আকস্মিক! আকস্মিকই বটে! গত ৮ মার্চ ২০২৬-এর গভীর রাতে চলে গেলেন হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানির কর্ণধার শোভনলাল সাহা (জ. ১ জুন, ১৯৪৬) এই মৃত্যু আর পাঁচটা মৃত্যুর মতো কেবল চলে যাওয়া নয়, আমাদের বাংলা সংস্কৃতি জগৎকে হঠাৎ অনাথ করে যাওয়া। বাংলা গানের ধ্বনিমুদ্রণ এবং তার প্রচার ও প্রসারের ইতিহাসে হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি এবং পরবর্তীকালে ওই প্রতিষ্ঠানেরই ইনরেকো এন্টারটেইনমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড-এর (১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত) গভীর এবং অনপনেয় অবদান রয়েছে। শোভনবাবু তাঁর পরিশ্রম, দূরদৃষ্টি এবং আন্তরিক নিবিড় ভালবাসায় এই প্রতিষ্ঠানকে বাঙালি সংস্কৃতির একটা নিরাপদ এবং নির্বিকল্প ঠিকানা করে তুলেছিলেন। একজন সফল চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে তাঁর নিজস্ব পেশাগত ব্যস্ততা সামলেও চুরানব্বই বছরের প্রতিষ্ঠান হিন্দুস্থান রেকর্ডকে তিনি আগলে রেখেছিলেন তাঁর ভালবাসার ধন হিসেবেই। শুধু আগলে রাখাই নয়, এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডকে তিনি বিস্তৃত করেছেন, বহুমুখী করেছেন।
গত ১২৪ বছরে (ভারতে ব্যাবসায়িক ভিত্তিতে প্রথম রেকর্ডিং এবং রেকর্ড প্রকাশ হতে শুরু করে ১৯০২ সালে) রেকর্ডিং ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯৩২ সালে হিন্দুস্থান তার যাত্রা শুরু করে আজ পর্যন্ত সেই পথের সমস্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে হিন্দুস্থান বাঙালির সংস্কৃতির প্রতি তাদের দায়বদ্ধতাকে প্রমাণ করেছে বারে বারে। হিন্দুস্থানের এই যাত্রায় শোভনবাবুর একটা দৃঢ় এবং সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল। গত শতকের শেষ পাদ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি হিন্দুস্থান রেকর্ড এবং ইনরেকোকে লালন করেছেন। সংগীত এবং প্রযুক্তির জগতের নানা পরিবর্তনের মধ্যেও তাঁর দূরদৃষ্টি, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধের ফলে প্রতিষ্ঠানটি বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নতুন শক্তি ও মর্যাদা অর্জন করে। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ভারতীয় সংগীতের বিভিন্ন ধারায় এক অগ্রণী ভূমিকা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। তাঁর সুদক্ষ পরিচালনায় এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু তার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখেনি, বরং নতুন উদ্যোগে সমৃদ্ধ হয়েছে। সংগীত প্রযোজনা ও আর্কাইভ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন, যাতে ভারতের সংগীত ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সংরক্ষিত থাকে। শিল্প ও সংস্কৃতিকে বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে যুক্ত করার জন্যও তিনি নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সংগীতের পাশাপাশি সংস্কৃতির বিস্তৃত পরিসরকে সামনে রেখে তাঁর উৎসাহেই এই প্রতিষ্ঠানে একটি বই প্রকাশনা বিভাগও গড়ে ওঠে। এই বিভাগের মাধ্যমে বাংলার বিশিষ্ট সংগীতশিল্পীদের জীবন ও কর্ম নিয়ে একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যা