সাধারণভাবে দৃষ্টিহীনতা বা অন্ধত্ব তিন রকম; সকলেই যে জন্ম থেকে দেখতে পায় না (জন্মান্ধ), তা নয়। একদল ‘টোটাল ব্লাইন্ড’, একদল ‘পারসিয়াল’ এবং আরেকদল, ‘অ্যাডাল্ট ব্লাইন্ড’ (যারা আগে দেখতে পেত, কিন্তু এখন পায় না।) এরা কোনও-না-কোনও সময়ে রঙ দেখেছে, চিনেছে। পূর্ণঅন্ধত্বর সময়ে, তাদের স্মৃতি থেকে রঙ কিংবা আলো চেনা অসুবিধেজনক হয় না। আবার যারা পারসিয়াল ব্লাইন্ড, তারা আবছা হলেও রং চিনতে পারে।
একমাত্র, যে কোনওদিনই কিছু দেখেনি, তার কাছেই রঙের পূর্বনির্ধারিত কোনও ধারণা বা সংজ্ঞা থাকে না। তাকে মুখে বলে-বলে, কানে শুনিয়ে রঙ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা হয়। সে রঙের বর্ণনা শুনে মনে রাখে— কোনটা লাল, বা কোনটা নীল। আগে সে কানে শোনে, তারপর ছুঁয়ে-ছুঁয়ে দেখে। সে আলো দেখতে পায় না, ফলত রঙও তার কাছে সরাসরি (ফিজিক্যালি) ধরা দেয় না। পূর্ণঅন্ধ মানুষের কাছে, রঙ অনুভবের বোধে আসে; তার ব্যঞ্জনা আরও গভীর।
থিয়েটারে অনেক সময়ে আলোর উত্তাপে তারা আন্দাজ করতে পারে, কোথায় আলো আছে বা নেই, কিন্তু কোন রঙের পোশাক কে পরেছে, সেই আন্দাজ রিহার্সাল আর স্পর্শের মধ্যে দিয়ে তৈরি হয়। সেটা স্মৃতিতে ধরে রাখার বিষয়। দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষরা যেমন আয়নায় নিজেদের দেখতে পায়, অন্ধের সে-সুযোগ থাকে না। অন্ধের কোনও নিজস্ব আয়না নেই। একজন অন্ধের ঘরে সাধারণত কোনও আয়না থাকে না।
আরও পড়ুন: ভাষাই দৃষ্টিহীনদের রং চেনায়! লিখছেন বিশ্বজিৎ ঘোষ…
একজন দৃষ্টিহীন মানুষের কাছে রঙের গুরুত্ব— ‘স্মৃতি’ ও ‘মেধা’র পরিসরে বিস্তৃত। শান্তিপুর নিবাসী শিল্পী শিবশঙ্কর দাস ও আমরা, গতবছর একটা আঁকার কর্মশালা করিয়েছিলাম। তখন অন্ধদের হাতে তুলি দিয়ে আলাদা করে বলে দেওয়া হয়েছিল, কোনটা নীল বা কোনটা সাদা। এক-একটা রঙের এক-একটা মানে আছে, কোন রঙটা কীসে ব্যবহার করা হয়— সবটা জানানো হয়েছিল। আসলে যে চোখে দেখে, তাকেও তো আলাদা-আলাদা করে জানানো হয়, কোন রঙের কী মানে। ধরা যাক, একটা বাচ্চাকে শেখানো হচ্ছে রক্তের রঙ ‘লাল’ নয়, ‘নীল’। সে তো সেটাই শিখবে। রক্তের রঙ যে ‘লাল’, সেই ‘লাল’ নামটা তো গোড়াতে কেউ দিয়েছিল, সেভাবেই চলে আসছে। এই চেতনাগুলোই তৈরি করে দেওয়া ছিল, সেই কর্মশালার উদ্দেশ্য।
দোলের দিন, কোনটা লাল বা কোনটা সবুজ সেটা আলাদা করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে অনেক সময়ে বিভিন্ন উপমাও ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি গন্ধও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। এক-একটা রঙের এক-একরকম গন্ধে তারা বুঝে নিতে পারে, কোনটা কী রঙ। আদপে সবটাই চেতনার রঙে রেঙে ওঠা।

