কালি, হাতের লেখা, স্টাইল
ঝরনা কলমের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল বাদামি চামড়ায় তৈরি পেলিকানের খাপ হাতে পেয়ে। এলিগান্স শব্দটার সঙ্গে পরেও বহুবার সাক্ষাৎ হয়েছে, তবে প্রথম দর্শনেই সটান প্রেমের অমন উদাহরণ জীবনে খুব বেশি নেই। খানিকটা লম্বাটে, ঠিক অর্ধ না হলেও, দ্বিতীয়বার একচিলতে চন্দ্রাকৃতির খাপটার একদিকে চেন— খুললে ভিতরে পাশাপাশি একটি কলম এবং মেকানিকাল পেনসিল ইলাস্টিক ফিতের নিরাপদ বন্ধনে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা, যাতে বাসে-ট্রামে, বা ‘টিউব’-এ খাপ খুললেও পড়ে না যায়। বিলেত থেকে কেউ একটা এনে দিয়েছিল, তবে পরিবারের কেউ নয়। ক্লাস থ্রি-র ছাত্র হলেও এটুকু বুঝেছিলাম, কারিগর যেই হোন-না কেন, কলম এবং তৎসম্পর্কিত যাবতীয় সরঞ্জামের প্রতি অকৃত্রিম এবং অযৌক্তিক ভালবাসা না থাকলে অমন জিনিস বানানো এক প্রকার অসম্ভব। খাপের ভিতরের ফ্ল্যাপে অসাধারণ সহজ ক্যালিগ্রাফিতে কোম্পানির নাম— ব্যাস আর কিছু নয়। নাকি আরও অনেক কিছু!
বিজ্ঞাপনের টেক্সট নিয়েও মোহিত হওয়ার সেই শুরু। সে-বিষয়ে পরে আসছি। কলমের কেস বা বাড়ির বাঙাল উচ্চারণে ‘কেইস’ হাতে তুলে নিলে হয় সারা জিন্দেগিভর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি হবে, নয়তো গুটখা মুখে… আমি কলমটা আঁকড়ে ধরলাম বিলকুল। তার প্রথম কারণ বাবা কখনও ডট পেন বা বলপয়েন্টে ছুঁতে দেয়নি; আর দ্বিতীয়টা জীবনে দর্শনের অধ্যাপক, শ্রী সুজিত চক্রবর্তী নামক এক মুক্তিযোদ্ধার প্রবেশ। রাজনৈতিক পালাবদলের ঘোলা জলে বাঘা সিদ্দিকির অনুগামীটি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে শিলিগুড়িতে রিপ্যাট্রিয়েটেড হওয়ার অপেক্ষায় থানা গেড়ে ছিলেন সে-সময়ে, এবং সত্তরের দশকের শেষ থেকে আশির দশেকর গোড়ার কয়েক বছর আমার বাংলা হাতের-লেখা পুনর্গঠনের কাজে উঠে পড়ে লাগেন— ফলে ফাউন্টেন পেন সর্বক্ষণের সঙ্গী। ‘স্মুদন্যাসের লগে কাগজ়ে নিবে খসখস আওয়াজ় হওনের বিরুদ নাই, বরং ওইডারেই কয় সাউন্ড অব প্যাশন— কিসু বোজ়লা?’ বোজ়লাম— এবং ‘মর্মে পশিল গো’ হওয়ামাত্র হাবুডুবুও যে খেতে শুরু করলাম তাতেও ভুল নেই— তবে সব ক’টা ব্যঞ্জনার মর্মার্থ হৃদয়ঙ্গম করতে সময় লেগেছিল।
আরও পড়ুন: ভারতের ঠা ঠা গরম ইউরোপে পৌঁছল কী করে? লিখছেন অমিতাভ মালাকার…
