‘হাঁসজারু’ থেকে ‘স্ট্যান’

‘চড়াই’ শব্দের বদলে কেউ কি আর ‘কলবিঙ্ক’ লিখবেন আজ? আর কেউ যদি লেখেনও-বা, অভিধানের সাহায্য ছাড়া বুঝবেন ক-জন! অথচ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার পাণ্ডুলিপি দেখতে গিয়ে দেখেছি, উনি ‘চড়াই’ শব্দটি কেটে দিয়ে ‘কলবিঙ্ক’ লিখছেন। কিংবা ধরা যাক, এই বাক্যটি— ‘আমি সেই নিখিল মাঙ্গলিকের নিতান্ত গৌণ অংশীদার হিসেব আমার অহং নির্বাপিত করে দিতে পেরেছিলাম’— অলোকরঞ্জনের এই গদ্য, প্রশ্ন জাগে, অল্পবয়সিরা খুব স্বচ্ছন্দে পড়তে পারবে তো? কেননা, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আমাদের তৈরি হয়েছে এক ভাষা-দূরত্ব। ছোট ছেলেমেয়েরা ‘কলবিঙ্ক’-জাতীয় শব্দ থেকে দূরে। তাদের শব্দভাণ্ডারে এখন এসে পড়েছে ‘বিটি’-‘ফোমো’-‘পুকি’— তা নিয়ে অবশ্য বাংলা ভাষা সুখী না দুখী, বোঝা দায়। কমলকুমার থাকলে দ্বন্দ্বে পড়ে আবারও ভাবতে চাইতেন, ভাষাকে যে আক্রমণ করে, সেই কি ভাষাকে বাঁচায়?

আমার যা বয়স, কপালজোরে ‘মিলেনিয়াল’ হয়ে জন্মেছি। অর্থাৎ, গায়ে-গায়ে। জেন-জি (Gen-Z) যারা, তারা আমার থেকে সামান্য ছোট। কিন্তু কথা বলতে গিয়ে দেখেছি, তাদের অধিকাংশ ভাষাই বুঝতে পারছি না। ভাবি, আমিই কি কোনওভাবে তাল মেলাতে পারিনি তাহলে? মিম-ভিত্তিক যে ভাষাবিশ্ব, তা আমার কাছে নইলে কেনই-বা অধরা থাকবে! আমিই যদি নিত্যদিন নতুন শব্দের মুখোমুখি হই, আমার আগের প্রজন্মের মানুষজন তো চোখে সর্ষেফুল দেখবেন, স্বাভাবিক। লিওনেল মেসি যখন ভারতে এল দিন কয়েক আগে, তখন চায়ের দোকানে কিংবা স্থানীয় জটলায় বলতে শুনেছি বয়স্কদের, ‘মেসি না লিখে গোট লিখছে কেন! গোট তো শতদ্রু দত্ত নিজেই!’ ‘গোট’ যে গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম— তা তাঁরা সহজে বুঝবেন কী করে!

বাঙালির ছেলেমেয়ে বাংলা শব্দভাণ্ডারে থাকা শব্দ নিয়েই ‘পান’ করবে ক্রমাগত, এ-ই যেন প্রথাসিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এতদিন। টয়লেট পেপারের বাংলা ‘হাগজ’, ইউরোলজিস্টের বাংলা ‘ধন্বন্তরি’— এই ধরনের মজা চলত বাজারে। অতঃপর একদিন ঢুকে পড়ল এমন সব শব্দ, তাতে জব্দ হল বাকিরা। ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটল ‘পুকি’ শব্দের মধ্যে। খোকা খুকিকে ডেকে বলতে লাগল, ‘হ্যালো, মাই পুকি!’ তাজ্জব বনে গেল দুনিয়া। এও হয়? ‘রিলেশনশিপ’ তকমায় যে-পৃথিবী সড়গড়, তাতে ঢুকে পড়ল ‘সিচুয়েশনশিপ’। উত্তর পঞ্চান্নগ্রাম, মৌড়িগ্রাম, ঝাড়গ্রাম সব ভেসে যেতে লাগল ইনস্টাগ্রামের ভাষায়।

আরও পড়ুন: এআই কি বাংলা ভাষার দুঃখ বোঝে?
লিখছেন ঋত্বিক মল্লিক…

সুকুমার রায়ের মিলেমিশে যাওয়া প্রাণীরা

ছোট কয়েকটা উদাহরণ দিই। একদিন কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে বসে আছি। অল্পবয়সি একটি ছেলে, আমার চেয়ে অনেকটাই ছোট, এসে বলল, ‘এত বিটি একসঙ্গে সামলাতে পারছি না, জানো!’ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বললাম, ‘এ তো কেউই পারে না! লোকে এক বিটিতেই নাস্তানাবুদ হয়, তোর আবার একসঙ্গে এত!’ ছেলেটি প্রথমে আমার দিকে ভ্যাবলার মতো তাকাল, তারপর হতাশ হয়ে বলল, ‘বিটি মানে ব্যাড ট্রিপ পৃথ্বীদা! এটাও জানো না?’ আরেকদিন আমার এক দাদার মেয়ে বলল, ‘জানো তো, বন্ধুরা সবাই বেড়াতে গেলে, আমি বাড়িতে বসে ফোমো খাই!’ শুনে খুব আনন্দ হল মনে। বললাম, ‘আমাকে খাওয়াবি একদিন? কেমন খেতে রে?’ সে এমন মুখঝামটা দিল, সেদিন জানলাম ‘ফোমো’ খাওয়ার জিনিস না, ওর অর্থ ফিয়ার অফ মিসিং আউট। কবুল করতে দ্বিধা নেই, এই একটা ক্ষেত্রেই অপমানিত হতে আমার ভাল লাগে। নতুন দু-চারটে ভাষা তো শেখা হয়!