বাংলা সংগীত ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক মূল্যবান উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে। ২০১৮ সালে শোভনবাবুর উদ্যোগে হিন্দুস্থানের ঐতিহাসিক রেকর্ডিং স্টুডিয়োটির আধুনিকীকরণ করা হয়, যাতে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা এখান থেকে সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পেতে পারেন। আজও এই স্টুডিয়ো ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিদ্যমান, যেখানে সমকালীন শিল্পীরা অতীতের অমর সুরসৃষ্টিকে নতুন ব্যাখ্যায় তুলে ধরছেন।

চুরানব্বই বছর আগে ১৯৩২ সালের ১৪ জুলাই হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি নিবন্ধিত হয় কলকাতায়। তাদের নিবন্ধন হয়েছিল ‘হিন্দুস্থান মিউজ়িক্যাল প্রডাক্টস অ্যান্ড ভ্যারাইটিস, সিন্ডিকেট, লিমিটেড’ নামে। তার আগে, অনেক আগে ১৮৯৫ সালে মতিলাল সাহা কলকাতার ২৩-৩,৫,৬ ধর্মতলা স্ট্রিটে এম. এল. শ (M. L. Shaw) নামে একটা হারমোনিয়ামের দোকান খোলেন। ১৯০৫ সালে এম. এল. শ নিকোল রেকর্ডের এজেন্ট এবং ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কলকাতার অন্যতম প্রধান টকিং মেশিনের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। ১৯১১ সাল নাগাদ এম. এল. শ তাদের ঠিকানা বদল করে ৫/১ ধর্মতলা স্ট্রিটে সরিয়ে নিয়ে যায়— সে-সময়ে তারা তাদের তৈরি ‘বীণা’ হারমোনিয়াম এবং ‘হিজ় মাস্টার্স ভ়য়েজ়’-এর জিনিসপত্র বিক্রি করতে থাকে। ১৯২২ সাল নাগাদ মতিলালের পুত্র চণ্ডীচরণ সাহা এম. এল. শ-র ম্যানেজার হিসাবে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাবসার প্রসার ঘটান। সে-সময়ে চণ্ডীবাবুর নেতৃত্বে এম. এল. শ ‘পাইয়োনিয়ার’ এবং ‘মেল-ও-ফোন’ টকিং মেশিন-এর ডিলার হিসাবেও আত্মপ্রকাশ করে। ১৯২০-র দশকের শেষের দিকে এই প্রতিষ্ঠান ‘টকি’-র ব্যাবসায় ঢুকে পড়ে ‘পাথে-বেবি’ হোম সিনেমা মেশিনের ডিস্ট্রিবিউটর হয়ে। ঠিক ওই সময়ে কোম্পানি ৬/১ অক্রূর দত্ত লেনে তাদের ওয়্যারহাউজ় প্রতিষ্ঠা করে। আজও সেই ৬/১ অক্রূর দত্ত লেনে হিন্দুস্থান রেকর্ড তাদের কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলা গানের আজকের এই দুর্দিনেও হিন্দুস্থান তাদের টিকিয়ে রাখতে পেরেছে, এটা কম কথা নয়।
গত ২৩ এপ্রিল ২০২৫-এ, আমরা দীর্ঘ সময় কথা বলেছিলাম হিন্দুস্থান রেকর্ডের কর্ণধার শোভনলাল সাহার সঙ্গে। আমাদের সেই আলাপচারিতায় সঙ্গ দিয়েছিলেন হিন্দুস্থানের আরও তিনজন সদস্য— অমল বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌতম বসু মল্লিক এবং সুতীর্থ দাস। আমাদের কথাবার্তাকে যন্ত্রে ধারণ করে রেখেছিলেন বিশিষ্ট শব্দ প্রকৌশলী অভিমন্যু দেব। সেই কথাবার্তা থেকে শোভনবাবুর বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ এখানে তুলে দেওয়া হল।
শোভনলাল সাহার বক্তব্য:
