মেঘে মেঘে বেলা : পর্ব ২

রাগ-অনুরাগ

আমার এখন প্রায় সবসময় মনে হয়, হাতে একটা লাঠি নিয়ে সবাইকে পেটাই। কেউ কথা না শুনলে, বোকা-বোকা কথা বললে, কেউ কোনও কথা না-শোনার ভান করলে, এক ভুল বারবার করলে, কানের কাছে কারণ বা অকারণে ঘ্যানঘ্যান করলে বেদম রাগ হয়। এটা অবশ্য হওয়ারই কথা। কারণ এখন আমার মাঝবয়স। আর পাঁজিতে নিশ্চয়ই কোথাও লেখা আছে যে, মাঝবয়সি মেয়েরা নাকি কথায়-কথায় রেগে যায়, অনেক সময় তো কারণ ছাড়াই। এরকমটাই চলছে এখন বাজারে, অবশ্য আগেও বাজারে এটাই চলত বোধহয়! আমি ব্যতিক্রম নই! অন্যের মুখে ‘আজকাল তোমার মেজাজটা ভারি খারাপ’— বাক্যটা এমন সর্বব্যাপী যে মনে হয়, আকাশ থেকে রাশভারী কণ্ঠে দৈববাণী হচ্ছে। 

কেন মাঝবয়সি মেয়েরা কথায়-কথায় রেগে যায়? মাঝবয়সের নতুন হবি? না কি হাতে অঢেল সময়, তাই বেশিরভাগটা রাগ করে কাটায়? না কি, ‘মেয়েরা এরকমই হয়!’ এই কথাগুলো শুনলেই তো রাগ তড়াং করে মাথায় উঠে যায়। কিন্তু আইপিএল, চ্যাটিং, নেটফ্লিক্স, অফিসের ব্যস্ততার মাঝে মহামূল্যবান সময়ের একটু বের করে যদি ভাবা যায়, তাহলে দেখা যাবে, আসলে মেয়েরা ‘অতিরিক্ত সহ্য করা’ নামের যে চাকরিটা এতদিন বিনা বেতনে করে এসেছে, সেটা থেকে এই বয়সে ধীরে ধীরে অবসর নেয়। আর অবসর নেওয়ার সময় যেভাবে সরকারি দপ্তরের বরিষ্ঠ কেরানি ধুত্তোর বলে শেষ ফাইলটা ছুড়ে ফেলেন, মেয়েরাও তেমনই রাগটা ছোড়ে এবং সবাই ওটা দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।

রাগ অনুভূতিটা মাঝবয়সি মেয়েদের নতুন আবিষ্কার নয়। রাগ ছিল, আছে, থাকবে। শুধু এতদিন সেটা গিলে ফেলা হত—জলের সঙ্গে, ভাতের সঙ্গে, স্বামীর কথার সঙ্গে, শাশুড়ির ‘আমাদের সময় এসব হত না’-র সঙ্গে, অফিসের ‘আপনি তো মা, আপনি বুঝবেন’-এর সঙ্গে। কিন্তু একটা বয়সের পর শরীর বলে— ‘দাদা, আর হবে না। লিমিট ক্রস হয়ে গেছে।’

মাঝবয়সি মেয়েদের শরীর যেন অন্তহীন টক শো! সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়ের কলমে ‘মেঘে মেঘে বেলা’ পর্ব ১…

এবং এই মাঝবয়সেই শুরু হয় সেই মহাপর্ব— হরমোনের রোলার-কোস্টার। মেনোপজ, প্রি-মেনোপজ, পেরি-মেনোপজ— এইসব শব্দ শুনলে অনেকের মনে হয় কোনও ইউরোপীয় ট্রেন রুট। কিন্তু আসলে এটা শরীরের ভেতরের এক বিশাল ‘বিভাগীয় রদবদল’। আগে ইস্ট্রোজেন-প্রোজেস্টেরন নিয়ম করে ডিউটি করত। এখন তারা ধর্মঘটের নোটিশ দিয়ে, কখনও আধঘণ্টা কাজ করে, কখনও তিনদিন সাইলেন্ট মোডে। আর শরীর? সে থতমত খেয়ে, হাঁউমাঁউ করে, তুলকালাম ছোটাছুটি বাগিয়ে, কোনওমতে ঠেকনা দেওয়ার চেষ্টা করে। 

