বছর দশেকও হয়নি ঘটনার। তখনও বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা খোয়ায়নি জম্মু ও কাশ্মীর। ওই দৃশ্য এখনও বহু মানুষের মনে রয়ে গিয়েছে। শ্রীনগর লোকসভা উপনির্বাচনের আগে, এক কাশ্মীরী যুবককে ‘মানব-ঢাল’ হিসেবে সেনা-জিপে বেঁধে ঘুরিয়েছিলেন মেজর মিতুল গোগোই, পাথর নিক্ষেপকারী প্রতিবাদীদের সায়েস্তা করতে। বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল।
সীমান্ত-জেলাগুলোতে আম-কাশ্মীরী তরুণরা সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর সন্দিগ্ধ চোখের দৃষ্টিতে, প্রায়ই হয়ে যান ‘সন্ত্রাসবাদী’। তাই ‘কাশ্মীর’স টর্চার ট্রেল’ তথ্যচিত্রের শেষে বছর পনেরো-ষোলর এক কাশ্মীরী ছেলে ক্যামেরার সামনে প্রশ্ন তোলেন, ‘আপনার দুটো চোখ হাত-পা আছে, আমারও আছে। আপনার শান্তি আছে, আমার নেই কেন, বলতে পারেন?’
এই পরিস্থিতির কয়েক বছর আগে ২০১১-র শুরুতে, জম্মু ও কাশ্মীর ক্রিকেট দলের কোচের দায়িত্ব নিয়ে শ্রীনগরে যান প্রয়াত ভারতীয় স্পিন বোলিং-এর কিংবদন্তি বিষাণ সিংহ বেদী। জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের রঞ্জি ট্রফিতে ১৯৫৯-৬০ মরসুম থেকে খেললেও, তখনও ন্যূনতম সমীহ আদায় করতে পারেনি ঘরোয়া ক্রিকেট-মহলে। এলিট গ্রুপ, নকআউট পর্ব ছিল মরীচিকার মতো। প্রাথমিক স্তর থেকেই ছিটকে যেতে হত জম্মু ও কাশ্মীরকে। বেদী তাই দায়িত্ব নিয়েই জোর দিলেন মানসিকতা পরিবর্তনের ওপর। ক্রিকেটারদের বোঝালেন, নিছক অংশগ্রহণ নয়, প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে খেলতে হবে লড়াই ও জেতার মানসিকতা নিয়ে।
আরও পড়ুন: ইমরান খানের পাশে দাঁড়ানোই অধিনায়কসুলভ কাজ! লিখছেন রোদ্দুর মিত্র…
অভিজ্ঞ বেদীর জহুরির চোখ পড়তে পেরেছিল যে, দলটা টেকনিক্যাল দক্ষতায় বিশেষ পিছিয়ে নেই, কিন্তু ঘাটতি রয়েছে মানসিকতায়। রাজ্যে তখন প্রতিযোগিতা-মূলক ক্রিকেটের উপযুক্ত পরিকাঠামো বলতে কিছুই প্রায় ছিল না, কিন্তু ক্রিকেটারদের এই হীনমন্যতা কাটাতে সমস্তরকম উদ্যোগ নেন ভারতের সর্বকালের সেরা বাঁহাতি স্পিনার। বেদীর দু’বছরের কোচিং-এর ফসল— ২০১৩-১৪ থেকে রঞ্জি ট্রফির কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছতে শুরু করে জম্মু ও কাশ্মীর; উঠে আসেন পরভেজ রসুলের মতো ক্রিকেটার যিনি রাজ্যের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে আইপিএল খেলার ডাক পান ২০১৩-তে, তার অলরাউন্ড পারফরমেন্সের জোরে। এবং রসুলই প্রথম কাশ্মীরী ক্রিকেটার, যার জন্য খুলে যায় টিম ইন্ডিয়ার দরজা। ২০১৪তে মীরপুরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন তিনি। পরে টি-২০ আন্তর্জাতিকেও ভারতের জার্সি পান। বর্তমান প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সামনে তিনিই ছিলেন অঞ্চলের একমাত্র রোল-মডেল। আর প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক ও কোচের বপন করা সেই বীজের ফুল হয়েই আজ ভারতীয় ঘরোয়া ক্রিকেটে ফুটছেন আকিব নবি, আব্দুল সামাদ, শুভম পুন্দিররা।

