বাঙালি ও শরৎচন্দ্র

ইস্কুলের মাঠে বাঙ্গালী ও মুসলমান ছাত্রদের ‘ফুটবল ম্যাচ’।’ একটা মোটে লাইন। তাও উপন্যাসের। ঔপন্যাসিকের নিজের কথাও নয়, প্রধান চরিত্র শ্রীকান্তের কথা। কিন্তু ওই একটা লাইন নিয়েই রীতিমতো তর্ক-বিতর্কের বল-পেটাপেটি চলছে অন্তত শতবর্ষ ধরে। অভিমানে লেগেছে শরৎচন্দ্র-প্রিয় পাঠকদের একাংশের। সাহিত্যকে ঘিরে মূলত বুদ্ধির চর্চা যাঁরা করেন, তাঁদেরও একাংশের আক্ষেপ, এ কী করলেন শরৎচন্দ্র! মুসলমান কি বাঙালি হতে পারে না?

শরৎচন্দ্রের এই সার্ধশতজন্মবর্ষে নতুন করে সেই পুরনো আক্ষেপে আপাত-বিনয়ী ঝাঁঝ মিশিয়ে দিয়েছেন কোনও সংগীতস্রষ্টা, ফেসবুকে। বিতর্কটা যে উঠতেই পারে, সেটা বুঝেছিলেন আশুতোষ ভট্টাচার্য। সেই ১৯৬০-এই তিনি লিখছেন, ‘আমি জানি বাংলার শিক্ষিত মুসলমান সমাজ এদেশের কথা-সাহিত্যিকদের মধ্যে শরৎচন্দ্রকে যতখানি শ্রদ্ধা করে, আর কাউকে তত শ্রদ্ধা করে না। তথাপি মুসলমান সমাজ সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের একটি উক্তি তাদের আঘাত করেছে। সেই তাঁর ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বের শ্রীকান্তের একটি উক্তি।… ইন্দ্রনাথের সঙ্গে শ্রীকান্তর যেদিন প্রথম পরিচয় হয়, সেদিন শরৎচন্দ্র শ্রীকান্তর জবানীতে লিখেছেন, ‘বাঙালী ও মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে একটা ফুটবল ম্যাচ ছিল।’ এই উক্তি থেকে আপাতদৃষ্টিতে এ-কথা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, মুসলমান বাঙালী নহে, তাহারা মুসলমান মাত্র, অন্ততঃ শরৎচন্দ্রের তাই বিশ্বাস। কিন্তু শরৎচন্দ্র যে এই অর্থে কথাটি ব্যবহার করেননি, তা আমরা সকলে না জানলেও অনেকেই জানি। এখানে শরৎচন্দ্র ভাগলপুরের উল্লেখ করেছেন। সেখানকার বাঙালীরা বাংলা ভাষাভাষী হলেও মুসলমানেরা হিন্দী ও উর্দু ভাষাভাষী। বাঙালী ও মুসলমান ছাত্র অর্থে তিনি বাংলা ভাষাভাষী ও হিন্দী বা উর্দু ভাষাভাষী ছাত্রই মনে করেছেন।’

আরও পড়ুন: উপন্যাস লেখার সময়েই শরৎচন্দ্র বুঝেছিলেন, ‘পথের দাবী’ নিষিদ্ধ হবেই!
লিখছেন আশিস পাঠক…

কোনও একটি মানবগোষ্ঠীকে কোন পরিচয়ে ঔপন্যাসিক চিহ্নিত করবেন, সেটা তাঁরই সিদ্ধান্ত। শ্রীকান্ত যে-ম্যাচের কথা লিখেছে, তার মুসলমানপক্ষে বাঙালি কেউ যে ছিলেন না সেটা প্রমাণ বা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। উপন্যাসের সত্য সেটাই। কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, একইসঙ্গে দুটি মানবগোষ্ঠীর একটিকে তার ভাষা-পরিচয়ে এবং অন্যটিকে ধর্ম-পরিচয়ে চিহ্নিত করাটা কতটা সঙ্গত? ওই পরিচয় এবং খেলার পরে ‘পাঁচসাতজন মুসলমান-ছোকরা’র হাতে শ্রীকান্ত-র মার খাওয়ার গল্প থেকে শরৎচন্দ্রের অভিপ্রায়ে অভিসন্ধি খোঁজার সুযোগ পেয়ে যান কেউ-কেউ। আবার, কেউ-কেউ ‘সতুয়ার চড়া’র ভৌগোলিক সূত্র থেকে ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বের ওই ম্যাচের ঘটনাস্থল ভাগলপুর প্রমাণ করে হঠাৎ নিশ্চিত হয়ে যান যে ‘শ্রীকান্ত’-র সময়ে ভাগলপুরে বাঙালি মুসলমান থাকতেই পারেন না!

