ভাষাই রং চেনায়

রং-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দৃষ্টি, দৃশ্যমানতা। দৃষ্টি দিয়ে যা খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়, তা হল রং। আমরা সে-কথা জানি। কিন্তু দৃষ্টিহীনদের কাছে রং কীভাবে এসে পৌঁছয়? দৃষ্টিহীনদের কাছে রং আসে ভাষার মাধ্যমে। ভাষাশিক্ষার অগ্রগতি যখন হয় তাদের, তারা ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে, বিভিন্ন বস্তুর সঙ্গে বর্ণের, রঙের সম্পর্ক আছে। সে যখন পোশাকআষাক পরছে, সে হয়তো পোশাকের রং নিজে নির্বাচন করছে। হয়তো কোনও বস্তু সে রং পছন্দ করে কিনছে। তাঁর স্মৃতিতে, কগনিটিভ মেমরিতে এক-একটি বস্তুর রং সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হয়ে যায়।

বিভিন্ন ফুলের সঙ্গে যখন পরিচয় হয় দৃষ্টিহীনদের, তারা ফুলকে স্পর্শ করে ফুল চেনে। কিন্তু সেই স্পর্শের সঙ্গে রংয়ের ধারণাও তাদের মনে স্পষ্ট হয়।

দোল উৎসবে আবির অনিবার্য। আবিরের নানা রং। আগে আবিরের রং ছিল নির্দিষ্ট। এখন নীল, গোলাপি নানারকমের রং আবিরের, কৃত্রিমভাবে সেইসব আবিরের রং তৈরি হয়। দোলে দৃষ্টিহীনরাও অংশ নেয় তাদের মতো করে। সেইসব নানা রঙের আবিরকে তারা একরকমভাবে মর্মে ধারণ করে।

আরও পড়ুন: অন্ধের রং নিজস্ব, সেখানে প্রথা ভাঙার উদ্দাম রয়েছে!
লিখছেন শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায়…

আমি নরেন্দ্রপুর ব্লাইন্ড বয়েজ অ্যাকাডেমির অধ্যক্ষ ছিলাম। আমি সেখানকারই ছাত্র, নরেন্দ্রপুরে আমার উচ্চশিক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে। আমি নিজেও সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন ছিলাম। দোল উৎসবের একটি সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত রয়েছে। গানেরও সময় দোল। নরেন্দ্রপুরে আমরা যখন দোল পালন করেছি, তখন খোল-করতাল-সহ নানারকমের বাদ্যযন্ত্র সহযোগে গানবাজনা করেছি। দোল এলেই খোঁজ পড়ে যেত, কে খোল বাজাবে, কে তবলা বাজাবে। আমরা ওখানেই একসঙ্গে থাকতাম। এই কৌমযাপনের সঙ্গে দোলও জড়িয়ে ছিল অন্যান্য উৎসবের মতো। দৃষ্টিহীনদের পাশাপাশি দৃষ্টিমানরাও থাকতেন আমাদের সঙ্গে। সবাই মিলে মেতে ওঠার উৎসব ছিল দোল। সেই উদযাপন তো কখনওই বেরঙিন নয়। রং তাই আমাদেরও কাছে আনন্দের।

বিভিন্ন ফুলের সঙ্গে যখন পরিচয় হয় দৃষ্টিহীনদের, তারা ফুলকে স্পর্শ করে ফুল চেনে। কিন্তু সেই স্পর্শের সঙ্গে রংয়ের ধারণাও তাদের মনে স্পষ্ট হয়। দোল উৎসবে আবির অনিবার্য। আবিরের নানা রং। আগে আবিরের রং ছিল নির্দিষ্ট। এখন নীল, গোলাপি নানারকমের রং আবিরের, কৃত্রিমভাবে সেইসব আবিরের রং তৈরি হয়। দোলে দৃষ্টিহীনরাও অংশ নেয় তাদের মতো করে। সেইসব নানা রঙের আবিরকে তারা একরকমভাবে মর্মে ধারণ করে।

দোলের গান, বা বসন্ত উৎসবের গান বললেই মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের কথা। রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের কাছে নানাভাবে এসে ধরা দেয়। দোলকে কেন্দ্র করে অনেক চলচ্চিত্রের গানও হয়েছে। কয়েকদিন আগেই চলচ্চিত্রজগতের শিল্পীদের সঙ্গে আমরা রং খেলেছি। সেখানেও গান, নাচ ছিল আমাদের উদযাপনের ভাষা। ‘খোল দ্বার খোল’ শুনলে দোলের আবাহন সকলের কাছে যেমনভাবে হয়, আমাদেরও তেমনটাই ঘটে।

মনে পড়ে, কলেজে পড়তে একবার শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম। বন্ধুরা মিলে মেতে উঠেছিলাম দোল উৎসবে। খোল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম গান গাইতে গাইতে। যৌবনের সেই স্মৃতি এখনও কত রঙিন!

সকলেই সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন নয়। কারও হয়তো ক্ষীণ দৃষ্টি। এরা রং চেনে ভাষা মারফত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দৃষ্টিহীনদের গান শেখানো হয়, বাদ্যযন্ত্র শেখানো হয়। কারণ ভাষাই তাদের চাবিকাঠি। এই ভাষাই তাদের রঙিন করে রাখে। রংহীন হতে দেয় না।

দোল উৎসবে দৃষ্টিহীনরা তাই সরাসরি অংশ নিতে পারে। রং তাদের কাছে অন্তরায় নয়, বরং মুক্তির মোকাম হয়েই আসে।