বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হত ৮৭ বছর। রাহুল দেববর্মন। এই দেববর্মন পরিবারের সঙ্গে বাংলা ও বাঙালির যোগ বহুদিনের আর সেই যোগ মাটি আঁকড়ে থাকা শিকড়ের টান। নদীমাতৃক বাংলার লোকসংগীতের সুরকে বুকে করে শচীনকর্তা এসেছেন কলকাতায়, সেখান থেকে বোম্বাই। গত শতকের তিনের দশকের শেষ থেকে শুরু হয় সুরকার হিসেবে তাঁর জয়যাত্রা।
বাংলা আধুনিক গানের জগতে রাহুলদেবের এসে পড়ার নেপথ্যেও যে পরোক্ষ হাত ছিল শচীন দেববর্মনের, তা তর্কাতীত। ১৯৬৫ সাল অবধি শচীন দেব বাংলা আধুনিক রেকর্ড করেছেন স্ত্রী মীরা দেববর্মনের রচনায়, নিজের সুরে। কিন্তু তারপরেই ১৯৬৬ সাল থেকে দেখা যাচ্ছে, তিনি আর বাংলা গান রেকর্ড করছেন না। হয়তো মানসিক বা শারীরিক বা উভয় কারণেই খানিক পর্যুদস্ত। পুত্র রাহুলদেবের হাতে সংগীতের উত্তরাধিকার আসে মোটামুটিভাবে ১৯৬৯-’৭০ সালে। জানা যায়, হিন্দি ছবি ‘আরাধনা’-র কাজ চলাকালীন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে ছবির কিছু গান রেকর্ড করানোর দায়িত্ব নেন রাহুল দেববর্মন।
আর তার পরে-পরেই ১৯৭০ সালে তাঁর প্রথম বাংলা ছবিতে সুরারোপ– ছবির নাম ‘রাজকুমারী’। গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। এরপর রাহুল দেববর্মন প্রায় বত্রিশটি প্রকাশিত বাংলা ছায়াছবিতে সুরারোপ করেছিলেন, যার মধ্যে আছে ‘অনুসন্ধান’, ‘ত্রয়ী’, ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ প্রভৃতি ছবি, কিন্তু বাংলা আধুনিক গানের ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ এই ছবিতে সুরারোপের চেয়ে অনেক বড়। ১৯৭০ সালের তিন বছর আগেই তাঁর সুরে বাংলা আধুনিক গান রেকর্ড করেছিলেন কিশোরকুমার— ‘একদিন পাখি উড়ে যাবে যে আকাশে’। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সুরে আশা ভোঁসলের দু’টি গান, ‘যাব কি যাব না’ এবং ‘এই এদিকে এসো, কথাটি শোনো’— প্রকাশিত হয়েছিল পুজোর গানের ডালিতে। ১৯৬৯ সালে নিজেই গেয়ে শুনিয়েছিলেন ‘মনে পড়ে রুবি রায়’ আর ‘ফিরে এসো অনুরাধা’।
আরও পড়ুন : সলিল চৌধুরী-বাসু চ্যাটার্জী, এক অনন্য সম্পর্ক! লিখছেন অনিরুদ্ধ ভট্টাচাৰ্য…



পাশ্চাত্যের সুর, তাল, ছন্দের সঙ্গে দেশীয় সংগীতের মিশেলে তৈরি হয়েছিল গানগুলো। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেনি রাহুল দেববর্মনের গানের তরী। কখনও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার , কখনও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় বা শচীন ভৌমিক কিংবা স্বপন চক্রবর্তী অথবা মুকুল দত্ত লিখেছিলেন গানের কথা। নিজের মতো করে বিভিন্ন সংগীতধারার আঙ্গিক আত্মীকরণে সুরারোপ করেছিলেন সেইসব রচনায়। তৈরি হয়েছিল ‘মনে পড়ে রুবি রায়’, ‘চোখে চোখে কথা বলো’, ‘সে তো এল না’, ‘যেতে দাও আমায় ডেকো না’, ‘ফিরে এসো অনুরাধা’, ‘ফুলে গন্ধ নেই’, ‘মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো’, ‘কথা দিয়ে এলে না’, ‘সন্ধ্যাবেলায় তুমি আমি বসে আছি দুজনে’, ‘পোড়া বাঁশি শুনলে’, ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’— এরকম অসংখ্য গান, যা বহুশ্রুতি ও কালের অতিক্রমণেও বাঙালি শ্রোতার মনে এখনও উজ্জ্বল। ‘ছন্দচাতুর্যে, বাঁশি ইত্যাদি যন্ত্রের প্রয়োগে , তালবাদ্যের ব্যবহারে রাহুলদেব স্বভাবতই স্বতন্ত্র’, লিখছেন সংগীত-সমালোচক স্বপন সোম।
আসলে সংগীতের যে আবহে বড় হয়েছিলেন রাহুল দেববর্মন, তার প্রেক্ষিতে কলকাতায় তাঁর সুরকার বা গায়ক হিসেবে পদার্পণ মোটেই অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া এই শহর তো তাঁর একান্ত আপনার— এ শহর জানে তাঁর প্রথম সব কিছুই!

