আটের দশকে বেড়ে ওঠা মফস্সল শহরের অলিগলি বটের ছায়া কিংবা অশ্বত্থের আদুরে মেজাজ লেপ্টে, কিছু স্মৃতি থেকে গেছে। থেকে যেতে চায়। বড়রাস্তা পেরিয়ে গলির মোড়— যেখানে বাঁধানো চাতালে টাইমে আসা যাওয়া জলের অ্যালার্ম তত্ত্ব— ভোর সাড়ে পাঁচটা বাজার আগেই চাতালকে সরগরম করে দিতে চাইত।
সময়টা এমনই, যখন প্রত্যাশার হাত ধরে থাকত অপেক্ষা। ধুলো ওড়ানো ফুটপাথে দু’পা এগোতে না এগোতে, ঝাঁকড়া বট-অশ্বত্থের নিঝুম ও দরাজ-দিলখোলা উপস্থিতি, প্রতিটি ঋতুতে বিভিন্ন জাত-ধর্ম, আচার-নিয়ম পালনের সাক্ষী থেকেছে। যেমন বিহার ‘দেশ’ থেকে আসা পরিবারগুলি প্রতিদিন আদর-যত্নে গরু-মোষ পালন করে, উপবাসী ছটপুজো কাটিয়ে দামাল শীত আর ঘন কুয়াশা থেকে বাঁচতে একচিলতে ঘরের সামনে আগুন জ্বেলে দিব্যি সংসারাকে নিবিড়-ভরাট উষ্ণতায় ধরে রাখতেন। তেমনই অন্য আর-একদিকে তিনতলা বিরাট ইমারতের নীচ-তলায়, মোটরগাড়ির গ্যারাজ। মাথায় পাগড়ি আঁটা সর্দারজিরা এই পাড়াগাঁয়ে কতগুলো গুরুপূর্ণিমা পার করেছিলেন, সেই হিসাব বটবৃক্ষের আলো-ছায়ারা আজ আর মিলিয়ে দিতে পারবে না।
এই বাড়ির ছাদ-ঘরে থাকা লম্বা বিনুনির তিন বোন বন্ধত্বের হাত বাড়িয়ে লঙ্গরে নিয়ে ঘি-জবজবে সুজির হালুয়া, তন্দুরি রুটি খাইয়ে পঞ্জাব ‘দেশ’-এর দরাজ উত্তাপে জড়িয়ে নিয়েছিল। উৎসবের দিনে পা ধুয়ে গুরদোয়ারার ভেতরে ঢোকার মুখে, জল-থইথই সেই চাতালগুলো কেন একার মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল?
আরও পড়ুন: মার্কিন প্রেসিডেন্টরা আসলে হাতের পুতুল? লিখছেন তপশ্রী গুপ্ত…
উদার অর্থনীতির হাওয়া শুরুর দিনগুলোতে সহজ আলাপ, সহজে যাওয়া-আসার রাস্তাগুলো কখন যেন লুঠ হয়ে গেল। অর্থনীতির উদার হয়ে ওঠার শর্ত, উদার যৌবনে পা রাখতেই স্মৃতির হিসাব রাখার মতো এ-পাড়া, ও-পাড়ার পড়শি বট-অশ্বত্থ গাছগুলো বাড়তি হয়ে দামাল উন্নয়নের কোপে চোখের সামনে খুন হল।
উদার অর্থনীতিকে অভিবাদন জানাতে উন্নয়নের প্রকাণ্ড খিদের সামনে মানুষের শরীর-সহ গোটা দুনিয়ার জৈব প্রক্রিয়া— লোভ-হিংসা-সহ বিচিত্র রসে অভিযোজিত হয়ে উঠতে খুব বেশি সময় খরচ করেনি। মফস্সল মিউনিসিপ্যালিটি, রাস্তা বড় করে তোলার মডেল সফল করতে হল্লা গাড়ির সঙ্গে লেঠেল বাহিনীর কায়দায়— উপযোগী বাহিনী জুটিয়ে আজ গাছ কেটে সাফ করছে তো কাল ঘর-বারান্দা ভেঙে চলেছে। রাস্তা বড় হচ্ছে। দৈর্ঘ্যের চিরাচরিত নাগাল টপকে দেশের অন্য প্রান্তের সঙ্গে অবলীলায় জুড়ে যাচ্ছে। সেই রাস্তা এতটাই কালো-মসৃণ-চিকন যে, রূপের দাপটে ধুলো-মাটি মাখা ফুটপাথ, বটের ছায়ায় দাঁড়ানো শীতলা মন্দির ম্যাজিকের মতো ভ্যানিশ হয়ে যায়। রেল-কারখানার শ্রমিক, স্কুলফেরত ছোটরা, কলেজের দামাল যুবক-যুবতী, ছোট-বড় দোকানের মালিক-কর্মচারীরা অবাক চোখ আর হাঁ হয়ে যাওয়া মুখে, দাঁতের পাটি বের করে বোবা মীমাংসার এস্ক্যালেটরে ততক্ষণে চেপে বসেছেন।
