কিছু কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এতটাই অভিঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, তা ইতিহাসের বাঁকবদলের সূচক হয়ে থেকে যায়। ভারতেও যেমন, ইন্দিরা গান্ধীর সময়কালে জরুরি অবস্থা, অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে পারমাণবিক পরীক্ষানিরীক্ষা, ডক্টর মনমোহন সিংহ অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন উদারীকরণ অথবা নরেন্দ্র মোদির নোটবন্দি। সবক’টিরই গুরুত্ব ভাল বা মন্দের অনুপাতে বিচার্য। কিন্তু বিগত কয়েকদিনে তৃতীয় দফার বিজেপি সরকার যা করতে চেয়েছিল, তা দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর খানিক বুলডোজারের প্রয়োগ হত তো বটেই, পাশাপাশি ভারতীয় গণতন্ত্রর মূল সুরটা চিরতরে বদলে যেতে পারত। এই সিদ্ধান্তের একদিকে দাঁড়িয়ে ছিল ভারতীয় সার্বভৌমত্ব, ভারতের বহুদলীয় ব্যবস্থার এতকালব্যাপী চলে আসা রূপরেখা, অন্যদিকে চূড়ান্ত শক্তিধর এক শাসক দল, যারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাকে নিজেদের মতো করে গড়েপিঠে নিতে চাইছিল। শুধুমাত্র সিংহাসনের মজবুত পায়াটুকু আরও মজবুত করার প্রায়-নির্লজ্জ উল্লাসে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে ইতিমধ্যেই বিভক্ত ভারতকে আবারও ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল উত্তর বনাম দাক্ষিণাত্য লড়াইতে। শুধু এই মেরুকরণটির কথাই হয়তো স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-ও সেদিন সংসদে উল্লেখ করেছেন, সঙ্গে বিরোধীদের ওপরই দায় চাপিয়েছেন এই বিভাজিকারেখা তৈরি করা নিয়ে, কিন্তু পূর্ব বা উত্তর-পূর্ব ভারতও ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে উত্তর বা পশ্চিম ভারতের বশংবদ হয়ে পড়ত বাধ্যতামূলকভাবে, যদি পাশ হত ডিলিমিটেশন বিল, যাকে পোশাকিভাবে মহিলা সংরক্ষণ বিলের আড়ালে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল সংসদে, অন্তত বিরোধীদের তেমনটাই অভিযোগ। একটু বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া যাক।
পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ও আপাতকালীন যুদ্ধ পরিস্থিতির গুরুত্বকে হেলায় উড়িয়ে সংসদে তিনটি খসড়া বিল প্রস্তাব করতে চলেছিল শাসক দল। প্রথমটি সংবিধানের ১৩১তম সংশোধনী বিল, যার পোশাকি নাম, ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’, দ্বিতীয়টি লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত বিল বা ডিলিমিটেশন, ও তৃতীয়টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল। সরকার আর্টিকেল ৮১ সংশোধন করে লোকসভা আসনের সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বৃদ্ধি করে ৮৫০ করতে ইচ্ছুক। ৮৫০টি আসন রাজ্যগুলির জন্য ও ৩৫টি আসন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির জন্য। এটি অবিলম্বে করতে আগ্রহী ছিল শাসক দল বিজেপি। নারী সংরক্ষণ বিল, যেটি বহু আগেই পাশ হয়ে গেছে, সেটিকে কার্যকর করতে নাকি এটি আশু কর্তব্য। একদিন বিলম্বও নাকি নারীর অধিকার হনন করতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছে। আদমশুমারি শেষবার হয়েছে ২০১১ সালে, পুরনো জনসংখ্যার ভিত্তিতে বিভিন্ন রাজ্যে নতুন আসন বন্টন আদৌ বৈধ? শুধুমাত্র মহিলা সুরক্ষার ভিত্তিতে উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও রাজস্থানের মতো রাজ্যে ৩০টিরও বেশি আসন বাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা কী কারণে?