… শুরুর কথা বলতে হলে আমার বাবার কথা দিয়েই শুরু করতে হবে। আমার বাবা শ্রীচণ্ডীচরণ সাহা জার্মানিতে যান ১৯২০-র দশকের শেষের দিকে। জার্মানিতে জর্জ নয়মান নামে একটা কোম্পানি আছে, যারা সাউন্ড রেকর্ডিং-এ বিশ্বখ্যাত। এই কোম্পানিতে গিয়ে উনি রেকর্ডিং-এর বিজ্ঞানটা শিখে আসেন এবং রেকর্ড করার জন্য একটা সিলিন্ডার মেশিন কিনে আনেন। এখন আমরা যেখানে বসে আছি, ৬/১ অক্রূর দত্ত লেন, এখানেই তিনি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৩২ সালে। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল যে, যখন বাবা হাইডেলবার্গে ছিলেন, সেখানেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওঁর আলাপ হয়। এর আগেই চণ্ডীচরণ দেশে একটা রেকর্ডিং কোম্পানি স্থাপন করার পরিকল্পনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সে-পরিকল্পনার কথা জেনে তাঁকে শুধু যে উৎসাহ দিয়েছিলেন তাই নয়, তিনি কথা দিয়েছিলেন যে কোম্পানি শুরু হলে রবীন্দ্রনাথ তার উদ্বোধন করবেন। রবীন্দ্রনাথের ছত্রছায়াতেই এই প্রতিষ্ঠান তার যাত্রা শুরু করে— বাংলা গানের প্রচার ও প্রসারের জন্য রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ এবং প্রত্যক্ষ সহযোগিতা হিন্দুস্থান রেকর্ড শুরু থেকেই পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ১৯৩২-এর ৫ এপ্রিল এই রেকর্ডিং স্টুডিয়োর উদ্বোধন করেন। প্রথম গান তিনি রেকর্ড করেন ‘তবু মনে রেখো’। পরে ১৯৩৪ সালে এখানেই প্রথমবার রেকর্ড করা হয় ‘জনগণমন-আধিনায়ক জয় হে’। হিন্দুস্থান থেকে একে-একে রবীন্দ্রনাথের অনেক রেকর্ডই বেরিয়েছে।…

… হিন্দুস্থান রেকর্ড, হিন্দুস্থানের প্রথম চেয়ারম্যান হয়েছিলেন রথীন্দ্রনাথ। আমাদের প্রথম বছরের মিনিট্স দেখলে বোঝা যায় যে, রথীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাঙালির এ-ধরনের আরও প্রতিষ্ঠানের মানুষেরাও জুড়ে থেকে এই বাঙালি উদ্যোগকে যেন সফল করে তোলা যায়— মেগাফোনের জিতেন্দ্রনাথ ঘোষ, সেনোলার বিভূতি সেন, নিউ থিয়েটার্সের বীরেন্দ্রনাথ সরকার এঁদের সকলকেই তিনি হিন্দুস্থান রেকর্ডের পরিচালন পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তাঁদের সকলের চেষ্টায় একটা দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, কীভাবে বাংলা গানকে যথাযথভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা যায়। এখানে যে-কথাটা বিশেষভাবে বলা উচিত তা হল, রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগেই হিন্দুস্থান রেকর্ডে সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলারা এসেছিলেন রেকর্ড করতে। তার আগে তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্র ঘরের মেয়েরা সাধারণত রেকর্ডে গান গাইতেন না। রবীন্দ্রনাথ হরিপদ চট্টোপাধ্যায়কে হিন্দুস্থান রেকর্ডে পাঠিয়েছিলেন যাতে তাঁর তত্ত্বাবধানে মেয়েরা এখানে নিরাপদে আসতে পারে, গান রেকর্ড করতে পারে এবং কোনওভাবেই যেন তাঁদের সামাজিক সম্মান বা ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এর আগে তো প্রধানত বাঈজিরাই রেকর্ডে গান করতেন, সেই অবরোধটা তুলতে সাহায্য করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। রবীন্দ্রনাথের মধ্যস্থতায় হিন্দুস্থানে সেই সময়ে গান রেকর্ড করেছেন অমিয়া ঠাকুর, অমিতা সেন, চিত্রলেখা সিদ্ধান্ত, সুপ্রভা রায় (সুকুমার রায়ের স্ত্রী), বিজয়া রায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাবিত্রী দেবী কৃষ্ণান, অমলা দত্ত থেকে শুরু করে রাজেশ্বরী দত্ত পর্যন্ত অনেকেই। আমি বাবার থেকে যা শুনেছি বা হিন্দুস্থানের সেই সময়ের রেকর্ড ক্যাটালগ দেখে যা বুঝেছি, তা হল এইভাবে মেয়েদের জনপরিসরে