ডেটলাইন: পর্ব ৪৫

Representative Image

দেশে-বিদেশে প্লেনে তো কম চড়া হল না, কিন্তু এমন আজব এয়ারপোর্ট দেখিনি কখনও। না, মার্কিন মুলুকের কোনও গ্রামের এয়ারপোর্টের কথা হচ্ছে না। খোদ সিলিকন ভ্যালির সান হোসে বিমানবন্দরের কথা বলছি। এমনকী একে সিলিকন ভ্যালির রাজধানীও বলা হয়। হাই টেক হাব, বড়-বড় আইটি কোম্পানিগুলোর সদর দফতর। সান হোসে থেকে ফ্লাইটে আমরা যাব লাস ভেগাস। এখানে আবার ডোমেস্টিক ফ্লাইটে মালের ভাড়া আলাদা। ডলারে সুটকেসের ভাড়া গুণে তাই একটু দমে গেছিলাম। তবু বেড়ানোর আনন্দে সেটুকু ভুলে থাকা গেল। ঠিক সময়ে বোর্ডিং হল, এমনকী রানওয়ে ধরে এগোতেও লাগল প্লেন। কিন্তু একটু পরেই আবার ব্যাক করতে লাগল। গাড়ি ব্যাক করে জানি, কিন্তু বিমানও? কে জানে, পৃথিবীর বহু রহস্যই তো অজানা। বসে আছি চুপচাপ, হঠাৎ ঘোষণা, সবাইকে নেমে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে, প্রযুক্তি বিভ্রাটে প্লেন এখন উড়বে না। আমাদের তো মাথায় হাত! এমনিতেই লাস ভেগাস পৌঁছতে সন্ধে হয়ে যাওয়ার কথা, তার ওপর আজ যদি ফ্লাইট ক্যানসেল হয়, তাহলে আমাদের হোটেল ভাড়া যাবে, সময়ও কমে যাবে। কিছু করার নেই, অগত্যা একে-একে প্লেন থেকে নেমে বসতে হল বোর্ডিং কাউন্টারের সামনে। কিন্তু আশচর্যজনকভাবে আমরা ক’জন বাঙালি ছাড়া আর কাউকে তেমন উত্তেজিত দেখলাম না। আমাদের পেছনে বসেছিলেন এক ফিলিপিনো প্রৌঢ়, তিনি শান্ত গলায় বললেন, ‘এটা আমার থার্ড দিন, এই ফ্লাইটে যেতে পারলাম না।’ শুনে তো আমাদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া। কলকাতা স্টাইলে আমরা চড়া গলায় জানতে চাইলাম কাউন্টারের মহিলার কাছে, ‘ফ্লাইট ছাড়বে কখন?’ তাঁর তেমন হেলদোল নেই। যান্ত্রিক গলায় বললেন, ‘প্লেন ছাড়বার মুহূর্তে পাইলট বুঝতে পেরেছে যে, নাটবল্টু ঢিলে আছে। তাই ফেরত এসেছে। অপেক্ষা কর, ঠিক হলে যাবে। আজ হতে পারে, কালও হতে পারে।’

