ভ্যানিশ
একটা বয়সের পর মেয়েরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু নিজের মুখটাই দেখে না— সে দেখে সমাজেরও একটা ‘লাইভ রিভিউ’। আরে, রিভিউ মানে সেই পাঁচতারা-একতারা নয়। এ হল এমন রিভিউ, যেখানে মেয়েটার কপালে দুটো ভাঁজ পড়লেই সমাজ হঠাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে— আহা, অ্যাপটা আপডেট হয়নি। যেন মেয়েদের বয়স বাড়া মানেই সফ্টওয়্যারের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া!
একদিন হঠাৎ মধ্য-চল্লিশ পেরনো মেয়েটা টের পায়— সে আর ‘মেয়ে’ নেই, সে ‘মহিলা’ হয়ে গেছে। এই রূপান্তরটা কাউকে হাতে রজনীগন্ধার তোড়া ধরিয়ে ঘোষণা করা হয় না। কেউ বলে না— ‘অভিনন্দন! আপনি এখন সমাজের অদৃশ্য বিভাগে পদোন্নতি পেলেন।’ কিন্তু লক্ষণগুলো ভয়ানক পরিচিত। আগের মতো ফোন আসে না। শীতে পিকনিক কোথায় হবে, মাসিমণিকে কোন শাড়ি দিলে মুখ বাঁচবে, মাংসে জায়ফল দিলে কেলেঙ্কারি হবে কি না— এই জাতীয় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের প্রশ্নগুলোও একদিন হঠাৎ কোথায় যেন ভ্যানিশ হয়ে যায়।
অথচ মেয়েটা আছে। দারুণভাবে আছে। শুধু সমাজের চোখে সে লাস্ট বেঞ্চের মানুষ। মানে, সে হারিয়েও যায়নি, আবার অদৃশ্যও নয় ঠিক। আসল কথাটা হল— সে গুরুত্বপূর্ণ তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। যেন একটা পরিবারের ‘অ্যাপ’-এ সে এখন ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেস। কাজ চলে তার ওপরেই, কিন্তু স্ক্রিনে তার নাম ওঠে না।
আরও পড়ুন: অলসরা ফাঁকিবাজিকেই কৃতিত্ব ভাবে? লিখছেন চন্দ্রিল ভট্টাচাৰ্য…
আর এই অদৃশ্যতার ঘটনাটা কোনও এক সকালে প্যারাস্যুট পরে এসে ধপাস করে পড়ে না। আসে চুপিচুপি। একটা ‘তুমি এখন একটু চুপ করে থাকো’ দিয়ে শুরু। তারপর ‘তুমি এত রেগে যাচ্ছ কেন?’— এই বাক্যের মধ্য দিয়ে সমাজ বুঝিয়ে দেয়, মেয়েদের রাগের বয়সও নাকি থাকে! পুরুষের বয়স হলে সে ‘অভিজ্ঞ’, ‘পরিণত’, ‘স্থিতধী’। আর মেয়ের বয়স হলে—আর আগের মতো নেই। কী নেই? সমাজের তাকে তার মতো করে গ্রহণ করার ক্ষমতা নেই।

সমাজ আমাদের চোখে দুর্দান্ত একখানা চশমা পরিয়ে দেয়—যার ফ্রেমে লেখা থাকে: যৌবন = গল্প। ‘বয়স = সাইলেন্ট মোড।’ মেয়েদের মূল্য নির্ধারণ হয়েছে তিনটে পুরনো মাপকাঠিতে— যৌবন, সৌন্দর্য, আর পরিবারের সেবায় সার্ভিস চার্জ ছাড়া কাজ করার ক্ষমতা। তারপর অনেক লড়াইয়ের পর এসেছে শ্রমের অধিকার, বাইরে কাজ করার অনুমোদন! কিন্তু সমস্যাটা হল, এই তিনটে মানদণ্ড সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে যায়— রূপ কমে, যৌবন যায়, শরীর ক্লান্ত হয়। ফলে অঙ্কটা সমাজের কাছে অতি সোজা: বয়স বাড়লেই মেয়ের মূল্য কমবে।
এই মূল্যহ্রাসের বিজ্ঞাপন দেয় কে? পরিবার দেয়, বাইরের সমাজ দেয় আর দেয় আমাদের মহাশক্তিমান মিডিয়া। সিনেমা, টিভি, বিজ্ঞাপন— সব জায়গায় মেয়েদের গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে যৌবন। প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, ভুল, দ্বন্দ্ব— সব যেন তরুণ শরীরের একচেটিয়া সম্পত্তি। বয়স বাড়লে চরিত্র বদলায়— মা, শাশুড়ি, ঠাকুমা। এরা হল গল্পের ‘সাপোর্ট স্টাফ’: নায়িকার কান্নায় জল, নায়কের প্লেটভর্তি ভাত, আর পরিবারের অতি প্রয়োজনীয় ‘এ-সব কথা বলা ঠিক না’ ডায়লগ। নিজেদের ইচ্ছা? নেই। প্রেম? না। কামনা? ওই বয়সে আবার এসব ভাবা যায় নাকি!
