‘এ বয়স জেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়
পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে
এ বয়সে তাই নেই কোনও সংশয়
এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’
আঠারো বছর বয়সের উদ্দাম প্রতিনিধিত্ব করেই এই দেশের সঙ্গে তাঁর চিরযৌবনের গ্রন্থি বাঁধা হয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য। এ-বছর ১০০ বছরে পা দিচ্ছেন সেই কিশোর কবি। তাঁর সৃষ্টিতে একদিকে রয়ে গেছে সাধারণ, নিপীড়িত মানুষের জন্য কৈশোর না-কাটা দরদী মনের ছাপ, অন্যদিকে রয়েছে পরিণত কাব্য প্রতিভার পথে এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহ। যদিও সেই পরিণামের দিকে আর এগনো হয়নি কবির।
অগ্নিবর্ষী আঠারো বছর বয়সের বন্দনা করে কাব্যরচনা করেছেন তিনি ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থে। একদিকে সমস্ত বিশ্বে অনাচার, নাৎসিবাদী, ফ্যাসিবাদী হুংকার, অত্যাচার, অন্যদিকে ব্রিটিশ-শাসিত ভারত। এই দুই কণ্টকিত আবহে সুকান্তের সব কবিতাই প্রায় হয়ে উঠেছে সময়ের বাস্তব দর্পণ। যে-সময় সুকান্ত এই দেশে জন্মেছিলেন, সেই সময় নিজের দেশ তো বটেই, সারা পৃথিবীতে এত অস্থিরতা ছিল, একদিকে ফ্যাসিবাদের উত্থান, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের; স্বৈরতন্ত্রের মুখোমুখি হওয়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলন, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, শ্রমিক আন্দোলন… সব মিলিয়ে এক টালমাটাল সময়।
আরও পড়ুন: নেতাজিকে নিয়ে হওয়া চলচ্চিত্রগুলি আলোড়ন ফেলেছিল এককালে! লিখছেন তন্ময় ভট্টাচাৰ্য…
সুকান্ত ভট্টাচার্যর জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট। সুকান্ত গবেষক ড. সরোজমোহন মিত্র লিখছেন, ‘মাতামহ সতিশ চন্দ্র ভট্টাচার্যের কালীঘাট অঞ্চলের ৪২ নম্বর মহিম হালদার ষ্ট্রীটের বাড়ির একটি দোতলার ঘরে সুকান্তের জন্ম । নিবারণ চন্দ্র ভট্টাচার্যের দ্বিতীয়া স্ত্রী সুনীতির দ্বিতীয় পুত্র হিসেবে।’ সুকান্তর যখন জন্ম হয়, তখন কবি কাজী নজরুলের স্বদেশপ্রেমের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছে সারা বাংলায়। সুকান্ত ছোটবেলা থেকেই কবিতার পাঠ নিয়ে ছিলেন তাঁর জাঠতুতো দিদি রানিদির কাছে। ছড়া কাটতে-কাটতে রানি সুকান্তের শিশুমনে কাব্যের বীজ বপন করেন। সুকান্ত যখন বেড়ে উঠছেন, তখন বাংলা সাহিত্যের কল্লোল যুগ।

পড়াশোনায় ভাল হলেও স্কুলের পাঠ্যক্রমের পাঠ তাঁর ভাল লাগত না। তিনি ছেলেবেলা থেকেই ছড়া লেখা শুরু করলেন।
“বদ্রিনাথের সর্দি হল কলকাতাতে গিয়ে
আচ্ছা করে জোলাপ নিল নস্যি নাকে দিয়ে
ডাক্তার এসে বলল কেশে ‘বড়ই কঠিন ব্যামো
এ সব কি সুচিকিৎসা? আরে আরে রামো।’”