বিশ্বাস করুন, এতটুকু বাড়িয়ে বলছি না, উনি ঠিক নাটস অ্যান্ড বোল্টস শব্দটাই ব্যবহার করেছিলেন। হাই টেক স্বর্গে এ কী হাতুড়ে মার্কা ব্যাপার-স্যাপার? অগত্যা অপেক্ষা ছাড়া আর কীই-বা করার আছে? আমরা ছাড়া কেউ এতবার করে জিজ্ঞেসও করছে না কখন ছাড়বে? দুই পৃথুলা কৃষ্ণাঙ্গী তো দেখলাম একটু দূরে মাসাজ চেয়ারে বসে আরাম করছে। বাচ্চারা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। একটু পরে ছোট জলের বোতল আর অসম্ভব শক্ত লেড়ো বিস্কুট দিল। রাগটা আরও বেড়ে গেল। ঘণ্টা দেড়েক পর মহিলা জানালেন, সারাই হয়ে গেছে, এবার বোর্ডিং স্টার্ট, ধড়ে প্রাণ এল। তবে একটু যে ধুকপুকুনি ছিল না, তা নয়। নাটবল্টু একবার না হয় ঢিলে হয়েছে রানওয়েতে, আকাশপথে হলে আর কে বাঁচাবে? ভেবে লাভ নেই, প্লেনে উঠে দেখে নিলাম, ফিলিপিনো ভদ্রলোক উঠেছেন কি না। থার্ড টাইম লাকি বলে কথা! আমেরিকার ডোমেস্টিক ফ্লাইট নিয়ে একটা দামি পরামর্শ পেয়েছিলাম দীর্ঘদিনের প্রবাসী এক বন্ধুর কাছে, কিন্তু সেটা এই অভিজ্ঞতার পর। স্বল্পদৈর্ঘ্যের উড়ানে না উঠে, ভলভো বাসে যাওয়া ভাল। সত্যি দেখেছি, কী অসাধারণ সার্ভিস গ্রে হাউন্ড বাসের। অনেক সময়ে প্লেনের থেকে বাসের ভাড়া বেশি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করাতে সে বলেছিল, ‘ছোট ফ্লাইটগুলো সময়ে চলাচল করে না। তার থেকে বাস বেটার।’

মার্কিন প্রেসিডেন্টরা আসলে হাতের পুতুল? পড়ুন: ডেটলাইন পর্ব ৪৪…

মার্ডার আর মোটেল, এই দুটো শব্দ একসঙ্গে রেখে বেশ কয়েকটা সিনেমা আর ডকু-সিরিজের নাম পাবেন হলিউডে। সত্যি-সত্যি মোটেলে খুনজখম হয় কি না, সেটা আমার জানা নেই। বাংলায় একটা চমৎকার শব্দ আছে, সরাইখানা। গাড়ি করে এসে পথচলতি রাত কাটানোর জায়গা। আমরা ঠিক করলাম, সান হোসেতে মোটেলে থাকব একটা দিন। সান্টা ক্লারার কাজ মিটতেই তাই, উবের ধরে চলে এলাম। এখানে বলে রাখা ভাল, কোনও অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় আমরা মোটেলে থাকতে আসিনি। সান হোসের হোটেল এত দামি যে, বাধ্য হয়েছি মোটেল বেছে নিতে। প্রথম মোটেল দর্শন মন্দ লাগল না। একটা বড় উঠোনের চারপাশ ঘিরে দোতলা বাড়ি, সারসার ঘর, নিচে ঘরের মধ্যেই ছোট্ট রিসেপশন, তার একধারে আবার চা-কফি-কুকিজ রাখা। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টও ওইটুকু জায়গাতেই শুনে বুঝলাম ব্রেড-ওমলেট-মাফিন ছাড়া আর কিছু থাকবে না। অবশ্য সস্তার জায়গায় এর বেশি কিছু আশা করা উচিত নয়।