কিন্তু এ-শহর যা জানত না, তাই একদিন তিনি নিজেই জানান দিলেন কলকাতার এক রেকর্ডিং রুমের অন্দরে। প্রয়াণের ঠিক একবছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর দু’টি বাংলা অ্যালবাম, যার মধ্যে অন্যতম ইন্দ্রাণী সেনের কণ্ঠে ‘সুরে সুরে জাল বোনা’। সবসুদ্ধ আটখানা গান রেকর্ড করা হয়েছিল এই অ্যালবামের জন্য।
অ্যালবামটির রেকর্ডিং-এর স্মৃতি এখনও খানিক থেকে গেছে ইন্দ্রাণী সেনের মনে। প্রথমে কথা ছিল মুম্বইতে হবে রেকর্ডিং। কিন্তু অজানা, অচেনা শহরে মন সায় দেয়নি যেতে, তাই পঞ্চম নিজেই পৌঁছে গিয়েছিলেন কলকাতায়। ইন্দ্রাণীর অ্যালবামে বেশ কিছু গান পুরনো হিন্দি গানের সুর ও বাংলা কথায় গাওয়া, যার গীতিকার ছিলেন সঞ্জয় চক্রবর্তী এবং শ্যামল সেনগুপ্ত। দুটো গানে ছিল নতুন সুর, এবং এই অ্যালবামটির দু’টি ভার্সন প্রকাশ করেছিল কনকর্ড রেকর্ডস। দ্বিতীয় ভার্সনটি প্রকাশিত হয় রাহুল দেববর্মন চলে যাওয়ার পরে। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছিল একটি নতুন ট্র্যাক, যেখানে ইন্দ্রাণীকে গান গেয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি নিজে!
নিপাট ভদ্র মানুষ আরডি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইন্দ্রাণী বলেছেন, স্টুডিওর দরজা ঠেলে ঢুকলেন মানুষটি— তসরের পাঞ্জাবি গায়ে, সামনে এসে করজোড় করে বললেন, ‘আমার নাম রাহুল দেববর্মন।’ ওঁর মতো অত বড় এবং জনপ্রিয় একজন শিল্পী এত বিনয়ের সঙ্গে নিজের পরিচয় দিচ্ছেন— অকল্পনীয়! তারপর গানের রেকর্ডিং শুরু হল। ইন্দ্রাণীর গানের খুব তারিফ করলেন। খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন বাকি শিল্পীদেরও। যেখানে সংশোধন করা একান্ত প্রয়োজন ছিল, তা করলেন। নিজে পারকাশন বাজিয়ে দেখালেন, বোঝালেন। এত দ্রুত বাজিয়েছিলেন, দেখে থ হয়ে গেল সবাই। আর তারিফ করার ভাষা তাঁর একটিই, ‘ফার্স্ট ক্লাস!’
স্টুডিও ছাড়ার আগে বলেছিলেন, এখন তো আর আমার সেরকম নাম নেই— এখন সবাই ভাবে আমি ফ্লপ মাস্টার, আমার গান করা ছবি তো আর খুব একটা হিট করে না— তা যদি আপনি কখনও আসেন, আমি আরেকবার চেষ্টা করব…
সেই সুযোগ আর আসেনি। ১৯৯৪ সালের ৪ জানুয়ারি ভোর রাতে চলে যান রাহুল দেববর্মন। একটা লম্বা সময় প্রায় নির্বাসিত ছিলেন কাজের জগৎ থেকে। শিল্পীর কাছে তাঁর সৃষ্টিই সবচেয়ে বড় জিনিস, তাঁর প্রাণবায়ু। ইন্দ্রাণী সেনের জন্য তৈরি করা এই গানগুলো আজও বেঁচে আছে, সেই দুঃখদিনের ইতিহাস বুকে করে, হিন্দি ছবির ক্ষেত্রে রাহুল দেববর্মনের শেষ কাজ ‘১৯৪২– আ লাভ স্টোরি’-র থেকে যার মূল্য কোনও অংশে কম নয় !


