নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত সচেতনভাবে অভিনয় ও নাট্যের সঙ্গে জড়িত হন শ্যামল ঘোষের ‘নক্ষত্র’ নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে। তার আগে একটি দলের সঙ্গে নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত যুক্ত ছিলেন বটে, কিন্তু সেই দলে তাঁর ভূমিকা খুব একটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না। সেই দলে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে পরিচিত মুখ ছিলেন সমরেশ মজুমদার। সমরেশ মজুমদার ও সুব্রত ভট্টাচার্য ছিলেন সমসাময়িক দুই বন্ধু, ওঁরা একটি দল খোলেন ‘শতকর্মী’ নামে। সেই দল, বলা যায়, খানিকটা ‘অ্যামেচারিশ’ ছিল। সেই দলে খুব একটা গঠনমূলক ভূমিকায় ছিলেন না নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত। নাটকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার, অভিনয়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তিনি যান ‘নক্ষত্র’-তে। সেখানে ‘ক্যাপ্টেন হুররা’-য় ফান্টুস বলে একটি চরিত্র তিনি করেন, পরিচিতি ও প্রশংসাও পান।
একটা জিনিস মাথায় রাখার, সময়টা ছিল সাতের দশক। সেসময় বাদল সরকারের ভিন্নধর্মী থিয়েটার প্রয়াস যেমন রয়েছে, তেমনই মোহিত চট্টোপাধ্যায় কবিতা থেকে ভিন্নধর্মী নাটকে পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন। থিয়েটারে সেই সময় কিন্তু কবিতা ও নাটকের মেলবন্ধনের এই ক্ষেত্রটায় সাফল্য পেয়েছিলেন শ্যামল ঘোষ, অভিনেতা-নির্দেশক। সঙ্গে ছিলেন মমতা চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ এবং নীলকণ্ঠ সেনগুপ্তও। এলটিজি, নান্দীকার এদের সঙ্গে কবি-সাংস্কৃতিক কর্মীরা যতটা সম্পৃক্ত ছিলেন, শ্যামল ঘোষ ও ‘নক্ষত্র’-র সঙ্গে সেই সংযোগ আরও বেশি ছিল। নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত সেই দলে ছিলেন।
১৯৭২ সালে নিজের দল করলেন নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত, ‘থিয়েটার কমিউন’। ১ জুলাই। দল তৈরি করার সময় ওঁর দৃষ্টিভঙ্গিটা যেমন বুঝেছিলাম, যে উনি থিয়েটারটা করতে চাইছেন, অনেকটাই আবেগ থেকে। সেই আবেগে কিন্তু বাংলা মৌলিক নাটক, স্বদেশি নাটক করার চাহিদা আলাদা করে ছিল না। সেসময় জাতীয় নাট্যভাবনার কথা বারবার করে বলছেন শম্ভু মিত্ররা। তিনি ব্যতিক্রমী নাটক প্রথম থেকেই করতে চেয়েছেন। যেমন, উইলিয়াম সারোয়ানের উপন্যাস “ট্রেসি’জ টাইগার” অবলম্বনে ‘বিভুর বাঘ’ ছিল ওঁর প্রথম নাটক। তারপর জোসেফ হেলারের ‘উই বম্বড ইন নিউ হেভেন’ অবলম্বনে করলেন ‘পরবর্তী বিমান আক্রমণ’, এই নাটকের অনুবাদ করেছিলেন নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত ও তরুণ ঘটক। তথাকথিত বাস্তববাদ বা স্বভাববাদ থেকে ‘বিভুর বাঘ’ একটু আলাদাই ছিল, কিছুটা মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের কিমিতিবাদ অনুসরণেই।

আরও পড়ুন : নাট্যানুরাগী রামকিঙ্করকে কতটা চিনি আমরা?
লিখছেন সায়ন ভট্টাচার্য…
‘থিয়েটার কমিউন’-এ ছিলেন সুব্রত ভট্টাচার্য, তরুণ ঘটক (স্পেনীয় সাহিত্যের অনুবাদক হিসেবে পরবর্তীতে বিখ্যাতও হন)-রা। এঁদের তুলনায় নীলকণ্ঠ সেনগুপ্তর বয়স কম হলেও, তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমি ৬ বা ৭ জুলাই যোগ দিয়েছিলাম, ১৯৭২-এই। তা সত্ত্বেও আমি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মর্যাদা পেয়েছিলাম, মনে পড়ে।
নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত একেবারেই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। ওঁদের ঘরে শোওয়ার জায়গার এতটাই সংকোচন ছিল, যে বাইরে, ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে তিনি এককালে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর অসম্ভব খিদে ছিল, প্যাশন ছিল নাটক নিয়ে। যেমন, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি ‘মারা সাদ’ করেছিলেন। সেই নাটক নিয়ে তখন যথেষ্ট আলোড়ন। যদিও সেই নাটকের অনুবাদ নিয়ে খানিক বিতর্ক ছিল। যেমন, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় খুব একটা পছন্দ করে উঠতে পারেননি সেই অনুবাদ। কিন্তু নতুন এক নাট্যকার হিসেবে সেই সময় নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত পশ্চিমি নাট্যভাবনার আধারেই ভাবছিলেন।

