আমার ৭৩ বছরের জীবন। স্মৃতি ঘাঁটব। স্মৃতির অধিকাংশই তো ছবি। পিছনে তাকালে কথা নয়, ছবিই বেশি ভেসে আসে। কথাও কিছু আসে, আর আসে শব্দ। ভোরের ট্রামের শব্দ, জলের ট্যাংকি বসানো। ট্রামের ঘর্ঘর, জলের ছরছর মেশানো শব্দটাই ভোরের প্রথম শব্দ। দূর থেকে আসা শিবমন্দিরের ঘণ্টা, ছোট স্টিমারের ভোঁ… বাড়ির সামনের খাল দিয়ে ছোট-ছোট স্টিমার যেত সুন্দরবন। ছবিই মনে পড়ে বেশি। উনুনের ভেতর থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে, কলতলায় সবুজ শ্যাওলা, সিঁড়ির বাঁকে ঘুঁটের বস্তা, তারে মেলে দেওয়া লাল-সাদা-সবুজ শাড়িগুলি, ছাদের কোণা থেকে দেখা বটগাছের লাল-লাল ফল, বটপাতার বোঁটা ভাঙলে একফোঁটা দুধ, মায়ের কাপড়ের হলুদের দাগ, ঠাকুমার শাড়ির লাল পাড়, জাঁতি দিয়ে সুপুরি কাটছে ঠাকুমা, কাঁথা সেলাই করছে মা-ঠাকুমা মিলে, তালপাতার পাখায় কাপড়ের লাল বর্ডার লাগাচ্ছে ঠাকুমা। ছাদে মুড়ি ছিটিয়ে দিয়ে বড় পিশেমশাই কাকদের ডাকছে— আয়…আয়…আয়…
সবচেয়ে পুরনো স্মৃতি কোনটা! সেই খাটের বিছানাটা। আমার তখন কত বছর বয়স কে জানে? তিন? চারও হতে পারে। মোট কথা কোলে ওঠার বয়স। আমার কাকামণি দু’হাতে তুলে গান গাইছে— ‘ঝিম ধরেছে ঝিম ধরেছে গাছের পাতায়… দুষ্টু ছেলেটা গরমে ঘামে নদীর বাঁকে জলেতে নামে…’ বলেই ঝপাং করে বিছানায় ফেলে দিল কাকামণি, আর আমি হাত-পা ছুঁড়ছি… দেখতে পাচ্ছি যেন তখনও কি জলে নেমে স্নান দেখছিলাম? গিয়েছিলাম গঙ্গায় ঠাকুমার সঙ্গে ‘হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে…। বলতাম আবার। কাকামণি আবার ফেলে দিত জলে। বিছানায় কাকামণি গানটার কথা একটু বদলে দিয়েছিলেন। দুষ্টু ছেলেটার বদলে নেংটু ছেলেটা। নেংটু বলেই নুংকুটা একটু নাড়িয়ে দিচ্ছেন। আদর। আমি দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি কাকামণি আমাকে নিয়ে দুর্গা ঠাকুর দেখতে নিয়ে গেছে। কী ভিড় সামনে! আমি সবার চাইতে বেশি লম্বা। আমি তো কাঁধের উপরে।
আমাদের কালো বারান্দা। বারান্দাটার এক প্রান্তে লাল। ওটা লাল সিমেন্টের। কালো বারান্দাটা বোধহয় কালো সিমেন্টের ছিল না। চলটা উঠে যাওয়া, বহুদিন অযত্নে থাকার রঙ ওটা। ওই কালো বারান্দার কত ছবি মনে পড়ে। বড় হচ্ছি, ইংলিশ প্যান্ট, বেল্ট নেই, কোমর থেকে পড়ে যেতে চায় বলে দড়ি।