ছড়া দিয়ে কবিজীবন শুরু হলেও তিনি অচিরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির ময়দানে ঢুকে পড়েন। যে-যুগে সুকান্তর কবি হয়ে ওঠা, সেই যুগটা হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সূচনার ইঙ্গিতবহ। পাশাপাশি ভারতে চলেছে দেশ স্বাধীন হওয়ার সংগ্রাম। শোষকের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদ বিরুদ্ধ কবিতা লেখার পাশাপাশি সুকান্ত চারপাশের যুবসমাজ ও শিশুদের উন্নয়নের কাজেও লেগে পড়েন। সেই সময় জীবনে প্রেমও এসেছিল। কৈশোর প্রেম, যা পরে গভীর রূপ নেয়। জীবনে প্রেম থাকলেও কবিতার লালিত্যের প্রতি তাঁর শ্লেষ বহু কবিতাতেই পাওয়া যায়।
দারিদ্র, খিদে, মাত্রাতিরিক্ত শ্রম ও শোষণের কথাই উঠে এসেছে বারবার তাঁর কবিতায়। নিপীড়িত মানুষের কথাই নানা রূপকে। কখনও সিগারেট, কখনও সিঁড়ি, কখনও দেশলাই কাঠি হয়েছে নিপীড়নের প্রতিবিম্ব। রিক্ত, নিঃস্ব পৃথিবীই তাঁর চোখে পড়েছে। কবিতার ভাষায় ফিরে পেতে চেয়েছেন এক সুষম সমাজ। দুলে ওঠা দিন, মৃত্যুতাড়িত বেঁচে থাকার আবহের নাগপাশ-বদ্ধ কবি ‘ঘুম নেই’ কাব্যগ্রন্থের ‘কবে’ কবিতায় লেখেন, ‘সারা পৃথিবীর দুয়ারে মুক্তি, এখানে অন্ধকার/ এখানে কবে আসন্ন হবে বৈতরনীর পার?’

এই সময়কালে তাঁর লেখায় প্রভাব ফেলছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী আন্দোলন ও মুক্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন। তখন ভারতে চলেছে গান্ধীজির নেতৃত্বে অহিংস আন্দোলন ও অন্যদিকে সহিংস, সশস্ত্র আন্দোলন। সহিংস আন্দলনের অনেকেই ছিলেন বাঙালি। ১৯৩৪ সালে যখন সুকান্ত লিখছেন, তখন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন হয়, মাস্টারদার ফাঁসি হয়। ১৯৪২ সালে হয় ভারত ছাড়ো আন্দোলন। তবে তখনকার স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে যায় মার্ক্সীয় চিন্তা। কবি সুকান্তর লেখায় তার প্রভাব ছিল। ওঁরা বোঝেন, শুধুমাত্র ব্রিটিশ তাড়ালেই স্বাধীনতা আসবে না। বিপুল সংখ্যার ভারতবাসীর মধ্যে যে দারিদ্র্য আছে, কুসংস্কার আছে, অশিক্ষা আছে তার জন্য দায়ী যত না ব্রিটিশ, তার চেয়ে বেশি একধরনের স্বার্থান্বেষী, ধনী, কুসংস্কারগ্রস্ত ভারতীয়, যাঁদের পতন না হলে দেশ স্বাধীন হবে না। সেই সঙ্গে ছিল বলশেভিক বিপ্লবের প্রভাব। সুকান্তও বিশ্বাস করতেন শ্রেণিসংগ্রামের মধ্যে দিয়েই ভারতবাসী দারিদ্রমুক্ত হবে।
শুধু কবিতা লেখা নয়, দেশের কিশোর বাহিনীকেও ঘরে-বাইরে, শরীরচর্চায়, মননে প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন তিনি। ‘জনযুদ্ধ’ পত্রিকায় ‘কিশোরের স্বপ্ন’ নামে একটি গল্প লিখলেন সুকান্ত। সুকান্ত তখন নিজেও কিশোর। এই কিশোরবাহিনীর করণীয় কাজ কি হবে, কিশোরবাহিনীর কর্মসচিব সুকান্তের একটি চিঠি থেকে জানা যায়— ‘তোমরা প্রথমে নিজেদের লেখাপড়া, আচার ব্যবহার, চরিত্রের দিকে নজর দেবে। নিজেদের স্বাস্থ্য ও খেলাধুলার দিকে নজর দেবে। তোমরা গরিব ও অসুস্থ ছেলেদের সব সময় সাহায্য করবে। নিজের পাড়ার বা গ্রামের উন্নতির জন্য প্রাণপণ খাটবে…’