একটা সম্মানের জায়গা তৈরি করে দেওয়ার কাজটা রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে হিন্দুস্থান রেকর্ড করতে পেরেছিল। এটা বাংলার সামাজিক ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সত্যি কথা বলতে, রবীন্দ্রনাথ ওয়াজ আওয়ার বিগেস্ট অ্যামবাস্যাডর। তবে বাংলা গানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রসংগীতকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে হিন্দুস্থানের ভূমিকা সবচেয়ে বড়। অন্য কোম্পানিগুলি গানের অন্য নানা দিকে কাজ করেছে— যেমন মেগাফোন ক্লাসিক্যাল এবং নজরুলের গান; সেনোলা বাংলা নাটক, ইত্যাদি।…
… আরও একটা ব্যবস্থা বাবা চালু করেছিলেন— সেটা হল রয়্যালটি দেওয়া। আগে শিল্পীদের একবারই পারিশ্রমিক দেওয়া হত, কিন্তু চণ্ডীচরণই প্রথম রয়্যলটি দিয়ে শিল্পীদের কোম্পানির লভ্যাংশে অংশীদার করে তুললেন। এর আগে এমন সুচারুভাবে এই ব্যবস্থা কেউ করেননি বাংলা গানের জগতে। একটা গল্প বলি— সায়গল ১৯৩২ সালে এখানে প্রথম রেকর্ড করতে আসেন দুটো গান, ‘ঝুলন ঝুলাও’ এবং ‘হরি হো ব্রজরাজ দুলাল’। এই গানদুটোর জন্য তাঁকে দশ টাকা দেওয়া হয়েছিল। এই গানের প্রায় পাঁচ লক্ষ রেকর্ড বিক্রি হয়েছিল। বাবা তখন সায়গলকে বললেন, তাঁর পারিশ্রমিক রয়্যালটি হিসেবে দিতে চান তিনি। কিন্তু সায়গল বলেছিলেন যে তিনি ওই দুটো গানের জন্য কোনও রয়্যালটি নেবেন না, বরং পরের গানগুলির জন্য রয়্যালটি নেবেন। আমরা সেই রয়্যালটি দিয়েছি ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত সায়গলের স্ত্রীকে— সেটাই তখন তাঁর (সায়গলের স্ত্রীর) একমাত্র রোজগার ছিল। এর পরে সায়গল আরও অনেক গান রেকর্ড করেছেন শুধু নয়, একমাত্র হিন্দুস্থান থেকেই তিনি রেকর্ড করেছেন আজীবন। এমনকী সায়গল যখন বম্বেতে গেলেন, তখনও তিনি হিন্দুস্থান ছাড়া আর কোথাও রেকর্ড করেননি। সায়গল তো হিন্দুস্থান ছাড়া আর কোনও স্টুডিয়োতে গিয়েও রেকর্ড করেননি। এখানে একটা মজার গল্প বলি। সায়গলের গান মাত্র একবারই অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো থেকে ব্রডকাস্ট হয়েছিল। সায়গল অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর স্টুডিয়োতে যেতে রাজি হননি, তাই অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো তখন অকাশবাণী থেকে টালিগঞ্জের স্টুডিয়ো পর্যন্ত তার ফেলে সংযোগ তৈরি করে সরাসরি ব্রডকাস্টের ব্যবস্থা করে। কিন্তু সে-সময়ে রেডিয়োতে হারমোনিয়াম নিয়ে গান গাওয়ার অনুমতি ছিল না, তাই সায়গল একটা আপত্তিকর কথা বলেছিলেন গান শুরু করার আগে যেটা সরাসরি রেডিয়োতে সম্প্রচারিত হয়ে যায়। এই ঘটনার পরে অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো আর সায়গলের গান সম্প্রচার করেনি সরাসরি, রেকর্ডে তাঁর গান বাজত রেডিয়োতে, কিন্তু রেডিয়োতে তাঁকে আর ডাকা হয়নি। মহিলাদের জন্য একটা সম্মানজনক পরিসর তৈরি এবং রয়্যালটির ব্যাপারে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়ম করে দেওয়ার ব্যাপারে হিন্দুস্থান রেকর্ড পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল এই বাংলায়।…

