গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের শেষ কিংবা সাতের দশকের গোড়ার দিকে, গ্যাব্রিয়েল ভেনেজিয়ানো নামক ইতালির এক পদার্থবিদ বিশ্বমঞ্চে একটি নতুন তত্ত্বের জন্ম দেন। তাঁর মতে, গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অজস্র অণু-পরমাণুর একমাত্রিক তার বা স্ট্রিং দ্বারা নির্মিত। এসব তার আবার ভিন্ন কম্পাঙ্কে প্রতিনিয়ত কম্পমান। কম্পাঙ্কের ভিন্নতা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিন্ন মৌলিক কণার জন্ম দেয়। বিশ্বচরাচরের সবটুকুই জুড়ে আছে ওই তার-মারফত।
কিন্তু এত গৌরচন্দ্রিকার কারণ কী? যেখানে ভেনেজিয়ানোর থিওরির নির্ভুলতা নিয়ে অনেক পদার্থবিদই সংশয় প্রকাশ করেন, সেখানে এহেন উপক্রমণিকা? যদি কিছুক্ষণের জন্যেও ধরে নিই, স্ট্রিং থিওরি নির্ভুল; তাহলে যাবতীয় ঘটনা ঘটার পিছনে বেশ কিছু নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায়, যা ওই সুতো বা তারেরই ভিন্ন প্রান্তে বিদ্যমান। যদি ধরে নিই, দুর্নীতির অভিযোগে কেজরিওয়ালের শ্রীঘর দর্শন, নির্বাচন ও কোর্টের নির্দেশে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া আদতে একই সুতোর পৃথক উপাদান। এই বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি, দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ কোর্টের বিশেষ সিবিআই জাস্টিস জিতেন্দ্র সিংহ ‘দিল্লি সুরা মামলা’য় এক ঐতিহাসিক রায় দেন। তিনি দ্বিপাক্ষিক বিবেচনা করে জানিয়ে দেন, দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ শিশোদিয়াসহ একাধিক ব্যক্তিকে উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই এই মামলায় ইচ্ছাকৃতভাবে ‘ফাঁসানো’ হয়েছে।
আরও পড়ুন: মেনকা গোস্বামীর মনোনয়ন ও আমাদের জং ধরা মানসিকতা! লিখছেন আদিত্য ঘোষ…
কোর্টের নির্দেশে তাঁদের প্রত্যেককে বেকসুর খালাস করা হয়। এর পাশাপাশি কোর্ট তদন্তকারী অফিসারের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়। এমন হাইপ্রোফাইল কেসে নূন্যতম দায়িত্ববোধের সিকিভাগ অনুপস্থিতি যদি স্ট্রিংয়ের একটি অংশ হয়, তার কম্পন কিন্তু সুদূরপ্রসারী।
অরবিন্দ কেজরিওয়াল নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে প্রথমবার যখন মিডিয়ার সামনে আসেন, তাঁকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। লক্ষ করা যায়, কংগ্রেস ও বিজেপির দুই ভিন্ন অবস্থান। বিজেপি কোর্টের নির্দেশে অসন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি এই রায়ের নিরুপেক্ষতা নিয়েও সন্দিহান। অন্যদিকে কংগ্রেস গোটা বিষয়টিকেই নাটক আখ্যায় অভিহিত করে। কিন্তু বিষয়টা কি আদৌ এতটা সংকীর্ণ? কংগ্রেস-বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়েও কি বৃহৎ নয় এই গোটা সংঘাতটা? আবার আশ্রয় নেওয়া যাক স্ট্রিং থিওরির।