এর ফল কী হয়? হঠাৎ মেয়েটার মাথা গরম হয়ে যায়। কেন? কেউ ফ্রিজের দরজাটা খুলে রেখেছে। কেউ ভেজা তোয়ালে বিছানায় ছুড়ে রেখেছে। কেউ রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে বলেছে, ‘আজ বড্ড ঝাল হয়েছে!’ এই ছোটখাট ঘটনাগুলোই নাকি মহাপাপ! কিন্তু আসল সত্যিটা হল— এগুলোই আসল কারণ নয়, এগুলো শেষ ফোঁটা। গ্লাসটা যে চল্লিশ বছর ধরে ভরে-ভরে উঠছে, সে খবর কারও কাছে নেই।

মাঝবয়সি মেয়েদের রাগকে সমাজ একটা কমেডি হিসেবে দেখে। ‘ওই যে, আবার শুরু করেছে!’— বলে লোকজন হাসে। সিরিয়ালে দেখায়, মা চরিত্রটি রেগে গিয়ে বাচ্চাদের পিছনে তাড়া করছে। স্বামী বলছে, ‘মেনোপজ চলছে বুঝি!’ ব্যস, ন্যারেটিভ সেট: হরমোন= পাগলামি।

কিন্তু বাস্তবটা একটু আলাদা। হরমোন মেয়েদের রাগ বাড়ায় না— হরমোন মেয়েদের ‘সহ্য করার ফিল্টার’-টা সরিয়ে দেয়। এতদিন যে ফিল্টারে সমাজের বাজে কথা ছেঁকে নেওয়া হত— ‘তুমি তো মেয়েমানুষ’, ‘এতক্ষণ ধরে সাজগোজ?’, ‘তোমার তো রাগ করা উচিত নয়’, আর ‘কবে বিয়ে করবি?’ বা ‘বিয়ে করলি না কেন? কেউ কি ছিল?’, ‘আরে বিয়ের দু-বছর হয়ে গেল, এখনও বাচ্চা হল না কেন? কোনও গণ্ডগোল আছে?’— এইসব ছেঁকে-ছেঁকে মেয়েরা বাঁচত। মাঝবয়সে এসে সেই ফিল্টারটা ছিঁড়েখুঁড়ে যায়। তারপর যা ঢোকে, সরাসরি ঢোকে। ফলে প্রতিক্রিয়াটাও সরাসরি।

এবার শরীরের কথা বলি। হরমোনের পরিবর্তনে ঘুম নষ্ট হয়। ঘুম নষ্ট হলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কম সহ্য করতে পারে। তার ওপর আছে ‘হট ফ্লাশ’— মাঝরাতে হঠাৎ মনে হবে, শরীরের ভেতরে কেউ উনুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তারপর ঠান্ডা ঘাম। তারপর আবার শীত। এই চক্র চলতে থাকে। সকালে উঠে মেয়েটা দেখে, সে শুধু ঘুমোয়নি— সে যুদ্ধ করে উঠেছে।

এমন যুদ্ধের পর যখন বাড়িতে কেউ বলে, ‘আজ টিফিনে কী দিচ্ছ?’ তখন রাগটা অকারণ নয়। এটা রাষ্ট্রীয় প্রতিবাদ। কারণ সেই ‘টিফিনে কী?’ প্রশ্নটার মানে আসলে— ‘তোমার কাজটা তো স্বাভাবিকভাবেই তোমার।’ আর মাঝবয়সে এসে মেয়েরা প্রথমবার টের পায়— স্বাভাবিক বলে কিছু নেই, সেটা সমাজ গজাল মেরে শিখিয়েছে। তার মনে হয়, টিফিনটা যার, সে-ই বা তৈরি করে গুছিয়ে নিতে পারছে না কেন? তার কাজটা মেয়েটিকে করে দিতে হবে কেন, আর সেই লোকটা সেটা তার জন্মগত পাওনা বলে ধরে নেবে কেন? ফলে এই রাগ হচ্ছে হরমোনের চক্রান্ত ভোগ করার, আর সমাজের চক্রান্তটা পুরোপুরি বুঝতে পেরে যাওয়ার একটা যোগফল।

আরেকটা বড় কারণ আছে। মাঝবয়সে মেয়েদের কাঁধে দায়িত্ব কমে না— বাড়ে। একদিকে সন্তান— তার পড়াশোনা, তার ভবিষ্যৎ, তার হরমোনও। অন্যদিকে বাবা-মা— তাঁদের ওষুধ, ডাক্তার, একাকিত্ব। তার মাঝখানে সংসার— যেটা অলৌকিক ভাবে নিজের কাজ নিজে করতে শেখে না। আর অফিস থাকলে তো কথাই নেই— সেখানে ‘মাল্টিটাস্কিং’ শব্দটা শুনে মনে হয়, মেয়েরা বুঝি জন্মসূত্রে এক্সট্রা আটটা হাত নিয়ে পৃথিবীর ভার লাঘব করবে বলে জন্মেছে। এত কিছুর মধ্যে হরমোনের ওঠানামা যদি রাগ বাড়ায়, সেটা কি আশ্চর্য? এটা ঠিক যেন আপনি লোকাল ট্রেনে ঘেমেনেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, চতুর্দিক থেকে ভিড় ঠেসে ধরেছে, আর কেউ এসে বলছে— ‘একটু হাসুন!’