থিয়েটারে আলোর এক-একটা রঙের আলাদা বাজারচলতি ব্যঞ্জনা আছে, যুদ্ধ-দৃশ্যের সময়ে রাল রঙের তীব্রতা, সাদার শান্তি, কিংবা সবুজের যৌবন— এই সবগুলোই অন্ধ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বলে-বলে বোঝানো হয়। এবারে আঁকার ক্ষেত্রে ধরা যাক, সে কোনও গাছ আঁকছে, সেখান সে আন্দাজে সবুজ রঙটা দিল। এভাবেই গোটা বিষয়টা পরিচালিত হয়।
তবে অনেক সময়ে অন্ধরা প্রচলিত ধ্যানধারণা বদলে দিয়েও ছবিতে রঙ করতে পারেন। সেখানেই একজন অন্ধ মানুষের রঙ দেখতে পাওয়া এবং তার কাছে রঙের সংজ্ঞা স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। সোমনাথ হোর-এর ছবিতে, ক্ষত আঁকার ক্ষেত্রে লাল রঙের পরিবর্তে সাদা রঙ ব্যবহৃত হয়েছে। সেখানে শিল্পীর দৃষ্টিতে সেটাই আলাদাভাবে বাস্তবানুগ।
বেশিরভাগ শিল্পকলাই কিন্তু অনুকরণের উপর ভর করে চলে আসছে বহুকাল যাবৎ। অর্থাৎ অনুকরণের মধ্যে দিয়ে নতুন সৃষ্টি। আমরা কালীদাস থেকে যে উপমা শুনে আসছি, তাই-ই নতুন করে আমাদের শিল্পের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করছি। এক্ষেত্রে অন্ধদের চিন্তা কিন্তু অনেক মুক্ত। যেহেতু তারা দেখতে পায় না, তাদের সৃষ্টি অনেক ক্ষেত্রেই অনুকরণহীন, স্বতন্ত্র। আমাদের প্রচলিত ধারণা সব সময়ে অন্ধদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আবার, আমরা ওদের মুখে-মুখে যেটা বলে দিচ্ছি, সেটা বুঝছে অনায়াসে। আঁকার কর্মশালার পর আমরা নাটকের ছেলেমেয়েদের দিয়ে তিনটে ছোট-ছোট নাটক করিয়েছিলাম, একটার নাম, ‘অন্ধের ছবি আঁকা’। নাটকের গল্প আঁকাকে কেন্দ্র করেই। ওরা যে বাড়ি-নদী-ঘর— এ-ধরনের আঁকাগুলো শিখল, সেগুলোকেই নাটকের মধ্যে দিয়ে কাজে লাগানো।
প্রথম নাটকটার কথা ধরা যাক। গল্পের বিষয় একটা দরিদ্র পরিবারে জন্মানো অন্ধ ছেলে, তার ইচ্ছে, সে ভিক্ষে করে জীবন যাপন করবে না, ছবি আঁকবে। এই অসম্ভব চাওয়াকে সকলে ব্যঙ্গ করছে, এবং এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই সে আঁকা শুরু করেছে। এহেন সময়ে সে একটি প্রদর্শনীতে ডাক পায় এবং সেখানে সকলে দেখে, সে অনেকটা ছবি এঁকেও ফেলেছে। এই অবস্থায় সে বলছে, অন্যরা (দৃষ্টিসম্পন্ন) মানুষরা যেভাবে ছবি আঁকে, সেভাবে সে আঁকবে না। নিজের মতো করে আঁকবে। তখন প্রশ্ন উঠছে, সে-ছবির তো কোনও মানে হবে না। সে বলছে, এই মানে ‘না-হওয়া’টাই তো একটা ‘হওয়া’; আপনারা কবে বুঝবেন?


অন্ধরা বলছে, আমাদের অন্ধকারে বোঝাবুঝিতে খুব একটা অসুবিধা হয় না, আলোর প্রাবল্যেই অন্ধকারের বেশি অসুবিধে। আলোর মানুষেরা অন্ধদের বলে, তোমরা আমাদের মতন হচ্ছ না কেন? কিন্তু গত দশ বছরে আলোর মানুষরাই তো যুদ্ধ করেছে, ধর্ষণ করেছে, করেছে আরও নানা অন্যায়! কই অন্ধকারের মানুষরা তো সেরকম করেনি, তারা পেতে চায় না তেমন আলো, যে-আলোতে মানুষ মানুষকে মারে!