গন্তব্য পিরামিডের প্রকৃত মাথা স্পর্শ করা উচ্চতায় কখন পৌঁছতে পারে, যাত্রীদের সেই অঙ্ক জানা নেই। পিরামিডের নীচ-তলার (বেস) ছড়ানো বিস্তীর্ণ উপত্যকা ছেড়ে উপরের দিকে পৌঁছতে হলে অনেক কিছু ছেঁটে ফেলাটাই দস্তুর, সেটা মেনে নেয়। ক্ষমতার স্তম্ভ সামাজিকভাবে ছেঁটে ফেলার ধারণাকে শর্ত হিসাবে দেগে দিয়ে সতেজতা কায়েম রাখতে চায়। শর্তের চাপে পড়শি গাছ, বাড়ি, দোকান, রাস্তা, গলি, রাস্তার পাশে টাইম-কলের বাঁধানো চাতাল একসময়ে সম্পর্কের সহজ কথা সহজ ডাক খোঁজ হারিয়ে ফেলে। সামাজিক ডিসঅর্ডার মানসিক ডিসঅর্ডারের ফলাফল হয়ে একাকিত্ব অনুভব করে। অর্থাৎ, উত্তরণে বহাল মেজাজ মজিয়ে রাখতে জৈব-অজৈব সম্পর্কের প্রতিটি সুতো চোখের সামনে কাটাকুটি খেলায় জেরবার।
কেটে যাওয়া ঘুড়ির মতো উঁচু ছাদের কার্নিশ থেকে একলাফে ঝুলে পড়ে রোদের তাপ শুষে শুকিয়ে আসা লম্বা সুতির দীর্ঘ রং-বেরঙের কাপড়গুলি মাথা জড়িয়ে পাক খাওয়া উপস্থিতি, পাগড়ি নামে পরিচিত। যে-পাগড়ি একটা সময়ে গুনতিতে কমে আসতে থাকে। নেমপ্লেটে সাঁটা নাম-ঠিকানাগুলো মধ্য-অর্থনীতির সীমানা খুইয়ে রাতারাতি হাত বদলে ঝকঝকে গ্লোবাল বেনে কর্পোরেট সংস্থার আউটলেট হয়ে বসে। ছাদের চিলেকোঠার ঘর শূন্য করে তিন বোনের পরিবার রাতারাতি মফস্সল শহরের শিকড় ছাড়ে। তবু রয়ে যায় ধুলো মাটির আস্তরণে। স্মৃতির জ্যান্ত ফলকে। এত বছরের প্রতিবেশী ঠিকানা বদলে কোথায় পৌঁছতে বাধ্য হলেন, সেই খবর কেউ রাখেনি।
বয়স যত বেড়েছে, উত্তর ভারতের দিল্লি, পঞ্জাব কিংবা চণ্ডীগড়ের ছোট গলি পুরনো বাড়ির দালান, ভিড় বাস কিংবা গুরদোয়ারার ভিড়কে কেন্দ্রে রেখে মিলিয়ে নিতে চেয়েছি তিন বোনের তিনটি উচ্চতার তিনরকম গড়নের মিলে যাওয়া কোনও অস্তিত্ব। গুরুপূর্ণিমায় স্বর্ণমন্দিরের প্রতিটি দরজা-চাতালে যখন উপচে পড়া ভিড় ঘিরে এক-একটা আলাদা জীবনসূত্রের স্নায়ুযন্ত্র তীব্র, ঠিক তখনই উত্তেজিত স্নায়ুতন্ত্রীতে ধাক্কা লাগে। তুঁতে রঙের মখমলে সালোয়ার কুর্তা, দুধ-সাদা চেহারায়, একমাথা কালো মিশমিশে চুলের মেয়েটি গাছের ছায়ায় বসে একমুখ হাসি নিয়ে দূরত্বের হিসাবকে মুছে দিয়ে উচ্চারিত শব্দ, কথায় পরিচিত হতে চায়। কাছে আসে।
নতুন সালোয়ার-কুর্তায় সেজে গুরুপূর্ণিমাকে ইয়াদগার করতে ১৪১ কিমি দূরত্বের লুধিয়ানা থেকে তিন বোন মিলে হাজির। অনেক গল্পের শেষে নাম জানালেন সুরিন্দর। আমি গোটা নামের বহর পূর্ণ করার তাগিদ নিয়ে কৌর পদবি জুড়ে দিতেই, মাথা হেলিয়ে জানালেন, পদবিতে তিনি খাতুন। বঙ্গবাসীর শরীর-মন-মেজাজের প্রগতিশীল ঘূর্ণিঝড়ের দাপট একনিমেষে থেমে গেল।