… শুরুতে এইচএমভি ছাড়া একমাত্র হিন্দুস্থানেরই রেকর্ডিং স্টুডিয়ো ছিল, কিন্তু রেকর্ড প্রেসিং হত এইচএমভিতে। এই ব্যাপারে এইচএমভি হিন্দুস্থান বা মেগাফোন বা আর যে-কোম্পানি ছিল, তাদের সঙ্গে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার সম্পর্ক রেখেছিল ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। যে-কোম্পানির রেকর্ডিং আগে পৌঁছাবে, তাদের রেকর্ডই আগে বেরোবে— এই ব্যাপারটা ছিল। ’৪৮ সালের পরে এইচএমভির পরিচালন ব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আসে, ফলে তখন থেকে সম্পর্কটা আর তেমন বন্ধুত্বপূর্ণ রইল না। এটা হিন্দুস্থান এবং মেগাফোনের মতো কোম্পানির ব্যাবসায়ে কিছুটা বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল।…
… অনেক নতুন শিল্পীকে গানের জগতে পরিচিত করেছে হিন্দুস্থান রেকর্ড। একজন তো শচীন দেব বর্মন— উনি বেশির ভাগ সময়েই হিন্দুস্থানে থাকতেন, ক্লাস করাতেন, এখানেই মীরা দেব বর্মনের সঙ্গে ওঁর পরিচয় হয়। শচীনকর্তা আমাদের একজন স্পোকস-পারসন ছিলেন। শচীনকর্তা বম্বে চলে যাওয়ার ফলে বাংলার বাইরে তাঁর রেকর্ড আর আমরা করতে পারতাম না, কিন্তু তাঁর কড়া নির্দেশ ছিল প্রযোজকরা যেন আমাদের দিয়েই তাঁর রেকর্ড ডিস্ট্রিবিউট করে। এছাড়াও পঙ্কজকুমার মল্লিক, সত্য চৌধুরী, অখিলবন্ধু ঘোষ, সুধীরলাল চক্রবর্তী, উৎপলা সেন, সুপ্রভা সরকার, অংশুমান রায়, রাধারাণী দেবী, সুবিনয় রায়, পূর্ণ দাস বাউলের মতো অসংখ্য শিল্পীর জায়গা ছিল হিন্দুস্থানে।…
… বাবা এক সময়ে কলকাতায় রেকর্ড প্রেসিং ইউনিট প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনাও করেছিলেন। এর জন্য বিরাটিতে অনেক জমিজমাও কেনা হয়েছিল কারখানা তৈরির জন্য। এমনকী জার্মানির ডেকা (Decca, ব্রিটিশ রেকর্ড কোম্পানি) রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে আমাদের চুক্তিও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা আর হয়ে ওঠেনি। না হওয়ার অবশ্য আরও একটা ইতিহাস রয়েছে— আমার দাদু মতিলাল সাহা গ্রামোফোন কোম্পানিতে চাকরি করতেন। আমার বাবা ওখানে অ্যাপ্রেন্টিস ছিলেন। বাবার ১৭ বছর বয়েসে ১৯২৬-’২৭ সাল নাগাদ গ্রামোফোন কোম্পানি বাবাকে একটা দোকান করে দেয়— এখন যেটা অপেরা সিনেমা। ‘এম. এল. শ’ নামের সে-দোকান থেকে আমরা সাইকেল, গ্রামোফোন, ইমপোর্টেড রেকর্ড, ফ্রিজ, হারমোনিয়াম বিক্রি করতাম। এম. এল. শ সে-সময়ে ‘বীণা’ নামে হারমোনিয়ামও তৈরি করত। গ্রামোফোন কোম্পানিই স্পনসর করে বাবাকে জার্মানি পাঠায় রেকর্ডিং-এর প্রযুক্তি শিখে আসার জন্য। বাবার সঙ্গে গ্রামোফোন কোম্পানির খুব একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বাবা সেই সম্পর্কটাকে খুব মূল্য দিতেন। তাই যখন বাবা নিজের কোম্পানি করলেন, তখন গ্রামোফোন কোম্পানিই বাবাকে বলল যে, গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ড তৈরির যে-ক্ষমতা আছে তার সম্পূর্ণ ব্যবহার হয় না। আলাদা রেকর্ড প্রেসিং ইউনিট না করে গ্রামোফোন কোম্পানির ইউনিটকেই তিনি যেন কাজে লাগান হিন্দুস্থানের রেকর্ড তৈরির জন্য। সেই ব্যবস্থাই চলেছিল। আমরা যখন ১৯৭৪ সালে একটা কারখানা তৈরি করার জন্য আবেদন করলাম, তখন বাবা আমার সঙ্গে সাতদিন কথা বলেননি। তাঁর কাছে এটা ছিল বিশ্বাসঘাতকতার শামিল— গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে তিনি তাঁর সম্পর্ককে এতটাই মূল্য দিতেন। আমাদের সেই কোম্পানি তৈরি হয়েছিল ১৯৭৮ সালে— ইনরেকো এন্টারটেইনমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড।…