আরও পড়ুন : কালীঘাটের ছায়াপথের সূচনা হত পটুয়াপাড়ায়! লিখছেন জয়ন্ত দে…
ইস্কুল যাচ্ছি। বৃষ্টি হয়েছে খুব। জল থই-থই নন্দলাল বসু লেন। কী মজা! ডান হাতে বইখাতা, বাঁ-হাতে চটি। মহারাজা কাশিমবাজার ইস্কুল। মাঠের দু’পাশে গোলপোস্টের ছবি। ফুটবল। কল টিপে হাতের আঁজলায় জল খাওয়া।
ছবির সঙ্গে গন্ধের স্মৃতিও পেতে থাকি। হজমিওলা। হজমি-মশলার গন্ধ। বিকেলের তেলেভাজা গন্ধ। গ্যালিফ স্ট্রিট ট্রাম ডিপোয় ট্রামের গন্ধ। ট্রামের থাকে। সবুজ গদির ফার্স্টক্লাস আর কাঠের বেঞ্চিরও কি আলাদা-আলাদা গন্ধ ছিল? মেজপিশেমশাইয়ের জামায় সিগারেটের গন্ধ, দাদুর গায়ে নস্যির গন্ধ, ঠাকুমার শরীরে পানের গন্ধ, বাবার ঘামের গন্ধ আর মায়ের! মায়ের গন্ধের কোনও আলাদা স্মৃতি নেই কেন? কখনও রান্নার জিরে-হলুদের গন্ধ, কখনও এঁটো বাসনের। দুঃখকষ্টের কি আলাদা কোনও গন্ধ হয়?

সুরকি মিলের পাশেই ঠাকুরমশাইয়ের চায়ের দোকান। ওখানে পাতলা-রকম ডালপুরি হয়। এক আনায় একটা। খাঁজকাটা এক আনা, আর চৌকো দু’আনা। ১৯৫৭ সালে নয়া পয়সা এসে গেছে তবু পুরনো একপয়সা-দু’পয়সা এক আনি-দো আনি সিকি-আধুলি চলছে। সুরকি মিল-এ ইঁট ভাঙা হয়। ভীষণ শব্দ। সেই শব্দের সঙ্গে মেশে ডালপুরির স্বাদ-গন্ধ।
বড় হচ্ছি। ক্লাস এইট, হেয়ার স্কুল। টু-বি বাসের দোতলা। মিনার-দপর্ণা-চিত্রা-উত্তরা-শ্রী-রাধা সিনেমা হল। স্টার থিয়েটার, বেথুন স্কুল, ঠনঠনিয়া কালী মন্দির। লোহাপট্টির শব্দ। হেয়ার স্কুলের গেটের পাশে দারোয়ান রামধুনের ঘর। ওখানেই ঝুলছে ঘণ্টা। ঘণ্টা বাজাচ্ছে রামধুন। পরনে ধুতি আর খাঁকি রঙের শার্ট। ফুটপাথে হেয়ার স্কুল আর প্রেসিডেন্সি কলেজের রেলিং। ওখানে পুরনো বইয়ের গন্ধের সঙ্গে মিশেছে ট্রামের নিজস্ব শব্দ। মৌলভী স্যার। দাড়ি। মাথায় টুপি।

বড় হচ্ছি, হালকা গোঁপ উঠেছে মুখে, কবিতা লিখছি একটা দুটো। গোঁপ ওঠার পর লিখলাম— ‘নাকের নিচে গোঁফের চিহ্ন/ জানিয়ে দিচ্ছে তোমার দিকে আসছে ধেয়ে অপরাহ্ণ/ কর্ম সারো তাড়াতাড়ি/ বুকের মধ্যে সকাল সন্ধে ঢাকের বাড়ি।’ ওই হলুদ ডায়েরিটার কথা মনে পড়ে। ওই ডায়েরিটার ছবি। ৮৬টা কবিতা ছিল। হারিয়ে গেল যখন কলেজে পড়ি।