উনি একইসঙ্গে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের মনোযোগী পাঠক তৈরির কাজটিও যে সারছিলেন, সেটি মালুম হল আরও কিছুকাল পরে। তদ্দিনে তলস্তয়, শেড্রিন, ব্লক, দস্তয়েভস্কির পাশাপাশি বিভূতিভূষণ, মানিক, শরৎ, রবীন্দ্রনাথে ডুব মেরে অন্য কোনও দিকে নজর দেওয়ার ফুরসত আর কখনও হবে না, তাও খুশি মনে, বিনা তকলিফে মেনে নিয়েছি। রুশ সাহিত্য এবং কলমে মনোনিবেশের প্রাথমিক কারণটি আর্থিক বিনিয়োগ সম্পর্কিত— বয়স্কদের বাকি আহ্লাদের অংশীদারিত্ব বর্জন করেছিলাম সন্তর্পণে, শখ মেটানোর সামর্থ্য ছিল না। পরবর্তীকালে সে-বিষয়ে আগ্রহ তৈরির সূত্রগুলো হারিয়ে ফেলেছিলাম ইচ্ছা করেই। ফাউন্টেন পেন, কালি, হাতের লেখা, নিজস্ব স্টাইল, কাগজ নিয়ে খুঁতখুঁতানি আর সাহিত্যে মনোনিবেশের মধ্যে নিবিড়, নিগূঢ় রসায়ন-সম্পর্কিত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ক্ষমতা নেই। তবে পছন্দের ঔপন্যাসিকের চামড়ায় বাঁধাই, সোনার জলে নাম লেখা, সামান্য জীর্ণ একটা ভল্যুম পুরনো বইয়ের দোকানের তাকে ফেলে এগিয়ে যেতে যতখানি মন খারাপ হয়, সকালে কফির কাপ হাতে কালি, কলম, খাতা-সাজানো ডেস্কে গিয়ে না বসা অবধি ততখানিই অস্থিরতা খুঁচিয়ে ফেরে। সবটা মিলিয়ে অন্য এক জগৎ, এবং এখন আর মেনে নিতে অসুবিধে হয় না যে সেটাই সত্যি, বাকিটা মায়া। সে-দুনিয়ায় প্রবেশের রহস্য ‘চুক আর গেক’, ইচু ফকির, ‘নীল পেয়ালা’-র অতিথি বৈমানিকের ক্ষণিকের উপস্থিতি, গানহি বাবা, অপুর কৈশোরের দিনগুলির অপস্রিয়মাণ আলো-ছায়ার ফাঁকফোকর দিয়ে মাঝেমধ্যে একেবারেই নজর হয় না যে তা নয়, তবে বেরোনোর রাস্তা যে তৈরি হয়নি কখনওই, সে-সম্পর্কে নিশ্চিত।

এমন দৃঢ় প্রত্যয় তৈরির কারিগর সত্যপ্রসাদ সেনগুপ্ত মহাশয়। ক্লাস এইটে ব্লেক, ইয়েট্স আর শেক্সপিয়রের পাশাপাশি কলমের সেকশনটি ছেড়ে খানিকটা ওপরে ধরতে বললেন— অনেকটা ওপরে। ‘যা লিখছ, তা কাগজে ফুটে উঠতে না দেখলে তো চলবে না বাবা? You must see the words taking shape, your thoughts and dreams etched on paper, বুঝেছ?’ ইংরিজি হাতের লেখা বদলে দিলেন বরাবরের মতো, ‘দ্রুত লিখতে হবে না… that, I must say, is not important and for the clerks to pursue, who need to return home after a long day at the ledgers and other quite dubious financial engagements… style থাকাটা জরুরি young man! Individuality is what we shall pursue, তোমার লেখা যেন আলাদা করে চেনা যায়, unique in both thought and expression.’