তাই শুক্রবার রঞ্জি ফাইনালের চতুর্থ দিনে, যুধবীর সিং যখন কর্ণাটকের শেষ উইকেটটা তুলে নিলেন, পরভেজ রসুলের প্রথম মনে পড়েছিল প্রয়াত ‘বেদী স্যরের’ কথাই। ‘তোমাদের দক্ষতার ওপর আমার যথেষ্ট আস্থা আছে, কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সফল হতে গেলে চাই যথাযথ টেম্পরামেন্ট। মাঠে নেমে জেতার জন্য উজাড় করে দাও নিজেদের, বিপক্ষকে ভয় পেও না!’ বেদীর এই উপদেশকে আপ্তবাক্য মেনে ধাপে-ধাপে বিবর্তিত হয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর ক্রিকেট। জম্মু ও কাশ্মীরকে ছ’মরসুম নেতৃত্ব দেওয়া রসুল থেকে বর্তমান টিমের অধিনায়ক পরশ ডোগরা, সাড়া জাগানো ফাস্ট-বোলার আকিব নবি, সবাই এক-বাক্যে মেনে নেন উত্তরণের এই ফর্মুলা। হুব্বালি কেএসসিএ স্টেডিয়ামে প্রথম ইনিংসে ২৯১ রানের লিড নেওয়ার পর, কার্যত কাপ আর ঠোঁটের ব্যবধান পরশ ডোগরাদের সঙ্গে রঞ্জি ট্রফি জয়ের স্বাদ পাওয়ার।
এই উত্তরণের পথ ছিল ঘটনাবহুল। এই পর্বে অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। ২০১৯-এ জম্মু ও কাশ্মীর বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা খুইয়ে দুটি পৃথক কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। লাদাখ এখন বিচ্ছিন্ন হয়ে আর-একটি ভিন্ন কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল। এই বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা খোয়ানো নিয়ে জম্মু ও কাশ্মীর উপত্যকার জনমত প্রায় বিপরীত। কাশ্মীর উপত্যকা যেমন মর্যাদা হারিয়ে স্বভূমি ও কাজের রক্ষা-কবচ হাতছাড়া হওয়ার বিরুদ্ধে, জম্মুতে অধিকাংশের মধ্যেই এই পরিবর্তনের প্রতি ছিল সমর্থন। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে নতুন করে নানা বিভাজনের কৌশলে জম্মু আর কাশ্মীর উপত্যকার মধ্যে তীব্র মেরুকরণ করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। সাম্প্রতিক অতীতের কিছু ঘটনায় এই বিভাজন রেখা আরও স্পষ্ট হয়েছে। যার প্রভাব পড়ে ক্রীড়াক্ষেত্রেও।
ভূ-রাজনীতির সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে রাজ্য ক্রিকেট সংস্থা-তেও। প্রায় দু’দশকের ওপর জম্মু ও কাশ্মীর ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (জেকেসিএ) শীর্ষে ছিলেন ন্যাশানাল কনফারেন্স মুখ্য নেতা ডঃ ফারুক আবদুল্লাহ। ওই সময়ে অঞ্চলের আধুনিক ক্রিকেট পরিকাঠামো বলে সে-রকম কিছুর অস্তিত্বই ছিল না। শেষের দিকে সংস্থার বিরুদ্ধে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগেও বিদ্ধ হয় জম্মু ও কাশ্মীর। তবে বেদীকে কোচ করে আনা হয়েছিল ওই আমলেই। ডঃ আবদুল্লাহ শীর্ষে থাকলেও জেকেসিএ পরিচালনা থেকে দল নির্বাচনে জম্মুর কর্তাদেরই প্রাধান্য ছিল। জম্মু আর কাশ্মীরের কর্তা ও প্লেয়ারদের মধ্যে আঞ্চলিক বিবাদের জেরেই ২০১৩-র মার্চে, বেদী পদত্যাগ করে চলে যান। জম্মু ও কাশ্মীর ক্রিকেট অ্যসোসিয়েশনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে ২০২১-এ, নেওয়া হয় নানা সংস্কার কর্মসূচি।
