
সাইলেন্স না থাকলে, নীরবতা না থাকলে, সামনের বাস্তবতাকে তুমি ঘেঁটে ফেলবে। তোমাকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে থাকতে হবে।
আপনার ছবিতে একটা ‘ক্যাওস’ ধরা পড়ে…
কারণ, ইন্ডিয়া ‘ক্যাওটিক’। ভারত এমনটাই।
কিন্তু অতিরিক্ত ক্যাওসেও তো নীরবতা তৈরি হয় অনেকসময়। মানে ক্যাকোফোনি তো একটা পর্যায়ে নীরবতা হয়েই ধরা দেয়, অত্যধিক নয়েসে আমরা আর কিচ্ছু শুনতে পাই না…
ঠিকই। ওই যে বললাম, অদৃশ্য হয়ে থাকতে হবে, না-হলে ওই ক্যাওস, এবং তার অন্তর্লীন নীরবতা, কোনওটাই কোনওদিন ধরা পড়বে না।

রঘু রাইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্বটা গড়ে উঠল কীভাবে?
রঘু রাই ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ দেখেছিলেন। তার সূত্রেই যোগাযোগ। তবে মজার ব্যাপার কী জানেন, কালা ঘোড়ায় ওঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে অবধি আমার ধারণাই ছিল না, লোকটাকে ঠিক কেমন দেখতে! ওঁর তোলা ছবিই শুধু দেখেছি তার আগে অবধি। ওঁর সঙ্গে আলাপ হওয়ার সময় বিস্ময়টাও তাই জোরদার ছিল।
অভনির সঙ্গে রঘু রাইয়ের সম্পর্কের যে চোরাস্রোতটার কথা বললেন, আপনি নিশ্চয়ই বাবা হিসেবে সেটা উপলব্ধি করেন এখন?
আমি আমার মেয়েকে দিয়ে বুঝি তো বটেই। বাবা বা মা শিল্পী হলে সন্তানের এটা হয় বলেই আমার ধারণা। আমার মেয়েরও বুঝতে সময় লেগেছে, আমি কী। আসলে শিল্পীরা একটু মনোযোগ পায়, কখনওসখনও একটু অতিরিক্ত মনোযোগই পায়। সেটা সন্তানকে একটু দূরে সরিয়ে দেয়।
শেষ কবে দেখা হয়েছে ওঁর সঙ্গে?
সে প্রায় দশ-এগারো বছর আগে। বহুদিন যোগাযোগ ছিল না।
ওঁর সবচেয়ে প্রিয় ছবি কোনটা আপনার কাছে?
আমি ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির ছবিগুলোর কথা বলব। সাংঘাতিক ছবি ওগুলো!

রঘু রাইয়ের ‘এক্সপোজার: পোর্ট্রেট অফ আ কর্পোরেট ক্রাইম’ বইটিতে ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার ভয়াবহতা উঠে এসেছিল। সেই কাজ কি এই ভারতে সম্ভব হত?
অসম্ভব! তখন একটা ঘটনা ঘটছে মানেই রঘু রাইয়ের ক্যামেরা সক্রিয়। আজকের ভারতে ফোটোগ্রাফি বাদ দিচ্ছি, কোনও ক্ষেত্রেই ওইরকম কাজ আর সম্ভব নয়। আজকের ভারতে রঘু রাইয়ের কোনও অস্তিত্বই থাকত না। হয়তো এই কাজটার জন্য আজ তাঁর হাজতবাস হত।
অনেকেই বলত, রঘু রাই ভারতের আত্মাকে ধরতে পারেন তাঁর ক্যামেরার মধ্য দিয়ে। ভারতের ‘ভিস্যুয়াল কালচার’ তাঁর তৈরি করা।
যে পুরনো ভারত, যা নিয়ে আমরা ‘নস্টালজিক’ হয়ে পড়ি, আমি যদি আমার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরতে চাই, তাহলে প্রাথমিকভাবে রঘু রাই, তারপর দয়ানীতা সিং ছাড়া আর কার কাজ আছে বলুন তো!
রঘু রাই ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ দেখেছিলেন। তার সূত্রেই যোগাযোগ। তবে মজার ব্যাপার কী জানেন, কালা ঘোড়ায় ওঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে অবধি আমার ধারণাই ছিল না, লোকটাকে ঠিক কেমন দেখতে! ওঁর তোলা ছবিই শুধু দেখেছি তার আগে অবধি। ওঁর সঙ্গে আলাপ হওয়ার সময় বিস্ময়টাও তাই জোরদার ছিল।
সত্যিই তাই! তার ওপর সোশ্যাল মিডিয়া ও রিলসের এই জমানায় ওই ‘ভিস্যুয়াল কালচার’ তো আরওই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হয়েছে তো বটেই। রিলস এখন আত্মকেন্দ্রিকতার উদযাপন। একটা ফোন ক্যামেরা এখন আয়না হয়ে গেছে, মানুষ সেখানে নিজেকে টপকে আর কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না।
রঘু রাইয়ের প্রাসঙ্গিকতা কি তাহলে আগেই হারিয়েছে?
তা বলব না। রঘু রাই ফোন ক্যামেরাতেও ছবি তুলেছেন।
আপনি কি কখনও সাদা-কালো বা মনোক্রোমে ছবি বানাবেন?
আমি ভীষণভাবে চাই, কিন্তু প্রযোজক পাই না।