তাই তো! পঞ্জাব ‘দেশ’-এর মানুষ জাতিগত পরিচয়ে পঞ্জাবি হতে পারে, কিন্তু ধর্মের দিক থেকে? সংবিধান-স্বীকৃত সেকুলার দেশে গোটা জাতকে ধর্মের হিসাবে বুঝে নিতে প্রগতিশীল মন কতটা জবরদস্ত নাকাবন্দি, ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে সেই অজ্ঞতা প্রকাশ্যে নাকাল করল। মার্ক টালি ও সতিশ জেকবতাদের Amritsar Mrs Gandhi’s Last Battle নামক কিতাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুধর্মের প্রতাপ ইংরেজ শাসনের সময় ও তার আগে-পরে কীভাবে পঞ্জাব প্রদেশে আধিপত্য বিস্তারের কৌশল নিয়ে সংখ্যালঘু শিখধর্মের উপর চেপে বসতে চেয়েছে, সেই হিসাবের ইতিহাস প্রকাশ্যে নথিবদ্ধ রয়েছে।
হিন্দুধর্মের উগ্র জাতপাতের সীমানা থেকে মুক্তি পেতে শিখধর্মের উদার মানবপ্রেম সমতাধর্মের আধার হয়ে ওঠে। ইসলামের সঙ্গে শিখদের কোনওদিনই দ্বিধা-বিদ্বেষের পাকাপাকি দূরত্ব কিংবা অস্থিরতা কোনওটাই ছিল না; কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসকের ভারতজোড়া বিষাক্ত ভেদাভেদের বীজ বপন করা ও ইসলামকে শিখধর্মের উপর আধিপত্যের বোঝা হিসাবে চাপিয়ে দিতে নৃশংস লাগামহীন হত্যা-জর্জরিত লাশভর্তি ট্রেন, আরোপিত ভৌগোলিক সীমারেখাকে দীর্ঘমেয়াদি রক্ত-বারুদের কারবারে বাঁচিয়ে রাখতে লাহোর থেকে অমৃতসরে পৌঁছয়। অর্থাৎ অবিভক্ত দেশে শিখ ও মুসলিম পাশাপাশি দিব্যি বসবাস করত। কোনও নিষেধ-আরোপ সেখানে ছিল না।
তাই তো! পঞ্জাব ‘দেশ’-এর মানুষ জাতিগত পরিচয়ে পঞ্জাবি হতে পারে, কিন্তু ধর্মের দিক থেকে? সংবিধান-স্বীকৃত সেকুলার দেশে গোটা জাতকে ধর্মের হিসাবে বুঝে নিতে প্রগতিশীল মন কতটা জবরদস্ত নাকাবন্দি, ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে সেই অজ্ঞতা প্রকাশ্যে নাকাল করল।
দেশ ভাগাভাগির পর ভারতের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের সঙ্গে থাকতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা শিখদের অধিকারের প্রসঙ্গে সচেতনভাবে-ই সরব করে তোলে। অকালি দল শিখদের অধিকার প্রসঙ্গকে প্রকাশ্যে দাবি হিসাবে পেশ করলে, পঞ্জাবের রাজনৈতিক অস্থিরতা কোন মাত্রায় পৌঁছতে পারে, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ অপারেশন ব্লু-স্টার। হিন্দুধর্মের আগ্রাসনকামী মনোভাব জাতপাতের বিষয়ে কতটা সংকীর্ণ এবং কতবার এ-দেশে পিছিয়ে থাকা জাতের মর্যাদা-সমতা-স্বাধীনতাকে খর্ব করে থাকলে এ-দেশে দলিত অংশের মানুষ ধর্মান্তরিত হয়ে মুক্তি পেতে চাইতে পারেন, সেই ইতিহাসকে স্মরণ করায়।
