কলমবিলাস: পর্ব ২

রবিবাবু ও পেন মার্ট

দলটি দু’ভাগে বিভক্ত। একদল বাড়ি-বাড়ি ঘুরে কলম এবং খবর সংগ্রহ করে, আর অন্যটি খানিকটা লাভের বিনিময়ে সে-কলম ফের শৌখিনদের হাতে পৌঁছে দেয়। খবর সংগ্রাহকদের অধিকাংশ অবাঙালি। তারা বিভিন্ন প্রদেশ থেকে একা এবং বেশির ভাগ সময়েই সপরিবারে কলকাতা আর শহরতলির মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে পুরনো জিনিস কিনে বেড়ায়। ‘রদ্দি’, ছেঁড়া-ফাটা মালের কারবারি— কলমও এক সময়ে রদ্দির তালিকাভুক্ত হয় শৌখিন মানুষরা ফৌত হলে। এঁরা কালীঘাট, হরিশ মুখার্জি স্ট্রিটের আশপাশে থাকত ঘরভাড়া নিয়ে— একটি দশ বাই দশ ঘরে সাত থেকে আটজনের বাস, এজমালি পায়খানা, অনেক সময়ে তেতলা বাড়ির একতলায় কল, এবং রান্নার ‘মাসি’ সামান্য পয়সার বিনিময়ে সবার ডাল-ভাত-রুটি-তরকারি দু’বেলা রেঁধে পিত্তি রক্ষার ব্যবস্থা করত। ফিস্টি, মুরগি-মটন যে একেবারে হত না তা নয়, তবে তা বছরে-দু’বছরে এক-আধবার— তার বেশি সামর্থ্য এদের ছিল না। সম্প্রতি, বছর দশেক আগে কেউ একজন এই বাড়িগুলো কিনে নিল রাজনৈতিক প্রতিপত্তির জোরে। সব ক’টি, এক লপ্তে। ‘বেঘর’, উদ্‌বাস্তু হয়ে গেল এরা একসঙ্গে সবাই। প্রায় সবাই দেশে ফেরে, বা চলে যায় অন্য শহরে ধান্দার খোঁজে।

মুশকিল হল, এই কারবারে মানুষের সঙ্গে পরিচয় তৈরি করাটা মূলধনের অংশ। কয়েক প্রজন্মের লাগাতার দেখাসাক্ষাতের ফলে তৈরি সম্পর্কের ভিত্তি এবং বিশ্বাসের ক্ষেত্রটি কেবল টাকা লগ্নির ওপর নির্ভরশীল নয়। বাপের হাত ধরে ছেলে ঢোকে বাড়িতে, বাপ মঁব্লঁ দেখায় আর ছেলে পেলিকান-ওয়াটারম্যান সাফ করার ফাঁকে ব্যাবসার কায়দাকানুন শেখে, কোন ধরনের বাবুরা কীসে খুশি-অখুশি তা মগজে ভরে রাখে। কার বাড়িতে কোন কলম বহুকাল অব্যবহৃত পড়ে আছে, কে শেফার্স-পার্কার ছোঁয় না, কে ওপেন নিব না হলে মঁব্লঁ-ও ফিরিয়ে দেয়, তা মাথায় না থাকলে বাবুদের সঙ্গে ভাব জমানো সম্ভব নয়। বাবুরাও জানে, কার কাছে গোছা ধরে কলম দিয়ে নিশ্চিন্তে নিজের কাজ করা যায়। বাড়িতে বিক্রয়যোগ্য পেন, দোয়াত, নিব থাকলেও পরিচিত ফেরিওলা না এলে বাবুটি সে-সম্পর্কে টুঁ-শব্দটি করবেন না অন্য কারওর কাছে।

আরও পড়ুন: অনেক সময়ে শুধু ফালতু পেনই কিনতে হয় ফেরিওলাদের মন রাখার জন্য, যাতে পরের বারও ‘মাল’ পেলে দেখায়! ‘কলমবিলাস: পর্ব ১’…