এই ধারণাকে তথ্যও সমর্থন করে। ‘জিনা ডেভিস ইনস্টিটিউট অন জেন্ডার ইন মিডিয়া’-র দীর্ঘ বিশ্লেষণ বলছে, হলিউড ও টেলিভিশনে ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে চরিত্রদের মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশই পুরুষ। নারী চরিত্র কম, আর থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পারিবারিক বা সহায়ক ভূমিকায় বন্দি। মানে, বয়স্ক নারীদের জীবনকে গল্প হিসেবে দেখানোর চলটাই নেই। ফল? দর্শকের চোখ শেখে— মাঝবয়সি মেয়েদের জীবন ‘নীরস’, ‘নট হ্যাপেনিং’। তাই তাদের গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই, তাদের কথা শোনারও দরকার নেই।

আর যদি কখনও বয়স্ক মেয়ের চরিত্র দরকার পড়ে, তখনও একটা আশ্চর্য জাদু হয়। তিন সন্তানের মা হচ্ছেন মধ্য তিরিশের এক তরুণী— যাঁর মুখে বলিরেখা নেই, চোখে ক্লান্তি নেই, শরীরে জীবনের ভার নেই— কিন্তু তিনি অভিনয় করছেন ‘বয়স্ক’ চরিত্রে। মিডিয়ার মতে, বয়স্ক নারী কোনও বাস্তব মানুষ নয়— একটা মেক-আপ লুক। একটা কনসেপ্ট।
এই গোটা প্রক্রিয়ার পোশাকি নাম— ‘জেন্ডার এজিজম’। বয়স এখানে ক্যালেন্ডারের হিসেব নয়, এটা শরীরের বিচার, কাজের বিচার, উপস্থিতির বিচার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-র ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন এজিজম’ জানাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি দু’জনের একজন বয়স নিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব পোষণ করে। মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা আরও কঠিন, আরও ব্যক্তিগত— কারণ মেয়েদের শরীরকে সমাজ বহুদিন ধরেই জনসম্পত্তি হিসেবে দেখে এসেছে। কেমন দেখাবে, কেমন চলবে, বয়স হলে কেমন হওয়া উচিত— সবকিছুতেই মতামত। যেন মেয়েদের শরীর একটা পাবলিক নোটিসবোর্ড— যেখানে যে যার মতো করে পোস্টার সাঁটে আর চলে যায়।
কর্মক্ষেত্রে গেলে এই বিচার আরও নির্মম। একটা বয়সের পর মেয়েদের ‘ফিট’ ধরা হয় না। শেখার ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ, প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে কটাক্ষ, শারীরিক শক্তি নিয়ে হাসাহাসি, কমিটমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন— সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য দেওয়াল। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের একাধিক এক্সপেরিমেন্টাল স্টাডি দেখিয়েছে, এমনকী, এন্ট্রি-লেভেল চাকরিতেও মাঝবয়সি নারীরা তরুণ নারী বা সমবয়সি পুরুষদের তুলনায় কম ডাক পান। অভিজ্ঞতা এখানে আশীর্বাদ নয়— মাথার ওপর বোঝা।
ভারতে এই বৈষম্য আরও পাকাপোক্ত, কারণ এখানে বয়সের সঙ্গে জুড়ে যায় অবৈতনিক কাজকম্ম— ঘরদোর, পরিবার, পরিচর্যা। এনএসএস এবং টাইম ইউজ সার্ভে অনুযায়ী, ভারতীয় নারীরা পুরুষদের তুলনায় দৈনিক গড়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি সময় অবৈতনিক গৃহস্থালির কাজে দেন। বয়স বাড়লে এই কাজ কমে না— বরং বাড়ে। সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ি, অসুস্থ পরিবার-সদস্য— সব সামলে কাজের জায়গায় টিকে থাকা যেন রোজকার একখানা অলিম্পিক। কিন্তু পদক? নেই। ফিতে কাটা? নেই। উল্টে আছে ‘তুমিই তো ঘরের লোক’— এই বাক্যের পুরস্কার, যা আদতে একটা পুরস্কার না, আজীবনের অলিখিত চুক্তিপত্র।
মাঝবয়সি নারীর শরীর যেন এক অন্তহীন টক শো। মেনোপজ হলে মন্তব্য, ওজন বাড়লে মন্তব্য, চুল পেকে গেলে মন্তব্য, চামড়ায় ভাঁজ পড়লে মন্তব্য। এপিএ-সহ নানা মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা দেখিয়েছে, বয়সভিত্তিক শরীর-সংক্রান্ত মন্তব্য নারীদের আত্মসম্মানে আঘাত করে, উদ্বেগ ও অবসাদের ঝুঁকি বাড়ায়। সমাজ যেন বলে— তোমার শরীর আর গ্রহণযোগ্য নয়।
মেয়েদের কাজের জীবন তাই ‘শর্তসাপেক্ষ’— কাজ করবে, যদি ঘর সামলানো থাকে। সময় দেবে, যদি অন্য কেউ তার জায়গা নেয়। এই ‘যদি’-র ফাঁদেই বহু মাঝবয়সি নারী কর্মক্ষেত্র থেকে মুছে যান— স্বেচ্ছায় নয়, পরিস্থিতির চাপে। সরকারি রিপোর্টে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বাড়ার গল্প শোনা যায়, কিন্তু সিইডিএ-র বিশ্লেষণ দেখায় বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহুরে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ দ্রুত কমে যায়। আর যাঁরা থাকেন, তাঁদের বড় অংশই অনিশ্চিত, কম মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা-বিহীন কাজে। মানে, ‘নারীরা ফিরে আসছে’— এই বাক্যের পাশে ছোট হরফে লেখা থাকে: কোন বয়সে, কোন শর্তে, কতটা নিরাপত্তা নিয়ে?