আমরা দিব্যি ফটো সেশন করছিলাম। মার্কিন মুলুকে মোটেলে থেকেছে, এরকম লোক আমাদের চেনাশুনোর মধ্যে নেই। অকস্মাৎ সশব্দে একটা বিশাল গাড়ি ঢুকল, একে তার নিজস্ব গর্জন তায় জোরসে গান বাজছে। আমরা চমকে একটু পিছিয়ে দাঁড়ালাম। কমবয়সি পাঙ্ক ছোকরার দল নয়, গাড়ি থেকে নামল একটা পরিবার। যেমন মোটা তেমনি লম্বা, হাতে-পায়ে ট্যাটু করা, স্যান্ডো গেঞ্জি আর শর্টস পরা বছর চল্লিশেকের যুবক, একই পোশাক পরা তার বউ, আর চারটি বাচ্চা। সবচেয়ে ছোটটা কোলে, একবছরও হয়নি। এরকম পরিবার খুবই কমন আমেরিকায়। কিন্তু যখন তারা গাড়ির ডিকি খুলল (এখানে বলে ট্রাস্ক), আমরা হতবাক। কী নেই সেখানে! বিশাল-বিশাল গোটা চারেক সুটকেস তো বটেই, সেই সঙ্গে বালতি, কোদাল, রান্নার বাসন! ভাবছিলাম, এসেছে তো হোটেল-মোটেলে থাকতে, সংসার তুলে এনেছে কেন? পরে শুনেছিলাম, মেক্সিকো বা লাতিন আমেরিকার অনুপ্রবেশকারী পরিবারগুলো এক জায়গায় থিতু হতে পারে না। তাড়া খেয়ে ঘুরে বেড়ায় যাযাবরের মতো। এখানে পা রাখা মাত্র কোলের বাচ্চাটি সেই যে কাঁদতে শুরু করেছে, কান্না থামছেই না। খিদে পেয়েছে বা পেট ব্যথা করছে জাতীয় মা-সুলভ প্রশ্নের মধ্যে না গিয়ে তার মা কেবলই তাকে ঝাঁকাচ্ছে। কিন্তু তার চিলচিৎকার থামার লক্ষণ নেই। একটা দুধের শিশু যে-কোনও কারণেই কাঁদলে উদ্বেগ হতে পারে, বিরক্তি আসে না। বিরক্তি চরমে উঠল যখন তার বাবা বাকি তিনটিকে দোতলায় পৌঁছে দিয়ে এসে বউয়ের ওপর সাংঘাতিক চেঁচামেচি জুড়ল। কেন সে বাচ্চাকে শান্ত করতে পারছে না? যেন বাচ্চার দায়িত্ব একা মায়ের! আমাদের তো মাথা গরম হয়ে গেছে। কিন্তু বিদেশ বিভুঁইয়ে লোকের ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানো ঠিক হবে না ভেবে চুপ করে রইলাম। বিষয়টা অবশ্য ব্যক্তিগত স্তরে ছিল না মোটেই, বরং বলা যায় পাবলিক নুইসেন্স। সেদিন সারা রাত দোতলা থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ এল। পরদিন সকালেও দেখলাম, বাচ্চা সামলাতে গিয়ে মায়ের খাওয়াই হল না প্রায়। বাবাটি কিন্তু গপগপ করে খেল। আর বাকি তিনটি বাচ্চা যে কার সঙ্গে এসেছে, তাই বোঝা দায়। নিজের মনে খেলছে, দৌড়চ্ছে, পড়ছে, উঠছে, খাচ্ছে, কী খাচ্ছে না— তাও দেখার কেউ নেই।

হাই টেক স্বর্গে এ কী হাতুড়ে মার্কা ব্যাপার-স্যাপার? অগত্যা অপেক্ষা ছাড়া আর কীই- বা করার আছে? আমরা ছাড়া কেউ এতবার করে জিজ্ঞেসও করছে না কখন ছাড়বে? দুই পৃথুলা কৃষ্ণাঙ্গী তো দেখলাম একটু দূরে মাসাজ চেয়ারে বসে আরাম করছে। বাচ্চারা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। একটু পরে ছোট জলের বোতল আর অসম্ভব শক্ত লেড়ো বিস্কুট দিল। রাগটা আরও বেড়ে গেল।