ফেরিওলাদেরও আছে পেটোয়া কলমের কারবারি— বাকিরা নানাবিধ লোভনীয় টোপ দিলেও, বাপের জমানার ব্যবসায়ীটিকেই ‘বাড়ি’র খোঁজ দেবেন তিনি, খানিকটা কম লাভের ধাক্কা সয়েও। একটা শহর ছেড়ে হঠাৎ তাঁদের সিংহভাগ অন্যত্র চলে গেলে গোটা ব্যাবসাটাই ধসে পড়ে। পড়েওছে গত কয়েক বছরে। ছোটো ব্যবসায়ীরা না থাকার ফলে রাঘব বোয়ালরা চিটিংবাজির কারবার ফেঁদে বসেছে মুনাফাবৃদ্ধির লক্ষ্যে। রবিবাবুরা পেরে উঠছেন না তাদের আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে। অমুক বাবু, তমুক দাদার বাড়িতে ছুটির দিন সকালে-বিকেলে হাজিরা দিয়ে, চা খেয়ে, খানিকটা আড্ডা মেরে কলম ‘ওয়াশ’ করা, নিব-ফিডের গ্যাপ বাড়িয়ে-কমিয়ে কালির ফ্লো নিয়ন্ত্রণ, সিস্টেম সারাই ইত্যাদি এখন অনেকটাই অতীতের গল্প। তার বদলে দোকানে যেতে হবে, কাউন্টারের ওপারে সম্পূর্ণ ফেরেব্বাজদের হাতে কলম তুলে দিয়ে আপাদমস্তক ঠকে নাজেহাল হওয়াই এখনকার নিয়ম। রবিবাবুরাই-বা নিয়মিত কলম না পেলে চার ঘণ্টা ট্রেনের দুলুনি সয়ে কলকাতায় আসবেন কেন? তাছাড়া বাবুদের বাসায় সব সময়ে একবার গেলেই কলম পাওয়া যায় তা নয়— পুরনো সম্পর্ক থাকলেও যায় না। বাবুরা অনেক সময়েই বিবিদের সামনে কলম বেচেন না, অপেক্ষায় থাকেন কখন পেনবাবুর সঙ্গে একা হওয়া যায়। বিবিরাও তক্কে-তক্কে থাকেন কী বেচল, কোনটা কিনে ‘অযথা পয়সা নষ্ট’ করল দেখার জন্য। ফলে ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে কলমের মতো নিরীহ বিষয় হলেও, নানা প্যাঁচালো ব্যঞ্জনায় পরিপূর্ণ।

রবিবাবুর পোশাকি নাম প্রদ্যুৎ বিশ্বাস। ’৮৪ সালে বাবা হাতে ধরে দোকানে বসান। দোকানের নাম ছিল ‘পেন মার্ট’— ৭ নং কিরণশঙ্কর রায় রোড। তারও অনেক আগে, ’৫৭-’৫৮ নাগাদ ওখানেই ফুটপাথে শোকেস সাজিয়ে কলম বিক্রি শুরু করেন পশুপতিবাবু। দোকান ’৬৮-তে। গোড়ায় গ্যারেজের মেকানিক ছিলেন। গাড়ি সারাতে এসে একজন বলেন, ‘হাতের এমন চমৎকার সূক্ষ্ম কাজ, এই কারবারের বদলে কলমের কাজ শেখো।’ তিনিই ঠিকানা এবং সুপারিশ লিখে ভবানীপুরের পাঠান ভবেশ চৌধুরীর বাসায়। ভবেশবাবু তিনের দশক থেকে একটানা কলমের জগতের বাদশা ছিলেন বললেও অত্যুক্তি হবে না। বিলেত, আমেরিকা থেকে পার্কার-শেফার্স, ওয়াটারম্যান ইত্যাদি কোম্পানি ওঁর কাছে কলম পাঠাত— শৌখিন কলমের রসিকরা প্লেনের ভাড়া গুনে জটিল রোগ সারাতে আসত। ভবেশবাবুই পশুপতিবাবুকে হাতে ধরে কাজ শেখান। আরও একজনকে শিখিয়েছিলেন, চিনার পার্কের কাছে দশদ্রোনে বাড়ি ছিল শংকর জানা মশাইয়ের। রবিবাবুর মতে, ভবেশ চৌধুরীর পর কলমের জগতে পশুপতিবাবু নন, শংকর জানাই ছিলেন সম্রাট— বিশেষ করে মঁব্লঁ সারাইয়ে ওঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না।

’৬৮ সালেই রবিবাবুর জন্ম। দুই দিদি, এক দাদা ছাড়াও আরও দুই বোন এবং একগাদা আত্মীয়স্বজন, জ্ঞাতি-কুটুম জড়িয়ে-মরিয়ে বিশাল পরিবার। দোকানে এক মামা, শ্রী সনাতন বিশ্বাস বাবার সহকারী ছিলেন— ফলে কাজে ভুল হলে, বা খেলার মাঠে ‘সময় নষ্ট’ করলে দু’তরফেরই চড়থাপ্পড় খেতেন নিয়মিত। ‘ও না হলে কাজ শিখতে পারতাম না। কতবার যে মার খেয়েছি সারাই করতে গিয়ে কলম ভেঙে ফেলে, তার কোনও হিসেব নেই। আজকের যুগে কোনও ছেলে ওসব মেনে নেবে না— দু’দিনে পালাবে কাজ ছেড়ে।’

কলমের ঘাঁতঘোঁত জানতে শুরু করেন ১৮ না পেরোতেই— সে-কাজ এখনও চলছে। সে-সময়ে পেন আমদানির লাইসেন্স ছিল না পশুপতি বিশ্বাসের। পেন হসপিটাল— এখনকারটি ‘অজ্জিনাল’ লয়কো, আর পুরোনোটির সাইনবোর্ড এখনও ঝুলছে, সরানো যাবে না— থেকে কলম কিনতেন ওঁরা। মঁব্লঁ আসত বোম্বাইয়ের জে. বি. ব্রাদার্সকে অর্ডার লিখে পাঠালে— ওই যাঁরা অজান্তা সার্কাসের মালিক। আরও অনেক কারবার ছিল ওঁদের কলমের ব্যাবসা ছাড়াও। সাধারণ কলমের দাম ছিল ২৫-৩০ পয়সা। পার্কার, শেফার্স ১-২ টাকায় পাওয়া যেত ওদের দোকানে— পেন হাসপাতালে আর একটু বেশি দরে বিকোত গুড উইলের কারণে। উইলসন এবং চাইনিজ় কলমের দামও এক টাকাই ছিল। পশুপতিবাবু মাসে সাড়ে সাতশো থেকে হাজার টাকার ব্যাবসা করতেন মাসে এবং ৩০% লাভ থাকত হেসেখেলে। এর চাইতে বেশি লাভ করার কথা ভাবত না ছোটো ব্যবসায়ীরা, এবং রবিবাবু এখনও শতকরা ২০ টাকা মুনাফাতেই কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন— তা সে কলম বিক্রিই হোক বা সারাই।