কলেজ। দমদম মতিঝিল। এসএফআই। পার্টি অফিসের এক কোণায় একগাদা লাল ঝান্ডা। ঝটু, শ্যামল ঘোষ, প্রসাদ, ফণী তারক…। মিছিল। কেয়া মাংতা হ্যায় হিন্দুস্তান? লালকিল্লা পর লাল নিশান। ল্যাবরেটরি। অ্যামোনিয়া-হাইড্রোক্লরিক অ্যাসিড-হাইড্রোজেন সালফাইডের মিশ্র গন্ধ। প্রথম চাকরি। বিহার বারৌনির দিকের রাস্তায় টিয়া পাখির ঝাঁকের ছবিটা দেখলাম। পাটনার মারুফগঞ্জ বাহারের মশলা সমারোহ। সেই গন্ধটা এল।
ভাবতে বসলে এই ভাবে শব্দ-গন্ধ মাখানো ছবিগুলো আসে। জীবনের পেরিয়ে আসা এতটা সময়ের ধারাবাহিক ছবি। এভাবেই আসে মায়ের অশ্রুভেজা ছবিগুলি। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়ে যতক্ষণ সম্ভব পিছনে ফিরে তাকানো। আমরা তখন বিরাটিতে। বাড়িতে উপরে উঠছে লাউগাছ। মায়ের দৃষ্টি লাউগাছটির দিকে। ১৯৭৭ সাল, আগস্ট। শ্মশান। শ্মশানের দেওয়ালে তখনও লেখা— কমল তোমায় লাল সেলাম। মুক্তি ছিনিয়ে আনব কথা দিলাম। মা পুড়ছে। ধোঁয়ায় মা পোড়া গন্ধ। এরপর যতবার শ্মশানে গিয়েছি, এই গন্ধে মা চলে আসে।

অজয় নদীর চরে কাশফুলের হই হই। সকালের রোদ্দুর অন্য রকমের সাদা। ভূমি-সংস্কারের চাকরি। আমি নস্করী বাবু, হাতে জমি মাপার লোহার চেন। লাল রঙের কাপড়ে বাঁধা পরিগণনার খাতা।
মাঠভেদ করে চলে যাওয়া গ্রাম্যপথের দু’পাশে সবুজ কাঁপছে। কোঁড়া বাচ্চারা ইঁদুরের গর্ত খুঁজে বেড়াচ্ছে, ইঁদুর ধরবে, খাবে। এগুলো ১৯৭৪-’৭৫-এর স্মৃতি।
হাওয়া অফিসের মাথায় বাতাস মোরগ। টেবিলে বিরাট ম্যাপ। ম্যাপে আলাদা দেশের আলাদা রঙ নেই। সব সাদা।
গল্প বেরচ্ছে। কফি হাউস। ধুতি পরা শৈলেনদা। শৈলেন্দ্রনারায়ণ বসু। সুখেন্দ্র ভট্টাচার্য ‘মধ্যাহ্ন’ পত্রিকা। যুগান্তরের গলি, অমৃত পত্রিকা। সম্পাদক মণীন্দ্র রায়। কী সুন্দর দেখতে।
সব ছবিগুলো কিন্তু পরপর নয়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নয়। একটু আগে-পরে হয়তো কিন্তু এই জাবর কাটা মানে ছবি দেখা।
আকাশবাণীর সেই সাদা পাথরের সিঁড়িটা, স্টুডিওতে ঢুকবার কাচের দরজা। দুরুদুরু বুকে ঢোকা, টুক করে ফেয়ারওয়েল। বুড়ো হয়ে গেলাম। একটাকায় দশটা লজেন্স থেকে একটা টফি দশটাকা হয়ে যাবার মধ্যে বুড়ো হয়ে গেলাম। কলতলাগুলো ওয়াশরুম হতে-হতে বুড়ো হয়ে গেলাম। লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটা আর অনলাইনে মুভির ওটিপি আসার মধ্যেকার সময়ের মধ্যে বুড়ো হয়ে গেলাম।