‘একমাত্র ক্রিকেট টিমেই প্রভাব পড়েনি বিভাজন রেখার’
গত ডিসেম্বরে পরশ ডোগরা, আকিব নবি, আবিদ মুস্তাকরা যখন ঘরোয়া মরসুমের জন্য অনুশীলনে মগ্ন, তখনই সন্তোষ ট্রফির জন্য নির্বাচিত ফুটবল দল নিয়ে এক এমন বিতর্ক তৈরি হয়, যার জেরে ওমর আবদুল্লাহ সরকারকে তদন্ত কমিটি নিয়োগ করতে হয়। জম্মুর বিজেপি ও কংগ্রেস নেতৃত্ব অভিযোগ তোলে, দলে মাত্র একজন জম্মুর ফুটবলারকে রাখা হয়েছে! অতীতে ক্রিকেটে সে-রকম বড় নাম না থাকলেও, কাশ্মীর উপত্যকা থেকে আব্দুল মজিদের মতো বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান জাতীয় দলের ফুটবলার পেয়েছে ভারত। কলকাতার বড় ক্লাবেও চুটিয়ে খেলেছেন আব্দুল মজিদরা। মজিদের ভাগ্নে ভারতীয় দলের প্রাক্তন ফুটবলার মেহরাজুদ্দিন বর্তমানে মহামেডান স্পোর্টিং এর কোচ; কলকাতার তিন প্রধানের জার্সি গায়েই খেলেছেন এই ডিফেন্ডার।
সন্তোষ ট্রফি বিতর্কের পরই ঠিক একই কারণে জম্মু ও কাশ্মীরের অনূর্ধ্ব ১৪ ক্রিকেট দল নির্বাচন নিয়েও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন জম্মু বনাম কাশ্মীর নেতারা। এসবকে ছাপিয়ে যায় গত জানুয়ারি মাসে কাটরার নতুন মেডিকেল কলেজে মুসলিম ছাত্রদের ভর্তির বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠ ৬০টি সংগঠন যখন প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করে, যার জেরে সদ্য-প্রতিষ্ঠিত কলেজটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রস্তাবিত এক আইন বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় স্থাপনা করা হবে, তাই নিয়েও সংঘাত রয়েছে দুই অঞ্চলের নেতাদের মধ্যে!

জম্মু ও কাশ্মীর দলের রসায়নটা একবার দেখে নেওয়া যাক। এই টিমে ১৪ জন ক্রিকেটার জম্মুর, যার মধ্যে পাঁচজন মুসলিম; আর চারজন কাশ্মীর উপত্যকার। অধিনায়ক পরশ ডোগরা হিমাচলের, এছাড়া রয়েছেন উত্তরাখণ্ডের এক ক্রিকেটার। কিন্তু আকিব নবি, কামরান ইকবাল, শুভম পুন্দির, সাহিল লোটরাদের উঠে আসার দীর্ঘ পথে এই বিভাজন-তাসের উত্তাপের আঁচ ন্যূনতম পড়েনি! যদি পড়ত, তাহলে ফাইনাল তো দূর অস্ত, দলটাই দাঁড় করানো যেত না। আর এখানেই জম্মু ও কাশ্মীর ক্রিকেটের সাফল্যের অন্যতম রহস্য লুকিয়ে, যার পেছনে কর্তা, কোচিং টিম, সিনিয়র ও জুনিয়র ক্রিকেটার, সবার অবদান রয়েছে। মাঠে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার লড়াইয়ে প্রতিভা, দক্ষতা, পেশাদারি কাঠামো ও কঠোর অনুশীলনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে সর্বক্ষেত্রে, অন্য কোনওরকম পরিচিতি সত্তা এখানে অপ্রয়োজনীয়।