এই থিওরি বলে, গিটারের স্ট্রিংয়ে একটি তারের কম্পন যেভাবে অন্যগুলোকেও প্রভাবিত করে, ঠিক তেমনই ‘ওয়েভ তৈরি করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু-পরমাণুর স্ট্রিং। যদি ধরে নিই, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর উপর এমন অসাংবিধানিক আঘাতের অভিঘাত আদতে একই তারে অবস্থিত জাতীয় গণতন্ত্রের সূক্ষ্ম পরিসরটুকুকেও প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। আদতে ক্ষমতার প্রচ্ছন্ন আস্ফালন বলে, জিজ্ঞাস্য রাষ্ট্রমুখী হলে প্রশ্নকর্তার করুণ পরিণতি অবশ্যম্ভাবী।
একটি গণতান্ত্রিক দেশে কোনও এক প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীকে সুনির্দিষ্ট প্রমান ছাড়াই যদি ৫ মাসের কাছাকাছি সময় এবং উপমুখ্যমন্ত্রীকেও ৫০০ দিনের অধিক বন্দী রাখা হয়; পরবর্তীতে যখন নিরাপরাধ প্রমাণিত হয়, ততদিনে তাঁদের রাজনৈতিক কেরিয়ার শেষ হয়ে যায়। বা শেষ না হলেও, এই কালির ছাপ তো আজীবন থেকে যাবেই। অন্যদিকে যে-রাষ্ট্র ব্যবস্থা তাঁদের এই পরিণতি করল, তার কার্যক্রম এদেশে ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে গণ্য হয়।
ঘটনার শুরুতে আসা যাক। ‘লিকার দুর্নীতি’কে কেন্দ্র করেই দিল্লিতে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে। প্রায় ১১ বছরের আপ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে বিজেপি সরকার। সেই পথ সুগম ও মসৃণ করতেই শ্রীঘরে পাঠানো হয়েছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে। অন্ততঃ ঘটনাক্রম বা শাসক দলের ভাষায়, ‘ক্রোনোলজি’ সে-রকমটাই ইঙ্গিত করছে। মাননীয় বিচারপতি তাঁর রায়ে উল্লেখ করেছেন, সিবিআইয়ের ১০০০ পাতার চার্জশিটের অধিকাংশই অমূলক ও ভিত্তিহীন। অনেকক্ষেত্রেই ইচ্ছাকৃত ও অনৈতিকভাবে অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তাঁর সরকার প্রসঙ্গ টানা হয়েছে শুধুমাত্র কালিমালিপ্ত করার উদ্দেশ্যে।
প্রথম কেসটিতে প্রধান অভিযুক্তের নাম কুলদীপ সিংহ, কিন্তু অদ্ভুত বিষয়, কোর্টে এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে নূন্যতম প্রমাণও দাখিল করতে পারেনি সিবিআই। পরবর্তীতে আসে মনীশ শিশোদিয়া প্রসঙ্গ, বিজেপি সরকারের মতে এই গোটা দুর্নীতির ‘মাস্টারমাইন্ড’ তিনিই। ওঁর বিরুদ্ধেও কোনও প্রমাণই পাওয়া যায়নি ১০০০ পাতার চার্জশিটে। এমনকী বিচারপতি জানিয়ে দেন— গোটা পলিসিটিতে আগাগোড়া কোনওরকম অপরাধমূলক চক্রান্তের প্রমাণ নেই। কেজরিওয়ালের প্রসঙ্গেও বিচারপতি জানিয়ে দেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে এই মামলায় খানিক জোর করে টেনে আনা আদতে আইনি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধাচরণ।
অর্থাৎ বিষয়টা খানিক এমনই দাঁড়ায় যে, স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একজন মুখ্যমন্ত্রী ও উপমুখ্যমন্ত্রীকে নির্বাচনের ঠিক আগে মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে হাজতে পাঠানো হয় ও দীর্ঘদিন বিনা বিচারে জেলবন্দি রাখা হয়। সঙ্গে যোগ হয়, ‘মিডিয়া ট্রায়াল’। দেশব্যাপী মিডিয়া— প্রমাণ হওয়ার আগেই, ‘দোষী’ বলে প্রচার শুরু করে ও দিল্লির মসনদে বসে বিজেপি। যদিও বিজেপি নেতৃত্ববৃন্দের আস্ফালন বিন্দুমাত্র কমেনি। তাঁরা জানিয়েছেন, নিম্ন আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে তারা উচ্চ-আদালতে যাবে। সিবিআইও হাইকোর্টে অ্যাপিল করবে, এমনটাই শোনা যাচ্ছে।