মাঝবয়সি মেয়েদের রাগের আরেকটা ভুল ব্যাখ্যা আছে: ‘ওদের ইগো বেড়ে গেছে।’ আসলে অহংকার নয়, বেড়েছে তার আত্মসম্মান। এতদিন মেয়েরা নিজেদের ইচ্ছেকে ছোট করে রেখেছে। নিজের গলা নিচু করে রেখেছে। ‘যা হোক চলুক’ বলে সংসার চালিয়েছে। কিন্তু মাঝবয়সে এসে তারা বোঝে—এই ‘যা হোক’-টা আসলে সবচেয়ে বড় ঠকে যাওয়া। কারণ এই বয়সে এসে মেয়েরা প্রথমবার নিজের শরীরকে দেখে— সে আর আগের মতো ‘মানিয়ে নেওয়া মেশিন’ নয়। শরীর বলে, ‘আমি ক্লান্ত।’ এবং ক্লান্তি মানে শুধু ঘুম না-পাওয়া নয়— ক্লান্তি মানে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ক্ষয়ে যাওয়া।

হরমোন মেয়েদের শেখায়— নিজের শরীরকে অগ্রাহ্য করা যাবে না। নিজের ক্লান্তিকে ‘ড্রামা’ বলা যাবে না। নিজের বিরক্তিকে ‘বদমেজাজ’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। হরমোন শরীরের ভেতরকার সেই চোস্ত সাংবাদিক, যে সব রিপোর্ট বের করে দেয়।

এখন প্রশ্ন, সমাজ কেন এত ভয় পায় মাঝবয়সি মেয়েদের রাগকে? কারণ একটা লোক রাগ প্রকাশ করছে মানে, তার ওপর শাসক নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। আর সমাজ তো মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করেই অভ্যস্ত। মেয়েরা নরম হবে, হাসবে, বুঝবে, মানিয়ে নেবে— এই দিয়ে মেয়েদের চরিত্র তৈরি। মাঝবয়সে এসে যখন মেয়েরা বলে, ‘না, আমি আর মানিয়ে নিতে পারছি না’— তখন সেটা শুধু একটা বিবৃতি নয়, একটা নিয়মভাঙা, বেপরোয়া হয়ে ওঠার লক্ষণ। এবং এই নিয়ম ভাঙাকে শক্তিশালী করতে হরমোন একটা অনুঘটকের কাজ করে মাত্র।

হরমোন মেয়েদের শেখায়— নিজের শরীরকে অগ্রাহ্য করা যাবে না। নিজের ক্লান্তিকে ‘ড্রামা’ বলা যাবে না। নিজের বিরক্তিকে ‘বদমেজাজ’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। হরমোন শরীরের ভেতরকার সেই চোস্ত সাংবাদিক, যে সব রিপোর্ট বের করে দেয়।

রাগ তো আসলে একটা ঘোষণা। ‘আমার কথা শোনো’, ‘আমার দিকে তাকাও, আমাকে বোঝো’, বা ‘আমার সহ্যেরও সীমা আছে।’

পরের বার যদি কোনও মাঝবয়সি মহিলা আপনার সামনে রেগে যান, দয়া করে ভাববেন না— ‘উফ, আবার মেনোপজ!’ ভাবুন— ‘হয়তো এই মানুষটা এতদিন অনেক সহ্য করেছে!’ আর সেই সময় ভুলেও বলবেন না, ‘আরে ঠিক আছে ঠিক আছে, এখন শান্ত হও’,  বা ‘তুমি বড্ড বাড়িয়ে ভাবছ।’

কারণ মাঝবয়সি মেয়েরা রাগে এমনি-এমনি নয়। এই একটু ঝালমুড়ি খেলাম, এই একটু রাগ করলাম, এই একটু চা খাব, তারপর খানিক অশান্তি করব— ব্যাপারটা তেমন খেলনাবাটি নয়। তারা রাগে কারণ, শেষে তারা আর চুপ করে থাকতে চায় না।