সান্টা ক্লারা শহরটা ছোট্ট, কিন্তু গিজগিজ করছে টেকিদের ভিড়ে। সান হোসের শহরতলি বলা যায়। নানা দেশের কমবয়সি ছেলেমেয়ের স্বপ্নের চাকরির ঠিকানা। ইনটেলের সদর দফতর। এখানকার লিভাইস স্টেডিয়ামে প্রায় সত্তর হাজার লোক ধরে। বলা বাহুল্য, সান্টা ক্লারায় ভারতীয়রা সংখ্যায় অনেক। বাঙালিও আছে প্রচুর। একেবারে শান্ত, নিরিবিলি জায়গা, কিন্তু চাইলেই উবের ধরে চলে যাওয়া যায় ঘণ্টাখানেক দূরত্বে সান ফ্রান্সিসকোতে। বললাম বটে, টেকিদের ভিড়, কিন্তু বাস্তবে রাস্তায় বেরলে একটি মানুষও দেখবেন না। মনে আছে, একদিন সকালে সোজা রাজপথ ধরে ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর উল্টোদিক থেকে এক যুবককে আসতে দেখে বেজায় ভয় পেয়েছিলাম। সে ঠিক প্রকৃতিস্থ ছিল না, হয় মানসিক ভারসাম্যহীন, নয়তো ড্রাগ অ্যাডিক্ট। তার আগে অবশ্য চারপাশ শুনশান দেখে ইচ্ছেমত অনেক মজা করেছি। জনমানবহীন টেনিস কোর্টের পাশের পরিখা থেকে গাছের ডাল দিয়ে টেনে এনেছি বল। পথের মধ্যিখানে বসে পা ছড়িয়ে কায়দা মেরে ফটো তুলেছি। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ট্রাম চলা দেখলাম। তাতেও খুব একটা যাত্রী নেই। আমাদের পাড়ার একটি ছেলেকে সান্টা ক্লারায় খুঁজে পেয়ে জিজ্ঞেস করতে বলল, ‘এখানে কারো সময় নেই আন্টি, উইকএন্ড ছাড়া। সকালে বেরোই, সন্ধেয় ফিরি। তারপরও ল্যাপটপ খোলা, নিজেকে আপডেটেড রাখতে হয়।’ সত্যিই তো, সিলিকন ভ্যালি বলে কথা! কথায়-কথায় হায়ার অ্যান্ড ফায়ার।

লিভাইস স্টেডিয়াম

তবে একটা কথা মানতেই হবে। আশেপাশে গুগল, মেটার অফিস না দেখে এলে বিরাট মিস। মাউন্টেন ভিউতে গুগলের সদর দফতর গুগলপ্লেক্স আর মেনলো পার্কে মেটার (আমরা যখন গেছিলাম, তখন অবশ্য নাম ছিল ফেসবুক)। সান্টা ক্লারা থেকে দুটো জায়গাই আধঘণ্টার মতো দূরত্বে। গুগলের অফিসের গায়ে লোগোটা আছে। ফেসবুকের অফিসে তখন এফ সাইনটা বিশাল করে লাগানো ছিল সামনে, এখন নতুন সাইনটা আর লাইক সাইনটা আছে। গুগলের ক্যাম্পাস দুই মিলিয়ন স্কোয়্যার ফিট জুড়ে, সবুজে মোড়া। বিন্ডিংগুলোও রঙিন। অফিসের ভেতর ঢোকার অনুমতি নেই, তবে ভিসিটর সেন্টারে অনেক কিছু দেখার, ক্যাফেতে আড্ডা মারার সুযোগ আছে। ট্যুরিস্টরা অবশ্য গুগল আর মেটার সাইনের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেই বেশি পছন্দ করেন। মেটা অফিসের ভেতরে এমনিতে ট্যুরিস্টদের ঢোকার অনুমতি নেই। তবে কোনও কর্মী চেনা থাকলে একটা চান্স হতে পারে। কর্মীদের আত্মীয়-বন্ধুদের ঘুরিয়ে দেখানোর পারমিশন আছে। কিছুটা জায়গায় ঢোকা যায়, মেশিনপত্র ঘেঁটে কিছু মজাদার অভিজ্ঞতাও সঙ্গে করে নিয়ে আসা যায়। অবাক হয়ে ভাবছিলাম, সারা পৃথিবীর সাত থেকে সত্তর, রাজারাজড়া থেকে পথবাসী, সব্বাই যে নেশায় ডুবে আছে, কখনও প্রাণ পর্যন্ত বিপন্ন হচ্ছে, পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, সেই পুতুলনাচের সুতো এই সিলিকন ভ্যালির রঙিন অফিসগুলোতে বাঁধা! পাঁশকুড়ার যে-কিশোরী ফেসবুকে আলাপ হওয়ার তিনমাসের মধ্যে পালিয়ে বিয়ে করে ফেলল, আর রাজস্থানের গ্রামের যে-কিশোর গুগলে চোখ রেখে রোজ রাতে ভাবে মহাকাশবিজ্ঞানী হবে, তাদের স্বপ্নভঙ্গ আর স্বপ্নপূরণ, দুইয়েরই জন্ম যে সহস্র যোজন দূরের এক অজানা দুনিয়ায়, কে বলবে!