সেই কবে বিষণ সিংহ বেদী এই দিশা দিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর প্রাক্তন ভারতীয় দলের ক্রিকেটার সুনীল যোশি, ইরফান পাঠান ও বর্তমান কোচ অজয় শর্মাদের পর্বগুলোয় ওই একই মন্ত্রে ধাপে-ধাপে বিবর্তিত হয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর-এর ক্রিকেট। তুলে এনেছে প্রবল সম্ভাবনাময় এক ক্রিকেট প্রজন্মকে। উত্তর কাশ্মীরের বারামুল্লার আকিব নবি বা জম্মুর রাজৌরির আব্দুল সামাদরা ইতিমধ্যেই বিস্ময়কর প্রতিভা হিসেবে চিহ্নিত, সুযোগ পেয়েছেন আইপিএলে। গত তিন বছরে কিছুটা হলেও উন্নত হয়েছে পেশাদারি ক্রিকেট পরিকাঠামোও।
প্রাক্তন দিল্লি ও জম্মু ও কাশ্মীরের ক্রিকেটার মিঠুন মানহাসকে ২০২১-এ সাবকমিটিতে নিয়ে আসে জম্মু ও কাশ্মীর ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হওয়ার আগে পর্যন্ত এই দায়িত্বে ছিলেন তিনি। জম্মুর ছেলে মানহাস অঞ্চলের পরিকাঠামো উন্নত করায় বিশেষ ভূমিকা নেন; আঞ্চলিক ও জেলা স্তরের ম্যাচ সংখ্যা বাড়িয়ে দেন প্রতিভা অন্বেষণ ও যথাযথ দল নির্বাচনের জন্য। আর প্রশাসনিক দিকটা সামলেছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার অনিল গুপ্তা। মানহাস ২০২২-এ অজয় শর্মাকে হেডকোচ করে, বোলিং কোচ করে নিয়ে আসেন পি কৃষ্ণকুমারকে, আর টিমের ফিল্ডিং-এর দায়িত্ব দেওয়া হয় দিক্ষান্ত ইয়াজ্ঞিককে। হিমাচলের পোড়খাওয়া রঞ্জি ক্রিকেটার পরশ ডোগরাকে নিয়ে এসে দেওয়া হয় অধিনায়কের দায়িত্ব। আগে বিশেষজ্ঞ বোলিং বা ফিল্ডিং কোচ পেতেন না পরভেজ রসুলরা। গত মরসুমে কেরলের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম ইনিংসে এক রানের ব্যবধানের জন্য সেমিফাইনালে উঠতে পারেননি সামাদ-সুনীল কুমাররা।
কেরলের ওই ইনিংসে, একটি ক্যাচ মিসের আক্ষেপ এখনও তাড়া করে দলের বাঁ-হাতি স্পিনার আবিদ মুস্তাককে। তাই এই মরসুমে, মাঠে আরও সতর্ক ও পেশাদারি দায়বদ্ধতা দেখা যায় পুরো টিমের মধ্যে। না হলে, প্রথম ম্যাচেই ঘরের মাঠে মুম্বইয়ের কাছে অল্প ব্যবধানে হারের পর একে-একে রাজস্থান, দিল্লির মাঠে দিল্লি ও হায়দ্রাবাদকে হারিয়ে লড়াইয়ের ফিরে আসতে পারতেন না ডোগরারা। এরপর ছত্তিশগড়, পুদুচেরি ও হিমাচলের সঙ্গে তিনটে ম্যাচ ড্র করে এলিট গ্রুপ থেকে ২৪ পয়েন্ট পেয়ে সহজেই কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায় অজয় শর্মার প্রশিক্ষণাধীন দল।
তবে নকআউট পর্বের জন্য নিজেদের সেরাটা তুলে রেখেছিলেন নবি-ইকবাল-পুন্দিররা। যাকে বলে একশো শতাংশ পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গি! প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে উদ্ভুত এই টিমটার কীরকম ইস্পাত কঠিন মানসিকতার, তা নকআউট পর্বে বারবার বোঝালেন জম্মু-কাশ্মীর ক্রিকেটাররা। ইন্দোরে গিয়ে মধ্যপ্রদেশকে সরাসরি হারিয়ে তারা বাংলার বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল খেলতে এলেন কল্যাণী বেঙ্গল ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের মাঠে, আন্ডারডগ হিসেবে। এই প্রথম বাংলার দর্শকরা টের পেলেন এই পরশ ডোগরার দল কতটা আকর্ষক ক্রিকেট উপহার দিতে পারে, প্রাণবন্ত উইকেটে চাপের মুখে পড়েও কীভাবে বিপক্ষের মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারে। বাংলার প্রথম ইনিংসে ৩২৮ রানের জবাবে কাশ্মীর তখন তিন উইকেট খুইয়ে মাত্র ১৩! অধিনায়ক পরশ ডোগরার সঙ্গে হাল ধরলেন সামাদ। দু’জনের জুটিতে চতুর্থ উইকেটে উঠল ১৪৩ রান। অর্ধশতরানের ইনিংসে ২৪-বছর বয়সি সামাদ দেখালেন চোখ জুড়োনো আগ্রাসী স্ট্রোক প্লে কাকে বলে। ধ্রুপদী এই ব্যাটিং-এর সুর, কোনওভাবেই বাজবল ক্রিকেট নয়। মহম্মদ শামি জ্বলে ওঠায় বাংলা প্রথম ইনিংসে পেল ২৬ রানের লিড। তখনও আড়াই দিন খেলা বাকি। ম্যাচ পরিস্থিতি চমৎকার বিশ্লেষণ করলেন জম্মু ও কাশ্মীরের বোলিং কোচ কৃষ্ণকুমার ও আকিব নবির নেতৃত্বে পুরো বোলিং টিম।


‘আমাদের বোলাররা দু’দিকেই সুইং করাচ্ছিল প্রথম ইনিংসে। তাই, জানতাম ঠিক জায়গায় বল রাখতে পারলে ভাল কিছু হতেই পারে। হাতে সময় তো ছিলই।’ ফাইনালে ওঠার পর সংবাদমাধ্যমকে বলে যান কৃষ্ণকুমার।
মাঠে ঠিক সেটাই রূপায়িত করেছিলেন নবিরা। প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট পেয়েছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসের শুরু থেকেই আগুন ঝরালেন বারামুল্লার ২৯ বছর বয়সি স্পীড-স্টার। তাকে যোগ্য সহায়তা করলেন জম্মুর আখনূর অঞ্চলের সুনীল কুমার আর যুধবীর সিং। মাত্র দু’ঘণ্টার মধ্যেই ৯৯ রানে শেষ হয়ে গেল ফেভারিট অভিমন্যু ইশ্বরণদের যাবতীয় প্রতিরোধ। কেউ বলতে পারেন, শুক্রবারের ভূমিকম্পেও বাংলা ততটা কাঁপেনি, যতটা কল্যাণীতে বাংলার ব্যাটিং-কে কাঁপিয়ে গিয়েছিলেন নবিরা! আরও চার উইকেট নিয়ে ফিরলেন ঠান্ডা মাথার নবি। সুনীল কুমারের শিকারও চারটি। আর হ্যাঁ, প্রথম ইনিংসে প্রয়োজনীয় সময় ঝলসে উঠেছিল নবির ব্যাটও, দিয়েছিল মূল্যবান ৫৩ রান! ছ’উইকেটে ম্যাচ পকেটে পুরে প্রথমবার ফাইনালে চলে গেল জম্মু ও কাশ্মীর। এতদিন যে নেতা-মন্ত্রীরা টিমের খবর রাখছিলেন না, এবার তারাই বিধানসভা কক্ষে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন দলের। মুখ্যমন্ত্রী উমর আবদুল্লাহ জানালেন, ‘সংহতি ছাড়া এই সাফল্য আসত না; আলাদাভাবে কেউ রঞ্জিতে ম্যাচ জিততে পারে না।’
কল্যাণীতে সেমিফাইনালে দুরন্ত জয়ের পর আবেগঘন মুহূর্তে আবিদ মুস্তাকরা বলে গিয়েছিলেন, ‘মুম্বই, বাংলা বা কর্ণাটক, যেই প্রতিপক্ষ হোক-না-কেন, আমাদের টিম নামের ওজন দেখে না। মাঠে নেমে নিজেদের কাজটা করার জন্য ফোকাস করে।’ তবুও কেএল রাহুল, প্রসিধ কৃষ্ণা, মায়াঙ্ক অগ্রবাল, করুণ নায়ারদের মতো বেশ কয়েকজন ভারতীয় দলের ক্রিকেটার সমৃদ্ধ, আটবারের রঞ্জি চ্যাম্পিয়ন কর্ণাটকের সঙ্গে ফাইনাল খেলতে যখন হুব্বালি পৌঁছলেন পরশ ডোগরারা, তখনও তারা আন্ডারডগ হিসেবেই চিহ্নিত হলেন। মরসুমে সামাদের ব্যাটের গড় ৫৭.