শরৎচন্দ্র পথে নেমেই চিনে নিতে চেয়েছেন পথ আর জীবনকে

এই দু’পক্ষের প্রতি চাহিয়াই বিস্ময়ের সীমা থাকে না। নিজের-নিজের ভাবনার খোপে আঁটাতে গিয়ে কেমন অনায়াসে শরৎচন্দ্রকে খণ্ড করে ফেলেন এঁরা! শরৎচন্দ্র তো কোনওদিন নিজের খোপে নিজেই আটকে থাকেননি। আমৃত্যু যে সজীব মন নিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন, সেখানে এরকম নিজস্ব জেদি ন্যারেটিভের জায়গাই ছিল না। নইলে ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বের প্রথম ইংরেজি অনুবাদে ওই বাক্যেই ‘বাঙ্গালী’র জায়গায় ‘Hindu’ করা গেল কী করে?

না, খোদার ওপর খোদকারি নয় সেটা। ওই অনুবাদ প্রকাশিত হচ্ছে ১৯২২-এ, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে। অনুবাদ করছেন কে সি সেন ওরফে ক্ষিতীশচন্দ্র সেন এবং থিয়োডোসিয়া টমসন। বইয়ের ভূমিকা লিখছেন এডওয়ার্ড জে টমসন। থিয়োডোসিয়া তাঁর স্ত্রী। অনুবাদটি যে দেখিয়ে নেওয়া হয়েছিল শরৎচন্দ্রকে, সে-বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত হওয়া যায়। কারণ, গোপালচন্দ্র রায় ক্ষিতীশচন্দ্রকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, ‘আমার অনুবাদ শরৎচন্দ্রের তেমন পছন্দ না হওয়ায় তিনি একজন ইংরাজ মহিলাকে আমার অনুবাদটা দেখতে দিয়েছিলেন। ঐ মহিলা আমার লেখা কিছু কিছু সংশোধন করেছিলেন বলে দুজনের নামেই তখন বইটা বেরিয়েছিল।’ তা ছাড়া বইয়ের প্রকাশক যেহেতু অক্সফোর্ড ও একজন অনুবাদক ক্ষিতীশচন্দ্র সেন বোম্বে হাইকোর্টের বিচারপতি, মূল উপন্যাসের জীবিত লেখককে উপেক্ষা করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। এডওয়ার্ড টমসনও বন্ধু ছিলেন শরৎচন্দ্রের। শরৎচন্দ্রও যে যথেষ্ট গভীরভাবে অনুবাদটিতে জড়িয়ে ছিলেন, সেটা বোঝা যায় ৩ নভেম্বর ১৯২০-তে সরোজকুমার গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা চিঠি থেকে, যেখানে লিখছেন, ‘আমি ভাগলপুর হইতে ফিরিয়াছি।… এখনও ইচ্ছা আছে একবার বাহির হইয়া পড়ি। গৃহিণী নিষেধ করেন যে, এরূপ অবস্থায় অত লম্বা ট্রেনে জার্নি বোধ হয় ভাল নয়। তাছাড়া কাজের চাপে যেন দিশাহারা হইয়া পড়িতেছি, বিশেষ করিয়া ইংলিশ ট্রান্‌শ্লেশানের জন্য। এবার যাহাতে আর দেরি না হয় সে বিষয়ে মন দিব। না হইলে রাবণের স্বর্গের সিঁড়ি হয়ত আর হইবেই না।’ শরৎচন্দ্র বেঁচে থাকতে তাঁর আর একটিমাত্র বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ হয়েছিল, ‘নিষ্কৃতি’। সে-অনুবাদের প্রকাশ এই চিঠি লেখার অন্তত বছর পনেরো পরে। সুতরাং এখানে যে ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বের অনুবাদের কথাই বলা হচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ থাকে না।