১৯৭৫ সাল থেকে ‘থিয়েটার কমিউন’ আস্তে আস্তে কল শো পেতে শুরু করে। সেই সময় আমার ওপর দায়িত্ব আসে, আমি লিখি ‘দানসাগর’, মুনশি প্রেমচন্দর গল্প থেকে। কিন্তু এই নাটক লেখা হয় একটা ভাল ছোটগল্পকে নাট্যরূপ দেওয়ার স্বার্থেই, ভারতীয় থিয়েটারের স্বার্থে আলাদা করে নয়। ‘দানসাগর’-এ সাফল্য আসে দু’রকমভাবে। একটা নাটকের জন্য, সেই নাটকে অভিনয় করতেন নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত ও দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়।
একটা কথা বলার, সেই সময় বাংলা নাটকে দু’টি বৃদ্ধের চরিত্রে দুই অভিনেতার অভিনয় আলোচিত হচ্ছিল। এক, ‘চাকভাঙা মধু’-তে জটার চরিত্র করতেন বিভাস চক্রবর্তী, আর ‘সাজানো বাগান’-এ বাঞ্ছারামের চরিত্র করতেন মনোজ মিত্র। এই দুই চরিত্রের অভিনয়কে অতিক্রম না করতে পারলে তিনি ‘দানসাগর’-এ বিশুর চরিত্র করতে চাইছিলেন না। এই শৈল্পিক প্রতিযোগিতায় কিন্তু তিনি সফলভাবে উতরে গিয়েছিলেন শেষাবধি। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, বাংলা নাটকে বিবিধ প্রলেতারিয়েত চরিত্র এসেছে বটে, কিন্তু লুম্পেন প্রলেতারিয়েত চরিত্র সেই তীক্ষ্ণতা নিয়ে আসেনি। বিশুর অভিনয়ে সেই অভাব পূরণ করেছিলেন নীলকণ্ঠদা।
আবদুল জব্বারের গল্প থেকে নাটক করেন, আবার ‘সধবার একাদশী’-ও করেন, আবার ‘জুলিয়াস সিজারের শেষ সাতদিন’-এর মতো নাটকও করেন। নীলকণ্ঠদা ব্যাপকভাবে রাজনীতি-সচেতন ছিলেন, সেকথা বলা যায় না। তবে ১৯৭৭-এর পালাবদলের পর থেকে নীলকণ্ঠদা ধীরে ধীরে পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান, রাজনৈতিক নাটক করতে শুরু করেন।

এরপর নীলকণ্ঠদা ক্রমে বাংলা নাটকের দিকে ঝোঁকেন। আবদুল জব্বারের গল্প থেকে নাটক করেন, আবার ‘সধবার একাদশী’-ও করেন, আবার ‘জুলিয়াস সিজারের শেষ সাতদিন’-এর মতো নাটকও করেন। নীলকণ্ঠদা ব্যাপকভাবে রাজনীতি-সচেতন ছিলেন, সেকথা বলা যায় না। তবে ১৯৭৭-এর পালাবদলের পর থেকে নীলকণ্ঠদা ধীরে ধীরে পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান, রাজনৈতিক নাটক করতে শুরু করেন। সেই সময় বা তার পর থেকে ‘থিয়েটার কমিউন’ একটু একটু করে স্তিমিত হয়ে পড়েন।
সত্তর দশকের রাগী যুবক, বাংলা নাটকে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত বা অসিত বসুদের কথা বিশেষভাবে উঠে আসে। অসিত বসুও তখন সদ্য ‘পিএলটি’ থেকে বেরিয়ে এসেছেন। কিন্তু যে-রাগ, যে-তেজ নীলকণ্ঠদার মধ্যে ছিল, তা আবার অসিতদার মধ্যে ছিল না। নীলকণ্ঠদা ‘গণদেবতা’, ‘পরশুরাম’ প্রভৃতি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। আমি মৃণাল সেনের থেকে শুনেছি, ওঁর অভিনয় নিয়ে বিদেশেও কথা হয়েছে। কিন্তু নীলকণ্ঠ সেনগুপ্তর প্রধান অবদান, সাতের দশকের ওই নানা পথের নাট্যান্বেষণের মধ্যে, নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত নিজের পথটা নিজে বেছে নিতে চেয়েছিলেন, এবং ‘থিয়েটার কমিউন’ তাই, নাট্য ইতিহাসের ওই পর্যায়ের উজ্জ্বল নাম হয়ে রয়ে গিয়েছে।



