পিতৃতন্ত্রের খেলনা

Representative Image

একটা সময় ছিল, মেয়েদের চুপ করাতে চণ্ডীমণ্ডপের জটলা লাগত, সালিশি সভা লাগত, পাড়ার মোড় লাগত। এখন লাগে একটা স্মার্টফোন আর মোটামুটি ভাল ইন্টারনেট কানেকশন। সভ্যতা এগিয়েছে, তাই না? আগে নাক গলানো হত জানলার ফাঁক দিয়ে, এখন ইনবক্সে। আগে চরিত্রহনন হত পাশের বাড়ির কাকিমার গলায়, এখন ফেসবুক-ইন্সটাগ্রামে। আগে হুমকি আসত গলির মোড়ে, লেটারবক্সে, চিরকুটে, এখন আসে নোটিফিকেশন হয়ে।

অর্থাৎ, পিতৃতন্ত্র মোটেও বেকার বসে নেই। সে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। আগে লাঠি ছিল, শাসানি ছিল। এখন ওয়াই-ফাই। আগে তর্জনী নাড়ত, থাপ্পড় মারত, এখন স্ক্রিনশট নেয়। আগে পিছু নিত, এখন ট্র্যাক করে। আগে মুখে কুৎসা রটাত, এখন ডিপফেক বানায়। প্রযুক্তি বদলেছে, মজ্জাটা বদলায়নি। মেয়েদের শরীর, মুখ, কণ্ঠস্বর, স্বাধীনতা— সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এই পুরনো নেশাটাই শুধু নতুন অ্যাপ হয়ে ডাউনলোড হয়েছে লক্ষ-কোটি ফোনে।

আমরা যে-দুনিয়াটাকে খুব আদর করে ‘পার্সোনাল স্পেস’ ভাবি, সেই ফোনের স্ক্রিনটাই এখন মেয়েদের পক্ষে অনেক সময়ে জনসমক্ষে ঝোলানো একখানা লজ্জাপট। সেখানে কারও অনুমতি ছাড়াই ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, কারও নকল প্রোফাইল খুলে চরিত্রহনন, কারও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে ভয় দেখানো, কারও ইনবক্সে পর্নোগ্রাফিক বার্তা, কারও পুরনো অন্তরঙ্গ ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেল, কারও মুখ বসিয়ে বানানো হচ্ছে কৃত্রিম পর্ন। আর এই সব কিছুর একটা ঝকঝকে ইংরেজি নামও আছে— ডিজিটাল ভায়োলেন্স। নাম শুনে মনে হয়, যেন কোনও সেমিনারের বিষয়। আসলে এটা পুরোদস্তুর হিংসা। একেবারে ঝাপটে পড়া, শ্বাস বন্ধ করা, বুক কাঁপানো হিংসা।

আরও পড়ুন: শ্রমজীবী নারীর আন্দোলন ও যুগান্তর ফিল্ম কালেকটিভ! লিখছেন অভিষেক রায় বর্মণ…

মজার কথা হল, এখনও অনেকেই এটাকে হিংসা বলতেই নারাজ। ‘ও তো অনলাইনে হয়েছে’, ‘ওসব পাত্তা দিও না’, ‘ব্লক করে দাও’, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকলে এগুলো একটু হবেই’— এইসব কথার মধ্যে আমাদের সমাজের পুরনো নিষ্ঠুরতা খুব আরামে হাই তোলে। যেন সমস্যাটা অপরাধীর নয়, সমস্যাটা মেয়েটার। সে কেন ছবি দিল? কেন কথা বলল? কেন উত্তর দিল? কেন রাত জেগে অনলাইন ছিল? কেন এত ভিজিবল? চমৎকার। মেয়েদের ওপর হামলার ইতিহাসে আমাদের সমাজের সবচেয়ে প্রিয় কাজই হল— হামলাকারীকে আড়াল করে আক্রান্ত মেয়েটার জীবনযাপনকে জেরা করা। অফলাইনে যেমন, অনলাইনেও তেমন। ধারাবাহিকতা বজায় আছে, এ-ও এক ধরনের সাংস্কৃতিক সাফল্য বটে।