এই অধ্যায়গুলো না থাকলে জীবন অন্যরকম হত, কলমের পিছনে ছুটে বেড়াতাম না, কলমও স্বপ্নে বা জাগরণের কেজো সুবিধের নেহাত প্র্যাকটিকাল বিপত্তি সত্ত্বেও ধাওয়া করত না। একদিন বাবাকে দেখেছিলাম অফিস থেকে ফিরে মাথা ঝুঁকিয়ে ইজ়িচেয়ারে বসে আছে— দুপুরে, টিফিনের অবসরে দপ্তরের টেবিল থেকে কোনও এক রসিক সবুজ রঙের পার্কার ফিফটিওয়ানটা তুলে নিয়েছে। সে-জমানায় পনেরো টাকা দাম ছিল কলমটার। তার চাইতেও বড় কথা, সাতের দশকের মধ্যভাগে অফিসে ছুটি নিয়ে আড়াই ঘণ্টা সফরের পর জলপাইগুড়ির কাগজ-কলমের দোকানে পার্কার ফিফটিওয়ানের চাইতে অবিশ্বাসীর পক্ষে ঈশ্বরের দেখা পাওয়া সহজ ছিল। কলম নেই মানে লেখা বন্ধ। লেখা বন্ধ মানে নিজের জগতে প্রবেশের দরজা খোলার উপায় নেই। তার মানে দুয়ারের এদিকে জীবিত আর মৃতের মধ্যে কেবল শ্বাস নেওয়া, না-নেওয়ার অকিঞ্চিৎকর তফাত। ওটুকু পার্থক্য মানসিক স্থৈর্য রক্ষার পক্ষে যথেষ্ট নয়। কলকাতা থেকে প্রায় রোজই কেউ-না-কেউ যাতায়াত করলেও— ফোর্ট উইলিয়াম ইস্টার্ন কমান্ডের হেডকোয়ার্টার হওয়ার ফলে সংযোগ রক্ষার্থে পাইক-পেয়াদা পাঠানোই দস্তুর ছিল সে-যুগে— তাদেরই কারওর হাতে নগদ পয়সা গুঁজে ধর্মতলা বা মহাত্মা গান্ধী রোডের প্রসিদ্ধ দোকানগুলোর একটিতে কলমের খরিদারির জন্য…!?!? লা হাওলা ওয়ালা…

কলম কিনতে হলে ফুরসত দরকার। রোজকার ঝামেলা-দিকদারি থেকে ফুরসত। হালকা পায়ে মেঘের ওপর কদমতাল, ঠোঁটের কোণে মৃদু মুসকান, কানে-গোঁজা তুলো থেকে গুলাবি আতরের খোশবাই, ফুরফুরে শরিফ মেজাজ আর দোকানের অন্দরে, নিভৃত কোণে, টেবিলের ওপাশ থেকে একজন মৃদু হেসে বলবেন, ‘বসুন, মাত্র এক পিসই পেয়েছি, আপনার জন্যই রাখা ছিল।’ তাড়াহুড়ো নেই, চিৎকার-চেঁচামেচি, গুটখা, টি-টুয়েন্টি, সিরিয়ালের নোংরামো নেই, এমনকী মোবাইলফোনও শুধু জরুরি কথা বলার জন্যই এক কোণে পড়ে থাকে। একশো বছর আগে তৈরি ল্যাকার বডির ওপর মাদার অফ পার্লের কারুকাজ, ডগায় সোনার ডাবল হোল্ড নিব, কাট গ্লাসের দোয়াত, নীল কাচের কলমদান…! দেওয়ালে মঁব্লঁ, সোয়ান, পেলিকানের বিজ্ঞাপন।
রবিবাবু, ওরফে প্রদ্যুৎ বিশ্বাস মহাশয়, গোটা ব্যবস্থাটি আপনার-আমার বৈঠকখানায় তুলে আনেন ২০১২ সালের মাঘ মাসে। কলেজ স্ট্রিটে আলাপ, তবে ঘণ্টাখানেক কফি হাউজ়ে নানা রকমের কলম নিয়ে ধস্তাধস্তির পর বোঝা গেল পাকা ঠেক চাই, ভিড় এড়াতে না পারলে বিনিময়প্রথার প্রাথমিক শর্তপূরণ বাবদ কেনাকাটা সারা গেলেও আড্ডা জমবে না। অতঃপর আমার অফিসের অপেক্ষাকৃত নীরবতায়। উঁহুঁ। কাজের চাপ থাকলে যে এসব হয় না, তা দুজনেরই বিরক্তি সহকারে স্বীকার করলাম। ফলে আমার বাড়ি— চমৎকার বন্ধুত্বের ওই সূত্রপাত, এবং লকডাউনের কিছুকাল বাদ দিলে, ওঁর আসা বন্ধ হয়নি। পৈতৃক বাড়ি পূর্বস্থলী। সেখানেই মিঁয়া-বিবি থাকেন মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর, ছেলে এই ‘লাইন’-এ না এসে চাকরি খুঁজে ব্যাঙ্গালোর পাড়ি দেওয়ায় বরাবরই