এর ফলে দক্ষিণের বিভিন্ন রাজ্য যেগুলি জনসংখ্যা সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাদের আসন ৩০টির বেশি হারে কমতে পারে। সহজ ভাষায় বললে, ‘নর্থ ইন্ডিয়া বেল্ট’ তথা ‘হিন্দিপ্রধান’ রাজ্যগুলির গুরুত্ব বাড়বে। সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব ৩৮% থেকে বেড়ে হবে ৪৩%। অন্যদিকে দাক্ষিণাত্যর প্রতিনিধিত্ব ২৪.৩% থেকে কমে ২০%-এর কাছাকাছি পৌঁছবে। দক্ষিণের যে রাজ্যগুলি বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে জনসংখ্যা কমিয়ে দেশের ‘আক্ষরিক’ বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে, প্রতি বছর ইন্ডাস্ট্রি বাড়িয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করছে, সরকারের ভাঁড়ারে কর দিয়েছে, উন্নততর হাসপাতাল বানাচ্ছে; শুধুমাত্র উত্তর ভারতের জনসংখ্যার কাছে পরাজিত হয়ে তাদের সংসদে আসনের ঘাটতি দেখা দেবে। স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রীয় সরকার-কর্তৃক এই বিলের বিরুদ্ধ স্বরকে ‘নারীবিরোধী’, ‘উন্নয়নবিমুখ’ ইত্যাদি বাছা-বাছা বিশেষণে বিশেষায়িত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: নাম লুঠের ভার কি বইতে পারবে গণতন্ত্র?
লিখছেন আব্দুল কাফি…
তাই ডিলিমিটেশনের গভীরে খানিক আলোকপাত করা যাক। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যা ব্যবহার করে লোকসভা কেন্দ্রগুলির সীমারেখা তৈরি হয় ও যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংবিধানের ৮২ নম্বর আর্টিকেলে বলা রয়েছে একটি ডিলিমিটেশন কমিশনকে অধিকার দেওয়া হয় এই পদ্ধতি কার্যকর করার জন্য। সঙ্গে জুড়ে আছে কিছু বিধিও। যেমন প্রতিটি রাজ্যকে তার জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বন্টন করা হয়। এছাড়াও নিয়মমাফিক প্রত্যেক ১০ বছর অন্তর এই কমিশনটি কার্যকর করা আবশ্যক। এতে দেশের নির্বাচনী মানচিত্রটি সঠিকভাবে আপডেট হতে থাকে সাম্প্রতিকতম জনগণনার ভিত্তিতে। এটির কারণও রয়েছে। বিভিন্ন জায়গার জনঘনত্ব ক্রমাগত বদলাতে থাকে। মানুষ কাজের প্রয়োজনে শহর বদলায়, বাসস্থান পরিবর্তন করে। তাই প্রতি দশকে অন্তত একবার নির্বাচনী ব্যবস্থার আধারটুকুও ধ্রুবক না থেকে বদলে দেওয়াই কাম্য। এছাড়াও কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে যাতে জনসংখ্যার বন্টন সমান থাকে, সেটিও নজর দেওয়া হয়। তাতে প্রতিটা মানুষের ভোটের মূল্য সুরক্ষিত হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও এই ব্যবস্থাটি চালু ছিল। এই কমিশনেরই ভিত্তিতে ১৯৭৩ নাগাদ লোকসভার আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে ৫০০ থেকে ৫২৫ করা হয়। প্রক্রিয়াতে ছেদ পড়ে ১৯৭৬ নাগাদ, যখন ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই ‘ডিলিমিটেশন’ প্রক্রিয়া আগামী ২৫ বছরের জন্য স্থগিত করেন। অর্থাৎ, নির্ধারিত হয়, পরবর্তী সবক’টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে মূলত ১৯৭১ সালের ডিলিমিটেশন কমিশনের তথ্যের ভিত্তিতে। পাশাপাশি সেই সময় লোকসভা আসনের ঊর্ধ্বসীমা ৫৫০ স্থির করা হয়। আদতে তৎকালীন ভারতে দেশের জনসংখ্যায় রাশ সরকারের বহুল প্রচার সত্ত্বেও কোনওভাবেই টানা সম্ভব হচ্ছিল না। সেইসময়কার ডাকটিকিটেও সেই সংক্রান্ত সচেতনতার উল্লেখ পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে জরুরি অবস্থা ওঠে, ১৯৮১ ও ১৯৯১-তে আদমশুমারিও হয়; কিন্তু ডিলিমিটেশন আর কার্যকর হয়নি। ২০০১ সালে ২৫ বছরের মেয়াদ শেষ হয়। ২০০২ সালে বাজপেয়ী সরকার, ৮৪তম সংশোধনী নিয়ে আসে ও এই ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া আরও ২৫ বছরের জন্য স্থগিত রাখে। বাজপেয়ী সরকারও ইন্দিরা গান্ধীর মতো একই যুক্তি খাড়া করে। এখনও দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। সব জায়গার জনঘনত্বের ভারসাম্য এখনও সমান নয়। তাই পিছিয়ে দিয়ে সময়কাল বর্ধিত করা হয় ২০২৬ পর্যন্ত।
এবার মোদি সরকার সচেষ্ট হয়েছে ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়াকে বিল এনে যেভাবে হোক কার্যকর করতে। নতুন আদমশুমারির অপেক্ষা বিজেপি হয়তো করবে না, অগত্যা ভরসা ২০১১ সালের পরিসংখ্যান। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতারই পুরস্কার দিতে চলেছে বিজেপি সরকার। ২০১১ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল ১২০-১২২ কোটির কাছাকাছি। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির আসন ধরে বিচার করলে ৫৪৩টির মধ্যে ১৩০টি আসন রয়েছে, অর্থাৎ মোট আসনের প্রায় ২৪%। যা কমে দাঁড়াতে পারে ২০ শতাংশে। অন্যদিকে বিজেপির গড় বলে পরিচিত হিন্দি বেল্টের উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রর গুরুত্ব বেড়ে ২০০ আসন থেকে পৌঁছতে পারে ৩৬১টি আসনে। সোজাসুজি বললে যে-সরকার এই রাজ্যগুলি নিয়ন্ত্রণ করবে তারাই নিয়ন্ত্রক হবে গোটা দেশের। দক্ষিণ ভারত, উত্তর-পূর্ব ভারত বা বাংলা দখল না-হলেও কোনও ব্যাপার না। মসনদে দিব্যি আসীন থাকবে বিজেপি সরকার। তাই জন্যই ৯০০-র বেশি সংখ্যক ধারণক্ষমতা-যুক্ত নবনির্মিত সংসদের এত দ্রুত উদ্বোধন। ‘ক্রোনোলজি’ খুব পরিষ্কার নয় কী!