এখন আইন না জানা সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করতেই পারেন, আইনের ফাঁক গলে হয়তো মুক্তি পেয়েছেন কেজরিওয়াল। কিন্তু না! কোনও টেকনিকাল লুপ-হোল ব্যবহার করে তিনি মুক্তি পাচ্ছেন, এমনটা একেবারেই নয়। তিনি কোনও প্রমাণ লোপাট বা রেইড চলাকালীন সাংবিধানিক পদের অপব্যবহার করে ফাইল বগলদাবা করেননি। কোর্ট জানিয়েছে, নূন্যতম প্রমাণের অভাবে ট্রায়ালটুকুও শুরু করা সম্ভব হয়নি, তাই তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।
জটিলতা এতটাই যে, তদন্তকারী অফিসারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কোর্ট। কোর্ট মনে করছে, তদন্তকারী অফিসার নিজের কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে ঠিকমত করেননি বা কিছু ত্রুটি রয়েছে তাঁর তদন্তে অথবা দুটো বিকল্পেরই সম্ভাবনা প্রবল। এই ঘটনাটি ছাড়াও বিগত ১০ বছরের পরিসংখ্যান হাতড়ালে লক্ষ করা যায়, মোদীর শাসনকালে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে ২০০-র উপর কেস রয়েছে ইডির। যার মধ্যে দণ্ডিতের সংখ্যা মাত্র দুই। অধিকাংশ কেসে ট্রায়ালই শুরু হয়নি। অনেকক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা দল বদলে বিজেপিতে। আদতে লক্ষ্য, দুর্নীতিমুক্ত ভারত নয়, বিরোধীমুক্ত ভারত। মোদী শাসনে আর কিছু হোক বা নাহোক, বিরোধী চিন্তাধারার সুনামকে যথেচ্ছ কালিমালিপ্ত করা গেছে।
আবার আসা যাক ভেনেজিয়ানোর থিওরিতে। স্ট্রিংয়ে একমাত্র অরবিন্দ কেজরিওয়াল নেই, আছে অন্যান্য বিরোধী কণ্ঠও। একে-একে আসা যাক অণু-পরমাণু বিশ্লেষণে।
সিবিআই ২০১৭ নাগাদ তথাকথিত ‘গোদি মিডিয়া’র প্রতিনিধি না হওয়ার কারণেই সম্ভবত, প্রণয় রায় ও রাধিকা রায়ের বিরুদ্ধে কেস ফাইল করে। আইসিআইসিআই ব্যাংকের ঋণে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছিল। বলা হয়েছিল ওঁরা ওঁদের শেয়ার, ঋণের জন্য বন্ধক রেখেছিলেন এবং এই বিষয়ে শেয়ার মার্কেট, শেয়ার হোল্ডার ও সেবি-সহ অন্যান্য রেগুলেটরি বডিকে বিস্তারিত জানাননি। বছর পেরিয়ে যায়, মামলাটি চলতে থাকে। অবশেষে ২০২৪ সালে সিবিআই একটি রিপোর্ট দাখিল করে জানায়, গোটা ঘটনার তদন্তে কোনওরকম অপরাধমূলক কিছু পাওয়া যায়নি।
এখন, লোন একটি অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। আইসিআইসিআই ব্যাংকও ওই একই শর্তে আরও ৮৩টি কোম্পানিকে লোন দিয়েছিল। আরবিআই পরবর্তীতে জানায়, এই গোটা আর্থিক লেনদেনটি কোনওরকম আইনবিরুদ্ধ ঘটনা নয়। সত্যের জয় হলেও, ততদিনে এনডিটিভির ক্ষতি আকাশ ছুঁয়েছে। নতুন করে তহবিল সংগ্রহ, ইনভেস্টর খোঁজা পুরোটাই প্রশ্নের মুখে। অফিস থেকে শুরু করে প্রণয় বাবুর বাড়ি, এই ক’বছরে সব জায়গাতেই অবাধ যাতায়াত ছিল সিবিআইয়ের।