কিন্তু সংখ্যাগুলো খুব নির্লজ্জ। তারা আড়াল মানে না। জাতিসংঘের এক সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, পৃথিবীর প্রায় ৩৮ শতাংশ নারী কোনও-না-কোনও রকম অনলাইন হেনস্তার শিকার হয়েছেন। ৮৫ শতাংশ নারী অন্য কাউকে এই হেনস্তার মুখে পড়তে দেখেছেন। অন্য সমীক্ষাগুলি মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, আনুমানিক ১৬ থেকে ৫৮ শতাংশ নারী-জীবনের কোনও-না-কোনও সময়ে প্রযুক্তি-নির্ভর লিঙ্গভিত্তিক হিংসার মুখোমুখি হয়েছেন। তা হলে ‘সেফ স্পেস’ কথাটা নিয়ে একটু হেসে নেওয়া যায়। মেয়েদের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট অনেক সময়ে সবুজ গালচে পাতা পার্ক নয়, বরং খানাখন্দে ভরা রাস্তা— কখন কোথায় পা মচকাবে, কে ধাক্কা দেবে, কে কাদা ছুড়ে মারবে, আগে থেকে বলা মুশকিল।

আরও শোনা যাক। ১৫ বছর বয়সের পর থেকে প্রতি ১০ জন নারীর অন্তত ১ জন কোনও না কোনও ধরনের সাইবার ভায়োলেন্সের শিকার। ব্রিটেনে এক বিশ্লেষণ বলছে, প্রতি ৫ জন নারীর মধ্যে অন্তত ১ জন জীবনে একবার হলেও অনলাইন হেনস্তার মুখে পড়েছেন। ৩১টি দেশে ১৪ হাজার মেয়ের উপর সমীক্ষা করে দেখা গেছে, ৫৮ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে হয়রানির শিকার। যাঁরা ফেমিনিজম, সমতা, অধিকার— এইসব ‘অতি বাড়াবাড়ি’ কথা প্রকাশ্যে বলেন, সেই অধিকার-রক্ষা নারী-কর্মীরা প্রায় নিয়মিত গালাগাল আর হুমকি পান। মানে, মেয়ে হয়ে মুখ খুললে প্রথমেই তাকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়— ইন্টারনেটেও মাইক্রোফোনটা শেষ পর্যন্ত তোমার জন্য নয়।

আর যার গলা যত জোরে, তাকে থামানোর তৎপরতাও তত বেশি। মহিলা সাংবাদিকদের উপরে হওয়া সমীক্ষা বলছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ অনলাইনে হেনস্তার শিকার হয়েছেন; প্রতি ৪ জনে ১ জন মৃত্যুর বা শারীরিক আক্রমণের হুমকি পেয়েছেন। আরও ভয়ানক হল, এক বিশ্বব্যাপী সমীক্ষা বলছে, প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই অনলাইন আক্রমণ পরে অফলাইন হামলায় গড়িয়েছে। মানে, ‘ওসব তো শুধু ভার্চুয়াল’ কথাটা আসলে আরামকেদারায় বসে বলা বুকনি। বাস্তবে স্ক্রিনে লেখা হুমকি দরজার কড়া নাড়তে খুব বেশি দেরি করে না।

এই হিংসার পদ্ধতিটাও লক্ষ করার মতো। খুব কম ক্ষেত্রেই এটা সিনেমার দৃশ্যের মতো আচমকা আসে। বরং ধীরে-ধীরে আসে। প্রথমে ‘হাই’, তারপর ‘রিপ্লাই দিচ্ছ না কেন?’, তারপর গালি, তারপর কুৎসা, তারপর ‘দেখে নেব’, তারপর এডিট করা ছবি, তারপর পরিচিতদের ইনবক্সে ছড়িয়ে দেওয়া। মানে, মেয়েটিকে শুধু অপমান করাই নয়, তাকে ক্লান্ত করে দেওয়া, আতঙ্কে রাখা, নিজের অস্তিত্বটাই যেন ঝামেলা বলে মনে করানো— এই কাজটা খুব পরিকল্পিত ভাবে হয়। ফলও মেলে। সে হয়তো নিজের পোস্ট মুছে দেয়, অ্যাকাউন্ট প্রাইভেট করে, ছবি দেওয়া বন্ধ করে, মতামত কমায়, বিতর্ক এড়িয়ে চলে, ধীরে-ধীরে নিজেকে ছোট করতে থাকে। দারুণ। পিতৃতন্ত্রের কাজ সে নিজেই করে দিল। নিজেকে নিজে নিয়ন্ত্রণ করাটাই তো আসল ফসল।