কলম একটা ব্যাপার ছিল সে-যুগে। সোয়ান, পেলিকান অথবা ব্ল্যাক, রেড, গ্রিন ইত্যাদি ‘বার্ড’-এর সংগ্রহ কেবল বুকপকেটের শোভাবর্ধনের কাজে লাগত, তা নয়। এ-যুগেও সেসবের খোঁজ চালিয়ে যাওয়া কেবল বর্তমানকে ভুলে থাকার জন্যই নস্টালজিয়ায় বিলাস বলা উচিত হবে না। কত-যে ইতিহাস জড়িয়ে আছে কলমের সঙ্গে, বলে শেষ করা যাবে না। শোনা যায় একশো পিস ব্লু বার্ড এসেছিল এদেশে— সবটাই নাকি বোম্বাইয়ের ডক থেকে ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল। গ্যাংওয়ার সামনে একটি কালো গাড়ি এসে দাঁড়াল ঘ্যাঁচ করে ব্রেক চিপে। একজন খালাসি— ঠোঁটের কোণ থেকে আধপোড়া সিগারেট ঝুলছে, চেক-কাটা কলার-ছাড়া টি-শার্ট আর টুপিতে চোখ ঢেকে গাড়ির ডিকিতে একটা বাক্স তুলে দিল… গুড়ুম-গুড়ুম করে পিস্তলের গুলি… গাড়িটা সাঁ করে বেড়িয়ে গেল… ফ্রেমে মিরনা লয় ফোনের রিসিভার থেকে দেড় হাত দূরে সিগারেটে আলতো টান মেরে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললে ‘সেন্ড হিম ইন…’ রোমহর্ষক নয় কি? এবার বিষয়টার কেন্দ্রে ব্লু বার্ড নামক কলমের বদলে চিনা কোম্পানির মোবাইল ফোন অথবা ‘কিচেন ফ্রেন্ডলি মিক্সার গ্রাইন্ডার’ ভাবুন— তারপর গল্পটা কেমন এগোল লিখে জানাবেন।

রবিবাবু কলম জোগাড় করে বাড়ি-বাড়ি ঘুরে বিক্রি, এবং ধোয়া পাখলা থেকে সারাইয়ের কাজ শুরু করেন ২০০৫ সাল থেকে। তদ্দিনে কলমের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। কলম কমতে শুরু করেছে বাজারে। উড়িষ্যায় কিছু কলম পাওয়া যেত কটকে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরে প্রতি বছর শীতকালে পুরনো জিনিসের বাজার বসে— হপ্তাখানেকের মেলা। সেখানেও কিছু মাল এখনও পাওয়া যায়। ইন্টারনেটে যে সেসব মেলে না তা নয়, তবে তার দামের কোনও মাথামুণ্ডু নেই। রবিবাবুরাও নেই সেখানে, ভার্চুয়াল জগতে কেনা হয়ে গেলে কলম হাতে পাওয়ার পর প্রথমবার কালি ভরে নিতে হয় নিজেকেই। রবিবাবু সিদ্ধার্থ শংকর রায়, অজিত পাঁজা, শান্তিনাথ মুখার্জি, বুদ্ধদেব গুহদের বাড়ি যেতেন কলম সারাতে— এদের অনেকেই নতুন কলম নিয়ে দোকানে আসতেন পশুপতিবাবুকে দিয়ে বা পরবর্তীকালে রবিবাবুর হাতে প্রথমবার কালি ভরাতে। মেলা থেকে কি শুধু কলম বা পার্টস নিয়ে ফিরেছেন ওঁরা? চিনেমাটির পুতুল, বিলিতি যন্ত্রপাতি, আকবরি মোহর না হলেও দিনার আশরফি, পুরনো বইয়ের গল্প হত। এসব মেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে চারপাশে ঘুরেফিরে বেড়ানো, এঁটুলির মতো সেঁটে থাকা বহুকালের পরিচিত পকেটমার এবং তাদের হাত থেকে কেনাবেচার টাকা সুরক্ষিত রাখার কায়দাকানুন নিয়ে কম গল্প হয়েছে! সবটা মিলিয়েই কলমের জগৎ। লেখার সময়ে তাঁরা সবাই দেখা দিয়ে যায়। চোখ মটকে মিচকি হেসে তাকায় কালি ভরার সময়ে। এক ফোঁটা কালি ‘নষ্ট’ করলে ভুরু কুঁচকে বকাঝকা দেয়। তারপর আড়চোখে দেখে সেকশনের কতটা ওপরে কলমটা ধরলাম। কী লিখছি, তা আমি ছাড়াও অনেকে একসঙ্গে দেখে। ভুলভ্রান্তি হওয়ার জো নেই মোটে।