আরেকটি নাটকের বিষয়— একটি মেয়ে, সে পারসিয়াল ব্লাইন্ড, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে সে সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যায়। সে শিক্ষিত, বিভিন্ন কাজ করে, ছবিও আঁকে। কিন্তু তার স্বামী তাকে সন্দেহ করে, অপমানজনক কথা বলে। এমনই একদিন, সে একটি প্রদর্শনীতে ছবি আঁকতে যায়, সেখানে সে একটি ঘোড়ার ছবি আঁকে সুচারুভাবে, সবাই মুগ্ধ হয়। হঠাৎই সে ঘোড়ার ছবিতে লালরঙ দিয়ে চাবুকের মতো তুলি চালাতে শুরু করে। মেয়েটির মাস্টারমশাই ভাবে, শান্ত মেয়েটির হল কী! মেয়েটি তখন বলে, এত হাততালি প্রশংসার মাঝে ওই যে দেখছেন আমার স্বামী বসে আছে, সে মনে করে আমি কোনও ইতর কাজের সঙ্গে যুক্ত, আমাকে অপমান করে, অসম্মান করে রাত্রিদিন। আপনারা যে ঘোড়ার রক্তাক্ত মুখটা দেখেছেন, সেটাই আমার আসল ছবি আঁকা। এতদিন আপনারা ঘোড়াটা দেখেছেন, রক্তটা দেখেননি তাই চমকাচ্ছেন।
জীবনে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে, ‘মাপ’ বিষয়টা খুব গুরত্বপূর্ণ। অন্ধের ক্ষেত্রে এই মাপ-এর আন্দাজ প্রাথমিকভাবে থাকে না। শেখানো হয় যে, সঠিক মাপটা তারা কীভাবে বুঝবে। এবারে, ঘর আঁকার ক্ষেত্রে তারা নাহয় বুঝে গেল— ঘরের মাপ কেমন হয়, কিন্তু আকাশ আঁকার ক্ষেত্রে? সেক্ষেত্রে কল্পনাই একমাত্র উপায়। এবারে এই মাপ আর মাপহীনতার মাঝে এক নতুন সৃষ্টি হয়। ধরা যাক, ঘরের জানলা সাধারণভাবে যেখানে হয়, একজন অন্ধ সেটা যথাস্থানে না এঁকে, অন্য জায়গায় এঁকেছে। অনেক সময়ে এটা ওরা ইচ্ছাকৃতভাবেই করে। জিজ্ঞেস করলে বলে, আপনার ক্ষেত্রে আপনার মাপ একরকম, আমাদের ক্ষেত্রে আলাদা। আপাত দৃষ্টিতে এই সৃষ্টি বিমূর্ত মনে হলেও, দৃষ্টিহীনদের দিক থেকে বাস্তববাদী ও স্বতন্ত্র।

রবীন্দ্রনাথের নাটকের দিক থেকে দেখলে বলা চলে, সে-নাটকে যে বাইরের ও ভেতরের এক পরত রয়েছে, তা যেন প্রেম ও মৃত্যুর উপাখ্যান। ‘রক্তকরবী’, ‘রাজা’, ‘বিসর্জন’, ‘ডাকঘর’— সব নাটকের ক্ষেত্রেই এই ভাবনা প্রযোজ্য হতে পারে। ‘ডাকঘর’, ‘রাজা’র সংলাপে, সরাসরিই এই ভেতর-দিককার রাস্তার কথা উঠে এসেছে। এ শুধু ‘বাইরের দেখা’ নয়। এই ভেতরের কাহিনির কথা যদি অভিনেতাদের বোঝানো যায়, তাহলে সেটা অন্য মাত্রা পাবে। শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে ‘রাজা’ নাটকটা তোমাদের লিখে দিত, আর অন্ধরা তো মনে করে, ওটা ওদেরই নাটক। ‘কিং অফ দ্য ডার্ক চেম্বার!’ ওই কক্ষে কি একা শুধু রানি থাকে? সমস্ত দেশ থাকে। অন্য একটা প্রসঙ্গে একজন অভিনেতা বলেছিল, জাল কি শুধু রাজারই থাকে? আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব জাল থাকে। এই জালের ওপারেই তো সমস্ত ক্ষমতা পুঞ্জিভূত রয়েছে। ওরা এভাবেই নিজেদের ভাবনা দিয়ে ‘রঙ-রূপ-রস’ খুঁজে নিচ্ছে, ওঁদের সঙ্গে কাজের সময়ে বোঝা যায়, এটা করতে যে ওদের খুব একটা বেগ পেতে হচ্ছে বা দূরের জগতের কথা ভাবতে হচ্ছে, তা নয়। সবটাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসা, রঙিন।