৩৩, দশটি ম্যাচে করেছেন ৭৪৮ রান (ফাইনাল ধরে), তবুও ম্যাচের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন নবি, যার ঝুলিতে সেমিফাইনাল পর্যন্ত ছিল ৫৫টি উইকেট; মরসুমে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন ছ’বার। এবারের আইপিএল নিলামে দিল্লি ক্যাপিটাল তাকে কিনেছে আট কোটি চল্লিশ লক্ষ টাকায়। ফাইনালে নবির বোলিং দেখতেই মাঠে আসবেন বহু কন্নড় দর্শক, তার বোলিং-এর ওপর তীক্ষ্ণ নজর থাকবে জাতীয় নির্বাচক সহ সব বিশেষজ্ঞদের। তাও পিছিয়ে থেকেই শুরু করল জম্মু ও কাশ্মীর; কিন্তু বিষয়টা তাদের কল্যাণীর মতোই মনস্তাত্ত্বিক সুবিধে করে দিল বাজিমাত করার জন্য। টসে জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কাজে লাগালেন ওপেনার ইয়াওয়ের হাসান আর শুভম পুন্দির। পুন্দিরের অপরাজিত শতরানে প্রথম দিনেই ২/২৮৪ রান তুলে আটবারের চ্যাম্পিয়নদের চাপে ফেলে দেন পরশ ডোগরারা। এই ফাইনালে টিমগেম কাকে বলে দেখালেন জম্মু ও কাশ্মীর ব্যাটসম্যানরা— পুন্দিরের শতরান ছাড়াও, পাঁচটি বড় অর্ধ-শতরান করলেন ডোগরা, হাসান, লোটরা, সামাদ ও ওয়াধাবান। তৃতীয় দিনের সকালে ৫৮৪ তে শেষ হল সামাদদের ইনিংস। দেশের সেরা বোলিং লাইন-আপের সামনে এই রানের পাহাড় তাড়া করতে গিয়ে চাপে পড়ে গেলেন লোকেশ রাহুলরা। মায়াঙ্ক অগ্রবাল বড় সেঞ্চুরি করলেন ঠিকই, কিন্তু আকিব নবিকে কে আটকাবেন? নিষ্প্রাণ পিচেও মরসুমে সপ্তমবার পাঁচ উইকেট তুলে নিলেন এই মুহূর্তে দেশের সবথেকে আলোচিত বোলার। ৫/৫৪ নিয়ে নবি মরসুম শেষ করলেন ৬০ উইকেটে, ইতিহাস গড়লেন জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম বোলার হিসেবে এক রঞ্জি মরসুমে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হয়ে; সঙ্গী সুনীল কুমার নিয়েছেন ৩১ উইকেট। ইতিহাস গড়ল তার দলও। মায়াঙ্কদের ফলো-অন না করিয়ে খেতাব নিশ্চিত করতে দ্বিতীয় ইনিংস ব্যাট করতে নামলেন পরশরা। শুরুতে ১১ রানে দুই উইকেট খুইয়ে সামান্য চাপে পড়েছিল দল। এবার সামলে দিলেন ওপেনার কামরান ইকবাল অপরাজিত ১৬০ করে। সাহিল লোটরা সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পরই ৩৪২/৪-এ সমাপ্তি ঘোষণা করে দিলেন পরশ। হার মেনে নেওয়া ছাড়া কর্ণাটকের আর কোনও উপায় ছিল না। ৬৭ বছর পর দেশের সেরার শিরোপা পেয়ে জম্মু ও কাশ্মীর বদলে দিল ঘরোয়া ক্রিকেটের ক্ষমতার বিন্যাসও। সাম্প্রতিক অতীতে মধ্যপ্রদেশ, বিদর্ভ, সৌরাষ্ট্রের মতো টিমও চ্যাম্পিয়ন হিসেবে উঠে এসেছে এই প্রতিযোগিতায়।
নবির এই পরিণত পারফরমেন্সে মুগ্ধ হয়ে তাকে আগামী ইংল্যান্ড সফরেই ভারতীয় দলে নেওয়ার দাবি তুলেছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। একসময়ে নবির শিক্ষক বাবা চাইতেন, ছেলে ডাক্তার হোক। ‘যখন ক্রিকেট খেলতে শুরু করি, তখন বাড়ি থেকে বিশেষ সমর্থন পাইনি। ক্রিকেট খেলে ভবিষ্যত গড়ার মতো কোনও ব্যবস্থা কাশ্মীরে ছিল না।’ কল্যাণীতে সেমিফাইনাল জেতার পর বলে গিয়েছিলেন নবি। ‘এখন আমাদের সাফল্য দেখে বহু অভিভাবক ভরসা পাবেন।’ এ-মরসুমে এতটাই ফর্মের চুড়োয় রয়েছেন নবি, যে শুধু নকআউট পর্বের তিনটে ম্যাচেই তার শিকার ২৬।
এখন উৎসবের জোয়ারে ভাসছে সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীর।