কিশোরবাহিনীর সংবাদ প্রথমে ‘জনযুদ্ধ’ ও পরে ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় প্রায়ই থাকত। তা ছাড়াও কেন্দ্রীয় কিশোরবাহিনী থেকে নিয়মিত চিঠি লেখা হত। এইসব চিঠি সুকান্তই লিখতেন। কর্মসচিব হিসেবে ওইসব চিঠিতে সুকান্তের স্বাক্ষর থাকত। নতুন আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি তখন কিশোরবাহিনী গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। কিশোরদের অনুপ্রাণিত করার জন্য তিনি তখন নতুন নতুন লেখা লিখে চলেছেন। এটা ১৯৪৩ সালের কথা, মন্বন্তর যখন চলছে। দুর্ভিক্ষের প্রকোপে গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহরে আসছে দু-মুঠো অন্নের জন্য। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় কঙ্কালসার মানুষের ভিড়, পড়ে থাকত খেতে না পেয়ে মরে যাওয়া মানুষের বীভৎস দেহ।
একদিকে ভারত ছাড়ো আন্দোলন অন্যদিকে মন্বন্তরের ভয়াবহ রূপ, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের আভাস। সাম্যবাদী মার্ক্সীয় চিন্তার প্রভাবে দেশকে দারিদ্রমুক্ত, শ্রেণিহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন… সব মিলিয়ে সুকান্ত তখন নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছেন কবিতার পথে। আর মারণব্যাধি যক্ষ্মা, দারিদ্রের প্রকোপ গ্রাস করছে তাঁকে। এই রাহুগ্রস্ত সময়েও কোনও-কোনও প্রোথিতযশা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং কাজী নজরুলের কাব্যরচনাকে ‘কাঁচা’ বলেছেন। যৌবনের তীব্রতার জন্যই, যেন পরিমিতিবোধ কম।
কিন্তু সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সুকান্তর মৃত্যুর পর ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় লিখছিলেন, একটি অপূর্ব রচনা, ‘কবি পেয়ে গেছে নতুন যুগ’। তাতে তিনি সুকান্ত সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘সুকান্তের চেহারার বৈশিষ্ট্য ছিল, ব্যঞ্জনা ছিল, কবিজনোচিত বলতে যা মনে আসে সে জলুশ ছিল না। নিভৃত নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চিন্ত আরাম কৈশোরকে লাবন্য মসৃণ মোলায়েম করে তোলেনি। জীবনযুদ্ধে সৈনিকোচিত রুক্ষশ্রী এসে মিশেছিল। লাজুক, মুখচোরা বলে সে পরিচিত ছিল। আমি তার ভেতরের হলকা মাঝে মাঝে অনুভব করতাম। তার শান্ত, স্বল্প কথায়, তার কবিতায়।’
সুকান্তর সেই কবিতার হলকা কি আজও অনুভুত হয়? সময় পাল্টেছে, সাম্রাজ্যবাদের ধারাও বদলেছে। আর যুদ্ধ? সেও ধুন্ধুমারভাবে, ভয়ঙ্করভাবে আজও চলছে, সেই যুদ্ধের কুপ্রভাব পড়ছে সারা বিশ্বের মানুষের ওপর।
আজকের যুগে সুকান্তের কবিতা কতখানি প্রাসঙ্গিক? বাচিকশিল্পীরা কী বলেন? আবৃত্তি-শিল্পী সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, তিনি সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’ গ্রন্থটিকে আবৃত্তির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এবং এখনও ওই বই থেকে নিজে আবৃত্তি করেন। খোলা মাঠে হোক বা প্রেক্ষাগৃহে, যেখানেই হোক, শ্রোতারা খুব উৎসাহভরে কবিতা শোনেন। সুতপা বললেন, “ওই বইয়ে যেটুকু মেসেজ কবি দিয়ে গেছেন বিশেষত ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার… ’, ঠিকই তো, যে সমাজের মধ্যে আমরা বাঁচছি সেই সমাজ তো আমরা শিশুকে দেখাতে চাই না, এখনও তাই এই কবিতা প্রাসঙ্গিক। তারপর ‘একটি মোরগের কাহিনী’ কী করুণ ভাবে বলেছেন সুকান্ত। আজ ‘রানার’ গান তো হয়ই, যদি কবিতার মতো করে পড়া হয়, তা হলেও যে কী অসাধারণ হতে পারে, তা ভাবাই যায় না। আজ চিঠি তো চলে গেছে। মুঠোফোন চিঠি কেড়ে নিয়েছে। রানারের দুঃখদুর্দশার সঙ্গে জুড়ে গেছে বাড়ি বাড়ি চিঠি বিলি করার দিন। আমার কাছে যে সব ছাত্রছাত্রীরা আবৃত্তি শিখতে আসে, তাদের আমি সুকান্তের কবিতা শেখাই।”
‘অখ্যাত কবিরা, যাঁরা তেমন নাম করেননি, এমন কবিরা অনেকেই কবি সুকান্তকে সেভাবে গুরুত্ব দিতে চান না। এটা একধরনের কবিদের মানসিকতা, কিংবদন্তিদের প্রতি এক ধরনের উদাসীনতা দেখানো।’ এ-কথা বলছিলেন কবি জয় গোস্বামী। তাঁর সঙ্গে সুকান্তের পরিচয় বাল্যকাল যখন শেষ হচ্ছে, তখন থেকেই। সেই সময় কবিতা খুব আবৃত্তি হত। পরে সেই চলটা কমে আসে। কমে এলেও আবারও ফিরে আসেন সুকান্ত।
অন্যদিকে বাচিক ও আবৃত্তিশিল্পী রায়া ভট্টাচার্য বলছিলেন, “কবি সুকান্ত তাঁর কবিতায় একটি স্বতন্ত্র ধারার ছাপ রেখে গেছেন বাংলা সাহিত্যে। এটা আজও অনস্বীকার্য। উনি ইতিহাসের নানা দিক দেখেছেন। সে কী অস্থির সময়! যখন সুকান্ত জনমানসের কবি হয়ে উঠলেন। আমি সুকান্তের একটি কবিতা তো বহু জায়গায় পাঠ করেছি। এ-বছর যদি ডাক আসে সুকান্তের একশো বছরে কবিতা পাঠ করব । আমি যে কবিতাটি খুব ভালবেসে আবৃত্তি করতাম তা হল ‘প্রিয়তমাসু’। এই কবিতাতেও রয়েছে এক সীমান্তপ্রহরী মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিন না দেখা পাওয়া প্রিয়ার কাল্পনিক কথোপকথন। এখানেও রয়েছে বঞ্চিত শোষিত এক মানুষের প্রিয় মিলনের করুণ আর্তি। আজও ভাবলে মন খারাপ হয় যে, কী এক অসাধারন প্রতিভা অসময়ে কিশোর বয়সে চলে গেল। একটা কথা না বললেই নয়, সুকান্ত যেসব ইতিহাসের ওপর আলোকপাত করেছিলেন সেইসব সমস্যা বদলায়নি।” রায়ার পাল্টা প্রশ্ন, ‘হয়তো দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু দুঃখ, দারিদ্র জীর্ণ মানুষের জীবন কি বদলে দিতে পেরেছে স্বাধীনতা? এই প্রতিকার হীন স্বাধীনতার স্বপ্ন কি সুকান্তের মতো সমাজ সচেতন কবি মানুষ দেখেছিলেন?’
সুকান্তের কবিতা যে আজও গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো জনপ্রিয়, সে-কথা শোনালেন আজকের প্রজন্মের নব্য আবৃত্তিকার ও বাচিকশিল্পী সাম্য কারফা। তাঁর বক্তব্য, কবি সুকান্তর কবিতা এখনও সময়োপযোগী। শোষকের মুখোশ বদলে গেছে, মুখগুলো একইরকম আছে। শ্রেণিশত্রু বলতে কবি যাদের বুঝিয়েছেন, তারা একইভাবে রয়ে গিয়েছে। কর্পোরেট অফিসে নিচুতলায় যারা কাজ করে, তারাও শ্রমিক, কৃষকদের মতোই, আজ শোষিত। তাই সুকান্তের কবিতা ওঁদের কবিতা। আবৃত্তির পর হাততালি পড়ে।