খানিকটা বিমর্ষ। সে-দুঃখ মেটার নয় জানিয়েছেন বহুবার, নানা কথার ফাঁকে সুযোগ পেলেই। ‘ধৈর্য নেই দাদা। এই কাজের প্রথম শর্ত কলম ধুতে শিখতে হবে। গোড়াতে সবাইকে হয়, আমিও পার্কার ধুয়ে শিক্ষানবিশি শুরু করি। পরের ধাপ পার্টস চিনতে শেখা— সব কলমের সব পার্টস আলাদা করে না চিনলে এই লাইনে কাজ করা সম্ভব নয়, আর তা শুরু হয় কলম ধুয়ে পরিষ্কার করা দিয়ে। এ-দেশে এসেছে এমন সব কলমের সব পার্টস আমি চিনি, আসল-নকলের তফাত ধরতে পারি রং আর ওজনের পার্থক্য মাথায় গেঁথে আছে বলে। ছেলে ধৈর্য ধরে শিখল না কাজটা। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম।’

আমিও দুঃখ পেয়েছিলাম ছেলের এহেন পরিণতির দুঃসংবাদে। একবার বলেছিলেন, ‘আমার মেয়েটা পারত— ওর শেখার, কাজ করার ক্ষমতা ছিল।’ রবিবাবুর স্ট্রোক হওয়ার পর সেরে ওঠার সময়ে সে একটানা বাবার মাথার কাছে বসে থাকত, আর্থিক কষ্টের দিনগুলিতে বাপ-মায়ের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওইটুকু মেয়ে। কাজ শেখালে যে পারত, তার প্রমাণ আমিও পেয়েছিলাম রবিবাবুর এ-কথা সে-কথার ফাঁক-গলে-পাওয়া ইঙ্গিত জোড়াতাড়া দিয়ে। তবে আমাদের দেশে কলমের কারবারে একচেটিয়া পুরুষদের আধিপত্য বরাবর— হয়তো শিক্ষাকে মেয়েদের নাগালের বাইরে রাখার বৃহদাখ্যানের অংশ হিসেবেই। তা ছাড়া, কলমের বেশিরভাগটাই জোগাড় হয় ফেরিওলাদের ‘টিপ’ থেকে। ‘অমুক বাড়িতে চারটে কলম আছে’, বা ‘তমুক বাবু খাপ-সহ দুটো পেনসিল আর কয়েকটা দোয়াত বিক্রি করবেন’ ইত্যাদি-প্রভৃতি।
প্রতিদিন কলকাতার এমাথা-ওমাথা ঘুরে ফেরিওলাদের জমায়েত হওয়ার ঠেকে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে সে-খবর সংগ্রহ করতে হয়, তাদের সঙ্গে চা-বিস্কুট খেতে হয়, দরাদরি সারতে হয় মাল গস্ত করার আগে। একগোছা ফালতু কলমের সঙ্গে একটি ভাল বিক্রয়যোগ্য পেন পাওয়া গেলে ভাগ্যের ব্যাপার— অনেক সময়ে শুধু ফালতু পেনই কিনতে হয় ফেরিওলাদের মন রাখার জন্য যাতে পরের বারও ‘মাল’ পেলে দেখায়। ঠেকগুলোয় গিয়ে দেখেছি রবিবাবুর মতো আরও অনেকে ব্যাবসা করছেন। খানিকটা বিরক্তই হয়েছেন তাঁরা আমাকে ‘কাজ’-এর জায়গায় দেখে— আমিও হতাম অফিসে কেউ চিরিয়া দেখতে এলে। উপস্থিত কথায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার টান থেকে মেদিনীপুর-মুর্শিদাবাদের সুর তো বটেই, হিন্দি এবং গুজরাতি জবানও কানে এল; তবে তার ফলে কারওর কমিউনিকেশনে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হচ্ছে একবারও মনে হয়নি। চা, পান, তামাক, ছাতুর শরবত, ডিম-পাঁউরুটি, সেদ্ধ ছোলা, শসা-বিটলবণ চলছিল এন্তার কাজের ফাঁকে। বেলা চারটের সময়ে অনেককেই দেখলাম লাঞ্চ সারতে উঠল সেদিনের মতো কারবার গুটিয়ে। একই স্টিলের সানকি থেকে মুড়ি খাওয়া এবং প্রেমালাপ বন্ধ না করেই একে অপরকে মিহি এবং জোরালো থ্রেট দেওয়ার কলাকৌশল রপ্ত করতে চাইলে একবার এই ‘দপ্তর’-এ যাওয়া দরকার।