তা হলে, মুসলমান ছাত্রদের বিপক্ষদলের পরিচয়টা যে বাঙালিই লিখতে হবে, এমন কোনও গোঁ শরৎচন্দ্রের ছিল না নিশ্চয়। হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন ভাষা-পরিচয় আর ধর্ম-পরিচয়ের এই কুয়াশাময় বাক্যটা বিভ্রান্তি তৈরি করবে অবাঙালি পাঠকের মনে। তাই ইংরেজি অনুবাদে বাঙালি কেটে হিন্দু করায় আপত্তি করেননি, অনুমান করতে পারি।

তবে অনুবাদ পছন্দ হয়নি  শরৎচন্দ্রের। গারট্রুড সেনকে ১৯৩৫ সালে চিঠিতে লিখছেন, ‘I am sending my car and a copy of Srikanta in English. This was the only copy available from the publishers as the edition has been completely exhausted. I did not want much to give it you as I thought the translation was done really very badly, however.’ 

কিন্তু ‘শ্রীকান্ত’র বাংলা সব সংস্করণে শরৎচন্দ্র ওই বাক্যে বাঙালি-ই রেখে দিলেন। এর কারণ, অনুমান করতে পারি, সাধারণ পাঠকের মন বুঝে লিখতেন শরৎচন্দ্র। সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ, সে-কালে এবং কিছুটা এ-কালেও, ওই পরিচয়গুলো অত তলিয়ে ভাবে না। এই সূত্রে একটু ‘পথের দাবী’ পড়ি আবার,

‘অপূর্ব্ব চিন্তা করিয়া কহিল, দেখো, আমি যাকে খুঁজি—আচ্ছা, যারা বাঙালী ক্রীশ্চান কিংবা—

লোকটি আশ্চর্য্য হইয়া বলিল, বলচেন বাঙালী, আবার খ্রীষ্টান কি রকম? খ্রীষ্টান হলে আবার বাঙালী থাকে না কি? খ্রীষ্টান-খ্রীষ্টান। মোচলমান-মোচলমান। ব্যস, এই ত জানি মশায়!

অপূর্ব্ব বলিল, আহা! বাঙলা দেশের লোক ত! বাঙলা ভাষা বলে ত?

সে গরম হইয়া কহিল, ভাষা বললেই হ’ল? যে জাত দিয়ে খ্রীষ্টান হয়ে গেল তাতে আর পদার্থ রইল কি মশায়? কোন বাঙালী তার সঙ্গে আচার-ব্যবহার করুক্ একবার দেখি ত! ওই যে কোত্থেকে সব মেয়ে-মাস্টার এসেচে ছেলেপুলেদের পড়ায়—ব্যস্! তা বলে কেউ কি তাদের সঙ্গে খাচ্ছে, না বসচে?’

বই-পড়া জীবন-ধারণা নিয়ে পথে নামেননি শরৎচন্দ্র। পথে নেমেই চিনে নিতে চেয়েছেন পথ আর জীবনকে। যেমন দেখেছেন, যেমন চিনেছেন, লিখেছেন সেটাই। নিজস্ব ন্যারেটিভে লেখাকে কৃত্রিম করে তুলতে চাননি। তবু অপূর্ব-র মধ্যে শরৎচন্দ্রকে খোঁজে পাঠক, শ্রীকান্ত-র মধ্যেও। মনোজ বসুকে একদিন শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘আমার লেখার মধ্যে সবাই আমাকে খোঁজে। কেউ বলে, আমি গোঁড়া হিন্দু, কেউ বলে আমি একজন নাস্তিক। কেউ বলে ‘চরিত্রহীন’ বইটায় আমার নিজের কাহিনী রয়েছে, কেউ বলে শ্রীকান্ত আমারই আত্মজীবনী। আমায় নিয়ে সবই কথা কাটাকাটি চলে, দূরে দাঁড়িয়ে আমি হাসি।’

তাঁর জন্মের দেড়শো বছরে এই প্রবল ন্যারেটিভময় উত্তর-সত্য যুগে ওই হাসিটা কিন্তু আজও জীবন্ত।