যোগেনদার চলে যাওয়াটা শিল্পজগতের এক বিরাট, অপূরণীয় ক্ষতি। যোগেন চৌধুরী কেবলমাত্র একজন শিল্পীর নাম নয়, যোগেন চৌধুরী একটি প্রতিষ্ঠান। ‘আইকন’ সংখ্যাটা খুব কম মানুষকেই দেওয়া যায়। যোগেন চৌধুরী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। যে উত্তরাধিকার তিনি তৈরি করে গেলেন, তা অতুলনীয়। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন যোগেন চৌধুরী। কলকাতায় ‘চারুবাসনা’, শান্তিনিকেতনে ‘স্বাদ’-এর মতো আর্ট সেন্টার তৈরি করেছেন। ছাত্র থেকে পরবর্তীর শিল্পী, সকলকে প্রেরণা জুগিয়েছেন যোগেনদা। বলা যায়, একটা প্রজন্মকে তৈরিই করেছেন তিনি। প্যারিসের জর্জ পপিঁদু থেকে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম— পৃথিবীর তাবড় গ্যালারি থেকে মিউজিয়ামের তাঁর কাজ প্রদর্শিত হয়েছে, কিন্তু শিল্পী হিসেবে শুধু নিজের সাফল্যে আটকে না থেকে যোগেনদা চেষ্টা করে গেছেন, পরের প্রজন্মের জন্য নতুন পরিসর তৈরি করার।
তাঁর শিল্পভাষা স্বতন্ত্র, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, আজ সে-কথা সবাই জানে। কিন্তু এই শিল্পভাষা একদিনে তৈরি হয়নি। যোগেনদার অনেকদিনের সাধনা রয়েছে তার নেপথ্যে। যোগেনদা দীর্ঘদিন ধরে বারবার বিভিন্ন মাধ্যমে, বিভিন্ন শিল্পভঙ্গিমায় নিজেকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। করতে-করতেই তাঁর নিজস্ব স্টাইলের জন্ম হয়েছে। খুব সহজ, বাস্তবোচিত শিল্পের ধরন খুঁজে পাওয়া যেতে পারে তাঁর প্রথমদিকের কাজগুলোতে। তার কারণ, গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে সেই ছয়ের দশকে তিনি যখন পাশ করে বেরিয়েছিলেন, তখন ওই শিল্পধারাটার দিকে একটা স্বাভাবিক ঝোঁক ছিল। কিন্তু সেখান থেকে যে ভাঙচুর শুরু হল যোগেনদার শিল্পে তারপর, তার তুলনা মেলা ভার।

যোগেন চৌধুরীর দুই পর্বের সাক্ষাৎকার! পড়ুন পর্ব ১ ও পর্ব ২…
ভারতীয় শিল্পের প্রতিনিধিত্ব তাঁর কাজে এমনভাবেই রয়েছে, যা অন্য কোনও শিল্পীর কাজে চট করে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাঁর বিষয়গুলো খুব সহজ, খুব সাধারণ, কিন্তু তাঁর প্রকাশভঙ্গি ছিল মৌলিক, অভিনব। এমন বিষয় তিনি বেছে নিতেন, যা সকলের হৃদয় অবলীলায় ছুঁয়ে যেত। তাঁর তুলির টান ছিল ‘ফ্রি ফ্লো’-এর মতো, যেন কোনও শিশু হাতে তুলি ধরেছে। কিন্তু সহজ রেখা তাঁর হাতের ছোঁয়াতেই হয়ে উঠত অনন্য। যতই বিমূর্ততার কাছাকাছি যান না কেন তিনি, মানবিক ও মাটির সঙ্গে লগ্ন বাস্তবতা থেকে একবিন্দুও বিচ্যুত হননি কখনও।
যোগেনদা ছিলেন মূলত, যাকে বলে ‘ফিগারেটিভ আর্ট’-এর লোক। প্যারিসের অধ্যায়টা জুড়ে যোগেনদাকে অধিকার করে ছিল মাতিসীয় আধুনিকতা, হয়তো খানিকটা পল ক্লি-ও। তারপর নিজস্ব একটা ভারতীয় আধুনিক শিল্পভাষ্য আবিষ্কার করেছিলেন যোগেনদা, ধীরে-ধীরে। ওঁর শান্তিনিকেতন অধ্যায়েরও কিছুটা ভূমিকা ছিল সেখানে। যেমন একটা কথা বলতে পারি, নারীরা তাঁর ছবিতে আসত কেবল ‘অবজেক্ট’ হিসেবে নয়। তাঁর নারীর ছবির ভেতর থেকে উঠে আসত লিঙ্গপ্রশ্ন। সামাজিকতাকে তিনি এড়িয়ে যেতেন না, আবার কেবলই সমাজনির্ভরতাও তাঁর ছবির একমাত্র চাবিকাঠি ছিল না।




আমরা প্রায় চল্লিশ বছর ধরে একে-অপরকে জানতাম। ওঁর কোনও একটি প্রদর্শনীতে ওঁর সঙ্গে প্রথম দেখা ও আলাপ। সেই থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল আমাদের। তারপর ক্রমশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠা আমাদের। আমরা জীবনের, পৃথিবীর সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা করতাম। আমরা ভালবাসতাম জীবনকে, আমাদের কথায়-বার্তায়। এমনও হয়েছে, কোথাও একসঙ্গে বসে আছি, কাউকে দেখে হয়তো মনে হল, অপূর্ব স্কেচ হতে পারে, আমরা আঁকতে শুরু করতাম সেই মানুষটাকে। হোটেলের লবিতে বসে-বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা কথা বলে গেছি, ছবি নিয়ে শুধু নয়, আরও কতকিছু নিয়ে!
যোগেনদার জীবনযাপন, জীবনযাত্রার গল্পগুলো এত অভাবনীয়, এত অবিশ্বাস্য ছিল, মনে হত শুনেই যাই অনন্তকাল ধরে। এত জীবন্ত থাকতেন যোগেনদা সবসময়, বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে, যোগেনদা আর নেই।