তারপর এসেছে এআই। নতুন কেতা, পুরনো বর্বরতা। প্রযুক্তি নাকি নিরপেক্ষ— এই কথাটা যাঁরা বলেন, তাঁরা বোধহয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারা, কাদের বিরুদ্ধে, কোন সমাজে— এই প্রশ্নগুলো খুব সুবিধাজনক ভাবে ভুলে যান। ডিপফেক তার সবচেয়ে নোংরা উদাহরণ। কোনও নারী হয়তো কখনও তেমন ছবি তোলেননি, তেমন ভিডিও বানাননি, তবু তাঁর মুখ বসিয়ে কৃত্রিম পর্ন বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, অনলাইন ডিপফেক কনটেন্টের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই নন-কনসেনশুয়াল পর্নোগ্রাফি, আর তার প্রায় ৯০ শতাংশ টার্গেট নারী। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খুব বাস্তব এক পিতৃতান্ত্রিক শয়তানিকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুলে-ফেঁপে তুলছে।

ভারতের দিকে তাকালেও ছবিটা আলাদা নয়। ২০২৩ সালে দেশে সাইবারক্রাইম বেড়েছে ৩১ শতাংশের বেশি; মোট সাইবারক্রাইম কেস হয়েছে প্রায় ৮৬ হাজার ৪২০টি। একই বছরে ‘ক্রাইম এগেনস্ট উইমেন’-এর কেস প্রায় ৪.৪৮ লক্ষ। কিন্তু আমরা সবাই জানি, সংখ্যার চেয়ে বড় হল, যে-সংখ্যাটা কোথাও লেখা থাকে না। যে-মেয়ে থানায় যায় না। যে যায়, কিন্তু ফিরিয়ে দেওয়া হয়। যে ভাবে, ‘আর ঝামেলা বাড়িয়ে কী হবে?’ যে জানে, অভিযোগ করতে গেলেই তার ফোন, তার সম্পর্ক, তার ছবি, তার পোশাক, তার সময়, সব কিছুর তল্লাশি হবে— অপরাধীর না, তার। ফলে নন-কনসেনশুয়াল ইমেজ শেয়ারিং, ফেক প্রোফাইল, ডক্সিং, সাইবারস্টকিং— এসবের বড় অংশই নথিবদ্ধ হওয়ার আগেই সামাজিক চাপে থেমে যায়।

এখানেই মানসিক স্বাস্থ্যের কথাটা আসে। কেউ-কেউ এখনও ভাবেন, এ সব শৌখিন ‘মন খারাপ’-এর ব্যাপার। যেন ঘুম না-হওয়া, বুক ধড়ফড়, আতঙ্ক, আত্মবিশ্বাস হারানো, নিজের শরীরকে অপমানের উৎস বলে মনে হওয়া—এসব খুব বিলাসী প্রতিক্রিয়া। আসলে এগুলো হিংসারই স্বাভাবিক ফল। সারাক্ষণ এই ভয় নিয়ে বাঁচা যে, কখন কোন ছবি ছড়িয়ে পড়বে, কখন কে কী বানাবে, কোন অচেনা নম্বর থেকে আবার কী আসবে— এটা কোনও ছোট অভিজ্ঞতা নয়। এটা মানুষের নিজের ওপর আস্থা নষ্ট করে। আর একবার সেই আস্থা নড়ে গেলে, তার প্রভাব পড়ে কাজের জায়গায়, সম্পর্কে, পাঁচ জন লোকের সামনে কথা বলায়, এমনকী নিজের ঘরেও।