স্বাভাবিকভাবেই তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা, কেরল-সহ একাধিক দক্ষিণী রাজ্যে তীব্র ক্ষোভের প্রতিচ্ছবি দৃশ্যমান। বামপন্থী নেতা জন ব্রিটাস সরাসরি বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে এই পদক্ষেপকে উত্তর ভারতের ঔপনিবেশিকীকরণ আখ্যা দিয়েছেন। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন সাবধান করেছেন, দক্ষিণী রাজ্যগুলোকে দুর্বল করার এই ষড়যন্ত্র যদি বাস্তবায়িত হওয়ার নূন্যতম প্রয়াসও হয়, তাহলে ডিএমকে ছয়-সাতের দশকের পুরোনো হিংস্র রূপে ফিরে যাবে। তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত রেড্ডিও প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন, এটি না করতে। তিনি পরিষ্কার উল্লেখ করেছেন তাঁর চিঠিতে যে, ডিলিমিটেশন ও মহিলা সুরক্ষা সম্পূর্ণ দু’টি আলাদা বিষয়। এই ‘গুলিয়ে দেওয়ার রাজনীতি’ না-করার অনুরোধ করেছেন। ভারতের রাজনীতিতে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের ভারসাম্যও নষ্ট হবে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
অতঃপর, গত ১৭ এপ্রিল মোদি সরকার বিল পেশ করেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা আনতে ব্যর্থ হয়। বিপক্ষে ভোট পড়েছে ২৩০টি। দেশব্যাপী বিরোধী শিবির বহু ইস্যুতে এক না হতে পারলেও এই সাংবিধানিক সংকটের অনতিকাল পূর্বে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। বিজেপির এটি সংসদে পাশ করাতে প্রয়োজন ছিল ৩৫২টি ভোট, যেখানে তারা ৩০০-র (২৯৮) গেরোও টপকাতে পারেনি। অন্যান্য বহু ইস্যুতে এতদিন সংসদ চত্বরে প্রতিবাদে বসতে দেখা যেত বিরোধীদের। আজ ১২ বছরে প্রথমবার সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ গেরুয়া শিবির। চিৎকৃত স্বরে বজ্রনির্ঘোষ অপলাপ, বিরোধী শক্তি ‘নারীবিরোধী’। তথ্য বলছে, যে বিল ২০২৩ সালে ৪৫৪ ভোটের ব্যবধানে পাশ হয়েছে, তাকে নিয়ে নতুন করে গরমাগরম রাজনীতি চলছে সংসদে। আদতে বিদ্যমান ৫৪৩টি আসনে সংরক্ষণ আনতে গেলে শাসক দলের পুরুষ প্রতিনিধিদেরও নিজেদের আসন ছাড়তে হবে, নয়তো কার্যকর হতে কিছু দেরি হবে মাত্র। এইটুকু আত্মত্যাগও নারী সংরক্ষণের বুলি আওড়ানো বিজেপি করতে প্রস্তুত নয়! অগত্যা আসনবৃদ্ধিই কর্তব্য।
নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে কীভাবে অতি-দক্ষিণপন্থী শাসক পক্ষ গণতন্ত্রের কাঠামোটাই বদলানোর চেষ্টা করে, তার একটি নিদর্শন দেখল ভারতীয় উপমহাদেশ। তবে এই চেষ্টা অন্তিম নয়। পরবর্তীতে আবারও হবে। বারবার হবে। আজ নারীমুক্তির ছদ্ম প্রচেষ্টার আড়ালে হচ্ছে, কাল অন্য কোনও বিশেষণের ছায়ায় হবে। তবু মনে রাখতে হবে সংসদের এই জোট বাঁধা লড়াইটা। প্রবল আরাধ্য একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার দেশে বিরোধী শক্তি জোট বাঁধলে দাম্ভিক শাসকও মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। বিরুদ্ধমত মাত্রই কারাগারের পিছনে থাকা দেশে, এই ঘটনা খানিক খোলা বাতাসের সুবাস। তবু কিছুটা হলেও মনে পড়ছে সেই লোকটার কথা, যিনি স্বাধীন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইটা রচনা করেছিলেন। সেই বিআর আম্বেদকর সাবধান করেছিলেন, ‘শুধুমাত্র নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভোটার হয়ে থাকলে হবে না। দেশের স্বার্থে আইন প্রণেতা হয়ে উঠতে হবে। নয়তো যাদের আমরা নির্বাচন করছি, তারাই আইন প্রণেতা হয়ে এমন আইন তৈরি করবে; যাতে আমরা শুধুমাত্র ভোটারে পরিণত হব।’ বা আজকের নিরিখে এআই-নির্দেশিত ‘ডিলিটেড ভোটার’।