… হিন্দুস্থান তাদের ব্যাবসাকে বিস্তৃত করেছিল ভারতীয় সংগীতের নানাদিকে। ১৯৩৬ সালে বেনারসের দ্য স্টার অফ হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতায় ‘স্টার হিন্দুস্থান রেকর্ড’ (অনেক ক্লাসিক্যাল রেকর্ড এই লেবেলে প্রকাশিত হয়েছে— বিসমিল্লাহ খানের রেকর্ড হয়েছিল এই লেবেলে), দিল্লির নিজ়াম রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে ‘নিজ়াম রেকর্ড’, কলকাতার কোহিনুর মিউজ়িক্যাল প্রডাক্টস-এর সঙ্গে ‘কোহিনুর’ রেকর্ড লেবেল প্রকাশ করে হিন্দুস্থান। কোহিনুর লেবেলে ভোজপুরি গান বেরোত। ১৯৩৬ থেকে ’৩৮ সালের মধ্যে হিন্দুস্থান লাহোরের জে ডি রজপাল-এর ‘আমেরিকান ফোন রেকর্ডস’ (হিন্দি, পঞ্জাবি গান বেরিয়েছিল), দিল্লির আজ়াদ মিউজ়িক্যাল প্রডাক্টস কোম্পানির ‘আজ়াদ রেকর্ড’, কলকাতার মেল-ও-ডি মিউজ়িক্যাল প্রডাক্টস-এর ‘মেল-ও-ডিস্ক’ লেবেলও প্রকাশ করে। ‘মেল-ও-ডিস্ক’-এ বেশ কিছু দক্ষিণ ভারতীয় গানের রেকর্ডিং-ও হয়েছিল। ১৯৩৭-এর জুলাইয়ে ‘ভারত বাণী’ (Bharat Bani) লেবেলও প্রকাশিত হয় হিন্দুস্থান থেকে। কালী ফিল্ম কোম্পানি তৈরি হয় ১৯৩৪ সালে। ‘কালী ফিল্মস রেকর্ডস’ নামে এদের তৈরি ছবির গান প্রকাশিত হত ৭৮-আরপিএম রেকর্ডে, প্রকাশ করত হিন্দুস্থান মিউজ়িক্যাল প্রডাক্টস অ্যান্ড ভ্যারাইটিস সিন্ডিকেট লিমিটেড। ১৯৩৬ সালে হিন্দুস্থান থেকে ‘Taj— Emblem of Perfection’ লেবেলে ‘Rural Uplift Records’ প্রকাশ করে হিন্দুস্থান, পরে অবশ্য ৯ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের রেকর্ড এই লেবেলে প্রকাশিত হয়। মূলত ইসলামি গানই এই লেবেলে বেরত। এই লেবেলে আমাদের এখনকার বিখ্যাত গায়ক রূপম ইসলামের বাবার গানও রেকর্ডে বেরিয়েছিল— রূপমই আমাকে সে-রেকর্ড এনে দিয়েছে। নিউ থিয়েটার্স-এর তৈরি সিনেমার গান, নিউ থিয়েটার্স-এর সঙ্গে যুক্ত সুরকার এবং গায়কদের সিনেমার গানের বাইরের রেকর্ডও হিন্দুস্থান বের করেছে ‘নিউ থিয়েটার্স’-এর নাম দিয়ে— তিমিরবরণ, পাহাড়ী সান্যাল-সহ অনেকের রেকর্ড বের হয়েছে এই লেবেলে। এছাড়াও লাহোরের জানকীনাথ কুমারের সঙ্গে মিলিতভাবে নীল লেবেলের ‘Jien-o-phone Record’, গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে একযোগে রেঙ্গুনের এ.ওয়ান ফিল্মস-এর ‘A1 Recording’ লেবেল, কাঠমাণ্ডুর এম. সৈফুদ্দিন ব্রাদার্স-এর ‘The New Gurkhali Records’ প্রকাশ করেছে হিন্দুস্থান। লাহোর থেকে বর্মা পর্যন্ত সর্বত্র হিন্দুস্থান তাদের কার্মকাণ্ডকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল। আরও একটা কথা— সাধারণ ১০ ইঞ্চির ৭৮-আরপিএম রেকর্ড গড়ে সাড়ে তিন মিনিট বাজত। ১৯৩৫-এ হিন্দুস্থান চার মিনিট বাজার জন্য ‘Hindusthan Record— Extra Long Recording’ বাজারে আনে।…
এই আলাপ চলেছিল আরও দীর্ঘ সময় ধরে। বিভিন্ন শিল্পী এবং রেকর্ডিং-এর কথা সেখানে এসেছিল। কথা হয়েছিল দেবব্রত বিশ্বাস, রাজেশ্বরী দত্তের প্রসঙ্গেও। সেসব কথা আমরা আপাতত তুলে রাখলাম ভবিষ্যতের জন্য।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা: অভিমন্যু দেব, সুতীর্থ দাশ, অমল বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌতম বসু মল্লিক