মুক্তি-মার্গকে প্রশস্ত করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময়ে গৌতম বুদ্ধ, চৈতন্য, কবীর, নানক, মীরাবাঈ সমতা-মর্যাদা-স্বাধীনতা জীবনের প্রতিটি স্তরে অনিবার্য ও সচলভাবে সক্রিয় করতে এবং প্রেমরসে সম্পৃক্ত মানবিক-স্থিতি গড়ে নিতে কোনও পিছুটান রেয়াত করেননি। ভালবাসার নাম-গানে জীবনকে বিস্তারিত করার এই ইতিহাস এদেশের মাটিতে বহু দীর্ঘ।
শিখেদের সাধনা মূর্তিমান চাক্ষুষ অনুভূতিতে আটক থাকেনি। গভীর উপলব্ধির বহতা ধারায় বয়ে যেতে চেয়েছে। ‘গুরু গ্রন্থসাহেব’ সেই পুথি, যেখানে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের জীবন ও প্রেমের স্তব-গান সংকলিত হয়েছে। আছে ‘গীতগোবিন্দ’র পদ, আছে কবীরের দোহা, আছে বহু পদকর্তাদের জীবন ও সমতার প্রেমগান— পরম যত্নে যে-পদগুলিকে জৈবিক স্বর ও সুরে বিস্তার করার মতো নিবেদন করলে আসলে তা হয়ে ওঠে মানব শরীর-মনে প্রেমের আবাহন। শিখধর্ম জীবনে-যাপনে সেবার মন্ত্র নিয়ে কমিউন উপলব্ধি। সেবা কৃষক আন্দোনের (২০২০) বল-ভরসা দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যয়ের কারিগর। কৃষি অধিকার নিয়ে সরব গোটা পঞ্জাব, রাজধানী দিল্লিকে চারিদিক থেকে ঘেরাও রেখে একটা আস্ত ঋতু পর্যায়কে অন্দোলন উদ্যাপনের নগর হিসাবে গড়ে তোলেন। পোস্টার, ফেস্টুন, স্লোগানে দাবি-উচ্চারণ ছাড়া আন্দোলন লাগাতার চালিয়ে নিয়ে যেতে প্রয়োজন সু-স্বাস্থ্যের। হাইব্রিড ফলন কৃষিজমি, জীববৈচিত্র্য-সহ কৃষি-অর্থনীতির উপর কতটা বিষাক্ত প্রভাব ফেলতে সক্ষম, সেই রাজনৈতিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তাদের জীবন-উপলব্ধির জারিত ফলাফল। গ্রামের সাধারণ কৃষক তাই সচেতন বিজ্ঞানীর ভূমিকায় সরব।
উৎসবের মেজাজে সচল ভিড় ঠেলে অজানা হাত অনেকগুলো কাগজ ধরিয়ে আশ্বস্ত হয়ে ফিরে গেল। কী কাগজ সেই ভাবনা এগোল না! মনে হল, ধর্ম-নাম-গান-লঙ্গরের মাঝখান দিয়ে বৈপ্লবিক বার্তা হাতে-হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। চিলেকোঠার তিন বোন কি তবে নাম-গান-ভজন-কীর্তনের ওপারে বৈপ্লবিক চলাচলও বটে?
দিনের শেষ ফ্যাকাশে আলোর আকাশ-প্রেক্ষাপটে শিখধর্ম তার প্রেমের নাম-গান একত্রিত উচ্চারণে ধর্মের সীমানাকে শারীরিক উপস্থিতি দিয়ে স্পষ্ট করল। এই মরা সময়ে ধর্মীয় ভেদাভেদের বিষ উপেক্ষা করে স্বর্ণমন্দিরের চাতাল-দালান, জলের সীমানা, গাছের নিঝুম ছায়ার মাঝে ইতিহাসের আড়াআড়ি উপস্থিতি। সেখানে গোলাগুলি-পুলিশ-মিলিটারি ট্যাংকারের দানবীয় আওয়াজ-রক্তমাখা লাশের গুমোট গন্ধ— আড়ালে থেকে তিরতিরে পায়ের ছাপ ফেলে বয়ে চলেছে…