২০২২ সালে আদানি গ্রুপ, বিশ্ব প্রধান কমার্শিয়াল গ্রুপ ক্রয় করেন, যার কাছে এনডিটিভির ২৭.২৬% শেয়ার রয়েছে। পরবর্তীতে শেয়ার বাজার থেকেও তারা আরও বেশি পরিমাণ শেয়ার ক্রয় করতে শুরু করে এবং এনডিটিভি গ্রুপের সর্ববৃহৎ শেয়ারহোল্ডার হয়ে ওঠে। একসময়ে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে, প্রণয় রায় এবং রাধিকা রায় পদত্যাগ করলে, এনডিটিভির নতুন মালিক হয়ে যায় গৌতম আদানি। মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার একটিমাত্র চ্যানেল, যারা নির্ভীকভাবে সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছিল তাদের সমূলে উৎপাটিত করা গেল। চলে আসা যাক স্ট্রিংয়ের আরেকটি অ্যাটম, ভিমা কোরেগাঁও মামলায়।
মোদির শাসনকালে মিডিয়ার দীর্ঘ অবনমন পেরিয়েও, যে দু’একটি মিডিয়া শিরদাঁড়া শক্ত রেখেছে, তারমধ্যে এনডিটিভি অন্যতম। সিবিআই ২০১৭ নাগাদ এনডিটিভির প্রতিষ্ঠাতা প্রণয় রায় ও রাধিকা রায়ের বিরুদ্ধে কেস ফাইল করে। আইসিআইসিআই ব্যাংকের ঋণে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছিল। বলা হয়েছিল ওঁরা ওঁদের শেয়ার, ঋণের জন্য বন্ধক রেখেছিলেন এবং এই বিষয়ে শেয়ার মার্কেট, শেয়ার হোল্ডার ও সেবি-সহ অন্যান্য রেগুলেটরি বডিকে বিস্তারিত জানাননি। বছর পেরিয়ে যায়, মামলাটি চলতে থাকে। অবশেষে ২০২৪ সালে সিবিআই একটি রিপোর্ট দাখিল করে জানায়, গোটা ঘটনার তদন্তে কোনওরকম অপরাধমূলক কিছু পাওয়া যায়নি।
২০১৮ সালে মহারাষ্ট্রের ভিমা কোরেগাঁও গ্রামে, দলিত সম্প্রদায় ও হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে দাঙ্গা হয়। একজনের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। এফআইআরে নাম আসে একজন হিন্দুত্ববাদী নেতা ও দ্বিতীয়জন একজন বামপন্থী, যাঁর নাকি মাওবাদীদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে বলে অভিযোগ করা হয়। পুলিশ তদন্ত করে আরও ১৬ জনকে গ্রেফতার করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ ধারা দেয়। দেখা যায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিত্বদের অধিকাংশই বামপন্থী, সমাজকর্মী, কবি, অধ্যাপক, আইনজীবী প্রমুখ। যাদের প্রত্যেককে ‘দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসমূলক’ কাজে লিপ্ত থাকার ধারা দেওয়া হয়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য পরবর্তীতে সামনে আসে, যখন একটি আমেরিকান ফরেন্সিক ফার্ম (আর্সেনাল কন্সালটিং) স্বাধীনভাবে বিষয়টির তদন্ত করে। তাদের তদন্তে উঠে আসে, যে তথ্যপ্রমানের ভিত্তিতে এই মানুষগুলোকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেগুলি বাইরে থেকে তাঁদের ল্যাপটপে ঢোকানো বা প্লান্ট করা হয়েছিল। কেউ বা কারা ফাঁসানোর জন্য, তাঁদের ল্যাপটপ হ্যাক করে এই তথ্যপ্রমাণ বাইরে থেকে ডাউনলোড করে। ভয়ংকর সুচারু ষড়যন্ত্র। এই খবরটি তৎক্ষণাৎ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও ছড়িয়ে পড়লে, মোদী সরকার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। দীর্ঘদিন আদিবাসীদের জন্য কাজ করা ফাদার স্ট্যান স্বামীকে জেলবন্দি রাখা হয়। ৮৪ বছরের এক পার্কিনসন আক্রান্ত বৃদ্ধর জল খাওয়ার জন্য সামান্য স্ট্র-টুকুও দেওয়া হয় না। জামিন খারিজ হতে থাকে বারবার। তাঁর আইনজীবী বারবার অনুমতি চাইলেও, স্ট্র কিন্তু মেলেনি। অবশেষে জেলবন্দি অবস্থাতেই একদিন মৃত্যু হয় তাঁর। দেশবাসী জানতেও পারল না আদৌ তিনি দোষী ছিলেন, না কি রাষ্ট্র ষড়যন্ত্র করে এক বিরোধী কণ্ঠস্বরকে নির্মমভাবে হত্যা করল। যথারীতি এই মামলাতেও ফাদারের মৃত্যুর পর নূন্যতম অভিযোগ প্রমান করতে ব্যর্থ প্রশাসন। স্ট্রিং ধরে পৌঁছে যাই পরবর্তী কণায়।