দু-একজনকে প্রশ্ন করেও দেখেছি, কেন এই সব উদ্ভট ভাষাপ্রয়োগ তাদের; উত্তর এসেছে, ‘অত সময় কই, ভেঙে গুছিয়ে বলার!’ তাহলে কি নতুন প্রজন্মের ভাষার মূল সূত্রই সংক্ষেপ? সুকুমার রায় যেরকম ‘হাঁসজারু’ কিংবা ‘বকচ্ছপ’ বানিয়েছিলেন, ওরাও তেমনি ‘স্টকার’ আর ‘ফ্যান’ মিলিয়ে বানিয়ে নিয়েছে ‘স্ট্যান’। কম কথায় অনেক কথা। চিঠি লেখার দিন কবেই হারিয়ে-ফুরিয়ে গেছে, তারপর কিছুদিন মোবাইলে টেক্সট মেসেজ, তারও পরে আসে সোশ্যাল মিডিয়া। ভেবে দেখার, চিঠি লেখা বা মোবাইলে টেক্সট মেসেজ যেখানে সীমাবদ্ধ ছিল নির্দিষ্ট সংখ্যায়— যেই সোশ্যাল মিডিয়া চলে এল, এই গণ্ডি গেল ভেঙে। পরিচিতজনের মধ্যে কেবল  যোগাযোগ আটকে থাকল না, তৈরি হল একসঙ্গে পঞ্চাশজনের সঙ্গেও মুহূর্তে বন্ধুত্বের সম্ভাবনা। যোগাযোগের দ্রতগতিই কি তাহলে এই শব্দচয়নের জন্য দায়ী?

‘ফ্লেক্স’, ‘টি’, ‘ক্যাপ’, ‘ইয়াপ’— এই ধরনের একাধিক শব্দও রয়েছে জেন-জি শব্দভাণ্ডারে, যার অর্থ আগে থেকে আমাদের জানা; কিন্তু জেন-জি’দের কাছে তা অন্য অর্থ বহন করে। ফ্লেক্সের অর্থ সাফল্য দেখানো, টি বলতে গসিপ বা গোপন খবর, ক্যাপ হল মিথ্যা কথা এবং ইয়াপ মানে বাচাল। আরও অসংখ্য শব্দ রয়েছে, যার তালিকা দীর্ঘ। সবটা কি নিজেও জানি? নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, না। তবে হ্যাঁ, এই ভাষা অধীনে থাকলে সুবিধে যেটা হয়— নতুনদের আপন করতে সময় লাগে কম। কেউ যদি নাক সিঁটকোন এই বলে যে, ওসব ‘গেঞ্জি ভাষা’-য় আমরা কথা বলি না— আখেরে ক্ষতি কিন্তু তাদেরই; বরং রাস্তা হওয়া উচিত এইটে, তাদের ভাষা আয়ত্তে এনে তাদেরকেও বাংলা ভাষার দিকে চালিত করা। বাংলা ভাষাকে ভালবাসতে শেখানো। এও এক কূট পন্থা হতে পারে। নতুন ছেলেটি বা মেয়েটি যখন দেখবে, আগের প্রজন্মের মানুষজন তাদের ভাষাকে সম্মান করছে, তাদেরও যে সেই সম্মান ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করবে না, কে বলতে পারে!

মিম, ভাইরাল ভিডিও যেভাবে প্রতিদিন বদলে চলেছে— যেভাবে এক কনটেন্ট থেকে আরেক কনটেন্টে ভেসে চলেছি আমরা—সংশয় জাগে, এইসব জেন-জি শব্দবন্ধের স্থায়িত্ব কতদিন? ‘সেলফি’-র মতো শব্দ যেরকম নিজের আসন পাকা করে ফেলেছে, সেভাবেই কি টিকে যাবে ‘রিজ’-ডেলুলু’-‘ব্রাহ’? আমরা কি ধরে রাখার জন্য খানিক বাংলা মিশিয়ে দিতে পারি শব্দগুলোয়? ধরা যাক, ‘মন’ শব্দটা যদি ‘পুকি’র সঙ্গে জুড়ে ‘পুকিমন’ করে নিই; স্ট্যান কারও সঙ্গে যদি বিয়ে হয় কোনও মেয়ের, তাহলে তার বরকে ‘স্ট্যান স্বামী’ বলি (এখানে কোনওভাবেই সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী স্ট্যান স্বামীর বিচারবিভাগীয় হত্যাকে লঘু করার উদ্দেশ্য নেই); কিংবা দু-জন ফোমো-খাওয়া মানুষের সম্পর্কের নাম দিই ‘ফোমোমনস্ক’— কেমন হবে? নিজেদের সুবিধার্থে, কিছুদিন বেশি মনে রাখতে পারব কি?

জেন-জি’দের কোন শব্দ থাকবে বা কোন শব্দ মুছে যাবে, তা বিচার করবে সময়। ওই যে কথায় বলে না, ভাষা নদীর মতো— শব্দ আসবেও, যাবেও। কিন্তু যা জরুরি, তা হল সংরক্ষণ। নিরপেক্ষ বিচারে সংরক্ষণ। এর প্রয়োগের প্রয়োজন যদি নাও থাকে, ঐতিহাসিক মূল্য আছে। এবং তা ভাষার স্বার্থেই। পরিস্থিতি এমন এখন, না বোঝা যায় জেন জি’দের কার্যকলাপ, না বোঝা যায় তাদের ভাষা। অতীতে যেরকম হরিচরণ নির্মাণ করেছিলেন ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’, এ-যুগেও কি একজন হ্যারিচরণ আমরা পাব না, যার হাতে গড়ে উঠবে নতুন ‘জেন-জি কোষ’?