এর সঙ্গে যোগ হয় শরীরের রাজনীতি। মাঝবয়সি নারীর শরীর যেন এক অন্তহীন টক শো। মেনোপজ হলে মন্তব্য, ওজন বাড়লে মন্তব্য, চুল পেকে গেলে মন্তব্য, চামড়ায় ভাঁজ পড়লে মন্তব্য। এপিএ-সহ নানা মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা দেখিয়েছে, বয়সভিত্তিক শরীর-সংক্রান্ত মন্তব্য নারীদের আত্মসম্মানে আঘাত করে, উদ্বেগ ও অবসাদের ঝুঁকি বাড়ায়। সমাজ যেন বলে— তোমার শরীর আর গ্রহণযোগ্য নয়।
ফল কী হয়? আত্ম-আড়াল। মেয়েরা জোরে হাসে না। কথা কম বলে। নিজের উপস্থিতি যতটা সম্ভব গুটিয়ে নেয়। আর সমাজ তখন গম্ভীর মুখে ঘোষণা করে— দেখো, ওরা নিজেরাই তো সামনে আসে না। বাহ, কী মসৃণ যুক্তি! যে-সমাজ বারবার ঠেলে-সরিয়ে দেয়, সেখানে সামনে আসার জায়গা কি সত্যিই থাকে?
পরিবারেও ভূমিকা বদলায়। একসময় যিনি ছিলেন কেন্দ্র— যাঁর তদারকিতে সংসার চলত, যাঁকে ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া চলত না— তিনি আস্তে আস্তে খানিক অবহেলার, খানিক উদাসীনতার শিকার হয়ে যান। যতদিন নিখুঁতভাবে সব সামলাতে পারেন, ততদিন মূল্য। একটু থতমত হলেই বোঝা। অসুস্থ হলে ‘ঝামেলা’, মত দিলে ‘হস্তক্ষেপ’, একা থাকতে চাইলে ‘অস্বাভাবিক’। ভীষণভাবে উপস্থিত থেকে ধীরে ধীরে ঘরের কোণে ঠাঁই— ডিভানে বসে বাইরে তাকিয়ে থাকা— এই অবনমনই অদৃশ্য হওয়ার সবচেয়ে বেদনাদায়ক রূপ।
অদৃশ্য হওয়া মানে তাই শুধু চোখে না পড়া নয়। অদৃশ্য হওয়া মানে গল্প থেকে বাদ পড়া— সিনেমা, বই, খবর, আলোচনায় অনুপস্থিত থাকা। অদৃশ্য হওয়া মানে সিদ্ধান্তের টেবিল থেকে সরিয়ে দেওয়া— পরিবারে, অফিসে, সমাজে। অদৃশ্য হওয়া মানে আকাঙ্ক্ষাকে অবৈধ ঘোষণা করা।
কিন্তু প্রশ্নটা একেবারে সোজা— এই অদৃশ্যতা কি প্রাকৃতিক? না কি আমরা বানাই? আমরা বানাই, আর যারা সচেতনভাবে খেয়াল রাখি, তাদেরও মনে রাখতে হবে মাঝবয়সি মেয়েদের গুরুত্ব দেওয়া মানে কেবল সহানুভূতি জোগানো নয়— এটা ন্যায্যতার প্রশ্ন, রাজনীতির প্রশ্ন। কারণ যে সমাজ তার মেয়েদের বয়সকে সম্মান দিতে শেখে না, সে-সমাজ আসলে অভিজ্ঞতা, স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ— তিনটাকেই অস্বীকার করে।
তাই মাঝবয়সি মেয়েরা অদৃশ্য নয়। আমরা তাদের অদৃশ্য করে রাখি। আর তারপর অবাক হয়ে বলি— ‘কেন যেন আর দেখা যাচ্ছে না!’