২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গায় মূল অভিযুক্ত হিসাবে নাম আসে উমর খালিদের। একজন ছাত্র, গবেষক ও রাজনৈতিক কর্মীকে আবারও ইউএপিএ দেওয়া হয়। অভিযোগ, তাঁর বক্তব্যের জোরেই নাকি দিল্লি দাঙ্গা হয়। প্রমাণ চাইলে পুলিশ জানায়, জনসমক্ষে হয়ত তিনি কোনও বক্তৃতায় আপত্তিজনক কিছু বলেননি; কিন্তু তিনিই নেপথ্যে থাকা ‘আসল’ ষড়যন্ত্রকারী। আজ মামলার ৬ বছর পরেও উমর খালিদ জেলবন্দি। কোর্টে এখনও ট্রায়ালই শুরু হয়নি। তবে তাতে কী আসে যায়? মিডিয়া ট্রায়াল কমপ্লিট। গণমাধ্যম জানিয়ে দিয়েছে, সে একজন ‘সার্টিফায়েড টেরোরিস্ট’।
মনে রাখা দরকার, আজমল কাসভ যে একজন পাকিস্তানি নাগরিক, তাঁর ট্রায়ালও কোর্টে সম্পূর্ণ হয়ে যায় ৪ বছরের মধ্যে। ফাঁসির সাজাও ঘোষণা হয়ে যায়। যদিও সেই মামলায় গোটা বিশ্বের নজর আমাদের বিচারব্যবস্থার উপর ছিল, তাই জটিলতা ছিল অনেক বেশি। স্ট্রিং ধরে আরও খানিক এগিয়ে আসলে লক্ষ করা যাবে, সরকার শুধুমাত্র বামপন্থী, সমাজকর্মী বা বিরোধী দলগুলোর মুখবন্ধ করতে উদ্যোগী এমনটা কিন্তু নয়; প্রয়োজন পড়লে একসময়কার হিতৈষীদেরও জেলের ঘানি টানতে হতে পারে।
২০১৯ সাল, সদ্য অপসারণ হয়েছে আর্টকেল ৩৭০-এর। লাদাখকে জম্মু-কাশ্মীরের থেকে আলাদা করা হয়েছে। প্রশংসায় পঞ্চমুখ সোনম ওয়াংচুক। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের সময় ভাবতেই পারেননি— খাঁড়ার কোপ একদিন তাঁর দিকেও আসতে পারে। তৎকালীন বিজেপির পোস্টার বয় ছিলেন রাজু হিরানির কাহিনির অন্যতম ইডিয়ট। কিন্তু যে-মুহূর্তে লাদাখের জনগণের হকের দাবিতে সোচ্চার হলেন, অর্জন করলেন রাষ্ট্রের ‘কৃপাদৃষ্টি’।
গত বছর সেপ্টেম্বর নাগাদ, লাদাখের সাধারণ জনগণকে সঙ্গী করে হরতালে বসলেন ওয়াংচুক। জল মাপছিল বিজেপি। বাড়ছিল অনশনের দিনসংখ্যা। কিন্তু হঠাৎই একদিন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে লাদাখ। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বিজেপি অফিসে। চারজন নিহত হয় আর্মড ফোর্সের গুলিতে। কোনও কারণ ছাড়াই গ্রেফতার করা হয় সোনম ওয়াংচুককে। যে-বিজেপির হয়ে তিনি একসময়ে ‘বয়কট চায়না’ ক্যাম্পেইন করেছিলেন, দিল্লির নেতারা তাঁকেও‘চিনা এজেন্ট’ আখ্যা দিতেও পিছপা হয় না। হেমন্ত সোরেন থেকে কাফিল খান হয়ে পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা— স্ট্রিংয়ের সমস্ত কণার প্রতি অভিঘাত খানিক একরকম। স্ট্রিংয়ের কম্পন যদি একইভাবে সমস্ত কণাকে প্রভাবিত করে, পার্শ্ববর্তী তারেও প্রভাব ছড়াতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে দেবালয়ে আগুন লাগলে আঁচ আমি বা আপনি অবধি পৌঁছতে কয়েক আলোকবর্ষ নিশ্চয়ই লাগবে না! এখন টার্গেট হচ্ছেন, বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, সমাজকর্মী কিংবা সমাজে পরিচিত বিদ্বজ্জনেরা।