এই কাজটা খুব পরিকল্পিত ভাবে হয়। ফলও মেলে। সে হয়তো নিজের পোস্ট মুছে দেয়, অ্যাকাউন্ট প্রাইভেট করে, ছবি দেওয়া বন্ধ করে, মতামত কমায়, বিতর্ক এড়িয়ে চলে, ধীরে-ধীরে নিজেকে ছোট করতে থাকে। দারুণ। পিতৃতন্ত্রের কাজ সে নিজেই করে দিল। নিজেকে নিজে নিয়ন্ত্রণ করাটাই তো আসল ফসল।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর কথাও আলাদা করে বলার আছে। তারা খুব নিরীহ সাজতে ভালবাসে। যেন তারা শুধু একটা ‘প্ল্যাটফর্ম’। কিন্তু তাদের অ্যালগোরিদম চেনে উত্তেজনার গন্ধ। চেনে ঘৃণার বাজার। জানে, কেলেঙ্কারি বিক্রি হয়, যৌন অপমান বিক্রি হয়, দলবদ্ধ আক্রমণ এনগেজমেন্ট বাড়ায়। ফলে কোনও কনটেন্ট সরানোর আগেই সেটা অনেক সময় গোটা সোশ্যাল মিডিয়ার ম্যাপটা ভাল মতো ঘুরে নেয়। কমিউনিটি গাইডলাইন থাকে, রিপোর্ট অপশন থাকে, কিন্তু বাস্তবে আক্রান্ত মেয়েটির সম্মান আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ার গতি ধীর, এবং কনটেন্টের ভাইরাল হওয়ার গতি বহু গুণ বেশি। একে কি কেবল প্রযুক্তিগত ত্রুটি বলা যায়? না, এটা রাজনৈতিক এবং ব্যাবসায়িক সুবিধার প্রশ্নও বটে।

তাই এই সমস্যার সমাধান ‘টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন অন রাখুন’-এ শেষ হয় না। সেটা দরকার, নিশ্চয়ই। তার চেয়েও বেশি দরকার স্পষ্ট আইন, দ্রুত টেক-ডাউন ব্যবস্থা, জেন্ডার-সেনসিটিভ সাইবার সেল, স্কুল-কলেজে ডিজিটাল কনসেন্টের শিক্ষা, প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি, আর সর্বোপরি সামাজিক বিরোধিতা। মেয়ের ছবি ফরওয়ার্ড করার আগে যে-বন্ধু থামবে, গ্রুপে নোংরা কৌতুকে হো-হো না করে যে বলবে ‘এটা ঠিক না’, ট্রোলড হওয়া কাউকে ‘ইগনোর কর’ না বলে যে পাশে দাঁড়াবে— সেখানেই বদলের বীজ।

কারণ ডিজিটাল হিংসা আদৌ ডিজিটাল নয়, খুবই বাস্তব। তার রক্তমাংস আছে, ঘাম আছে, কাঁপুনি আছে, লজ্জা আছে, দমবন্ধ করা ভয় আছে। স্ক্রিনে শুরু হওয়া আঘাত শরীরে, মনে, কাজে, রাস্তায়, সংসারে গিয়ে লাগে। দাগটা সব সময়ে বাইরে থেকে দেখা যায় না বলেই সেটা কম সত্যি নয়। বরং আরও কৌশলী।

আজকের পিতৃতন্ত্র ওয়াই-ফাই দিয়ে চাবুক চালায়। ডেটার গতিতে শিকার ধরে। আর আমরা যদি এখনও বলি ‘ওসব তো অনলাইন’— তা হলে দায় এড়ানো হবে, সমস্যাটা বোঝা হবে না। কারণ অনলাইন এখন আর আলাদা কোনও দুনিয়া নয়। এটা আমাদের জীবনের একটা সম্প্রসারণ। ফলে সেখানে মেয়েদের নিরাপত্তা, সম্মান আর  অধিকার রক্ষা করা মানে শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা নয়; গণতন্ত্রের অর্ধেককে বাঁচিয়ে রাখা।

তথ্যসূত্র:
Forbes,
UN Women,
European Institute for Gender Equality,
End Violence Against Women,
Plan International / ITU
UNESCO,
International Center for Journalists,
IMPRI India,
Drishti IAS
Equality Now
United Nations