বয়সে প্রবীণ, এক জন উঁচুদরের আবৃত্তি ও বাচিকশিল্পী অবশ্য জানালেন, তিনি সুকান্তের কবিতা পাঠ বা আবৃত্তি করেন না। কারণ কবিতাগুলি অপরিণত এবং অল্পবয়সিদের ভাল লাগার মতো হলেও কবিতার মধ্যে কাঁচা বয়সের সীমাবদ্ধতা আছে। যা সেই বিখ্যাত বাচিকশিল্পীর পছন্দ নয়।
‘অখ্যাত কবিরা, যাঁরা তেমন নাম করেননি, এমন কবিরা অনেকেই কবি সুকান্তকে সেভাবে গুরুত্ব দিতে চান না। এটা একধরনের কবিদের মানসিকতা, কিংবদন্তিদের প্রতি এক ধরনের উদাসীনতা দেখানো।’ এ-কথা বলছিলেন কবি জয় গোস্বামী। তাঁর সঙ্গে সুকান্তের পরিচয় বাল্যকাল যখন শেষ হচ্ছে, তখন থেকেই। সেই সময় কবিতা খুব আবৃত্তি হত। পরে সেই চলটা কমে আসে। কমে এলেও আবারও ফিরে আসেন সুকান্ত।
জয়ের কথায় জানা যায়, ১৯৮৮ সালে জন্ম লেখক সম্বিত বসুর। সুকান্তের জন্মকালের সঙ্গে বেশ একটু ব্যাবধানই আছে। তবুও সম্বিতের একটি লেখায় বন্ধু অরুণাচল বসুকে সুকান্তর হাতে লেখা একটি চিঠি জায়গা করে নিয়েছে। তার মানে, সুকান্ত তাঁর নিজস্ব সময়কে পার হয়ে আধুনিক কালে এসে পরেছেন। এখন আবার সুকান্তচর্চার চল হয়েছে। সুকান্তের কাব্যগ্রন্থ ‘ঘুম নেই’-এর নামকরণের খুব প্রশংসা করেন জয় । প্রশংসা করেন সুকান্তের গদ্য ছন্দ ও পদ্য ছন্দে লেখা কবিতারও। তাঁর মতে, আজকালকার পাঠকদের কাছে সুকান্তের কবিতার নতুন করে মুল্যায়ন হচ্ছে।

সুকান্তের যে এখনও আবেদন একইরকম, তা প্রমাণ করে এই ২০২৬ সালে অপর্ণা সেন নিবেদিত ছবি ‘অদম্য’। পরিচালক রঞ্জন ঘোষ। সুকান্তের কবিতায় যে সংগীতগুণ আছে, তা আমরা আগে থেকেই জানি। এই ছবিতেও একটি দেশলাই কাঠি গান হয়ে ওঠে। কবির ‘দেশলাই কাঠি’ কবিতা অবলম্বনে এই ছবির নায়কও একচিলতে বারুদের মতো অপশাসনের বিরুদ্ধে আগুনের শিখা হয়ে জ্বলে ওঠে। আবার তার বিদ্রোহী সত্তা বারুদের মতো নিভেও যায়। কিন্তু রেখে যায় আগুনের রেশ। সেই আগুন বুকে নিয়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে তার আর-এক কমরেড। শিরদাঁড়া টানটান করে দেখার এই ছবি আসলে তো সুকান্তের প্রতিবাদী ভাবনা রূপকেরই প্রজ্বলিত বিস্তার।
কবি মন্দাক্রান্তা সেন মনে করেন, এই মুহূর্তে দেশের এবং বিশ্বের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অনেক প্রতিবাদের কথা বলার আছে। আমাদের লড়াই এখনও চলছে। এই সময় সুকান্তের মতো প্রতিবাদী কবির আরও অনেক বেশি দরকার ছিল। সুকান্ত যদি এই কঠিন সময়ের সাক্ষী হতেন, তা হলে আরও অনেক বেশি প্রত্যক্ষ প্রতিবাদের লেখা লিখতেন। হয়তো গল্প, উপন্যাসও লিখতেন।
ঠিক যেমন ভারতের স্বাধীনতা লাভের প্রহসনটি কবি সুকান্তের দেখা হয়নি। ১৯৪৭ সালের মে মাসেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কত প্রাণ বলিদানের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা! কিন্তু তথাকথিত স্বাধীনতা পেতে গিয়ে দেশভাগের ট্র্যাজেডি, সাম্প্রদায়িক হানাহানির রক্তাক্ত রূপ কবিকে দেখতে হয়নি। এইটুকুই কবি সুকান্তের সৌভাগ্য। বৃহত্তর অর্থে।
১৫ আগস্ট সুকান্তের জন্ম। আর সেইদিনই ভারত স্বাধীন হল। এই কাকতালীয় তারিখের মিলটুকু আমাদের স্বাধীনতাবোধের আখর হয়ে থাকুক।




